The City of Four Seasons

In Delhi, one can clearly make out four different seasons of the year. The city is by far the greenest in the country; the greenery is a visual treat especially in its central neighbourhoods and southern fringes. Driving down the leafy avenues of Lodi Road, Prithviraj Road and APJ Abdul Kalam (erstwhile Aurangzeb) Road just to name a few under the arching canopies of the ancient trees is pure bliss!

The spring in Delhi sets in by mid-February, when all the Gulmohars (Krishnachura) start glowing with their scarlet blooms and the Silk Cotton (Shimul) trees without any leaves suddenly turn crimson with their heavy flowers. Among such a riot of colours, one can spot not so common Flame of the Forest (Palash) too. By mid-March, the trees, which had shed all their leaves before the winter turn coppery brown or glistening green with their nascent foliage.

As the spring gives in to the blistering summer, the city is infamous for, the dust settles onto the thick green leaves of the trees and as the temperature shoots up beyond 40 deg C by early May, the city roads are aglow with Amaltas (Indian laburnum). Some of the narrow roads in my neighbourhood are lined on both the sides with them laden with the delicate flowers of golden yellow hues. They bloom in abundance heralding the summer in the city while painting the canvas with our own ‘cherry blossom’. Unlike Kolkata, we don’t get many Nor’westers (কালবৈশাখী) during the summer in Delhi; we have our share of severe dust storms (Aandhi) though to bring down the temperature as it becomes almost unbearable!

While monsoon hits Malabar coast on June 01 and proceeds to Mumbai by June 10, it takes quite a momentum for it to cross the Vindhyas to set foot on the north. Though June 29 happens to be official date for the monsoon to arrive in Delhi, it often plays truant pushing back its arrival almost to mid-July. As the monsoon sets in, thick dark clouds cover the sky and the storm ushering in the much-awaited downpour brings down the temperature of the city by a few notches. The verdant nature, awash with the rains, soothes nerves of the city dwellers.

When the city celebrates Diwali in late October or in early November, a slight nip in the evening air sets the stage for the forthcoming winter. Soon the early mornings turn misty and Delhi-ites ring in the New Year amidst thick fog engulfing the city till quite late in the day. Some days in January can be depressing too as the sun fails to appear throughout the day with a haze hanging over the city, chilled to its bones. Come February and the city‘s well-crafted public spaces and parks explode with the vibrant colours of petunias, pansies, hollyhocks, calendulas… the kerbs of Shanti Path, Lodi Garden, Nehru Park, the Garden of Five Senses… invite the denizens into their open arms to savour the nature, a virtual kaleidoscope of floral extravaganza!

As the winter loses its teeth, spring comes with its new promises…fullsizeoutput_766.jpeg

Advertisements

কচি মেয়ে

সেদিন যখন গাড়িটা থামলো
ট্রাফিক সিগনালে,
দৌড়ে আসে কচি এক মেয়ে
চোখ তার ছলছলে
শীর্ণ দুহাতে ধরে আছে সে
গোলাপ ফুলের ভার,
অফিসের পথে ফুল কি হবে?
নেই মোর দরকার
কচি মেয়ে বলে, ফুল বেচে যদি
কয়েকটা টাকা পাই,
কিছু খেতে পাবো আমরা দু’জন
আমি আর ছোট ভাই
বিরসবদনে দশটা’ টাকা
গুঁজে দিই তার হাতে,
কাচ তুলে দিই সাত তাড়াতাড়ি
আর বিরক্ত না করে যাতে

মাঝা মাঝে তার দেখা পেয়ে যাই
চৌরাস্তা’র মোড়ে,
চোখ আমার খুঁজে ফেরে তারে
ব্যস্ত লোকের ভীড়ে
একদিন আমি মোবাইলে তার
দু’টো ছবি তুলে রাখি,
রুখু চুলো মাথা, মুখে হাসি তার
করুণ যে দু’টি আঁখি

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে মাঝে
দেখা নাই কেন তার?
আমি তো গিয়েছি ঐ মোড় দিয়ে
গাড়িতে বারংবার
একদিন তাই মোড়ের কাছেই
গাড়ি থেকে নেমে আসি,
কোথায় সেই কচি মেয়ে আর
মিষ্টি মুখের হাসি
ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করি
কোথায় গেছেরে সে?
শুনি দুরন্ত এক গাড়ির চাকা
দিয়েছে তারে পিষে !

পথের সাথী…

অনিন্দ্য রায় কলকাতা ছেড়েছে বেশ কিছু বছর…যাদবপুরে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে এক বহুজাতিক কোম্পানীতে শাঁসালো মাইনের চাকরি নিয়ে তার পুণায় আসা । মেধা ও কর্মনিষ্ঠার জোরে কোম্পানী বেশ তাড়াতাড়িই অনিন্দ্যকে ম্যানেজার করেছে, কয়েক বছরের মধ্যেই আমেরিকা ও ইউরোপে দু’বার পাঠিয়েছে লম্বা এসাইনমেন্টে । সে এক নিরলস কর্মী, কাজে বড়ই ব্যস্ত … সুদর্শন অনিন্দ্য’র বয়স প্রায় তিরিশ ছুঁইছুঁই, কিন্তু বিয়েটা তার করা হয়ে ওঠেনি এখনও । আর তাছাড়া বিয়ের উদ্যোগটাই বা নেবে কে? অনিন্দ্য তার মা’কে হারিয়েছে ক্লাস টেনে পড়ার সময়, জামশেদপুরে বাবা থাকেন একা, তিনি বার কয়েক বলে ছিলেন; কিন্তু অনিন্দ্য ‘কাজের চাপ আছে’, ‘ছুটি পাবনা এখন’ ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিয়েছে এতদিন… অফিসে অনেক মহিলাই তার বেশ গুণমুগ্ধ, কয়েকজন বলেও ফেলেছে উইকেন্ড-এ দু’জনে লাঞ্চ বা ডিনার করতে গেলে কেমন হয় গোছের কথা, অনিন্দ্য মুচকি হেসে এড়িয়ে গেছে, মনের গভীরে তার কমিটমেন্টের কোনও অভাব কাজ করে বোধহয়…

ইদানীং অনিন্দ্য ঢুকেছে ফেসবুকে, জামশেদপুরের Loyola School ও যাদবপুর মিলিয়ে তার বন্ধু সংখ্যা বেশ ভালোই, এছাড়াও আছে তার কিছু তুতো ভাই-বোন… অনিন্দ্য হ’ল যাকে বলে নীরব দর্শক, সে মন দিয়ে অন্যদের দেশ-বিদেশ বেড়ানোর, জন্মদিনের কেক কাটার ছবি দেখে, বন্ধুদের বিবাহবার্ষিকীতে গদগদ ভাষায় তাদের বৌ’দের প্রশংসা বেশ বোকা-বোকা লাগে তার আবার কিছু বন্ধুদের হাস্যরসাত্মক লেখায় সে মজাও পায় বেশ… কিন্তু ঐ পর্যন্তই, অনিন্দ্য কোনও কমেন্ট করেনা, আর নিজে কোনও পোস্ট করা তো দূরের কথা ! এক শুক্রবার রাত দশটায় ডিনার সেরে ল্যাপটপ খুলে বসেছে অনিন্দ্য, অনেকদিন ধরে ভাবছে কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়, অনেক ছুটি তার পাওনা, দিন পনেরো ছুটি কোম্পানী খুব খুশী হয়েই দেবে কাজপাগল লোকটাকে একটু বিশ্রাম দিতে… কিন্তু একা একা বেড়াতে যাওয়াটা যে খুব বোরিং ব্যাপার, তার প্রায় সব বন্ধুদেরই বিয়ে হয়ে গেছে, কেই বা বৌ-বাচ্চা ছেড়ে তার মত ব্যাচেলরকে সঙ্গ দেবে, কি যে উপায়? তার অনেকদিনের শখ সাউথ-ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোয় যাওয়ার – থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি… ব্যাকপ্যাকিং-এর একেবারে আদর্শ জায়গা সব !

