পরিতোষের পৃথিবী

পরিতোষবাবু একা মানুষ, প্রায় নিজেকে নিয়েই থাকেন তিনি । ডালহাউসি পাড়ায় এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হেড অফিসে তিনি বছর দুই আগে তাঁর সেকশানের বড়বাবু হয়েছেন, রিটায়ারমেন্টের আগে এটাই অবশ্য শেষ প্রমোশন – তা মাইনেপত্র, বোনাস এসব মিলিয়ে উপার্জন তাঁর একার জন্য যথেষ্ট । বাহুল্যবর্জিত তাঁর জীবন, শাক চচ্চড়ি আর মাছের ঝোল-ভাতেই পরিতৃপ্ত পরিতোষবাবু, তবে সপ্তাহান্তে পেগ দুয়েক হুইস্কি তাঁর গতানুগতিক জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে যেন ! তাঁর আর এক বিলাসিতা মাসের প্রথমে বাড়ি ফেরার সময় রাসবিহারীর মোড়ের মিষ্টির দোকানে এক ভাঁড় রাবড়ি সেবন । এই পঞ্চান্ন বছর বয়স অবধি কোনওদিন রেসের মাঠমুখো হননি তিনি আর নারীসঙ্গের অভাবটাও বিশেষ বোধ হয়নি তাঁর । এমনকি কম্প্যাশনেট গ্রাউন্ডে তাঁরই সেকশানে চাকরি নিয়ে আসা বছর পঁয়তাল্লিশের বিধবা ইলা চক্রবর্তী তাঁর প্রতি ছায়াঘন চোখে তাকালেও পরিতোষবাবু বেশ উচিত গাম্ভীর্যের সঙ্গেই মোকাবিলা করেছেন পরিস্থিতির সঙ্গে । তবে কিনা অফিসের ছেলে-ছোকরার দল আড়ালে তাঁকে কিপটে বলে নিন্দে করে । বলে ইলাদি শত চেষ্টা করেও সফল হবেনা, পরিতোষবাবু মোটেই টলবেননা, পা হড়কালে অনেক খরচা হয়ে যাবে যে !

যে যাই বলুক পরিতোষবাবু মোটামুটি সুখী পুরুষ – রামনগর হাইস্কুল তারপর কাঁথি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেছিলেন পরিতোষ, তাঁর স্কুল-কলেজের বন্ধু-বান্ধব সব গ্রামাঞ্চলেই থেকে গেছে আর কলকাতা শহরে বিশ্বাস করে নতুন বন্ধু করে উঠতে পারেননি তিনি । তাতে কিছু যায় আসেনা তাঁর, একার পৃথিবীটা প্রতিদিনই এক অচেনা রূপ খুলে ধরে তাঁর সামনে – সন্ধ্যায় টিভিতে ডিসকভারি ও ট্র্যাভেল চ্যানেল, ছুটিছাটার দিনে গড়িয়াহাটের মোড় থেকে কিনে আনা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের পুরানো সংখ্যা আর সাত সকালে খুঁটিয়ে আনন্দবাজার পড়া, এসব খুচরো আনন্দ নিয়ে ভালোই দিন কেটে যায় পরিতোষবাবুর ।

তবে সঙ্গী তাঁর আছে বটে একজন – অনেক দিনের বিশ্বস্ত পবন, পরিতোষবাবুর সঙ্গেই থাকে সে; আদতে বালেশ্বরের লোক, তারও গ্রামদেশে কেউ আর বেঁচে নেই । পরিতোষবাবুই এখন তার ধ্যানজ্ঞান, সর্বক্ষণই তাঁকে আগলে রাখে সে । বহুবছরের সান্নিধ্যের ফলে মনিব-নফরের সম্পর্কটা বেশ একটা অম্লমধুর কাকা-ভাইপো মার্কা সম্পর্কে দাঁড়িয়েছে যেখানে ভাইপোই যেন অভিভাবক আর কাকাবাবুও নিজের মনে হেসে মেনে নেন এ উল্টোপুরাণ !

রবিবার দিনটা নিজেকে কেমন রাজা রাজা মনে হয় পরিতোষবাবুর – শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর নিয়মমাফিক হুইস্কিপান; রবিবার একটু দেরী করে ঘুম থেকে উঠে লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে প্রাতরাশ তারপর হাতে দু’টো থলি ঝুলিয়ে বাজারে বেরোন পরিতোষবাবু, সারা সপ্তাহের বাজারটা সেরে ফেলেন একদিনেই । আনন্দবাজারটা আদ্যন্ত পড়ে বেলা সাড়ে বারোটা বাজলে পবনের তাড়াতে বাথরুমে ঢোকেন তিনি । একটা নাগাদ পবন তাঁর খাবার থালা সাজিয়ে দেয় – বিশেষ কিছুই নয়, সাধারণ লাউছেঁচকি কিংবা শুক্তো আর গুলে মাছের ঝাল পবনের হাতের গুণে অসামান্য হয়ে দাঁড়ায় । এরপর এক অতি সুখ উদ্রেককারী ঘন্টা দু’য়েকের দিবানিদ্রা !

