এলোমেলো…

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সিনিয়র সিটিজেনের তকমাটা পাকাপাকি ভাবে এঁটে বসবে গায়ে, তবে আশার কথা শুনছি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ঠিক করেছে যে ৭৫ বছর বয়স না হ’লে নাকি কাউকে বৃদ্ধ বলা হ’বে না ! সে যাই হোক, শীঘ্রই মাস মাইনে বন্ধ হয়ে পেনশন চালু হবে – পেনশনার কথাটা’র মধ্যে কোথাও একটা সামান্য শ্লেষ লুকিয়ে থাকে যেন, ‘দেখ, লোকটা কেমন সরকারের পয়সায় বসে বসে খাচ্ছে…’ সকাল ন’টার মধ্যে তৈরী হয়ে অফিস যাওয়ার তাগিদটা থাকবে না আর । জুনিয়র সহকর্মীরা আর এগিয়ে এসে বলবে না, ‘গুডমর্নিং স্যার, কেমন আছেন ?’, কেউ কেউ আবার আমার তোলা ছবি ও লেখার ভক্ত, কোনও জায়গায় বেড়াতে গেলেই তারা বলে, ‘ছবি কবে দেখতে পাবো? আর ট্র্যাভেলগ?’ পাঁচতলায় আমার অফিসের বিরাট কাঁচের জানালা থেকে উদাত্ত আকাশ, দক্ষিণ দিল্লীর শ্যামলিমা, দূরে কুতুব মিনারের চূড়ো আর ধীর গতিতে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যাওয়া উড়োজাহাজ – এদের কিন্তু বড়ই মিস করবো আমি !

কিছুদিন বাদে কোনও মিটিঙে জোরালো বক্তব্য রাখতে হবেনা আর, কোট-টাই পরে চমক লাগানো প্রেজেন্টেশন দেওয়ার প্রয়োজনও ফুরোবে তখন । সরকারি চাকরিতে ‘ইঁদুর দৌড়’ ছিল না ঠিকই, কিন্তু দৌড়টা ছিল ভালো রকমই । দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আর ছুটে বেড়াতে হবে’না নানা কাজে – দেশটাকে চষে ফেলা ‘পায়ের তলায় সর্ষে’তে অভ্যস্ত আমি হয়ত একটু মুষড়ে পড়ব তখন ।

বুঝতেই পারছি ধীরে চলার সময় এসেছে কাছে, বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা বাস আর ছুটে গিয়ে ধরতে ইচ্ছে করেনা, মনে হয় কি হবে তাড়াতাড়ি করে, পরের বাসটা ধরব না হয় । আর মনটা যেন আগের থেকে অনেক বেশী উদার হয়ে গেছে, রেস্তোরাঁয় বিল চুকিয়ে ১০০-২০০ টাকা টিপস দিয়ে দিই অনায়াসেই, অফিসের ড্রাইভারকে একটু দেরীতে ছাড়লে খুব সহজেই ১০০ টাকা দিয়ে বলি, ‘কিছু খেয়ে নিও ভাই’ । কেউ খারাপ ব্যবহার করলে প্রতিবাদ করি না চেঁচামেচি করে, মুচকি হেসে সরে যাই । অন্যের অনেক অন্যায়ই ক্ষমা করে দিই হাসিমুখে, আগের মত তার ভুল প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগিনা আর ।

ভালো লাগে, খুব ভালো লাগে আমার পরবর্তী প্রজন্মকে – আমার সব ঝকঝকে ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নী, আমার বন্ধুদের ছেলে-মেয়েরা, ছেলে-মেয়ে’র বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে ফেসবুকের দৌলতে যোগাযোগ বেশ নিয়মিত, তাদের দেখে নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে । তাদের আশা-আকাঙ্খা, সাফল্য, জীবনের বিভিন্ন মাইলফলক বড় আনন্দ দেয় আমায়, কত কিছুই যে শেখার আছে তাদের কাছ থেকে… বেশ কয়েকজন আবার মজার কমেন্ট লেখে আমার পোস্ট করা ছবিতে বা লেখায়, খুশীতে মনটা ভরে ওঠে !

অনেকেই বলেন রিটায়ারমেন্টের পর খুব ঘুরে বেড়াবেন আপনারা । আমি অবসর নিলেও স্ত্রী’র চাকরি এখনও বেশ কিছুদিন বাকি; পদোন্নতির সঙ্গে তার দায়িত্বও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে । তার ছুটিছাটার ব্যাপারটা মাথায় রেখে তবেই না ঘোরাঘুরি । আর সেই বিখ্যাত প্রবাদ – সময়, সঙ্গতি আর দৈহিক ক্ষমতার চিরাচরিত সংঘাত । কম বয়সে সময় ছিল, ক্ষমতা ছিল কিন্তু সঙ্গতি ছিলনা, মাঝ বয়সে সঙ্গতি হয়ত ছিল, ক্ষমতাও ছিল কিন্তু সময় ছিলনা একদম আর এখন সঙ্গতি আছে, সময়ও আছে অফুরাণ কিন্তু ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন ! একটা ‘Bucket List’ তৈরি আছে আমার, সব সময়ে কাছেই থাকে সেটি – স্বপ্নে ও টিভি’র ট্র্যাভেল চ্যানেলে ভেসে যাই দেশ-দেশান্তরে । কিন্তু স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হ’বে, সে হিসেবের ছক কষে রেখেছেন স্বয়ং বিধাতা ।

জন্মালে যেমন একদিন মরতে হবে’ই, কালের নিয়মে অবসর গ্রহণও তাই অবশ্যম্ভাবী । ব্যস্ত কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে ভালো কিছু করার সুযোগ পাব আশাকরি । মাথা খাটিয়ে কিছু হালকা কাজকর্ম করতে ভালোই লাগবে । অনেক বই পড়া হয়নি আমার, রবীন্দ্রনাথও পড়িনি সেভাবে – ভালো কিছু সাহিত্য পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি । নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে গানও শোনা হয়নি তেমন, মন ভালো করে দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীতই যথেষ্ট । আশা করব লেখালিখির জন্য সময়টা আরও একটু বেশী পাওয়া যাবে – ভ্রমণ না করলে তো ভ্রমণকাহিনী লেখা যাবেনা, তাই অন্য ধরণের লেখা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে একটু-আধটু । আর একটা জিনিস বেশ সিরিয়াসলি শুরু করতে চাই, ইন্টারনেট থেকে রেসিপি খুঁজে দেশ-বিদেশের পদ রান্না, অপরের জন্য রান্না করতে আমার অবশ্য বেশ ভালোই লাগে ।

সবচেয়ে বড় কথা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিটা আমার বজায় থাকে যেন, মনোভাব থাকে অসূয়া মুক্ত… পরমপিতার কাছে প্রার্থনা জানাই সবার কাছে যেন অপ্রয়োজনীয় না হয়ে যাই…

Advertisements

নায়কোচিত…

সুদীর্ঘ কর্মজীবনে এই বিশাল দেশটা’র অনেকাংশই ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার – উত্তর-পূর্বে মায়ানমার সীমান্তবর্তী মনিপুরের মইরাং থেকে পশ্চিমে পাকিস্তান সীমানায় কচ্ছের কালাডুঙ্গর, উত্তরে হিমাচল থেকে দক্ষিণে তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম ও কেরালায় ত্রিবান্দ্রাম… এক সময়ে প্রতি সপ্তাহেই বেরিয়ে পড়েছি দিল্লী ছেড়ে, পাড়ি দিয়েছি দেশের নানা শহরে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজেক্টের কাজে, সেমিনার/কনফারেন্সে পেপার পড়তে । স্বভাবতই বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে একই বিমানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়েছে – সুনীল গাওস্কর, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, গিরিশ করনাড, জীতেন্দ্র, প্রণব মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢড়া, রাজনাথ সিং… তালিকাটি বেশ দীর্ঘই । কখনই আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যাইনি, বরং সসম্ভ্রমে এঁদের এড়িয়ে গিয়েছি আমি । একমাত্র ব্যতিক্রম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় – উনি চলে যাওয়ার কয়েক মাস আগে ওঁর সঙ্গে দিল্লী বিমানবন্দরে দেখা হয়েছিল, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলাম আর বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার !

বছর দশেক আগের কথা – ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের বানিজ্য রাজধানী মুম্বাই-তে আয়োজিত হয়েছিল Composites নিয়ে তিনদিন ধরে এক বিরাট জাতীয় স্তরের conference-cum-exhibition । সে কনফারেন্সে আমাদের পেপার ছাড়াও exhibition-এ অংশগ্রহণ করেছিল আমাদের সরকারি সংস্থা । কনফারেন্স ডিনারের আয়োজন ছিল জুহু’র Sun-n-Sand হোটেলে – রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা, ডিনারের শেষে আমরা ফিরছি আই আই টি বম্বে’র গেস্টহাউসে, আমার সঙ্গে এক পুরুষ ও এক মহিলা সহকর্মী আর আই আই টি খড়্গপুরের এক মহিলা প্রফেসর । হোটেলের লবিতে সবশেষে গাড়িতে উঠছি আমি, হঠাৎ চোখের কোন দিয়ে দেখি কিছু দূরে মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসছেন স্বপ্নের নায়ক ! অল্পবিস্তর পানীয়ের প্রভাবে কিনা জানিনা বেশ জোরেই চেঁচিয়েছি আমি, ‘ধর্মেন্দ্র’ আর গাড়ির দরজা খুলে একলাফ দিয়ে ছুটেছি নায়কের দিকে; শুনতে পাই সহকর্মী’র ব্যাকুল ডাক, স্যার, স্যার, কি করছেন ! একফুট দূরে ধর্মেন্দ্র, আমি হাতটা বাড়িয়ে বলি, ‘Sir, it’s just great to see you. I’m an avid fan of yours. We’ve grown up watching your films.’ ভুবনভোলানো হাসিতে মুখ ভরিয়ে কাছে টেনে নিয়ে নায়ক বলেন, ‘What’s your name?’ আমি জবাব দিলে বলেন, ‘Soumitra, oh you’re a Bengali’। একটু থেমে বলেন, ‘You know whatever I’m today, it’s all because of you, my dear viewers’! এত বিখ্যাত মানুষের এরকম মন ভেজানো কথা – আমি একেবারে অভিভূত, নায়ককে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে আসি আমি । আমার সহকর্মীরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে – তারা খুব ভয়ে ছিল নিশ্চয়ই হোটেলের বাউন্সার স্যারকে গলাধাক্কা দেবে, আর বেশ কিছু কটু কথা শোনাবে !

 

নানা রঙের দিনগুলি…

ছোটবেলার পূজো মানেই নতুন জামাকাপড়ের প্রলোভন – খুব ছোটবেলায় মায়ের হাতমেশিনে সেলাই করা জামা-প্যান্টই ছিল আমার বরাদ্দ । এখনও মনে আছে মা একটা সাদা কাপড়ের ওপর সরু সরু নীল বর্ডার বসিয়ে বেশ চওড়া কলারওয়ালা একটা sailor suit তৈরি করে দিয়েছিলো – সেটা ছিল এক সময়ে আমার অতিপ্রিয় পোষাক । একটু বড় হ’তেই অবশ্য রেডিমেড জামা ও দর্জির তৈরি প্যান্ট পরা শুরু হ’ল… জন্মদিন বা নববর্ষ উপলক্ষ্যে নতুন জামাকাপড়ের বিশেষ বালাই ছিলনা আমাদের, একমাত্র সন্তান হ’লেও পূজোতেও বাবা’র কাছ থেকে একটাই ভালো শার্ট ও প্যান্ট পাওয়া যেত । তবে কিনা আমার বাবাও ছিলেন এক ভাই আর মা’ও মামার বাড়িতে একই মেয়ে, অতএব আমার পিসীদের আমিই একমাত্র ভাইপো ও মামারবাড়িতে একমাত্র ভাগ্নে হওয়ার সুবাদে সব মিলিয়ে পূজোর সময় চার-পাঁচটা নতুন জামাকাপড় হয়েই যেত আমার !

আমাদের ছোটবেলায় সবই ছিল সুতীর কাপড়, ক্লাস সেভেন-এইটে উদয় হ’ল Terylene (polyester) ; সে এক অদ্ভুত কাপড় – মাঢ় দিতে হয়না, ইস্ত্রী করারও দরকার নেই, ঠান্ডা জলে কাচা যায়… টেরিলীন নতুন বাজারে এসেছে, ভালো সুতীর কাপড়ের চেয়েও তার অনেক দাম বেশী ! একটু বায়না করে একটা টেরিলীনের শার্ট হ’ল পূজোর সময়ে বাবার ঔদার্যে … সে বেশ ফ্যাশনেবল্ ব্যাপার । এই টেরিলীন নিয়ে একটা মজার ঘটনা – আমার বড়মামা টেরিলীনের শার্টে ভাল ক্রিজ হয়না, এই বলে ইস্ত্রী একটু গরম করে চালিয়েছেন; ব্যাস, শার্টের কাপড় একেবারে গলে গিয়ে বিরাট গর্ত ! কিছুদিন বাদেই সবাই বুঝতে পারলে আমাদের মত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় টেরিলীন অতি বিরক্তিকর … হঠাৎ উদয় হয়ে হঠাৎই সে উধাও হ’ল ! আগমন হ’ল নতুন তন্তুর, Terene (polyester) ও সুতী মিলিয়ে Terrycot – সে বাজার দখল করল ভালোই; তবে এখনতো আবার ১০০% সুতীর রমরমা !

আর পূজোর সময়েই নতুন জুতো কেনা হ’ত – বাটা কোম্পানীর সেই বিখ্যাত স্লোগানটা মনে পড়ে এখনও, “পূজোয় চাই নতুন জুতো – Bata”। অবধারিত ভাবে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সময় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা – পায়ে ফোস্কা পড়ত যে নতুন জুতোয় ! ক্লাস নাইনে আমাদের একটু উড়ু উড়ু ভাব, বাটা কোম্পানী বার করেছে নতুন ডিজাইনের ‘Go Go’ জুতো, বেশ হিরো মার্কা চেহারা তার । আর আমিও গোঁ ধরেছি ওই গো-গো জুতোর জন্য, ২২-২৪ টাকার বেশ দামী জুতো সে সময়ে । একমাত্র পুত্রের আবদার, বাবাও মেনে নিলেন শেষমেশ ! আর সেই জুতো পরে একটু নায়কোচিত হাবভাবে আমি ঘুরে বেড়াই পূজো প্যান্ডেলে । সবচেয়ে দুঃখ হ’ত পূজোর সময় বৃষ্টি পড়লে, জলে-কাদায় নতুন জুতোর দফারফা হ’য়ে যেত একেবারে !