অনিন্দ্য ফেসবুকে দেখে ছোট্ট একফালি বিজ্ঞাপন, ‘Don’t travel alone… look for your travel buddies… বিজ্ঞাপনে আরও লেখা, ‘Register yourself for ideal travel mates…roam around the world in great company’. একটু অবাক হয়ে অনিন্দ্য সেই ওয়েবসাইটে ক্লিক করে – এতো মজার ব্যাপার, পৃথিবীতে অনেকেই তার মত একা, তারা ভ্রমণসঙ্গী খুঁজছে অথবা চাইছে কোনও ভ্রমণার্থী দলে ভিড়তে… অনেকটা খেলার ছলেই অনিন্দ্য রেজিস্টার করে নিজেকে, ‘Techie (30) working for MNC in Pune, India… love backpacking, swimming & photography… looking forward to meeting the travel buddy for a two-week holiday somewhere in SE Asia’… তারপর যথারীতি ফেসবুকের পাতা উল্টে, নিজের কিছু মেইল চেক করে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ শুতে যায় অনিন্দ্য…

সকাল ছ’টা নাগাদ পুণাতে সবে একটু আলো ফুটেছে পূবাকাশে, টুং করে মোবাইল জানালো অনিন্দ্য’র একটা মেইল এসেছে… চশমাটা পরে মেইলটা দেখে সে, ‘Hi, it’s Karen here…Karen Martin (27) from Sydney, NSW… planning a backpacking trip for about two weeks to Bali in March… would be happy to join you buddy’… অনিন্দ্য ফেসবুকে গিয়ে Karen Martin-এর প্রোফাইল চেক করে, দেখে ক্যারেন University of New South Wales থেকে কেমিস্ট্রি নিয়ে M.Sc করেছে, সিডনী-তে সে এক কেমিক্যাল ল্যাবোরেটরিতে কাজ করে Senior Analyst হিসেবে… অনিন্দ্য প্রথমে ক্যারেন-কে friend request পাঠায়, আধঘন্টার মধ্যেই ক্যারেন তার ফেসবুকের বন্ধু হয়…

বালি যাওয়ার প্ল্যান নিঃশব্দে সেরে ফেলে অনিন্দ্য, শুক্রবার রাতে বম্বে থেকে সাড়ে পাঁচ ঘন্টায় কুয়ালা লামপুর, তারপর সেখান থেকে প্রায় ঘন্টা তিনেক পর শনিবারের এক ঝকঝকে সকালে বালি’র ডেনপাসার বিমানবন্দরে পৌঁছয় অনিন্দ্য… ক্যারেন বলেছিল আধঘন্টা আগেই পৌঁছে যাবে ও সিডনি থেকে, অপেক্ষা করবে এয়ারপোর্টের বাইরে অনিন্দ্য’র জন্য … বালিতে ভারতীয়দের বিশেষ খাতির, ‘Visa on arrival’, ৩৫ ডলার ফি জমা করে একমাসের ভিসা পেয়ে যায় অনিন্দ্য, কাস্টমস পেরিয়ে এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে বেরোতেই অনিন্দ্য শোনে, ‘Hi Ani’… দেখে একমুখ উজ্জ্বল হাসি নিয়ে ক্যারেন দাঁড়িয়ে, সে বলে, ‘Hey, how was your flight? Any interesting co-passenger?’ অনিন্দ্য বলে, ‘No such luck buddy, a fat guy on the next seat… he was snoring so badly’… দু’জনেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে এবার… বালি ভ্রমণের খুঁটিনাটি সব প্ল্যান করেছে ক্যারেন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে, কাজে ব্যস্ত অনিন্দ্য এ ব্যবস্থায় খুব খুশী । এয়ারপোর্ট থেকে কাছেই কুটা নামের এক জায়গায় সমুদ্রের ধারে রিসোর্ট-এ দু’টো ঘর বুক করেছিল ক্যারেন, পাসপোর্ট দেখাতেই পাওয়া গেল ঘরের চাবি … বেশ উঁচুমানের কমপক্ষে চার তারকা মার্কা রিসোর্ট, কিন্তু অনিন্দ্য দেখে দেশের তুলনায় দাম অনেক কম…

শুরু হয় তাদের বালি ভ্রমণ… আদ্যন্ত এডভেঞ্চার স্পোর্টস পাগল ক্যারেন এক উচ্ছল অস্ট্রেলিয়ান তরুণী – সমুদ্রে উইন্ড সার্ফিং, প্যারাসেলিং, স্নর্কেলিং, স্কুবা ডাইভিং এসবে তার বিশেষ আগ্রহ… সকাল ছ’টায় ইন্টারকমে ফোন আসে তার, ‘Ani, get ready in 15 minutes. Let’s go jogging on the beach’. কুটার সমুদ্রসৈকতে প্রায় একঘন্টা দৌড়ে অনিন্দ্য তো গলদঘর্ম… অফিসের ঠান্ডাঘরে বসে মগজমারি করে সে, ক্যারেনের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে অনিন্দ্য… একটু একটু করে জানতে পারে সে ক্যারেনকে; ওর বাবা নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশে এক ছোট শহরে প্রাইমারী স্কুলের টীচার আর মা এক অতিনিষ্ঠ হোমমেকার; আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই তাদের প্রথম বিয়ে বছর ৩৫ আগের… ক্যারেনের দাদা ও বৌদি দু’জনেই ডাক্তার, দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তারা থাকে সিডনিতেই; ভাইপো-ভাইঝি দু’জন ক্যারেন-এর বিরাট ফ্যান, প্রায় প্রতি উইকএন্ড-এই ক্যারেন তার দাদার বাড়ি চলে যায় । বাচ্চাদের বড়ই ভালোবাসে ক্যারেন, অন্যান্য দেশে শিশু অধিকার, তাদের প্রতি অবিচার এসব নিয়ে অনেক পড়াশোনা তার । ভারতে শিশুদের প্রতি জঘন্য সব অপরাধের ঘটনা সবই তার জানা, এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে ক্যারেন… অনিন্দ্য বলতে বাধ্য হয়, ‘Hey Karen, please stop this now. I’m no child molester… I simply adore kids’. মাঝে মাঝে একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করে তারা; অনিন্দ্য বলে, ‘Karen, aren’t we just wasting our money? We can save big time if we share room in the hotel… I don’t snore much’. ক্যারেন জবাব না দিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায় । কোনওদিন আবার ক্যারেন বলে, ‘Ani, you have a funny name. It sounds like calling you as Honey’… হো হো করে হেসে ওঠে ওরা দুজন ।