বছরদশেক আগে চেতলায় সাকুল্যে আড়াই কামরার এই একতলা বাড়িটা সস্তায় ভাড়া পেয়ে যান পরিতোষবাবু – মাঝারি সাইজের একটা শোবার ঘর, পবনের একটা ছোট ঘর, বেশ বড় বসার ঘর ও রান্নাঘর, বাথরুম নিয়ে বাড়িটা পরিতোষবাবুর বিশেষ পছন্দ, পাশেই একটা কর্পোরেশনের মাঠ, আর মাঠ পেরিয়ে বাচ্চাদের এক স্কুল, তা সে স্কুল বসে সকালে ঘন্টা চারেকের জন্য । প্রতিবেশীদের বাড়ি দূরে দূরে, তাই নেই কোনও প্রতিবেশীর গায়ে পড়া ঔৎসুক্য । গড়ে ওঠে নিরালায় পরিতোষবাবু ও পবনের একান্ত পৃথিবী…

গত রবিবার বিকেলে গড়িয়াহাটের মোড়ে একটা পুরানো ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে চোখটা আটকে গেল পরিতোষবাবুর, ‘Mystery of the Universe’ । দরদাম করে পঞ্চাশ টাকায় ম্যাগাজিনটা কিনেও ফেললেন তিনি । বাড়ি পৌঁছে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে গোগ্রাসে যেন গিলতে থাকেন  লেখাগুলি – পরিতোষবাবুর চোখের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য ! এতদিন তাঁর জ্ঞান সীমিত ছিল আমাদের নবগ্রহে, তার বাইরে ব্রহ্মাণ্ডের অনেক কিছুই ছিল তাঁর অজানা । পরিতোষবাবু পড়লেন গ্রহ, তাদের উপগ্রহ, তারকা সমূহ নিয়ে কয়েক যোজন লক্ষ মাইল জুড়ে আমাদের এই আকাশগঙ্গা (Galaxy) যার নাম ছায়াপথ বা Milky Way – এরকম  অসংখ্য আকাশগঙ্গা রয়েছে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে, প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে যার সৃষ্টির ব্যাখ্যা করেছে বিজ্ঞান ‘Big Bang’ থিয়োরির মাধ্যমে । ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে পেরোতে হবে প্রায় ৫০,০০০ কোটি আলোকবর্ষের পথ (তাঁর মনে পড়ে গেল স্কুলের বিজ্ঞান বইতে পড়েছিলেন যে আলো এক সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল পথ অতিক্রম করে) । ব্রহ্মাণ্ডের এই অসীম ব্যাপ্তির কথা জেনে হতবাক হয়ে গেলেন পরিতোষবাবু, বিপুলা এ বিশ্বের পরিধির কাছে নিজেকে বড়ই তুচ্ছ বলে মনে হতে লাগলো তাঁর । ছাদে উঠে বেশ কিছুক্ষণ ধরে একমনে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি; গ্রহাদি ও নক্ষত্র মন্ডলকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন এই পরিণত বয়সে ।

সোমবার অফিস থেকে ফেরার পথে একটা অদ্ভুত কাজ করে ফেললেন পরিতোষবাবু – পার্ক স্ট্রীটে এক অ্যান্টিক ও কিউরিও’র দোকানে গিয়ে একটা টেলিস্কোপ দেখতে চাইলেন তিনি । দোকানের মালিক মিঃ লালওয়ানি জানালে তার কাছে ৪” ব্যাস ও ৭৫ গুণ ম্যাগনিফিকেশন সম্পন্ন পেতলের একটি টেলিস্কোপ আছে, সেটি ব্যবহৃত হত কোনও এক জাহাজে, গুজরাতে পুরানো জাহাজটি ভাঙা হ’লে বহু হাত ঘুরে টেলিস্কোপটি পৌঁছয় তার দোকানে । জীবনে প্রথম শখ করে কড়কড়ে ৫,০০০ টাকা খরচ করে টেলিস্কোপটা দুম করে কিনেই ফেললেন পরিতোষবাবু । ট্যাক্সি চেপে বাড়ি ফিরে সটান ছাদে উঠে ট্রাইপডে টেলিস্কোপটি বসিয়ে তাতে চোখ লাগিয়ে তিনি তাজ্জব – একি শনির বলয় একেবারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আর বৃহস্পতির চারধারে মেঘের আবরণ ! শুরু হল পরিতোষবাবুর নতুন প্রেম জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে…