নীচু ক্লাসে আমাদের এক বিরাট আকর্ষণ ছিল দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত পূজাবার্ষিকী – রামধনু, মনিহার, বেনুবীণা, মন্দিরা… হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে বাবা’র কাছ থেকে পাওয়া যেত পূজোর সময় ওই বহু আকাঙ্খিত বইটি । হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট ও ময়ূখ চৌধুরির কার্টুনের জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে থাকতাম । আমি হয়ত তখন ক্লাস ফাইভ কিংবা সিক্সে পড়ি, বাবার সঙ্গে গিয়েছি আমার এক দিদুর (মায়ের নিজের মাসী) বাড়ি, চলে আসার সময় দিদু আমাকে দশটা টাকা দিয়ে বললেন পছন্দ মত কোনও বই কিনে নিতে । সেই মহামূল্যবান দশটাকা নিয়ে আমি ও বাবা কলেজ স্ট্রীট কফি হাউসে বেশ পেল্লায় সাইজের দু’টো চিকেন কবিরাজি কাটলেট খেয়ে, বাকি টাকা দিয়ে পূজাবার্ষিকী কিনে মহানন্দে বাড়ি ফিরি – সেই আমার কফি হাউসে প্রথম পদক্ষেপ…

আমরা যখন এইট-নাইনে পড়ি তখন বাজারে এলো ‘কিশোর ভারতী’ – কিছুদিনের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা পৌঁছালো তুঙ্গে । পরের দিকে কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী কিনলে, আমি কিনতাম শারদীয়া কিশোর ভারতী – কয়েকদিনের মধ্যেই বই পালটে দুটোই পড়া হয়ে যেত আমাদের । এছাড়াও ছিল মৌচাক ও সন্দেশ – সত্যজিত রায়ের লেখা প্রফেসর শঙ্কু, ফটিকচাঁদ এসব মনিমানিক্য পড়েছি সন্দেশে । আর প্রতিবছর শারদীয়া দেশে বেরোত ফেলুদা’র গোয়েন্দাকাহিনী – সে এক রোমাঞ্চকর উত্তেজনা ! স্কুল জীবনের একেবারে শেষধাপে আবির্ভাব হ’ল ‘আনন্দমেলা’র; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু মন কেড়ে নিল খুব শীঘ্রই ।

ছোটবেলাতেই কলকাতা ছেড়েছি আমি – বাবা’র চাকরি খড়্গপুরে; প্রতি পূজোয় কিন্তু আমাদের কলকাতা যাওয়া চাইই । তাই ষষ্ঠী-সপ্তমী দু’দিন বরাদ্দ ছিল খড়্গপুরের জন্য; পূর্বে ইন্দা থেকে পশ্চিমে সুভাষপল্লী অবধি গোটা দশেক ঠাকুর দেখা তো হয়েই যেত – তালবাগিচা, ডিভিসি, খড়িদা এসব প্রত্যন্ত অঞ্চল বাদ পড়ে যেত । খড়্গপুরের সবচেয়ে বনেদী পূজো গোলবাজারের দুর্গা মন্দিরে, পুরোনো জমিদারবাড়ির আদলে তৈরি বিরাট ঠাকুর দালান – মন্ডপের সামনে সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গন, তার অপর প্রান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ । ডাকের সাজে পুরোনো ধাঁচের প্রতিমা; সন্ধ্যারতির পর ঢাকের তালে তালে ধুনুচি নাচ – দুর্গা মন্দিরের পূজোবাড়ি গমগম করত ! সেখানে গেলেই দেখা হ’ত স্কুলের কিছু বন্ধুর সঙ্গে আর আলোচনা শুরু হ’ত কে ক’টা ঠাকুর দেখল আর কোন ঠাকুরটা সবচেয়ে ভাল হয়েছে ।

অষ্টমীর দিন ভোরবেলা ফার্স্ট লোকাল ধরে কলকাতা, তখন আমাদের বাস শ্যামবাজারে ভূপেন বোস এভিনিউতে । কলকাতায় পূজোয় সবকালেই ভীড়, তা সে ভীড় ঠেলে এ প্যান্ডেল থেকে ও প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখা আমার মায়ের ঘোর নাপসন্দ্ । আমি ও বাবা মহা উৎসাহে বেরিয়ে পড়ি – আমাদের পাড়া’র শ্যামবাজার কেন্দ্রীয় সার্বজনীন দিয়ে শুরু, শ্যামপুকুরে বন্ধুদল, অল্প দূরেই বাগবাজার সার্বজনীনের সুপ্রাচীন পূজো ও বিরাট মাঠ জুড়ে মেলা, কুমারটুলি সার্বজনীন, জগৎ পার্কে অদ্ভুত ধরণের আর্টের ঠাকুর… এসব পেরিয়ে কলেজ স্কোয়ারে রমেশ পালের তৈরি দুর্গা প্রতিমা !

আর বিকেলে বেরিয়ে মানিকতলার কাছে বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব ও সিমলা ব্যায়াম সমিতি – যতদূর মনে পড়ে বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবে একবার প্রতিমা শিল্পী ছিলেন রমেশ পাল । রাস্তা বন্ধ করে বিরাট উঁচু প্যান্ডেল, বেশ ওপরে রাখা প্রতিমা’র নীচ দিয়ে লোক চলাচলের রাস্তা । বাবা আমাকে তুলে ধরে বলেন, ‘অসুরটাকে ভালো করে দ্যাখ !’ দেখি নিহত মহিষের পেল্লায় সাইজের মাথা দু’হাতে ধরে মা দুর্গা কে ছুঁড়ে মারতে উদ্যত অসুর, শ্যেণ দৃষ্টি হেনে দুর্গা নেমে আসছেন কৈলাশ পর্বত থেকে ত্রিশূল হাতে আর সিংহ লাফিয়েছে অসুরের দিকে । গদা হাতে গনেশ আর তীর ধনুক নিয়ে কার্ত্তিক ‘রণং দেহি’ মেজাজে এগিয়ে যাচ্ছেন, মা সরস্বতী ও লক্ষী পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরে । অসুরের ‘সিক্স প্যাক’ দেখার মত আর শরীরের শিরা-উপশিরা একেবারে অ্যানাটমির বই থেকে ধার করা, মুখে অতি হিংস্র অভিব্যক্তি, ভয়ঙ্কর ক্রুর চোখের দৃষ্টি ! এ ঠাকুর দেখতে উপচে পড়েছে ভীড়, মাইকে ঘন ঘন ঘোষনা, ‘নেবুতলা থেকে এসেছেন নেপাল ভৌমিক আপনি যেখানেই থাকুন…’

আমাদের ছোটবেলায় মহম্মদ আলী পার্কের অত কৌলীন্য ছিলনা । বাবা’র সঙ্গে আমার ঠাকুর দেখা সীমাবদ্ধ থাকত মূলত উত্তর কলকাতায়, দক্ষিণটা ছিল যেন অন্য এক রাজ্য ! তবে একবার কালীঘাটের সঙ্ঘশ্রী’র ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম মনে আছে । সমাজসেবী সঙ্ঘ, বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ও একডালিয়া এভারগ্রীন… এসব ঠাকুরের সঙ্গে আমার পরিচয় কলেজ জীবনে, দক্ষিণ কলকাতা’র বন্ধুদের সৌজন্যে । ১৯৮৪ সালে বন্ধুদের সঙ্গে সারা রাত ধরেও ঠাকুর দেখেছি – সেটাই কলকাতায় আমার দেখা শেষ পূজো !

বিয়ের পরে বার বার ছুটে গিয়েছি ভোপালের পূজোতে । যাদবপুরে পড়াকালীন আমার স্ত্রী’র তখনই তার মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে একত্র হয়ে আনন্দের সুযোগ; প্রবাসে পূজোর আন্তরিকতা হাতছানি দিয়ে সরিয়ে নিত আমাদের কলকাতা’র জাঁকজমক থেকে ।

১৯৯০ সালে কলকাতা’র মায়াজাল ছিঁড়ে পাকাপাকি ভাবে আমাদের দিল্লী চলে আসা… কলকাতা‘র পূজো ছেড়ে এসেছি তেত্রিশ বছর আগে, যদিও সুনীলের সেই মর্মস্পর্শী ভাষায় বলতে পারিনি, ‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো, আমি বিষপান করে মরে যাব’… কিন্তু মাঝে মাঝে প্রিয় কবিতা বুকটা ভারী করে দেয় যেন !