অনিন্দ্য ও ক্যারেন বালির সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে যায়, একদিন ওরা যায় কিন্তামনি – কিছুটা গাড়িতে আর অনেকটাই ট্রেক করে ওরা পৌঁছয় ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি ‘মাউন্ট বাটুর’… পাহাড়ের চূড়ো থেকে নীচে ‘লেক বাটুর’-এর শোভা বড়ই মনোরম… কোনও দিন আবার ওরা ঘুরে বেড়ায় ‘উবুদ’, অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে মধ্য বালির এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল; উবুদ নানারকম শিল্পকলা ও বালিনীজ্ নৃত্যগীতের কেন্দ্রস্থল । অনেক পর্যটকের, বিশেষত ‘ব্যাকপ্যাকার’ দের আস্তানা সেখানে । রাস্তার দুধারে ওরা দেখে বড় বড় আর্টগ্যালারিতে আঁকা ছবি, কাঠ ও পাথরের ভাস্কর্যের সম্ভার, অসংখ্য বুটিক হোটেল, ইউরোপীয় খানার রেস্তোরাঁ ও কাফে । ওরা থামে ‘তেগালালাং’ গ্রামে – ক্যামেরায় বন্দী করে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধানচাষের (terrace farming) দৃশ্য । ‘তাম্পাক সিরিং’ গ্রামে ওরা যায় ‘তির্তা এম্পুল’ (পবিত্র প্রস্রবণের মন্দির) দেখতে – মন্দিরটির একপাশে সবুজ পাহাড়, চত্বরে অনেকগুলি ছোট মন্দির, দীর্ঘ ও প্রাচীন গাছের ছড়াছড়ি, একটি বেশ বড় ও কয়েকটি ছোট ছোট জলাশয় – পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা এক প্রস্রবণই এই জলের উৎস । দেখে আসে ওরা সমুদ্রতীরে ‘পুরা টানা লট’, ভাষান্তরে ‘সমুদ্রে ভাসমান মন্দির’; বালির দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে হিন্দু জলদেবতা বরুণ বন্দনার মন্দির, তীর থেকে অল্প দূরে এক ছোট্ট দ্বীপে । ভাঁটার সময় সমুদ্রের জল যায় সরে, হেঁটে পৌঁছনো যায় মন্দির চত্বরে ।নীচে থেকে প্রায় দৌড়ে পৌঁছে যায় ক্যারেন পাহাড়ের মাথায় ‘উলুওয়াটু’ মন্দিরে – বালির একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে এক পাহাড়ের শীর্ষে মন্দিরটি, খাড়াই ‘ক্যানিয়ন’-এর নীচে নীল-সবুজ রঙ মেশানো ভারত মহাসাগরের আছড়ে পড়া ঢেউ – বড়ই মনোমুগ্ধকর !

দেখতে দেখতে কেটে যায় দু’টো সপ্তাহ, ফিরে যাওয়ার আগের দিন এক পড়ন্ত বিকেলে অনিন্দ্য ও ক্যারেন পৌঁছয় ‘জিম্বারন বীচ’ – সূর্যাস্তের পর সমুদ্রের পাড়েই সী-ফুড ডিনার সেরে নেবে তারা । রক্তিম গোলাকৃতি সূর্যদেব ধীরে এগিয়ে চলেছেন দিক চক্রবাল পানে – সমুদ্রে ঠোঁট ছোঁয়ালেন সুয্যিমামা – আকাশে লালিমার পরশ, একদল পাখির ঘরে ফেরা – পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছিল ওরা সূর্য ডোবার পালা… অনিন্দ্যর আঙুলে ক্যারেনের আঙুলের ছোঁয়া, ক্যারেন বলে, ‘Ani, I would like to visit India… would love to explore your country with you dear’. অনিন্দ্য নীচু স্বরে জবাব দেয়, ‘Karen, please don’t visit India…come over to stay back forever’… ডুবন্ত সূর্যের অস্তরাগে চারটি চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে যেন… ক্যারেনকে বুকে টেনে নেয় অনিন্দ্য নিবিড় আলিঙ্গনে…

After the sunset @ Kuta
After the sunset, Kuta

নায়কোচিত…

সুদীর্ঘ কর্মজীবনে এই বিশাল দেশটা’র অনেকাংশই ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার – উত্তর-পূর্বে মায়ানমার সীমান্তবর্তী মনিপুরের মইরাং থেকে পশ্চিমে পাকিস্তান সীমানায় কচ্ছের কালাডুঙ্গর, উত্তরে হিমাচল থেকে দক্ষিণে তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম ও কেরালায় ত্রিবান্দ্রাম… এক সময়ে প্রতি সপ্তাহেই বেরিয়ে পড়েছি দিল্লী ছেড়ে, পাড়ি দিয়েছি দেশের নানা শহরে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজেক্টের কাজে, সেমিনার/কনফারেন্সে পেপার পড়তে । স্বভাবতই বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে একই বিমানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়েছে – সুনীল গাওস্কর, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, গিরিশ করনাড, জীতেন্দ্র, প্রণব মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢড়া, রাজনাথ সিং… তালিকাটি বেশ দীর্ঘই । কখনই আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যাইনি, বরং সসম্ভ্রমে এঁদের এড়িয়ে গিয়েছি আমি । একমাত্র ব্যতিক্রম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় – উনি চলে যাওয়ার কয়েক মাস আগে ওঁর সঙ্গে দিল্লী বিমানবন্দরে দেখা হয়েছিল, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলাম আর বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার !

বছর দশেক আগের কথা – ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের বানিজ্য রাজধানী মুম্বাই-তে আয়োজিত হয়েছিল Composites নিয়ে তিনদিন ধরে এক বিরাট জাতীয় স্তরের conference-cum-exhibition । সে কনফারেন্সে আমাদের পেপার ছাড়াও exhibition-এ অংশগ্রহণ করেছিল আমাদের সরকারি সংস্থা । কনফারেন্স ডিনারের আয়োজন ছিল জুহু’র Sun-n-Sand হোটেলে – রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা, ডিনারের শেষে আমরা ফিরছি আই আই টি বম্বে’র গেস্টহাউসে, আমার সঙ্গে এক পুরুষ ও এক মহিলা সহকর্মী আর আই আই টি খড়্গপুরের এক মহিলা প্রফেসর । হোটেলের লবিতে সবশেষে গাড়িতে উঠছি আমি, হঠাৎ চোখের কোন দিয়ে দেখি কিছু দূরে মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসছেন স্বপ্নের নায়ক ! অল্পবিস্তর পানীয়ের প্রভাবে কিনা জানিনা বেশ জোরেই চেঁচিয়েছি আমি, ‘ধর্মেন্দ্র’ আর গাড়ির দরজা খুলে একলাফ দিয়ে ছুটেছি নায়কের দিকে; শুনতে পাই সহকর্মী’র ব্যাকুল ডাক, স্যার, স্যার, কি করছেন ! একফুট দূরে ধর্মেন্দ্র, আমি হাতটা বাড়িয়ে বলি, ‘Sir, it’s just great to see you. I’m an avid fan of yours. We’ve grown up watching your films.’ ভুবনভোলানো হাসিতে মুখ ভরিয়ে কাছে টেনে নিয়ে নায়ক বলেন, ‘What’s your name?’ আমি জবাব দিলে বলেন, ‘Soumitra, oh you’re a Bengali’। একটু থেমে বলেন, ‘You know whatever I’m today, it’s all because of you, my dear viewers’! এত বিখ্যাত মানুষের এরকম মন ভেজানো কথা – আমি একেবারে অভিভূত, নায়ককে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে আসি আমি । আমার সহকর্মীরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে – তারা খুব ভয়ে ছিল নিশ্চয়ই হোটেলের বাউন্সার স্যারকে গলাধাক্কা দেবে, আর বেশ কিছু কটু কথা শোনাবে !