রোজই  অফিস থেকে ফিরে এসে ছাদে চলে যান পরিতোষবাবু, সাতটা থেকে রাত সাড়ে ন’টা অবধি টেলিস্কোপে মহাকাশ পরিদর্শন করেন তিনি; গ্রহ-তারা জগতের নেশায় বুঁদ হয়ে যান যেন, অতঃপর পবনের চেঁচামেচিতে নীচে নামতে বাধ্য হ’ন খাওয়াদাওয়া সারতে । টেলিস্কোপে রাতের আকাশ চষে ফেলার পাশাপাশি পরিতোষবাবু পড়তে শুরু করলেন মহাকাশ জগত সম্বন্ধে । বেশ কিছু বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের বই কিনে ফেললেন তিনি, জানতে পারলেন Unidentified Flying Object বা ইউএফও’র কথা । ১৯৪৭ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে পৃথিবীর নানা জায়গায় দেখা গেছে ইউএফও – বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা, জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স ও সুইডেন সরকার এবং তাদের সামরিক বিভাগ অনেক অনুসন্ধান চালিয়েছে ইউএফও নিয়ে । অনেক রিপোর্টই জনসমক্ষে আসেনি, কিন্তু কেউই জোর গলায় ইউএফও’র সম্ভবনা উড়িয়েও দিতে পারে নি ।  ব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও প্রাণীর অস্তিত্ব আছে কিনা এ নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে দ্বিমত, অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন মানুষের চেয়েও মেধায় উৎকৃষ্ট প্রাণী আছে হয়ত দূরদূরান্তের কোনও গ্রহে । মহাকাশ থেকে ভেসে আসা কিছু অদ্ভুত সিগন্যাল এই থিয়োরিকে সমর্থন যোগায় । চীনদেশে ৫০০ মিটার ব্যাসের এক বিশালাকায় রেডিও টেলিস্কোপ বসানো হয়েছে ভিন্ন গ্রহের প্রাণীদের পাঠানো সিগন্যাল রেকর্ড করে অনুধাবন করার জন্য – মানুষের চেয়ে উন্নত মেধার প্রাণীদের খোঁজে সারা বিশ্ব খুবই তৎপর ।

শনিবার সন্ধ্যায় ঘন্টা তিনেক ধরে টেলিস্কোপে পূর্ণিমার চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে নীচে নামলেন পরিতোষবাবু, তারপর তাঁর নিয়মমাফিক সন্ধ্যাহ্নিক দুই পেগ হুইস্কি দু পিস মাছভাজা দিয়ে ।  সেদিন রাতের মেনুতে পাটশাক দিয়ে ডাল, আলু-ফুলকপির ডালনা ও কাজলি মাছের ঝাল – আহা ! মনে মনে পবনের জয়জয়কার করলেন পরিতোষবাবু । মহাকাশ নিয়ে লেখা একটা নতুন সায়েন্স ফিকশনের বই নিয়ে আরামকেদারায় বসলেন তিনি, Inter-galactic Travel-এর টান টান উত্তেজনার কাহিনী । প্রথম দু’টো পরিচ্ছেদ শেষ করতেই দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত বারোটা বাজল, ফাঁকা জায়গা, চারদিক বেশ নিঝুম; বইটা রেখে দিয়ে ঘরের আলোটা নিভিয়ে শুতে যাবেন পরিতোষবাবু – ওমা, এ কি কান্ড !  বাইরে থেকে এক তীব্র সার্চ লাইটের আলো তাঁর ঘরের মধ্যে ঘুরতে লাগলো ।  পরিতোষবাবু জানালায় গিয়ে দাঁড়ালেন – দেখলেন এক বিরাট গোলাকৃতি বস্তু ওই জোরালো আলো ফেলে ধীরে ধীরে নেমে আসছে পাশের মাঠে । সত্যি সত্যি ইউএফও দেখছেন নাকি পরিতোষবাবু ? ব্যাপারটা একটু ভালো করে বুঝতে পবনকে না ডেকে খুব সন্তর্পণে বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন তিনি ।

এক রূপোলী ধাতব গোলক, ব্যাস তার কমপক্ষে ১২ ফিট – মাটির কাছাকাছি আসতেই গোলকের নীচ থেকে তিনটে পায়া বেরিয়ে এল, সে পায়ায় ভর দিয়ে গোলক মাঠে দাঁড়ালো আর তার সামনের এক প্যানেল খুলে গেল নিঃশব্দে ।  কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনটি অদ্ভুত চেহারার জীব গোলকটি থেকে লাফিয়ে নেমে এল আর তাঁকে দেখতে পেয়েই তাঁর দিকে এগোল । কিম্ভুত ওই জীবগুলির দেহ বলতে এক চকচকে ধাতব বাক্স আর বাক্সের নীচে তিনটে পা নিয়ে বেশ জোরেই হেঁটে আসছে তারা । হাতের জায়গায় দু’টো স্প্রিং-এর মত জিনিস ঝুলছে; মুখ, চোখ, নাক, কান নেই কিছুই – বাক্সের ওপরের দিকে লাল, নীল, বেগুনী সব আলো জ্বলে উঠছে । পরিতোষবাবুর তো চোখ যাকে বলে ছানাবড়া !