এক বিরল ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে

সুদীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের চাকুরি জীবনে অনেক গুনীজনের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছে আমার । একজন প্রবাদপুরুষ যিনি আমাকে কর্মজীবনে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, তিনি আমাদের অতিপ্রিয় একাদশতম রাষ্ট্রপতি, ডঃ এ পি জে আব্দুল কালাম । কিছুদিন আগে ডঃ কালাম পার্থিব জগত থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন – মনে পড়ছে তাঁর শিশুসুলভ সারল্য ও মানবিক ব্যক্তিত্বের কথা ।

২০০১ সালে দিল্লীতে ডঃ কালাম প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসাবে কর্মরত, তিনি তখন ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অধীনস্ত আমাদের TIFAC-এরও চেয়ারম্যান । টাইফ্যাকের Advanced Composites Mission-এ আমাকে Mission Director নিযুক্ত করেছিলেন ডঃ কালাম । নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে অনেক সময়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হ’ত – সব সময় বলতেন সাধারণ মানুষের কাজে আসে এমন সব প্রোজেক্ট নিতে । নতুন প্রযুক্তির বিকাশে দেখেছি তাঁর অদম্য উৎসাহ ও প্রেরণা । কোনও প্রোজেক্টের বিশেষ সাফল্যে সরকারি নথিপত্রে তিনি প্রায়ই লিখে পাঠাতেন, ‘Delighted’, ‘Glad to note’ কিংবা ‘Well done’ – তাঁর এসব নোটিং আমাদের অসম্ভব উদ্বুদ্ধ করতো !

ডঃ কালামকে নিয়ে একটি বিশেষ ঘটনার কথা লিখছি আজ । ২৬শে জানুয়ারী ২০০১ ভারতের ইতিহাসে একটি কালো দিন – সেদিন গুজরাতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কবলে হয় প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত । ভারত সরকারের তরফ থেকে আমাদের ডাক পড়ল ভূমিকম্প পীড়িতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থার জন্য । আমাদের বিভিন্ন প্রোজেক্টে তৈরি composite material (সংমিশ্রিত উপাদান) দিয়ে কম খরচে অস্থায়ী বাড়িঘর নির্মাণের এক পরিকল্পনা অনুমোদিত হ’ল খুব তাড়াতাড়িই । আমরা ঠিক করলাম আগামী ছয়মাসের মধ্যে প্রায় ৪০০ টি বাড়ি ও ১২৫ টি ফাইবার গ্লাসের শৌচালয় তৈরি করব গুজরাতের কচ্ছে । শীঘ্রই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম প্রতিটি বাড়ি ও শৌচালয় ব্লকের নকশা, টাউনশিপের layout plan, বাড়ির স্টীল স্ট্রাকচার, দেওয়াল ও ছাদের উপাদান এসব নিয়ে । অতঃপর শুরু কর্মযজ্ঞের – ভূজের কাছেই পাওয়া গেল জমি – অসমান, এবড়ো-খেবড়ো, কাঁটা ঝোপে ভরা অতি রুক্ষ – প্রায় ১০ দিন ধরে বুলডোজার চালিয়ে শুরু হল পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্মাণ । আমাদের প্রজেক্ট, ‘টাইফ্যাক-দীনদয়াল নগর’ ধীরে ধীরে এক পরিকল্পিত টাউনশিপের চেহারা নিল । ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে নভেম্বর অবধি ভূজ হয়ে উঠলো আমার দ্বিতীয় গৃহ – প্রায় প্রতি সপ্তাহে দু-তিন দিনের জন্য আমি ছুটে গিয়েছি ভূজ ও কচ্ছের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের প্রোজেক্ট সংক্রান্ত কাজে !

ভূজ পুনর্বাসন প্রকল্পে ডঃ কালামের আগ্রহ ছিল অপরিসীম, প্রতিনিয়ত খোঁজ রাখতেন তিনি আমাদের প্রোজেক্টের – নানা খুঁটিনাটি ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করতেন আর বন্ধুসুলভ উপদেশ দিতেন জোর কদমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য । মার্চ মাসের গোড়ায় আমরা যখন প্রথম ১০ টি বাড়ি তৈরি প্রায় শেষ করে এনেছি, ডঃ কালাম আমাদের কাজ দেখতে ভূজ আসতে চাইলেন । ওঁর আসার আগের দিন সারারাত ধরে কাজ করে ১০ টি বাড়ি তৈরি সম্পূর্ণ হ’ল ।

১৫ই মার্চ ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানে এসে ডঃ কালাম ভূজ বিমানবন্দর থেকে সোজা আমাদের প্রোজেক্ট সাইটে পৌঁছলেন। আমাদের তৈরি বাড়ি দেখে উনি খুব খুশী – ঘুরে ঘুরে দেখলেন সব ব্যবস্থা । আমাদের প্রোজেক্ট টিমের শ্রমিকদের সঙ্গে ছবি তুললেন – তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ক উপস্থিতি ও উষ্ণ সান্নিধ্য আমাদের সবাইকে ওই মহাযজ্ঞের কাজে করলো উজ্জিবীত ! এরই মধ্যে হঠাৎ একফাঁকে আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, “Biswas, can you build a school for the kids from your township? That would be a great service!” “I’ll surely try Sir”, আমি থতমত হয়ে জবাব দিই !

স্কুল তৈরির নকশা নিয়ে মাথা ঘামাই আমরা – ঠিক হয় ৫০০ স্কোয়ার ফুটের দুটি ক্লাসরুম হ’লে স্থানীয় স্কুল চালু করা যেতে পারে । আমাদের ভূমিকম্পের ত্রাণকার্যে অংশীদার হয় অনেক সুজন – কর্ণাটক হার্ডওয়্যার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও বেঙ্গালুরু রোটারি ক্লাবের আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয় দুটি ক্লাসরুম – আমাদের প্রোজেক্টের বাড়তি কোনও খরচা ছাড়াই ! গুজরাত সরকার শীঘ্র অনুমোদন দেয় – একজন শিক্ষকের পোস্টিং হয় আমাদের স্কুলে । মে মাসের শেষে এক সোমবার আমি ডঃ কালাম কে ফোনে জানাই, “Sir, the school you wanted us to construct is ready in Bhuj”. উনি বলেন, “Can I come and inaugurate the school?”  আমি বলি, “Then you have to do that rather soon Sir as the school cannot remain idle for long”. সঙ্গে সঙ্গে জবাব পাই, “Can it be next Saturday?”

২রা জুন (শনিবার), ২০০১ ডঃ কালাম আবার এলেন আমাদের প্রোজেক্ট সাইটে । সকালে জেট এয়ারওয়েজের বিমানে মুম্বাই থেকে ভূজ এসে অপরাহ্ণে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে উনি মুম্বাই ফিরে যাবেন – মধ্যে ঘন্টা চারেক সময় নিয়ে ঠাসা প্রোগ্রামের পরিকল্পনা আমাদের । বিমানবন্দরে ডঃ কালামকে স্বাগত জানাই, প্রোজেক্ট সাইটের পথে গাড়িতে পাশেই বসি আমি – হাসিমুখে ডঃ কালাম এক আপাত নিরীহ প্রশ্ন করেন আমাকে, “Biswas, you look very happy. Are you happy?”  আমি বলি, “I am always happy Sir, I have no problems in life”. শুনি এক জ্ঞানগর্ভ বানী, “You love your job buddy, that’s why you are so happy” – যেন এক দার্শনিক বাচন, এ আমার কর্মজীবনের পাথেয় !

স্কুল উদ্ঘাটনের অনুষ্ঠানে স্টেজে আমার থেকে একটু দূরে বসে ডঃ কালাম – দেখি তিনি সম্মান সুলভ উপহার পান এক ধাতব বস্তু একটি ছোট বাক্সে । স্টেজ থেকে নেমে সবাই ব্যস্ত যখন অনুষ্ঠান সূচনার মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে, ডঃ কালাম চট করে ওই বাক্সটি আমার হাতে দিয়ে বলেন এটা তোমার জন্য ।

স্কুল উদ্ঘাটনের পর আরও দু’টি অনুষ্ঠানে ডঃ কালামকে নিয়ে গেছি  – কেটে গেছে তিন ঘন্টা সময় । সামান্য নিরামিষ গুজরাতি থালি সহকারে সকলের মধ্যাহ্ন ভোজন ।  হঠাৎ মনে পড়ে আমার পকেটে রাখা ওই ছোট বাক্সটির কথা, বের করে দেখি সেটি বিগত দিনের কচ্ছ নেটিভ স্টেটের অতি মূল্যবান রৌপ্য মুদ্রা, পাঁচ কৌড়ি ।  আমি তো আনন্দে অভিভূত !