 

নানা রঙের দিনগুলি…

ছোটবেলার পূজো মানেই নতুন জামাকাপড়ের প্রলোভন – খুব ছোটবেলায় মায়ের হাতমেশিনে সেলাই করা জামা-প্যান্টই ছিল আমার বরাদ্দ । এখনও মনে আছে মা একটা সাদা কাপড়ের ওপর সরু সরু নীল বর্ডার বসিয়ে বেশ চওড়া কলারওয়ালা একটা sailor suit তৈরি করে দিয়েছিলো – সেটা ছিল এক সময়ে আমার অতিপ্রিয় পোষাক । একটু বড় হ’তেই অবশ্য রেডিমেড জামা ও দর্জির তৈরি প্যান্ট পরা শুরু হ’ল… জন্মদিন বা নববর্ষ উপলক্ষ্যে নতুন জামাকাপড়ের বিশেষ বালাই ছিলনা আমাদের, একমাত্র সন্তান হ’লেও পূজোতেও বাবা’র কাছ থেকে একটাই ভালো শার্ট ও প্যান্ট পাওয়া যেত । তবে কিনা আমার বাবাও ছিলেন এক ভাই আর মা’ও মামার বাড়িতে একই মেয়ে, অতএব আমার পিসীদের আমিই একমাত্র ভাইপো ও মামারবাড়িতে একমাত্র ভাগ্নে হওয়ার সুবাদে সব মিলিয়ে পূজোর সময় চার-পাঁচটা নতুন জামাকাপড় হয়েই যেত আমার !

আমাদের ছোটবেলায় সবই ছিল সুতীর কাপড়, ক্লাস সেভেন-এইটে উদয় হ’ল Terylene (polyester) ; সে এক অদ্ভুত কাপড় – মাঢ় দিতে হয়না, ইস্ত্রী করারও দরকার নেই, ঠান্ডা জলে কাচা যায়… টেরিলীন নতুন বাজারে এসেছে, ভালো সুতীর কাপড়ের চেয়েও তার অনেক দাম বেশী ! একটু বায়না করে একটা টেরিলীনের শার্ট হ’ল পূজোর সময়ে বাবার ঔদার্যে … সে বেশ ফ্যাশনেবল্ ব্যাপার । এই টেরিলীন নিয়ে একটা মজার ঘটনা – আমার বড়মামা টেরিলীনের শার্টে ভাল ক্রিজ হয়না, এই বলে ইস্ত্রী একটু গরম করে চালিয়েছেন; ব্যাস, শার্টের কাপড় একেবারে গলে গিয়ে বিরাট গর্ত ! কিছুদিন বাদেই সবাই বুঝতে পারলে আমাদের মত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় টেরিলীন অতি বিরক্তিকর … হঠাৎ উদয় হয়ে হঠাৎই সে উধাও হ’ল ! আগমন হ’ল নতুন তন্তুর, Terene (polyester) ও সুতী মিলিয়ে Terrycot – সে বাজার দখল করল ভালোই; তবে এখনতো আবার ১০০% সুতীর রমরমা !

আর পূজোর সময়েই নতুন জুতো কেনা হ’ত – বাটা কোম্পানীর সেই বিখ্যাত স্লোগানটা মনে পড়ে এখনও, “পূজোয় চাই নতুন জুতো – Bata”। অবধারিত ভাবে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সময় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা – পায়ে ফোস্কা পড়ত যে নতুন জুতোয় ! ক্লাস নাইনে আমাদের একটু উড়ু উড়ু ভাব, বাটা কোম্পানী বার করেছে নতুন ডিজাইনের ‘Go Go’ জুতো, বেশ হিরো মার্কা চেহারা তার । আর আমিও গোঁ ধরেছি ওই গো-গো জুতোর জন্য, ২২-২৪ টাকার বেশ দামী জুতো সে সময়ে । একমাত্র পুত্রের আবদার, বাবাও মেনে নিলেন শেষমেশ ! আর সেই জুতো পরে একটু নায়কোচিত হাবভাবে আমি ঘুরে বেড়াই পূজো প্যান্ডেলে । সবচেয়ে দুঃখ হ’ত পূজোর সময় বৃষ্টি পড়লে, জলে-কাদায় নতুন জুতোর দফারফা হ’য়ে যেত একেবারে !

নীচু ক্লাসে আমাদের এক বিরাট আকর্ষণ ছিল দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত পূজাবার্ষিকী – রামধনু, মনিহার, বেনুবীণা, মন্দিরা… হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে বাবা’র কাছ থেকে পাওয়া যেত পূজোর সময় ওই বহু আকাঙ্খিত বইটি । হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট ও ময়ূখ চৌধুরির কার্টুনের জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে থাকতাম । আমি হয়ত তখন ক্লাস ফাইভ কিংবা সিক্সে পড়ি, বাবার সঙ্গে গিয়েছি আমার এক দিদুর (মায়ের নিজের মাসী) বাড়ি, চলে আসার সময় দিদু আমাকে দশটা টাকা দিয়ে বললেন পছন্দ মত কোনও বই কিনে নিতে । সেই মহামূল্যবান দশটাকা নিয়ে আমি ও বাবা কলেজ স্ট্রীট কফি হাউসে বেশ পেল্লায় সাইজের দু’টো চিকেন কবিরাজি কাটলেট খেয়ে, বাকি টাকা দিয়ে পূজাবার্ষিকী কিনে মহানন্দে বাড়ি ফিরি – সেই আমার কফি হাউসে প্রথম পদক্ষেপ…

আমরা যখন এইট-নাইনে পড়ি তখন বাজারে এলো ‘কিশোর ভারতী’ – কিছুদিনের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা পৌঁছালো তুঙ্গে । পরের দিকে কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেব সাহিত্য কুটীরের পূজাবার্ষিকী কিনলে, আমি কিনতাম শারদীয়া কিশোর ভারতী – কয়েকদিনের মধ্যেই বই পালটে দুটোই পড়া হয়ে যেত আমাদের । এছাড়াও ছিল মৌচাক ও সন্দেশ – সত্যজিত রায়ের লেখা প্রফেসর শঙ্কু, ফটিকচাঁদ এসব মনিমানিক্য পড়েছি সন্দেশে । আর প্রতিবছর শারদীয়া দেশে বেরোত ফেলুদা’র গোয়েন্দাকাহিনী – সে এক রোমাঞ্চকর উত্তেজনা ! স্কুল জীবনের একেবারে শেষধাপে আবির্ভাব হ’ল ‘আনন্দমেলা’র; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু মন কেড়ে নিল খুব শীঘ্রই ।