তিনজনের মধ্যে লীডার গোছের একজন এগিয়ে এসে পরিতোষবাবুকে উদ্দ্যেশ্য করে কিছু অদ্ভুত আওয়াজ করলো, তিনি পরিস্কার বুঝতে পারলেন সে কি বলছে – ওদের ভাষায় কথা বললে কি হবে, সে কথা তাৎক্ষণিক বাংলায় তর্জমা হয়ে যাচ্ছে ! এ যে মানুষের চেয়ে প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে । পরিতোষবাবু শুনলেন, ‘কি হে, ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না? আমরা কিন্তু সত্যিই বহুদূর থেকে আসছি, আমাদের গ্রহটা পৃথিবী থেকে ৫০০ আলোকবর্ষ দূরে । অবশ্য আমাদের এখানে আসতে সময় লেগেছে তোমাদের হিসেবে মাত্র ১৫ দিন । দেখবে নাকি আমরা কোথা থেকে এসেছি?’ এই বলে সে স্প্রিং হাতটি তার বুকের কাছে ছোঁয়ালে আর তার বুকে ফুটে উঠলো টেলিভিশনের মত সব ছবি । পরিতোষবাবু দেখলেন মরুভূমির মত এক দেশ, শ্যামলিমার ছিটেফোঁটা নেই কোথাও, ঝাঁ চকচকে সব বিশালাকায় বাড়ি, চওড়া রাস্তা – সেসব রাস্তা দিয়ে ছোট-বড় অনেক ধাতব গোলক দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে রাস্তার একটু ওপরে শূন্যে ভাসতে ভাসতে । আরও দেখলেন নানা ল্যাবরেটরিতে ঐসব তিনপেয়ে বাক্সধারী জীব কাজ করছে অত্যন্ত উন্নত সব প্রযুক্তি নিয়ে ! ছবি দেখানো বন্ধ করে দিয়ে তিনপেয়ে লীডার বললো, ‘চলো, তোমাকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাই, আমাদের রাজা খুব খুশী হবে তোমার মত এরকম অদ্ভুত জীব দেখলে’। পরিতোষবাবু সভয়ে বলে ঊঠলেন, ‘আরে, না না, আমি এই পৃথিবীতেই খুব ভালো আছি, এই বয়সে নতুন কোথাও গিয়ে কাজ নেই আমার’ ।  লীডার বলে, ‘নিজের ইচ্ছেয় না গেলে, আমাদের জোর করতে হবে’ । সঙ্গে সঙ্গে তার দুই শাগরেদ চারটে স্প্রিং-এর হাত দিয়ে সাড়াঁশীর মত চেপে ধরলে পরিতোষবাবুকে, তিনি পবন, পবন বলে সজোরে চিৎকার করে উঠলেন !

বেলা প্রায় আটটা, বাইরে চড়া রোদ্দুর – পবন পরিতোষবাবুকে জোরে নাড়া দিয়ে বলছে, ‘কতদিন বলেছি ঐসব ছাইপাঁশ গিলবেননি, তা আমার কথা শুনবে কেন ? কি দুঃস্বপ্ন দেখছিলে, এরকম গোঁ গোঁ করে চেঁচাচ্ছো’?

 

 

Advertisements

A Moment of Pride…

Way back in 1993 I was driving my first car, a second hand Premier Padmini, always known as Fiat in Delhi’s parlance. Like its many cousins, my car also demanded routine servicing for its upkeep apart from frequent trips to the mechanic for some repair or the other. On a Friday morning, I took the car to Byford, an authorized service centre for Fiat near my office and dumped it with them for a regular service.

Byford while taking up routine service would change the components, whatever deemed necessary by them without seeking any consent from the owner. Around 5.30 pm I went to collect my car and the total bill raised for the works was Rs.480/- or so, which included replacement of a few minor components. I was carrying about Rs.300/-, which was sufficient for a routine service those days. Those primitive (!) days without credit cards or ATMs, being cashless would consign one to utter penury! It was after the bank business hours and I was at a complete loss for failing to meet the magic figure. I had promised a trip to Sarojini Nagar on Saturday morning for shopping to my dear wife and mom-in-law, who was visiting us then… I was aghast with Byford and its smart practices!