ফেরার পথে গাড়িতে ডঃ কালামের পাশে বসে বলি, “Sir, do you know what you gave me in the morning?”  উনি জবাব দেন, “Yeah, a silver coin, I suppose”.  আমি বলি, “That’s something fantastic! I collect coins, I have coins from 67 countries in the world.”  ডঃ কালাম উচ্ছ্বসিত হ’য়ে বলেন, “Oh! You never told me this buddy. OK, I’ll give you something very interesting.”   আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছেছি বেশ দেরীতে, প্লেন ছাড়বে একটু পরেই । হাতের ছোট ব্যাগটি আগাপাশতলা হাতড়ে ডঃ কালাম খুঁজে বার করেন একটি মাউন্টেড মুদ্রার সেট, জানান আগের দিন হায়দ্রাবাদে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফিসারদের এক সম্মানসভায় পাওয়া । সেটি আমার হাতে ধরিয়ে দ্রুত বিমান অভিমুখে রওনা দেন ডঃ কালাম ।

 

 

অবাক বিস্ময়ে ভালো করে দেখি ১৯৯৬ সালে মুদ্রিত সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্মারক মুদ্রার সেট – একটি করে ১০০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০ টাকা ও ২ টাকা মুদ্রা ।  দিল্লী ফিরে গিয়ে পরের সপ্তাহে ডঃ কালামের অফিসে দেখা করি আমি, অনুরোধ জানাই ওই মুদ্রার সেটটির ভিতরের পৃষ্ঠায় কিছু লিখে দেওয়ার জন্য । স্নেহভরে মৃদু হেসে ডঃ কালাম লেখেন,

“With best wishes for Sri S Biswas,

For his excellent work done in Bhuj”

নীচে করে দেন সই ।

আমাদের ভূজ প্রোজেক্টে অক্লেশ কর্মের অমূল্য পুরস্কার – আমার জীবনে মনিরত্ন বিশেষ !

[মাতৃ মন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত]

 

 

 

ফিরে দেখা…

আজ থেকে ৪৩ টি বসন্ত আগে প্রায় ১৭ ছুঁই ছুঁই বয়সে আমরা স্কুলবন্ধুরা হয়েছিলাম বিছিন্ন (মনে রাখতে হ’বে আমরা ১১ ক্লাসের পর হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিয়েছিলাম, অতএব অনেকের বয়সই তখন ১৭ পেরোয়নি) – দুনিয়াটাকে পালটে দেওয়ার স্বপ্ন  দেখে বেছে নিয়েছিলাম নিজেদের পথ ! এক ছোট মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের শান্ত ছত্রছায়া থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম আমরা আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে । মধ্যবিত্ত মুল্যবোধ, মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গী আর যৌথ পরিবারের স্নেহ-মমতা মাখা কৈশোর থেকে পা বাড়িয়েছিলাম দুর্নিবার যৌবনের হাতছানিতে !

আমার মনে পড়ে যে ১৯৭৪ সালে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি ১৯শে মার্চ বাংলা পরীক্ষা দিয়ে শুরু হয়ে ১লা এপ্রিল বায়োলজি পরীক্ষা দিয়ে শেষ হয়েছিল । তিনবছরের সিলেবাসের গুরুভার মাথা থেকে নামিয়ে কেমন যেন বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মত অবস্থা আমাদের । পরের দিনই ২রা এপ্রিল খড়্গপুর রেলওয়ে স্কুলের আমরা একদল ছুটেছিলাম মেদিনীপুরের মহুয়া সিনেমায় তখনকার সুপারহিট ছবি টীন-এজার লাভস্টোরি, ‘ববি’ দেখতে । আমাদের এক বন্ধু সুকুমার ‘ববি’ দেখতে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তার বাবা এমন চোখে তাকিয়েছিলেন সুকুমার যেন মানুষ খুন করে এসেছে; বেচারা সুকুমারের ‘ববি’ দেখা আর হয়নি ! বলাই বাহুল্য এ ছবি দেখার পর উদ্ভিন্ন যৌবনা ডিম্পল কাপাডিয়া আমার বেশ কিছু রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল । ৩রা এপ্রিল আমরা ভীড় করেছি খড়্গপুরের বম্বে সিনেমায় রাজকুমার অভিনীত ইন্দো-পাক যুদ্ধের বিষয় নিয়ে ছবি, ‘হিন্দুস্তান কি কসম’ দেখতে । তার পরদিন ৪ঠা এপ্রিল ডিম্পল কাপাডিয়ার মোহিনী আকর্ষণে সাড়া দিয়ে আমি গিয়েছি আবার ‘ববি’ দেখতে । এর ফলস্বরূপ পাওয়া গেল মায়ের কাছ থেকে এক কড়া বকুনি; ‘সাপের পাঁচ পা দেখেছো নাকি? সামনে লাইন দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্ট, সেগুলোতে ভালো ফল না করলে জীবনে তো কিছুই করতে পারবে না !’

এখানে বলে রাখা উচিত যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার শিকার ছিলাম আমরা সবাই, তাই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া আর কোন কেরিয়ার পছন্দের বিলাসিতা ছিল আমাদের একেবারেই ব্রাত্য । লেখাপড়ায় ভালো করে ওই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এই ঢুকতে হবে, ওটাই মূললক্ষ্য ! পড়াশোনায় একটু অমনোযোগী হলেই বাবার একটা খুব চালু উক্তি ছিল, ‘তবে কি রেলের খালাসী হবি ?’ রেলের খালাসী সম্বন্ধে খুব একটা সম্যক ধারণা ছিলনা, তবে ব্যপারটা যে বেশ খারাপ সেটা বুঝতাম !

আই আই টির অ্যাডমিশনের জন্য অ্যাপ্লিকেশন ফর্মের কথাটা বলি – আমরা খড়্গপুরের ছেলে, তাই ফর্ম ভরতে সোজা আই আই টি পৌঁছেছি । ফর্মের সঙ্গে ১৫ টাকার পোস্টাল অর্ডার জমা দিতে হবে, কোথায় পাব পোস্টাল অর্ডার ? আই আই টির মধ্যেই পোস্ট অফিসে পাওয়া যায় নাকি, তা আমি কুড়ি টাকা দিতে কাউন্টার থেকে ১৬.৫০ টাকা কেটে আমাকে ৩.৫০ টাকা ফেরত দিলে । আমার মুখ চুন, আমাকে ঠকিয়ে ১.৫০ টাকা বেশী নিয়ে নিল, পোস্টাল অর্ডারে যে কমিশন লাগে তা জানা ছিলনা তখন !