ছোটবেলাতেই কলকাতা ছেড়েছি আমি – বাবা’র চাকরি খড়্গপুরে; প্রতি পূজোয় কিন্তু আমাদের কলকাতা যাওয়া চাইই । তাই ষষ্ঠী-সপ্তমী দু’দিন বরাদ্দ ছিল খড়্গপুরের জন্য; পূর্বে ইন্দা থেকে পশ্চিমে সুভাষপল্লী অবধি গোটা দশেক ঠাকুর দেখা তো হয়েই যেত – তালবাগিচা, ডিভিসি, খড়িদা এসব প্রত্যন্ত অঞ্চল বাদ পড়ে যেত । খড়্গপুরের সবচেয়ে বনেদী পূজো গোলবাজারের দুর্গা মন্দিরে, পুরোনো জমিদারবাড়ির আদলে তৈরি বিরাট ঠাকুর দালান – মন্ডপের সামনে সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গন, তার অপর প্রান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ । ডাকের সাজে পুরোনো ধাঁচের প্রতিমা; সন্ধ্যারতির পর ঢাকের তালে তালে ধুনুচি নাচ – দুর্গা মন্দিরের পূজোবাড়ি গমগম করত ! সেখানে গেলেই দেখা হ’ত স্কুলের কিছু বন্ধুর সঙ্গে আর আলোচনা শুরু হ’ত কে ক’টা ঠাকুর দেখল আর কোন ঠাকুরটা সবচেয়ে ভাল হয়েছে ।

অষ্টমীর দিন ভোরবেলা ফার্স্ট লোকাল ধরে কলকাতা, তখন আমাদের বাস শ্যামবাজারে ভূপেন বোস এভিনিউতে । কলকাতায় পূজোয় সবকালেই ভীড়, তা সে ভীড় ঠেলে এ প্যান্ডেল থেকে ও প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখা আমার মায়ের ঘোর নাপসন্দ্ । আমি ও বাবা মহা উৎসাহে বেরিয়ে পড়ি – আমাদের পাড়া’র শ্যামবাজার কেন্দ্রীয় সার্বজনীন দিয়ে শুরু, শ্যামপুকুরে বন্ধুদল, অল্প দূরেই বাগবাজার সার্বজনীনের সুপ্রাচীন পূজো ও বিরাট মাঠ জুড়ে মেলা, কুমারটুলি সার্বজনীন, জগৎ পার্কে অদ্ভুত ধরণের আর্টের ঠাকুর… এসব পেরিয়ে কলেজ স্কোয়ারে রমেশ পালের তৈরি দুর্গা প্রতিমা !

আর বিকেলে বেরিয়ে মানিকতলার কাছে বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব ও সিমলা ব্যায়াম সমিতি – যতদূর মনে পড়ে বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবে একবার প্রতিমা শিল্পী ছিলেন রমেশ পাল । রাস্তা বন্ধ করে বিরাট উঁচু প্যান্ডেল, বেশ ওপরে রাখা প্রতিমা’র নীচ দিয়ে লোক চলাচলের রাস্তা । বাবা আমাকে তুলে ধরে বলেন, ‘অসুরটাকে ভালো করে দ্যাখ !’ দেখি নিহত মহিষের পেল্লায় সাইজের মাথা দু’হাতে ধরে মা দুর্গা কে ছুঁড়ে মারতে উদ্যত অসুর, শ্যেণ দৃষ্টি হেনে দুর্গা নেমে আসছেন কৈলাশ পর্বত থেকে ত্রিশূল হাতে আর সিংহ লাফিয়েছে অসুরের দিকে । গদা হাতে গনেশ আর তীর ধনুক নিয়ে কার্ত্তিক ‘রণং দেহি’ মেজাজে এগিয়ে যাচ্ছেন, মা সরস্বতী ও লক্ষী পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরে । অসুরের ‘সিক্স প্যাক’ দেখার মত আর শরীরের শিরা-উপশিরা একেবারে অ্যানাটমির বই থেকে ধার করা, মুখে অতি হিংস্র অভিব্যক্তি, ভয়ঙ্কর ক্রুর চোখের দৃষ্টি ! এ ঠাকুর দেখতে উপচে পড়েছে ভীড়, মাইকে ঘন ঘন ঘোষনা, ‘নেবুতলা থেকে এসেছেন নেপাল ভৌমিক আপনি যেখানেই থাকুন…’

আমাদের ছোটবেলায় মহম্মদ আলী পার্কের অত কৌলীন্য ছিলনা । বাবা’র সঙ্গে আমার ঠাকুর দেখা সীমাবদ্ধ থাকত মূলত উত্তর কলকাতায়, দক্ষিণটা ছিল যেন অন্য এক রাজ্য ! তবে একবার কালীঘাটের সঙ্ঘশ্রী’র ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম মনে আছে । সমাজসেবী সঙ্ঘ, বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ও একডালিয়া এভারগ্রীন… এসব ঠাকুরের সঙ্গে আমার পরিচয় কলেজ জীবনে, দক্ষিণ কলকাতা’র বন্ধুদের সৌজন্যে । ১৯৮৪ সালে বন্ধুদের সঙ্গে সারা রাত ধরেও ঠাকুর দেখেছি – সেটাই কলকাতায় আমার দেখা শেষ পূজো !

বিয়ের পরে বার বার ছুটে গিয়েছি ভোপালের পূজোতে । যাদবপুরে পড়াকালীন আমার স্ত্রী’র তখনই তার মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে একত্র হয়ে আনন্দের সুযোগ; প্রবাসে পূজোর আন্তরিকতা হাতছানি দিয়ে সরিয়ে নিত আমাদের কলকাতা’র জাঁকজমক থেকে ।

১৯৯০ সালে কলকাতা’র মায়াজাল ছিঁড়ে পাকাপাকি ভাবে আমাদের দিল্লী চলে আসা… কলকাতা‘র পূজো ছেড়ে এসেছি তেত্রিশ বছর আগে, যদিও সুনীলের সেই মর্মস্পর্শী ভাষায় বলতে পারিনি, ‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো, আমি বিষপান করে মরে যাব’… কিন্তু মাঝে মাঝে প্রিয় কবিতা বুকটা ভারী করে দেয় যেন !

এক বিরল ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে

সুদীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের চাকুরি জীবনে অনেক গুনীজনের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছে আমার । একজন প্রবাদপুরুষ যিনি আমাকে কর্মজীবনে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, তিনি আমাদের অতিপ্রিয় একাদশতম রাষ্ট্রপতি, ডঃ এ পি জে আব্দুল কালাম । কিছুদিন আগে ডঃ কালাম পার্থিব জগত থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন – মনে পড়ছে তাঁর শিশুসুলভ সারল্য ও মানবিক ব্যক্তিত্বের কথা ।

২০০১ সালে দিল্লীতে ডঃ কালাম প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসাবে কর্মরত, তিনি তখন ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অধীনস্ত আমাদের TIFAC-এরও চেয়ারম্যান । টাইফ্যাকের Advanced Composites Mission-এ আমাকে Mission Director নিযুক্ত করেছিলেন ডঃ কালাম । নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে অনেক সময়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হ’ত – সব সময় বলতেন সাধারণ মানুষের কাজে আসে এমন সব প্রোজেক্ট নিতে । নতুন প্রযুক্তির বিকাশে দেখেছি তাঁর অদম্য উৎসাহ ও প্রেরণা । কোনও প্রোজেক্টের বিশেষ সাফল্যে সরকারি নথিপত্রে তিনি প্রায়ই লিখে পাঠাতেন, ‘Delighted’, ‘Glad to note’ কিংবা ‘Well done’ – তাঁর এসব নোটিং আমাদের অসম্ভব উদ্বুদ্ধ করতো !