The accounts clerk told me, ‘Please meet our Director-Finance, only he can bail you out of this’. I ambled across to the room of Director-Finance with a lot of trepidation – I discovered an elderly bespectacled and elegantly dressed Punjabi gentleman in his seventies poring over some papers. I narrated my predicament with all sincerity and as I had stopped for catching my breath, I heard, ‘What did you say your name? Is it Mr Biswas? How can I not trust one who is called Biswas?’ That was a common joke in North India in my conjecture. But he continued, ‘You were not even born those days young man, I was a student of DAV College, Lahore. And Professor Biswas taught us English literature…I would never forget the lessons of Shakespeare by him. He was the best teacher I have ever had in my life! So anything for Mr Biswas…please take your car and whenever you feel comfortable, come back and make the payment.’ With these words, he happily signed on my bill allowing deferred payment!

So much love for a teacher! A rare moment to titillate my Bengali ego…thanks to my scholarly namesake, my family could enjoy the weekend outing as promised to them. And it goes without saying that as Byford had opened its shutters next Monday morning, I promptly paid the balance amount.

[Based on a true incident]

এক বিরল ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে

সুদীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের চাকুরি জীবনে অনেক গুনীজনের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছে আমার । একজন প্রবাদপুরুষ যিনি আমাকে কর্মজীবনে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, তিনি আমাদের অতিপ্রিয় একাদশতম রাষ্ট্রপতি, ডঃ এ পি জে আব্দুল কালাম । কিছুদিন আগে ডঃ কালাম পার্থিব জগত থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন – মনে পড়ছে তাঁর শিশুসুলভ সারল্য ও মানবিক ব্যক্তিত্বের কথা ।

২০০১ সালে দিল্লীতে ডঃ কালাম প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসাবে কর্মরত, তিনি তখন ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অধীনস্ত আমাদের TIFAC-এরও চেয়ারম্যান । টাইফ্যাকের Advanced Composites Mission-এ আমাকে Mission Director নিযুক্ত করেছিলেন ডঃ কালাম । নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে অনেক সময়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হ’ত – সব সময় বলতেন সাধারণ মানুষের কাজে আসে এমন সব প্রোজেক্ট নিতে । নতুন প্রযুক্তির বিকাশে দেখেছি তাঁর অদম্য উৎসাহ ও প্রেরণা । কোনও প্রোজেক্টের বিশেষ সাফল্যে সরকারি নথিপত্রে তিনি প্রায়ই লিখে পাঠাতেন, ‘Delighted’, ‘Glad to note’ কিংবা ‘Well done’ – তাঁর এসব নোটিং আমাদের অসম্ভব উদ্বুদ্ধ করতো !

ডঃ কালামকে নিয়ে একটি বিশেষ ঘটনার কথা লিখছি আজ । ২৬শে জানুয়ারী ২০০১ ভারতের ইতিহাসে একটি কালো দিন – সেদিন গুজরাতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কবলে হয় প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত । ভারত সরকারের তরফ থেকে আমাদের ডাক পড়ল ভূমিকম্প পীড়িতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থার জন্য । আমাদের বিভিন্ন প্রোজেক্টে তৈরি composite material (সংমিশ্রিত উপাদান) দিয়ে কম খরচে অস্থায়ী বাড়িঘর নির্মাণের এক পরিকল্পনা অনুমোদিত হ’ল খুব তাড়াতাড়িই । আমরা ঠিক করলাম আগামী ছয়মাসের মধ্যে প্রায় ৪০০ টি বাড়ি ও ১২৫ টি ফাইবার গ্লাসের শৌচালয় তৈরি করব গুজরাতের কচ্ছে । শীঘ্রই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম প্রতিটি বাড়ি ও শৌচালয় ব্লকের নকশা, টাউনশিপের layout plan, বাড়ির স্টীল স্ট্রাকচার, দেওয়াল ও ছাদের উপাদান এসব নিয়ে । অতঃপর শুরু কর্মযজ্ঞের – ভূজের কাছেই পাওয়া গেল জমি – অসমান, এবড়ো-খেবড়ো, কাঁটা ঝোপে ভরা অতি রুক্ষ – প্রায় ১০ দিন ধরে বুলডোজার চালিয়ে শুরু হল পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্মাণ । আমাদের প্রজেক্ট, ‘টাইফ্যাক-দীনদয়াল নগর’ ধীরে ধীরে এক পরিকল্পিত টাউনশিপের চেহারা নিল । ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে নভেম্বর অবধি ভূজ হয়ে উঠলো আমার দ্বিতীয় গৃহ – প্রায় প্রতি সপ্তাহে দু-তিন দিনের জন্য আমি ছুটে গিয়েছি ভূজ ও কচ্ছের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের প্রোজেক্ট সংক্রান্ত কাজে !