যাই হোক ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ও ৫ই মে আমরা বসেছিলাম আই আই টির জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় – পরীক্ষার সেন্টারও আই আই টিতেই । দিনে দু’টো তিন ঘন্টার পরীক্ষা, প্রথম দিন অঙ্ক আর কেমিস্ট্রী, পরদিন ইংরাজি ও ফিজিক্স । পরীক্ষা কিরকম দিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই, কিন্তু পরিস্কার মনে আছে দু’টো পরীক্ষার মধ্যে এক ঘন্টার বিরতিতে কিছু খাওয়ার জন্য মা আমাকে দু’দিন একটা করে টাকা দিয়েছিলো – সে টাকায় আই আই টির ক্যান্টিনে ৫৫ পয়সা দিয়ে কোকা কোলা খেয়েছিলাম স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে । আর একটা ব্যাপার বেশ মনে আছে, শেষ পরীক্ষা ছিল ফিজিক্সের – পরীক্ষা শুরুর আধঘন্টা পর হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি ৪-৫ টা বেঞ্চ দূরে বসা আমাদের রেলওয়ে গার্লস স্কুলের এক প্রথম দিকের ছাত্রীর (নামটা উহ্যই রাখলাম) চোখে অঝোর বারিধারা, হাতে ধরা প্রশ্নপত্রের প্রতি অসহায় দৃষ্টি ! শুনেছিলাম পরের বছর সে নাকি ডাক্তারি তে ভর্তির সু্যোগ পেয়েছিল ।

তারপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন – ৮ই মে, ১৯৭৪; অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেন্স ফেডারেশনের সভাপতি জর্জ ফার্নান্ডেজের ডাকে সারা ভারতে একযোগে শুরু রেল ধর্মঘট । তার জোরালো প্রকোপ পড়েছিল রেল শহর খড়্গপুরে – সরকারের তরফ থেকে ধরপাকড়, বাড়ী থেকে ড্রাইভার-গার্ডদের  জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ট্রেন চালানোর বিফল প্রচেষ্টা । ১৭ থেকে ১৯শে মে হওয়ার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স, কিন্তু রেল ধর্মঘটের প্রভাবে সে পরীক্ষা পিছিয়ে গেল জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে – আমাদের প্রিপারেশনেও ঢিলে পড়লো ।

৩রা জুন সোমবার আমাদের আই আই টি জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল বেরোলো, আমাদের স্কুল থেকে আমাকে নিয়ে তিনজন চান্স পেয়েছে । জুনের মাঝামাঝি কাউন্সেলিং, সেদিনই  সাকুল্যে ৬০০-৬৫০ টাকা জমা দিয়ে আই আই টিতে ভর্তিও হয়ে গেলাম আমরা ।  এরপর আমায় আর পায় কে, মনে মনে ঠিক করেই রেখে ছিলাম পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আর বসবো না । আমার বড়মামা তখন মেদিনীপুরে খুব নামী ডাক্তার, তাঁর বরাবরের ইচ্ছে আমি ডাক্তার হই – আমি পরীক্ষাই দিইনি শুনে, ভীষণ রাগারাগি করে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন !

এরপর অগাস্ট মাসে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ – আমরা মফঃস্বলের ছেলে, হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করাটাই ছিল সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি । আই আই টি তে ঢোকার পরেও মনে ভয়, ফার্স্ট ডিভিশন পাব তো ? রেজাল্ট বেরিয়েছে, হেড মাস্টার মশাইয়ের ঘরে মার্কশীট এসে পৌঁছেছে ডাক মারফত । আমরা দুরুদুরু বক্ষে বাইরে অপেক্ষা করছি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম । আমাদের ইংরাজির শিক্ষক, শ্রী এন কে রায়কে আমরা কোনও দিন হাসতে দেখিনি, তিনি দেখি মৃদু হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলি, ‘স্যার, আপনি কি রেজাল্ট দেখেছেন, ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি স্যার?’ উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরিয়ে রায় মশাই বলেন, ‘স্টার পেয়েছিস তো রে, দু’টো সাবজেক্টে লেটার পেয়েছিস’ ।

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে ! সাইকেল নিয়ে ঊর্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটি মায়ের হাসিমুখটা দেখবো বলে…

[প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমাদের সময়ে ৭৫% নম্বর পেলে বোর্ড থেকে প্রকাশিত রেজাল্ট বুকলেটে রোল নম্বরের পাশে একটি * দেওয়া থাকতো; লেটার মানে কোনও বিষয়ে ৮০% বা তার বেশী মার্কস পাওয়া । আর ওই রকম ডাকসাইটে রেজাল্টের পর বড়মামা মেদিনীপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন অভিনন্দন জানাতে ।]

 

মনে কি দ্বিধা…

ভোরবেলা এ-সময়টা বড় ভালো লাগে অপর্ণার । সেই ছোটবেলা থেকেই খুব ভোরে স্নান সেরে নেওয়ার অভ্যাস – সাড়ে পাঁচটা বাজতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর । ঐ সময়ে গুড়গুড় আওয়াজ করে কলে জল আসে, তাড়াতাড়ি স্নান করে ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় চলে আসেন তিনি । সকাল ছ’টা নাগাদ দিল্লী অন্ধকার – পূবদিক সবে ফরসা হচ্ছে । অপর্ণা বারান্দায় বসে একমনে নামজপ করেন; সেই কম বয়সে মা’র হাত ধরে ভারত সেবাশ্রমে স্বামী পরমানন্দজির কাছে দীক্ষা নেওয়া । অপর্ণাকে বড়ই স্নেহ করতেন গুরুদেব, নিয়মিত চিঠি লিখতেন পোস্টকার্ড ভর্তি করে, মুক্তোর মত হাতের লেখা ছিল তাঁর ! দেহ রাখার আগের দিনও গুরুদেব অপর্ণাকে চিঠি লিখে গেছেন ।

দক্ষিণ দিল্লীর এদিকটা বেশ সবুজ – চারপাশে গাছগাছালিতে ভরা । একটা বড় শহরে এত গাছের ছড়াছড়ি – চারদিক তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে ওঠে ! এই বারান্দায় বসেই অপর্ণা অনেক পাখির দেখা পান । ধীরে ধীরে আলো ফোটে – দূরে রাও তুলারাম মার্গ দিয়ে একটা গাড়ি চলে যায় মৃদু শব্দ করে, স্থানীয় হিন্দিভাষীদের দুর্গামন্দির থেকে ভেসে আসা শিবস্তোত্র আর মসজিদের আজানের ডাক মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । হঠাৎ সমস্ত নিঃশব্দতা চিরে একঝাঁক টিয়াপাখি কর্কশ ডাক দিয়ে উড়ে যায় সামনের রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের বড় অশ্বত্থ গাছটার দিকে । পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস মেহরা বারান্দায় বাজরার দানা আর পাত্রে জল রেখে দেন – সেগুলো খুঁজে পেয়ে একদল শালিখ বেজায় কিচিরমিচির জুড়ে দেয় ।  দু’টো বুলবুলি নিজের মনে শিস দিয়ে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়ায় । অপর্ণা লক্ষ্য করেন পাশের বাড়ির সানশেডে একজোড়া পায়রা নিজেদের মধ্যে খুনসুটিতে ব্যস্ত । একজন তেড়ে যায় আর অন্যজন ঘাড়ের পালক উঁচিয়ে তাকে ভয় দেখায়, তারপর নিজেদের মধ্যেই কি রকম অদ্ভুত সুরে বকবকম ডাক তোলে – অপর্ণা বুঝতে পারেননা, সেটা ঠাট্টার টিটকিরী না প্রেমের অভিব্যক্তি !

একটু পরেই ছোট বেডরুমের দরজাটা খুলে যায় – নাতনি টুসি হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে আসে, ‘গুড মর্নিং দিম্মা, রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?’ টুসি ওরফে আত্রেয়ী, অপর্ণার ছোট নাতনি, ক্লাস ইলেভেনে পড়া তন্বী টীন-এজার । ডিপিএস-আর কে পুরম্ স্কুলে প্রথমে দিকের ছাত্রী – লেখাপড়া ও ডিবেটে তুখোড়, বাস্কেটবল আর সাঁতারেও সমান পারদর্শী । দিদির দেখাদেখি সেও সায়েন্স নিয়ে পড়ে, তারও ইচ্ছে দিদির মত ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ার । তার দিদি মানে অপর্ণার বড় নাতনি, সুমি ওরফে আদৃতা কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছে । দু’ই নাতনিই অপর্ণার সমান ন্যাওটা – ছোটবেলা থেকেই দু’পাশে শুয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনত । অপর্ণার গল্পের স্টক অফুরন্ত – রূপকথার রাজারানী, বিশ্বভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী বা ভূত-পেত্নীর গা ছমছমে গল্প বলে অপর্ণা ঘুম পাড়াতেন দুই নাতনিকে । ওরা কেমন তাড়াতাড়িই সব বড়  হয়ে গেল যেন !