ডঃ কালামকে নিয়ে একটি বিশেষ ঘটনার কথা লিখছি আজ । ২৬শে জানুয়ারী ২০০১ ভারতের ইতিহাসে একটি কালো দিন – সেদিন গুজরাতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কবলে হয় প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত । ভারত সরকারের তরফ থেকে আমাদের ডাক পড়ল ভূমিকম্প পীড়িতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থার জন্য । আমাদের বিভিন্ন প্রোজেক্টে তৈরি composite material (সংমিশ্রিত উপাদান) দিয়ে কম খরচে অস্থায়ী বাড়িঘর নির্মাণের এক পরিকল্পনা অনুমোদিত হ’ল খুব তাড়াতাড়িই । আমরা ঠিক করলাম আগামী ছয়মাসের মধ্যে প্রায় ৪০০ টি বাড়ি ও ১২৫ টি ফাইবার গ্লাসের শৌচালয় তৈরি করব গুজরাতের কচ্ছে । শীঘ্রই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম প্রতিটি বাড়ি ও শৌচালয় ব্লকের নকশা, টাউনশিপের layout plan, বাড়ির স্টীল স্ট্রাকচার, দেওয়াল ও ছাদের উপাদান এসব নিয়ে । অতঃপর শুরু কর্মযজ্ঞের – ভূজের কাছেই পাওয়া গেল জমি – অসমান, এবড়ো-খেবড়ো, কাঁটা ঝোপে ভরা অতি রুক্ষ – প্রায় ১০ দিন ধরে বুলডোজার চালিয়ে শুরু হল পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্মাণ । আমাদের প্রজেক্ট, ‘টাইফ্যাক-দীনদয়াল নগর’ ধীরে ধীরে এক পরিকল্পিত টাউনশিপের চেহারা নিল । ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে নভেম্বর অবধি ভূজ হয়ে উঠলো আমার দ্বিতীয় গৃহ – প্রায় প্রতি সপ্তাহে দু-তিন দিনের জন্য আমি ছুটে গিয়েছি ভূজ ও কচ্ছের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের প্রোজেক্ট সংক্রান্ত কাজে !

ভূজ পুনর্বাসন প্রকল্পে ডঃ কালামের আগ্রহ ছিল অপরিসীম, প্রতিনিয়ত খোঁজ রাখতেন তিনি আমাদের প্রোজেক্টের – নানা খুঁটিনাটি ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করতেন আর বন্ধুসুলভ উপদেশ দিতেন জোর কদমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য । মার্চ মাসের গোড়ায় আমরা যখন প্রথম ১০ টি বাড়ি তৈরি প্রায় শেষ করে এনেছি, ডঃ কালাম আমাদের কাজ দেখতে ভূজ আসতে চাইলেন । ওঁর আসার আগের দিন সারারাত ধরে কাজ করে ১০ টি বাড়ি তৈরি সম্পূর্ণ হ’ল ।

১৫ই মার্চ ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানে এসে ডঃ কালাম ভূজ বিমানবন্দর থেকে সোজা আমাদের প্রোজেক্ট সাইটে পৌঁছলেন। আমাদের তৈরি বাড়ি দেখে উনি খুব খুশী – ঘুরে ঘুরে দেখলেন সব ব্যবস্থা । আমাদের প্রোজেক্ট টিমের শ্রমিকদের সঙ্গে ছবি তুললেন – তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ক উপস্থিতি ও উষ্ণ সান্নিধ্য আমাদের সবাইকে ওই মহাযজ্ঞের কাজে করলো উজ্জিবীত ! এরই মধ্যে হঠাৎ একফাঁকে আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, “Biswas, can you build a school for the kids from your township? That would be a great service!” “I’ll surely try Sir”, আমি থতমত হয়ে জবাব দিই !

স্কুল তৈরির নকশা নিয়ে মাথা ঘামাই আমরা – ঠিক হয় ৫০০ স্কোয়ার ফুটের দুটি ক্লাসরুম হ’লে স্থানীয় স্কুল চালু করা যেতে পারে । আমাদের ভূমিকম্পের ত্রাণকার্যে অংশীদার হয় অনেক সুজন – কর্ণাটক হার্ডওয়্যার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও বেঙ্গালুরু রোটারি ক্লাবের আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয় দুটি ক্লাসরুম – আমাদের প্রোজেক্টের বাড়তি কোনও খরচা ছাড়াই ! গুজরাত সরকার শীঘ্র অনুমোদন দেয় – একজন শিক্ষকের পোস্টিং হয় আমাদের স্কুলে । মে মাসের শেষে এক সোমবার আমি ডঃ কালাম কে ফোনে জানাই, “Sir, the school you wanted us to construct is ready in Bhuj”. উনি বলেন, “Can I come and inaugurate the school?”  আমি বলি, “Then you have to do that rather soon Sir as the school cannot remain idle for long”. সঙ্গে সঙ্গে জবাব পাই, “Can it be next Saturday?”

২রা জুন (শনিবার), ২০০১ ডঃ কালাম আবার এলেন আমাদের প্রোজেক্ট সাইটে । সকালে জেট এয়ারওয়েজের বিমানে মুম্বাই থেকে ভূজ এসে অপরাহ্ণে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে উনি মুম্বাই ফিরে যাবেন – মধ্যে ঘন্টা চারেক সময় নিয়ে ঠাসা প্রোগ্রামের পরিকল্পনা আমাদের । বিমানবন্দরে ডঃ কালামকে স্বাগত জানাই, প্রোজেক্ট সাইটের পথে গাড়িতে পাশেই বসি আমি – হাসিমুখে ডঃ কালাম এক আপাত নিরীহ প্রশ্ন করেন আমাকে, “Biswas, you look very happy. Are you happy?”  আমি বলি, “I am always happy Sir, I have no problems in life”. শুনি এক জ্ঞানগর্ভ বানী, “You love your job buddy, that’s why you are so happy” – যেন এক দার্শনিক বাচন, এ আমার কর্মজীবনের পাথেয় !

স্কুল উদ্ঘাটনের অনুষ্ঠানে স্টেজে আমার থেকে একটু দূরে বসে ডঃ কালাম – দেখি তিনি সম্মান সুলভ উপহার পান এক ধাতব বস্তু একটি ছোট বাক্সে । স্টেজ থেকে নেমে সবাই ব্যস্ত যখন অনুষ্ঠান সূচনার মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে, ডঃ কালাম চট করে ওই বাক্সটি আমার হাতে দিয়ে বলেন এটা তোমার জন্য ।

স্কুল উদ্ঘাটনের পর আরও দু’টি অনুষ্ঠানে ডঃ কালামকে নিয়ে গেছি  – কেটে গেছে তিন ঘন্টা সময় । সামান্য নিরামিষ গুজরাতি থালি সহকারে সকলের মধ্যাহ্ন ভোজন ।  হঠাৎ মনে পড়ে আমার পকেটে রাখা ওই ছোট বাক্সটির কথা, বের করে দেখি সেটি বিগত দিনের কচ্ছ নেটিভ স্টেটের অতি মূল্যবান রৌপ্য মুদ্রা, পাঁচ কৌড়ি ।  আমি তো আনন্দে অভিভূত !

