ফিরে দেখা…

আজ থেকে ৪৩ টি বসন্ত আগে প্রায় ১৭ ছুঁই ছুঁই বয়সে আমরা স্কুলবন্ধুরা হয়েছিলাম বিছিন্ন (মনে রাখতে হ’বে আমরা ১১ ক্লাসের পর হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিয়েছিলাম, অতএব অনেকের বয়সই তখন ১৭ পেরোয়নি) – দুনিয়াটাকে পালটে দেওয়ার স্বপ্ন  দেখে বেছে নিয়েছিলাম নিজেদের পথ ! এক ছোট মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের শান্ত ছত্রছায়া থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম আমরা আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে । মধ্যবিত্ত মুল্যবোধ, মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গী আর যৌথ পরিবারের স্নেহ-মমতা মাখা কৈশোর থেকে পা বাড়িয়েছিলাম দুর্নিবার যৌবনের হাতছানিতে !

আমার মনে পড়ে যে ১৯৭৪ সালে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি ১৯শে মার্চ বাংলা পরীক্ষা দিয়ে শুরু হয়ে ১লা এপ্রিল বায়োলজি পরীক্ষা দিয়ে শেষ হয়েছিল । তিনবছরের সিলেবাসের গুরুভার মাথা থেকে নামিয়ে কেমন যেন বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মত অবস্থা আমাদের । পরের দিনই ২রা এপ্রিল খড়্গপুর রেলওয়ে স্কুলের আমরা একদল ছুটেছিলাম মেদিনীপুরের মহুয়া সিনেমায় তখনকার সুপারহিট ছবি টীন-এজার লাভস্টোরি, ‘ববি’ দেখতে । আমাদের এক বন্ধু সুকুমার ‘ববি’ দেখতে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তার বাবা এমন চোখে তাকিয়েছিলেন সুকুমার যেন মানুষ খুন করে এসেছে; বেচারা সুকুমারের ‘ববি’ দেখা আর হয়নি ! বলাই বাহুল্য এ ছবি দেখার পর উদ্ভিন্ন যৌবনা ডিম্পল কাপাডিয়া আমার বেশ কিছু রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল । ৩রা এপ্রিল আমরা ভীড় করেছি খড়্গপুরের বম্বে সিনেমায় রাজকুমার অভিনীত ইন্দো-পাক যুদ্ধের বিষয় নিয়ে ছবি, ‘হিন্দুস্তান কি কসম’ দেখতে । তার পরদিন ৪ঠা এপ্রিল ডিম্পল কাপাডিয়ার মোহিনী আকর্ষণে সাড়া দিয়ে আমি গিয়েছি আবার ‘ববি’ দেখতে । এর ফলস্বরূপ পাওয়া গেল মায়ের কাছ থেকে এক কড়া বকুনি; ‘সাপের পাঁচ পা দেখেছো নাকি? সামনে লাইন দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্ট, সেগুলোতে ভালো ফল না করলে জীবনে তো কিছুই করতে পারবে না !’

এখানে বলে রাখা উচিত যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার শিকার ছিলাম আমরা সবাই, তাই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া আর কোন কেরিয়ার পছন্দের বিলাসিতা ছিল আমাদের একেবারেই ব্রাত্য । লেখাপড়ায় ভালো করে ওই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এই ঢুকতে হবে, ওটাই মূললক্ষ্য ! পড়াশোনায় একটু অমনোযোগী হলেই বাবার একটা খুব চালু উক্তি ছিল, ‘তবে কি রেলের খালাসী হবি ?’ রেলের খালাসী সম্বন্ধে খুব একটা সম্যক ধারণা ছিলনা, তবে ব্যপারটা যে বেশ খারাপ সেটা বুঝতাম !

আই আই টির অ্যাডমিশনের জন্য অ্যাপ্লিকেশন ফর্মের কথাটা বলি – আমরা খড়্গপুরের ছেলে, তাই ফর্ম ভরতে সোজা আই আই টি পৌঁছেছি । ফর্মের সঙ্গে ১৫ টাকার পোস্টাল অর্ডার জমা দিতে হবে, কোথায় পাব পোস্টাল অর্ডার ? আই আই টির মধ্যেই পোস্ট অফিসে পাওয়া যায় নাকি, তা আমি কুড়ি টাকা দিতে কাউন্টার থেকে ১৬.৫০ টাকা কেটে আমাকে ৩.৫০ টাকা ফেরত দিলে । আমার মুখ চুন, আমাকে ঠকিয়ে ১.৫০ টাকা বেশী নিয়ে নিল, পোস্টাল অর্ডারে যে কমিশন লাগে তা জানা ছিলনা তখন !