এরপর টুসি দৌড়বে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হ’তে । অপর্ণার মেয়ে, অনুরাধা অন্য বেডরুম থেকে বেরিয়ে  এলো, ‘মা, তোমার চান হয়ে গেছে তো ? চা করি?’ । অনুরাধা কাছেই এক পাবলিক স্কুলে সিনিয়র ক্লাসে ইতিহাস পড়ায়, সেও বেরিয়ে যাবে সকাল আটটার মধ্যে । জামাই, অম্লান হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরে মর্নিং ওয়াকের জন্য তৈরি, হাসিমুখে বললো, ‘মা, শরীর ভাল তো ?’ অম্লান ভারত সরকারে বেশ উঁচু পোস্টে কাজ করে, ইকনমিক্স-এর মেধাবী ছাত্র ছিল সে । মেয়ে অনুরাধার জন্য যখন সুযোগ্য পাত্র খুঁজছিলেন অনিলবাবু, হঠাৎ জব্বলপুর থেকে ওঁর ছেলেবেলার বন্ধু সুবিনয়ের চিঠি এলো তাঁর ছেলে অম্লান-এর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে । সুঠাম, সপ্রতিভ অম্লানকে  দেখে ও তার সঙ্গে কথা বলে অনিলবাবু ও অপর্ণার খুব পছন্দ হয়েছিল । অম্লান সত্যিই বড় ভাল ছেলে – অনিলবাবু ও অপর্ণার প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান আর কাজকর্মেও তার খুব নামডাক ।

অনুরাধার থেকে বছর চারেকের বড় তার দাদা, অপর্ণার একমাত্র পুত্র, অনির্বাণ গুড়গাওঁতে থাকে – সেও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন এক মাল্টিন্যাশনাল  কোম্পানি-তে ভাইস প্রেসিডেন্ট । প্রায়ই অফিসের কাজে বিদেশ যায় অনির্বাণ, কখনও এক সপ্তাহ কখনওবা একমাসের জন্য –আজ জাপান, কাল জর্ডন অথবা পরশু ব্রাজিল – সারা পৃথিবী চষে বেড়ায় সে । ম্যানচেস্টারে পোস্টেডও ছিল বছর পাঁচেক । ছেলের কথা মনে পড়লেই অপর্ণার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, অভিমানে বুক ঠেলে উঠে আসে চাপা কান্না !

অনিলবাবু রেলে কাজ করতেন,  কলকাতা থেকে বদলী হয়েছিলেন চক্রধরপুরে – দু’টি কামরা, রান্নাঘর,  বাথরুম, সামনে ও পেছনে জাফরি দেওয়া বারান্দা আর পেছন দিকে একটা খোলা উঠোন  নিয়ে নতুন তৈরি রেলের কোয়ার্টার্স, সামনে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা অনেকটা বাগান করার জায়গা । সাবেকি উত্তর কলকাতার জয়েন্ট ফ্যামিলির প্রায়ান্ধকার বাড়ি ছেড়ে এসে অপর্ণা চক্রধরপুরে যেন মুক্তির স্বাদ পেলেন ! শনিবারের হাট থেকে খুরপি-কোদাল কিনে নিয়ে এসে জোর উদ্যমে অপর্ণা অনেক গাছপালা লাগিয়েছিলেন বাগানে । বিকেলে কলে জল এলে রোজ বালতি করে গাছে জল দিতেন অপর্ণা  – উর্বর মাটি আর তাঁর স্নেহমাখা স্পর্শ পেয়ে গাছগুলো সব লকলক করে বেড়ে উঠেছিল । চৈত্রের শেষ দিকে সারাদিন আগুন ঝরিয়ে যখন সূর্য ডুবত আর ধীরে ধীরে নেমে আসতো ছায়াঘন সন্ধ্যা, অপর্ণার বাগান ম-ম করতো যুঁই আর হাস্নুহানার গন্ধে – অনিলবাবু অফিস ফেরত বাগানে বসে চায়ের পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মৃদুহেসে বলতেন, ‘তুমি যে ওদের ভালোবাসো, গাছগুলো বোধহয় বুঝতে পারে’ ।

চক্রধরপুরে অনির্বাণ ছোট্ট ছেলে, তার তিন বছর বয়স, অনুরাধা তখনও পেটে আসেনি । এখনকার মত এত কম বয়সে কেউ স্কুলে ভর্তি হত না তখন, অনির্বাণ মা’র কাছেই পড়াশোনা করত – বর্ণপরিচয়, ছড়া ও ছবি, রবীন্দ্রনাথের সহজপাঠ এসবই পড়াতেন অপর্ণা । ছবি এঁকে শেখাতেন ভূগোল – উঁচুনিচু পাহাড়,  পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, নদীর স্রোত, সমতল বেয়ে এসে নদীর সমুদ্রে মিশে যাওয়া, নদী মোহনার ব-দ্বীপ – অতি আগ্রহে অনির্বাণ তার শিশুমনে গেঁথে নিত সব তথ্য । মাথাটা তার বরাবরই পরিস্কার, কোনও বিষয় একবারের বেশী দু’বার বোঝাতে হতনা ।

দিনগুলো যেন বড়ই দ্রুত কেটে গেল এরপর – অনুরাধার জন্ম, অনির্বাণের স্কুলে ভর্তি । ধাপে ধাপে অনির্বাণ পার হল স্কুলের নিচু থেকে উঁচু ক্লাস – একগাল হাসি নিয়ে রেজাল্টের দিন ছেলে বাড়ি ফিরত, ‘মা, এবারেও আমি ফার্স্ট।’ ক্লাস টেন-এর বোর্ড পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করে অনির্বাণ ভর্তি হল নরেন্দ্রপুরে – ওকে হস্টেলে রেখে বাড়ি ফেরার সময় অনিলবাবু আর অপর্ণার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল । এরপরেই অনিলবাবু বদলী হলেন নাগপুরে; অনির্বাণ হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় তিনটে লেটার নিয়ে পাশ করল – জয়েন্ট এনট্রান্সে তার র‍্যাঙ্ক হল ৩৭, আনন্দে আত্মহারা অনিলবাবু অফিসের সবাইকে সিঙ্গাড়া-মিষ্টি-কচুরি খাওয়ালেন পেট ভরে ! অনির্বাণ যাদবপুরে ভর্তি হল ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে ।

অনির্বাণ যখন থার্ড ইয়ারে পড়ে, ওর সহপাঠী শৌভিকের বোন, সুদীপা ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হল যাদবপুরে – শৌভিক অনির্বাণের খুব কাছের বন্ধু, ওদের বাড়ি কসবায় । যাদবপুরের হস্টেল থেকে শনি-রবিবারে ওদের বাড়ি প্রায়ই চলে যেত অনির্বাণ, হস্টেলের ডাল-ভাত-চচ্চড়িতে পেটে চড়া পড়ে গেলে মাসীমার হাতের রান্নায় মুখ বদলাতে । সুদীপা-কে মাঝে মাঝে অঙ্ক আর ফিজিক্স পড়াত, সুদীপা বলতো, ‘অনির্বাণদা’, তুমি কিন্তু দাদার চেয়ে ভালো বোঝাতে পারো ।’  একদিন কলেজের পর অনির্বাণ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল হস্টেলের দিকে, দেখে মেন গেটে সুদীপা দাঁড়িয়ে তার আর এক বন্ধুর সঙ্গে । ‘আরে, কি খবর, তোমাদের ক্লাস শেষ ?’ সুদীপা হাসিমুখে বলল, ‘অনির্বাণদা’, কেমন আছো ? তুমি কিন্তু অনেক দিন আসনি আমাদের বাড়িতে । আলাপ করিয়ে দিই, আমার ক্লাসমেট সুচেতনা, ও মডার্ন হাই স্কুলে পড়ত’ । ‘সুচেতনা, এ আমার দাদার বিশেষ বন্ধু অনির্বাণদা’, হ্যান্ডশেক করার চেষ্টা করিসনা, তোর হাত কেটে যাবে – অনির্বাণদা’ হীরের টুকরো কিনা’, খিলখিল করে হেসে উঠল ওরা দু’জনেই ।