ভূজ পুনর্বাসন প্রকল্পে ডঃ কালামের আগ্রহ ছিল অপরিসীম, প্রতিনিয়ত খোঁজ রাখতেন তিনি আমাদের প্রোজেক্টের – নানা খুঁটিনাটি ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করতেন আর বন্ধুসুলভ উপদেশ দিতেন জোর কদমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য । মার্চ মাসের গোড়ায় আমরা যখন প্রথম ১০ টি বাড়ি তৈরি প্রায় শেষ করে এনেছি, ডঃ কালাম আমাদের কাজ দেখতে ভূজ আসতে চাইলেন । ওঁর আসার আগের দিন সারারাত ধরে কাজ করে ১০ টি বাড়ি তৈরি সম্পূর্ণ হ’ল ।

১৫ই মার্চ ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানে এসে ডঃ কালাম ভূজ বিমানবন্দর থেকে সোজা আমাদের প্রোজেক্ট সাইটে পৌঁছলেন। আমাদের তৈরি বাড়ি দেখে উনি খুব খুশী – ঘুরে ঘুরে দেখলেন সব ব্যবস্থা । আমাদের প্রোজেক্ট টিমের শ্রমিকদের সঙ্গে ছবি তুললেন – তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ক উপস্থিতি ও উষ্ণ সান্নিধ্য আমাদের সবাইকে ওই মহাযজ্ঞের কাজে করলো উজ্জিবীত ! এরই মধ্যে হঠাৎ একফাঁকে আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, “Biswas, can you build a school for the kids from your township? That would be a great service!” “I’ll surely try Sir”, আমি থতমত হয়ে জবাব দিই !

স্কুল তৈরির নকশা নিয়ে মাথা ঘামাই আমরা – ঠিক হয় ৫০০ স্কোয়ার ফুটের দুটি ক্লাসরুম হ’লে স্থানীয় স্কুল চালু করা যেতে পারে । আমাদের ভূমিকম্পের ত্রাণকার্যে অংশীদার হয় অনেক সুজন – কর্ণাটক হার্ডওয়্যার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও বেঙ্গালুরু রোটারি ক্লাবের আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয় দুটি ক্লাসরুম – আমাদের প্রোজেক্টের বাড়তি কোনও খরচা ছাড়াই ! গুজরাত সরকার শীঘ্র অনুমোদন দেয় – একজন শিক্ষকের পোস্টিং হয় আমাদের স্কুলে । মে মাসের শেষে এক সোমবার আমি ডঃ কালাম কে ফোনে জানাই, “Sir, the school you wanted us to construct is ready in Bhuj”. উনি বলেন, “Can I come and inaugurate the school?”  আমি বলি, “Then you have to do that rather soon Sir as the school cannot remain idle for long”. সঙ্গে সঙ্গে জবাব পাই, “Can it be next Saturday?”

২রা জুন (শনিবার), ২০০১ ডঃ কালাম আবার এলেন আমাদের প্রোজেক্ট সাইটে । সকালে জেট এয়ারওয়েজের বিমানে মুম্বাই থেকে ভূজ এসে অপরাহ্ণে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে উনি মুম্বাই ফিরে যাবেন – মধ্যে ঘন্টা চারেক সময় নিয়ে ঠাসা প্রোগ্রামের পরিকল্পনা আমাদের । বিমানবন্দরে ডঃ কালামকে স্বাগত জানাই, প্রোজেক্ট সাইটের পথে গাড়িতে পাশেই বসি আমি – হাসিমুখে ডঃ কালাম এক আপাত নিরীহ প্রশ্ন করেন আমাকে, “Biswas, you look very happy. Are you happy?”  আমি বলি, “I am always happy Sir, I have no problems in life”. শুনি এক জ্ঞানগর্ভ বানী, “You love your job buddy, that’s why you are so happy” – যেন এক দার্শনিক বাচন, এ আমার কর্মজীবনের পাথেয় !

স্কুল উদ্ঘাটনের অনুষ্ঠানে স্টেজে আমার থেকে একটু দূরে বসে ডঃ কালাম – দেখি তিনি সম্মান সুলভ উপহার পান এক ধাতব বস্তু একটি ছোট বাক্সে । স্টেজ থেকে নেমে সবাই ব্যস্ত যখন অনুষ্ঠান সূচনার মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে, ডঃ কালাম চট করে ওই বাক্সটি আমার হাতে দিয়ে বলেন এটা তোমার জন্য ।

স্কুল উদ্ঘাটনের পর আরও দু’টি অনুষ্ঠানে ডঃ কালামকে নিয়ে গেছি  – কেটে গেছে তিন ঘন্টা সময় । সামান্য নিরামিষ গুজরাতি থালি সহকারে সকলের মধ্যাহ্ন ভোজন ।  হঠাৎ মনে পড়ে আমার পকেটে রাখা ওই ছোট বাক্সটির কথা, বের করে দেখি সেটি বিগত দিনের কচ্ছ নেটিভ স্টেটের অতি মূল্যবান রৌপ্য মুদ্রা, পাঁচ কৌড়ি ।  আমি তো আনন্দে অভিভূত !