ফেরার পথে গাড়িতে ডঃ কালামের পাশে বসে বলি, “Sir, do you know what you gave me in the morning?”  উনি জবাব দেন, “Yeah, a silver coin, I suppose”.  আমি বলি, “That’s something fantastic! I collect coins, I have coins from 67 countries in the world.”  ডঃ কালাম উচ্ছ্বসিত হ’য়ে বলেন, “Oh! You never told me this buddy. OK, I’ll give you something very interesting.”   আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছেছি বেশ দেরীতে, প্লেন ছাড়বে একটু পরেই । হাতের ছোট ব্যাগটি আগাপাশতলা হাতড়ে ডঃ কালাম খুঁজে বার করেন একটি মাউন্টেড মুদ্রার সেট, জানান আগের দিন হায়দ্রাবাদে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফিসারদের এক সম্মানসভায় পাওয়া । সেটি আমার হাতে ধরিয়ে দ্রুত বিমান অভিমুখে রওনা দেন ডঃ কালাম ।

 

 

অবাক বিস্ময়ে ভালো করে দেখি ১৯৯৬ সালে মুদ্রিত সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্মারক মুদ্রার সেট – একটি করে ১০০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০ টাকা ও ২ টাকা মুদ্রা ।  দিল্লী ফিরে গিয়ে পরের সপ্তাহে ডঃ কালামের অফিসে দেখা করি আমি, অনুরোধ জানাই ওই মুদ্রার সেটটির ভিতরের পৃষ্ঠায় কিছু লিখে দেওয়ার জন্য । স্নেহভরে মৃদু হেসে ডঃ কালাম লেখেন,

“With best wishes for Sri S Biswas,

For his excellent work done in Bhuj”

নীচে করে দেন সই ।

আমাদের ভূজ প্রোজেক্টে অক্লেশ কর্মের অমূল্য পুরস্কার – আমার জীবনে মনিরত্ন বিশেষ !

[মাতৃ মন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত]

 

 

 

পথ চলতি…

দেখতে দেখতে নিবেদিতা কুঞ্জের সরকারি বাড়িতে আমাদের পনেরোটা বছর কেটে গেল – ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বাড়িটায় চলে আসি আমরা, আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়ি ছেড়ে । আনকোরা নতুন আটতলা বাড়ি, আমাদের ফ্ল্যাটটা পাঁচ তলায় – আমি প্রথম allotment পেয়েছি, নিবেদিতা কুঞ্জে সব বাড়ি তৈরি শেষ হয়নি তখনও । হিসেব করে দেখলে, এই বাড়িটায় জীবনে সবচেয়ে বেশী সময় থেকেছি এ পর্যন্ত ।

আমার জন্মের পর থেকে প্রায় প্রথম ছ’বছর ছিলাম আমাদের পুরানো পৈতৃক বাড়ি শ্যামবাজারে ভূপেন বোস অ্যাভিনিউতে । বাবার রেলের চাকরি – ১৯৬৩ সালে বাবা ট্রান্সফার হ’লেন খড়্গপুরে; আমি ও মা খড়্গপুরে এলাম ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে – তালেগোলে স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়াই হ’লনা আমার, বাড়িতেই মা’র কাছে পড়েছি ক্লাস ওয়ানের পাঠ । বাবা প্রথমে কোয়াটার্স পেয়েছিলেন ট্র্যাফিক সেটেলমেন্ট নামে এক পাড়ায়, সে বাড়িটা আমাদের কারোরই পছন্দ হ’য়নি একটুও – মাস তিনেক সেখানে থাকার পর আমরা চলে আসি ডেভেলাপমেন্ট কলোনীতে ৫৮৬ নম্বরে । সবই ঠিক ছিল বাড়িটায়, কিন্তু বাড়িতে রোদ্দুর ঢুকতো না একদম আর বাগান করারও জায়গা ছিল না বিশেষ । পাড়াটা মা-বাবার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল, প্রতিবেশী কাকিমা-মাসীমা’রা মায়ের বেশ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ।

বছরখানেকের মধ্যেই ঠিক উল্টো দিকে ৫৯৪ নম্বর বাড়িটায় চলে যাই আমরা, সেখানে কাঁটাতার ঘেরা বিরাট বাগান – মা অদম্য উৎসাহে বাগান করতে লেগে গেলেন । অচিরেই অনেক দোপাটি, অপরাজিতা ও গাঁদা ফুলে বাগান ভরে উঠলো – এছাড়াও ছিল শীতকালের মরশুমী ফুল । মায়ের লাগানো হাস্নুহানা গাছটা গরম কালের সন্ধ্যায় তার ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে বাতাস ভারী করে দিত যেন । বাগানের পেছন দিকটায় একটা বেশ ঝাঁকড়া কাঁঠাল গাছ ছিল আর তাতে ফল ধরত প্রচুর । নিজেদের খাওয়ার কথাতো বাদই দিলাম, প্রতিবেশীদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে এঁচোড় দিয়ে আসতাম আমি । বাড়িটার পেছনে একটা বিরাট সিমেন্ট বাঁধানো খোলা উঠোন আর সেই উঠোন পেরিয়ে পাঁচিলের গায়ে কলতলা । এ বাড়ি থেকেই ১৯৬৪ সালের গোড়ায় সাঊথ সাইড প্রাইমারী স্কুলে সরাসরি ক্লাস টু’তে ভর্তি হই আমি । আর সে বছরই দুর্গাপূজোর সময় লক্ষ্ণৌ বেড়াতে গিয়ে আমার ডান হাতটি ভাঙে – তার ফলে আমি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বসতেই পারিনি । হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফোর্থ হয়েছিলাম বলে ক্লাস থ্রি-তে প্রমোশন দিয়েছিল স্কুল, আর ‘Good Conduct’-এর একটা প্রাইজও দিয়েছিল । এই বাড়িতেই ১৯৬৯ সালে বাবা ম্যালিগন্যান্ট মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন । সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনও গা শিউরে উঠে কেমন যেন !

১৯৬৯ সালে জানুয়ারী মাসের এক সকালে আমরা কুঁচো-কাঁচারা খবর পেলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যাবেন আমাদের পাড়ার পাশের রাস্তা দিয়ে – প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছিলেন আই আই টি-তে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস উদ্বোধন করতে । খোলা জীপে করে আসছেন ইন্দিরা গান্ধী, আমরা জনা দশ-বারো বাগান থেকে ফুল তুলে ছোট ছোট তোড়া বানিয়ে তাঁর পথ আটকেছি । প্রধানমন্ত্রী সস্নেহে হাসিমুখে আমাদের হাত থেকে ফুল গ্রহণ করেন, করজোড়ে নমস্কার জানান আমাদের ! একজন পুলিসও এসে বকুনি দেয়নি আমাদের, হাসতে হাসতেই সরে গিয়েছি আমরা রাস্তা থেকে । একথা এখন একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হয়…

১৯৭০ সালের মাঝামাঝি আমরা চলে গেলাম খড়্গপুরের সাউথ সাইডে, ২২৫/ইউনিট-২ নম্বর বাড়িতে । এ বাড়িটা একটু বড় আর পাড়াটা বেশী অভিজাত ! অনতিদূরেই আমাদের রেলওয়ে স্কুল – সেটাই এই বাড়িতে যাওয়ার মূল কারণ যদিও । ডেভেলাপমেন্ট পাড়াটা ছাড়তে পেরে আমি যার পর নাই খুশী, আমার অসন্তোষের প্রধান কারণ পাড়ার ছেলে-ছোকরার দল –আমাদের কিছুটা সিনিয়ার হাতেগোনা দু’এক জনকে বাদ দিলে, সবাই লেখাপড়ায় একেবারে রদ্দিমার্কা, তার সঙ্গে নানারকম শয়তানি বুদ্ধি, নিজেদের মধ্যে মারপিট, যথেচ্য নোংরা ভাষার ব্যবহার – ভবিষ্যতের পথ ঝরঝরে করার সব উপাদানই মজুদ তাদের । ছেলেবেলায় ঐ রকম বুনিয়াদ নিয়ে তারা কে কোথায় সব হারিয়ে গেছে ।