এরপর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে অনির্বাণের যেন ঘনঘনই চোখে পড়তে লাগলো সুচেতনা – মৌখিক স্বল্পালাপ থেকে রেস্তোরাঁর ঘেরাটোপ – তারপর একদিন ওদের বাড়ি । সুচেতনার বাবা ইউনিয়ন কার্বাইডের জেনারাল ম্যানেজার, সানি পার্কে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিঙে আটতলায় ওদের ফ্ল্যাট – সেখান থেকে কলকাতা যেন এক মায়া নগরী, আকাশছোঁয়া সাফল্যের স্বর্গলোক, সব রকম দুঃখকষ্টের অনেক ওপরে । ক্যালকাটা ক্লাবের সুইমিং পুল দাপানো, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ‘কেয়ার ফ্রী’ স্বভাবের সুচেতনা অনির্বাণের মন জয় করে নিল সহজেই । যাদবপুরের পড়া শেষ করে অনির্বাণ আই আই টি কানপুরে এম টেক করতে গেল, সুচেতনা বি এস সি’র পর এম এস সি তে ভর্তি হ’ল – কানপুর থেকে বেরিয়ে অনির্বাণ আমেরিকায় যাওয়ার আগেই চারহাত এক হল এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় । বড়লোক বেয়াই বাড়ি – অনির্বাণের বিয়েতে যথেষ্টই খরচা করেছিলেন অনিলবাবু, তবু তাদের মন পাওয়া ভার । বৌভাতের সন্ধ্যায় সুচেতনার মা’ ঝেঁঝেঁ উঠলেন, ‘দেখবেন মিস্টার মিত্র, আমাদের বাড়ির লোকজনদের যেন কোনও অযত্ন না হয়’ ।

বিয়ের দু’সপ্তাহের মধ্যেই অনির্বাণ আর সুচেতনা চলে গেল আমেরিকা, বৌ আর শ্বাশুড়ির মধ্যে কোনও সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই দূরত্বের ব্যবধান তৈরি হ’ল অনেক । অনিলবাবু ও অপর্ণা অনির্বাণের চলে যাওয়াতে প্রথমে ভেঙ্গে পড়েছিলেন, পরে অনুরাধার সঙ্গে অম্লানের বিয়ের পর ওঁরা যেন মনের জোর ফিরে পেয়েছিলেন একটু ।

অনুরাধার ছোট মেয়ে টুসি জন্মাবার সময় অনিলবাবু ও অপর্ণা দিল্লী চলে এসেছিলেন – ওদের একটু সাহায্য হবে ভেবে । দেখতে দেখতে টুসি বড় হয়ে উঠলো – মেয়ে-জামাই আর ওঁদের ছাড়েনা, যাবার কথা বললেই বলে আর ক’দিন থেকে যাওনা মা, কলকাতায় তোমাদের আর কি বা কাজ? তাছাড়া ওখানে লোকজন  পাওয়া যায়না, বাড়ির সব কাজ সামলাতে মা’র কষ্ট হবে ! একদিন গভীর রাতে অনিলবাবু অপর্ণাকে ডেকে বললেন, ‘আমার বুকে একটু কষ্ট হচ্ছে’ । অম্লান সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে গেল অল ইন্ডিয়া ইন্সটিউটে – ডাক্তারদের সব চেষ্টাই বিফল করে সকাল সাতটায় চিরকালের মত চোখ বুজলেন অনিলবাবু । সুমি আর টুসি এসে অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরল, ‘দিম্মা, তুমি আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবেনা’ । তখন অনির্বাণ গুড়গাওঁ-এ চাকরি নিয়ে চলে এসেছে, খবর পেয়ে সেও দৌড়ে এল – বাবার শ্রাদ্ধশান্তি সবই করলে নিয়ম মেনে । অপর্ণা রয়ে গেলেন মেয়ের কাছে, কর্তব্যপরায়ণ ছেলে সপ্তাহে একবার ফোন করে, মাসে-দুমাসে দেখা করতে আসে – কিন্তু ঐ পর্যন্তই, ছেলে বা বৌমা কেউ বলেনা, ‘মা, আমাদের কাছে ক’দিন থাকবে চলনা’ । তবুও যখন অনির্বাণের ফোনটা আসে, ‘মা, কেমন আছো ?’, অপর্ণার চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে যেন ।

সকালবেলায় এ সময়টা অপর্ণার মনে ঘুরে ঘুরে আসে কলকাতার বাড়িটার কথা । ছেলেকে হস্টেলে রেখে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়িয়ে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে বাড়িটা করেছিলেন অনিলবাবু – দমদম পার্কে প্রায় আড়াই কাঠা জমির ওপর একটা বসার ঘর, দু’টো শোবার ঘর, বাথরুম ও ছোট রান্নাঘর নিয়ে একতলা বাড়িটা । বড় শখ করে ওঁরা দুজনে বাড়ির নাম রেখে ছিলেন, ‘নোঙর’ । বাড়ির ঠিক পেছনে একটা বিরাট টলটলে পুকুর – ঐ পুকুরটা দেখেই জমিটা খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল অনিলবাবু আর অপর্ণার । বাড়িটা তৈরি হয়ে গেলে বিশুমালিকে কাজে লাগিয়ে একটা ছোট বাগান করেছিলেন অপর্ণা সামনের আর পাশের জমিতে । বাঁশ পুঁতে আর কঞ্চি লাগিয়ে বিশু মাচা তৈরি করেছিল –  বর্ষার জল পেয়ে সদ্য যুবতী লাউগাছটা মাচা জড়িয়ে আনন্দে নাচানাচি করত । আর তরতর করে বেড়ে যাওয়া শিম গাছটা দোতলার ছাতে পৌঁছে গিয়েছিল – ছাতে উঠলেই হাতে আসতো থোকা থোকা শিম । অপর্ণার বাড়ির পেছনের পাঁচিল থেকে পুকুরের ধার ঘেঁসে মালিরা গাছ লাগিয়েছিল অনেকরকম – ঝাঁকড়া আমগাছটায় যেবার প্রথম আম ফললো, বিশুমালির বউ শ্যামলী ডেকে বলল, ‘মাসীমা, এই নিন গাছের প্রথম কাঁচা আম, টক করে খাবেন’ ।  বিশুমালির মেয়ে বিন্তি আর ছেলে তাপসের জন্য ভালো রান্নাবান্না হ’লে একটু সরিয়ে রাখতেন অপর্ণা, পালাপার্বণে পাঁচ-দশটা টাকা ধরিয়ে দিতেন, বলতেন ‘এই নে, তোরা ফুচকা খাস’ । মালিদের গাছে এসে বসত অনেক পাখি, বসন্তবৌরি, টুনটুনি আর ফিঙে – পানকৌড়ি-টা দুচোখ  বুজে ঘুমোবার ভান করতো, কিন্তু পুকুরে কোনও ছোট মাছ দেখলেই ছোঁ মেরে তুলে নিত তার ঠোঁটের ফাঁকে ! শীতের দুপুরে বাড়ির পেছনে আচার রোদে দিতেন অপর্ণা । ভাতের সঙ্গে একটু আচার খেতে বড় ভালোবাসতেন যে অনিলবাবু ।

‘মা, ওরা সবাই বেরিয়ে গেছে, আমিও বেরোচ্ছি অফিসে, দরজাটা বন্ধ করে দিন’, অম্লানের গলার আওয়াজে সম্বিত ফিরল অপর্ণার ।

[মাতৃমন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৪]