ফেরার পথে গাড়িতে ডঃ কালামের পাশে বসে বলি, “Sir, do you know what you gave me in the morning?”  উনি জবাব দেন, “Yeah, a silver coin, I suppose”.  আমি বলি, “That’s something fantastic! I collect coins, I have coins from 67 countries in the world.”  ডঃ কালাম উচ্ছ্বসিত হ’য়ে বলেন, “Oh! You never told me this buddy. OK, I’ll give you something very interesting.”   আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছেছি বেশ দেরীতে, প্লেন ছাড়বে একটু পরেই । হাতের ছোট ব্যাগটি আগাপাশতলা হাতড়ে ডঃ কালাম খুঁজে বার করেন একটি মাউন্টেড মুদ্রার সেট, জানান আগের দিন হায়দ্রাবাদে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফিসারদের এক সম্মানসভায় পাওয়া । সেটি আমার হাতে ধরিয়ে দ্রুত বিমান অভিমুখে রওনা দেন ডঃ কালাম ।

 

 

অবাক বিস্ময়ে ভালো করে দেখি ১৯৯৬ সালে মুদ্রিত সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্মারক মুদ্রার সেট – একটি করে ১০০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০ টাকা ও ২ টাকা মুদ্রা ।  দিল্লী ফিরে গিয়ে পরের সপ্তাহে ডঃ কালামের অফিসে দেখা করি আমি, অনুরোধ জানাই ওই মুদ্রার সেটটির ভিতরের পৃষ্ঠায় কিছু লিখে দেওয়ার জন্য । স্নেহভরে মৃদু হেসে ডঃ কালাম লেখেন,

“With best wishes for Sri S Biswas,

For his excellent work done in Bhuj”

নীচে করে দেন সই ।

আমাদের ভূজ প্রোজেক্টে অক্লেশ কর্মের অমূল্য পুরস্কার – আমার জীবনে মনিরত্ন বিশেষ !

[মাতৃ মন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত]

 

 

 

পথ চলতি…

দেখতে দেখতে নিবেদিতা কুঞ্জের সরকারি বাড়িতে আমাদের পনেরোটা বছর কেটে গেল – ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বাড়িটায় চলে আসি আমরা, আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়ি ছেড়ে । আনকোরা নতুন আটতলা বাড়ি, আমাদের ফ্ল্যাটটা পাঁচ তলায় – আমি প্রথম allotment পেয়েছি, নিবেদিতা কুঞ্জে সব বাড়ি তৈরি শেষ হয়নি তখনও । হিসেব করে দেখলে, এই বাড়িটায় জীবনে সবচেয়ে বেশী সময় থেকেছি এ পর্যন্ত ।

আমার জন্মের পর থেকে প্রায় প্রথম ছ’বছর ছিলাম আমাদের পুরানো পৈতৃক বাড়ি শ্যামবাজারে ভূপেন বোস অ্যাভিনিউতে । বাবার রেলের চাকরি – ১৯৬৩ সালে বাবা ট্রান্সফার হ’লেন খড়্গপুরে; আমি ও মা খড়্গপুরে এলাম ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে – তালেগোলে স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়াই হ’লনা আমার, বাড়িতেই মা’র কাছে পড়েছি ক্লাস ওয়ানের পাঠ । বাবা প্রথমে কোয়াটার্স পেয়েছিলেন ট্র্যাফিক সেটেলমেন্ট নামে এক পাড়ায়, সে বাড়িটা আমাদের কারোরই পছন্দ হ’য়নি একটুও – মাস তিনেক সেখানে থাকার পর আমরা চলে আসি ডেভেলাপমেন্ট কলোনীতে ৫৮৬ নম্বরে । সবই ঠিক ছিল বাড়িটায়, কিন্তু বাড়িতে রোদ্দুর ঢুকতো না একদম আর বাগান করারও জায়গা ছিল না বিশেষ । পাড়াটা মা-বাবার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল, প্রতিবেশী কাকিমা-মাসীমা’রা মায়ের বেশ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ।