নতুনপাড়ায় বন্ধুরা অন্যরকম, দুষ্টুমিতে কেউ কম যায়না তারসঙ্গে নিয়ম করে খেলাধূলো, গল্পের বইয়ের আদানপ্রদান কিন্তু লেখাপড়ায় সবাই সিরিয়াস, প্রায় সবার মধ্যেই জীবনে কিছু একটা করার বা হওয়ার অদম্য ইচ্ছে – নতুন পাড়ায় এসে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন ! ১৯৭৪ সালে ঐ বাড়ি থেকেই আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে আই আই টি’তে ভর্তি হই । আর ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি বাবা খড়্গপুর ছেড়ে কলকাতা চলে যান ট্রান্সফার হ’য়ে । ইঞ্জিনীরিয়ারিং পাশ করে, এম-টেক করে আমি খড়্গপুর ছাড়লাম ১৯৮১ সালে । এরপর দিল্লী থেকে খড়্গপুর আই আই টি’তে সরকারি কাজে গিয়েছি বহুবার, সপরিবারে গিয়েছি আই আই টি’র পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আর স্কুলের বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে বছর দু’য়েক আগে আমাদের ছোটখাটো গেট টুগেদারে… খড়্গপুর আমার প্রাণের শহর, আমার বাল্যের ও কৈশোরের অতি সুখস্মৃতি বিজড়িত রেলশহর, সে শহর আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে নিজের হাতে, সে শহরে বড় হয়ে গিয়েছি দুনিয়ার কোণে কোণে – খড়্গপুর থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি, কিন্তু খড়্গপুর রয়ে গেছে আমার মনের মণিকোঠায় । খড়্গপুরের কথা মনে পড়লেই গলায় উঠে আসে একটা ডেলা, ঝাপসা হয়ে আসে দুই চোখ !

১৯৭৭ সালে বাঙ্গুর এভিনিউতে একটা ছোট্ট বাড়ি করে বাবা-মা শ্যামবাজারের পুরানো বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন । ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে আমি যখন কলকাতায় চাকরি নিয়ে গিয়েছি, বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেছেন নাগপুরে । ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে আমিও কলকাতা ছাড়লাম ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইডে চাকরি নিয়ে । এরপর আমি ও বাবা দু’জনেই ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় ফিরে এলাম ১৯৮৩ সালের অগাস্ট মাসে । ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে বাবা রিটায়ার করলেন আর আমাদের বাঙ্গুরের বাড়ির দোতলা তৈরি হ’ল । ঐ বাড়ি থেকেই আমার বিয়ে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে । প্রায় সাত বছর চেষ্টার পর কলকাতায় ভালো কেরিয়ারের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে অবশেষে ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে আমাদের দিল্লী আগমন ।

প্রথমে কিছুদিন ভাড়াবাড়ি, তারপর Scientists’ Hostel – এরই মধ্যে আমাদের কন্যা তিন্নীর জন্ম ১৯৯২’র জানুয়ারিতে । ১৯৯৪ সালে পাওয়া গেল আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়িটা, একদমই পছন্দ হয়নি বাড়িটা আমাদের কারোরই, কিন্তু ‘out of turn’ allotment, প্রত্যাখান করা যাবে না। সে বাড়িতে থাকাকালীন আমাদের পুত্র তানের জন্ম ১৯৯৪’র অগাস্টে । সেখানে কেটে গেল আটটা বছর, দু’টো প্রমোশনের গন্ডী পেরিয়েছি আমি ততদিনে । ২০০২ সালে অগাস্ট মাসের শেষে পাওয়া গেল নিবেদিতা কুঞ্জের allotment – এ বাড়িতে এসে আমরা সবাই খুব খুশী । তিনটে ভালো সাইজের বেডরুম, আরও একটা বেশ বড় study আর ড্রইংরুমটা পেল্লায়, সঙ্গে servant’s quarters ও একতলায় ঢাকা গ্যারেজ । বাবা-মা আমাদের সঙ্গে দিল্লীতে পাকাপাকি ভাবে থাকেন ১৯৯২ সাল থেকেই – আমাদের ছ’জনের জন্য এ বাড়িতে অঢেল জায়গা । আর সবচেয়ে আকর্ষক ব্যাপারটা হ’ল বাড়ির ঠিক পেছনেই আমাদের কন্যা ও পুত্রের স্কুল, ডি পি এস-আর কে পুরম; বাড়ি থেকে মিনিট ছয়েকের হাঁটাপথ !

নিবেদিতা কুঞ্জের এই বাড়ি থেকেই তিন্নী ও তানের দশ ও বারো ক্লাসের বোর্ড পরীক্ষা ভালো ভাবে পাশ করে IIIT Delhi-তে ইঞ্জিনীরিয়ারিং পড়তে যাওয়া । এই বাড়িতেই মা’কে হারিয়েছি ২০১৩ সালের অগাস্ট মাসে, আশ্চর্যজনক ভাবে তার কিছুদিন পরেই বাবাও চলে গেলেন ২০১৪ সালের মার্চে – আমাদের বাড়ির লোকসংখ্যা ছয় থেকে কমে চারে দাঁড়ালো । অগাস্ট ২০১৪-তে তিন্নী উচ্চশিক্ষার্থে পাড়ি দিল সুদূর কানাডা, বাকি রইলাম আমরা তিনজন । ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তান বি-টেক পাশ করে চাকরি নিয়ে চলে গেল হায়দ্রাবাদ – আমরা দু’জন ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’! এরপর এল বড় ধাক্কা – এ’বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বুলবুল ট্রান্সফার হয়ে গেল মুম্বাই । ‘হারাধনের একটি ছেলে কাঁদে ভেউ ভেউ’…

নিবেদিতা কুঞ্জের বাড়ি’র সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, বারান্দায় দাঁড়ালে খোলা আকাশ ও সবুজ গাছগাছালির ছড়াছড়ি । আমাদের পূব-পশ্চিমের বাড়ি, তাই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি প্রতিদিন । সন্ধ্যায় সূর্যটা যখন স্থানীয় দুর্গামন্দিরের চূড়োর পিছনে মুখ লুকোয়, আকাশটাকে রাঙিয়ে দেয় কম করে তিন রকমের লাল রঙ, একটা এরোপ্লেন ধীরে এগিয়ে যায় ডুবে যাওয়া সূর্যের পথ ধরে এয়ারপোর্টের দিকে । প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে পাতা ঝরে যাওয়া ন্যাড়া শিমুল গাছটা একদিন লেলিহান আগুনশিখার মত ফুলে ফুলে লাল হয়ে ওঠে । আর দেওয়ালির রাতে একের পর এক আতসবাজীর আলো আকাশের সব কালিমা মুছে দেয় যেন । সকালে একঝাঁক টিয়া পাখি কর্কশ চিৎকার করে বারান্দার খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়, পায়রাগুলো বকবকম শব্দ করে ঘাড় উঁচিয়ে এগিয়ে আসে বাজরার দানার লোভে ।

নিবেদিতা কুঞ্জে আমার দিন সীমিত – অবসর গ্রহণের দিন এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, ছেড়ে দিতে হ’বে সরকারি এ আবাসন, খুঁজে নিতে হ’বে নতুন কোনও ঠিকানা !