যাই হোক ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ও ৫ই মে আমরা বসেছিলাম আই আই টির জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় – পরীক্ষার সেন্টারও আই আই টিতেই । দিনে দু’টো তিন ঘন্টার পরীক্ষা, প্রথম দিন অঙ্ক আর কেমিস্ট্রী, পরদিন ইংরাজি ও ফিজিক্স । পরীক্ষা কিরকম দিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই, কিন্তু পরিস্কার মনে আছে দু’টো পরীক্ষার মধ্যে এক ঘন্টার বিরতিতে কিছু খাওয়ার জন্য মা আমাকে দু’দিন একটা করে টাকা দিয়েছিলো – সে টাকায় আই আই টির ক্যান্টিনে ৫৫ পয়সা দিয়ে কোকা কোলা খেয়েছিলাম স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে । আর একটা ব্যাপার বেশ মনে আছে, শেষ পরীক্ষা ছিল ফিজিক্সের – পরীক্ষা শুরুর আধঘন্টা পর হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি ৪-৫ টা বেঞ্চ দূরে বসা আমাদের রেলওয়ে গার্লস স্কুলের এক প্রথম দিকের ছাত্রীর (নামটা উহ্যই রাখলাম) চোখে অঝোর বারিধারা, হাতে ধরা প্রশ্নপত্রের প্রতি অসহায় দৃষ্টি ! শুনেছিলাম পরের বছর সে নাকি ডাক্তারি তে ভর্তির সু্যোগ পেয়েছিল ।

তারপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন – ৮ই মে, ১৯৭৪; অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেন্স ফেডারেশনের সভাপতি জর্জ ফার্নান্ডেজের ডাকে সারা ভারতে একযোগে শুরু রেল ধর্মঘট । তার জোরালো প্রকোপ পড়েছিল রেল শহর খড়্গপুরে – সরকারের তরফ থেকে ধরপাকড়, বাড়ী থেকে ড্রাইভার-গার্ডদের  জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ট্রেন চালানোর বিফল প্রচেষ্টা । ১৭ থেকে ১৯শে মে হওয়ার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স, কিন্তু রেল ধর্মঘটের প্রভাবে সে পরীক্ষা পিছিয়ে গেল জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে – আমাদের প্রিপারেশনেও ঢিলে পড়লো ।

৩রা জুন সোমবার আমাদের আই আই টি জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল বেরোলো, আমাদের স্কুল থেকে আমাকে নিয়ে তিনজন চান্স পেয়েছে । জুনের মাঝামাঝি কাউন্সেলিং, সেদিনই  সাকুল্যে ৬০০-৬৫০ টাকা জমা দিয়ে আই আই টিতে ভর্তিও হয়ে গেলাম আমরা ।  এরপর আমায় আর পায় কে, মনে মনে ঠিক করেই রেখে ছিলাম পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আর বসবো না । আমার বড়মামা তখন মেদিনীপুরে খুব নামী ডাক্তার, তাঁর বরাবরের ইচ্ছে আমি ডাক্তার হই – আমি পরীক্ষাই দিইনি শুনে, ভীষণ রাগারাগি করে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন !

এরপর অগাস্ট মাসে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ – আমরা মফঃস্বলের ছেলে, হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করাটাই ছিল সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি । আই আই টি তে ঢোকার পরেও মনে ভয়, ফার্স্ট ডিভিশন পাব তো ? রেজাল্ট বেরিয়েছে, হেড মাস্টার মশাইয়ের ঘরে মার্কশীট এসে পৌঁছেছে ডাক মারফত । আমরা দুরুদুরু বক্ষে বাইরে অপেক্ষা করছি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম । আমাদের ইংরাজির শিক্ষক, শ্রী এন কে রায়কে আমরা কোনও দিন হাসতে দেখিনি, তিনি দেখি মৃদু হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলি, ‘স্যার, আপনি কি রেজাল্ট দেখেছেন, ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি স্যার?’ উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরিয়ে রায় মশাই বলেন, ‘স্টার পেয়েছিস তো রে, দু’টো সাবজেক্টে লেটার পেয়েছিস’ ।

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে ! সাইকেল নিয়ে ঊর্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটি মায়ের হাসিমুখটা দেখবো বলে…

[প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমাদের সময়ে ৭৫% নম্বর পেলে বোর্ড থেকে প্রকাশিত রেজাল্ট বুকলেটে রোল নম্বরের পাশে একটি * দেওয়া থাকতো; লেটার মানে কোনও বিষয়ে ৮০% বা তার বেশী মার্কস পাওয়া । আর ওই রকম ডাকসাইটে রেজাল্টের পর বড়মামা মেদিনীপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন অভিনন্দন জানাতে ।]