বছরখানেকের মধ্যেই ঠিক উল্টো দিকে ৫৯৪ নম্বর বাড়িটায় চলে যাই আমরা, সেখানে কাঁটাতার ঘেরা বিরাট বাগান – মা অদম্য উৎসাহে বাগান করতে লেগে গেলেন । অচিরেই অনেক দোপাটি, অপরাজিতা ও গাঁদা ফুলে বাগান ভরে উঠলো – এছাড়াও ছিল শীতকালের মরশুমী ফুল । মায়ের লাগানো হাস্নুহানা গাছটা গরম কালের সন্ধ্যায় তার ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে বাতাস ভারী করে দিত যেন । বাগানের পেছন দিকটায় একটা বেশ ঝাঁকড়া কাঁঠাল গাছ ছিল আর তাতে ফল ধরত প্রচুর । নিজেদের খাওয়ার কথাতো বাদই দিলাম, প্রতিবেশীদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে এঁচোড় দিয়ে আসতাম আমি । বাড়িটার পেছনে একটা বিরাট সিমেন্ট বাঁধানো খোলা উঠোন আর সেই উঠোন পেরিয়ে পাঁচিলের গায়ে কলতলা । এ বাড়ি থেকেই ১৯৬৪ সালের গোড়ায় সাঊথ সাইড প্রাইমারী স্কুলে সরাসরি ক্লাস টু’তে ভর্তি হই আমি । আর সে বছরই দুর্গাপূজোর সময় লক্ষ্ণৌ বেড়াতে গিয়ে আমার ডান হাতটি ভাঙে – তার ফলে আমি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বসতেই পারিনি । হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফোর্থ হয়েছিলাম বলে ক্লাস থ্রি-তে প্রমোশন দিয়েছিল স্কুল, আর ‘Good Conduct’-এর একটা প্রাইজও দিয়েছিল । এই বাড়িতেই ১৯৬৯ সালে বাবা ম্যালিগন্যান্ট মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন । সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনও গা শিউরে উঠে কেমন যেন !

১৯৬৯ সালে জানুয়ারী মাসের এক সকালে আমরা কুঁচো-কাঁচারা খবর পেলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যাবেন আমাদের পাড়ার পাশের রাস্তা দিয়ে – প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছিলেন আই আই টি-তে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস উদ্বোধন করতে । খোলা জীপে করে আসছেন ইন্দিরা গান্ধী, আমরা জনা দশ-বারো বাগান থেকে ফুল তুলে ছোট ছোট তোড়া বানিয়ে তাঁর পথ আটকেছি । প্রধানমন্ত্রী সস্নেহে হাসিমুখে আমাদের হাত থেকে ফুল গ্রহণ করেন, করজোড়ে নমস্কার জানান আমাদের ! একজন পুলিসও এসে বকুনি দেয়নি আমাদের, হাসতে হাসতেই সরে গিয়েছি আমরা রাস্তা থেকে । একথা এখন একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হয়…

১৯৭০ সালের মাঝামাঝি আমরা চলে গেলাম খড়্গপুরের সাউথ সাইডে, ২২৫/ইউনিট-২ নম্বর বাড়িতে । এ বাড়িটা একটু বড় আর পাড়াটা বেশী অভিজাত ! অনতিদূরেই আমাদের রেলওয়ে স্কুল – সেটাই এই বাড়িতে যাওয়ার মূল কারণ যদিও । ডেভেলাপমেন্ট পাড়াটা ছাড়তে পেরে আমি যার পর নাই খুশী, আমার অসন্তোষের প্রধান কারণ পাড়ার ছেলে-ছোকরার দল –আমাদের কিছুটা সিনিয়ার হাতেগোনা দু’এক জনকে বাদ দিলে, সবাই লেখাপড়ায় একেবারে রদ্দিমার্কা, তার সঙ্গে নানারকম শয়তানি বুদ্ধি, নিজেদের মধ্যে মারপিট, যথেচ্য নোংরা ভাষার ব্যবহার – ভবিষ্যতের পথ ঝরঝরে করার সব উপাদানই মজুদ তাদের । ছেলেবেলায় ঐ রকম বুনিয়াদ নিয়ে তারা কে কোথায় সব হারিয়ে গেছে ।

নতুনপাড়ায় বন্ধুরা অন্যরকম, দুষ্টুমিতে কেউ কম যায়না তারসঙ্গে নিয়ম করে খেলাধূলো, গল্পের বইয়ের আদানপ্রদান কিন্তু লেখাপড়ায় সবাই সিরিয়াস, প্রায় সবার মধ্যেই জীবনে কিছু একটা করার বা হওয়ার অদম্য ইচ্ছে – নতুন পাড়ায় এসে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন ! ১৯৭৪ সালে ঐ বাড়ি থেকেই আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে আই আই টি’তে ভর্তি হই । আর ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি বাবা খড়্গপুর ছেড়ে কলকাতা চলে যান ট্রান্সফার হ’য়ে । ইঞ্জিনীরিয়ারিং পাশ করে, এম-টেক করে আমি খড়্গপুর ছাড়লাম ১৯৮১ সালে । এরপর দিল্লী থেকে খড়্গপুর আই আই টি’তে সরকারি কাজে গিয়েছি বহুবার, সপরিবারে গিয়েছি আই আই টি’র পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আর স্কুলের বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে বছর দু’য়েক আগে আমাদের ছোটখাটো গেট টুগেদারে… খড়্গপুর আমার প্রাণের শহর, আমার বাল্যের ও কৈশোরের অতি সুখস্মৃতি বিজড়িত রেলশহর, সে শহর আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে নিজের হাতে, সে শহরে বড় হয়ে গিয়েছি দুনিয়ার কোণে কোণে – খড়্গপুর থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি, কিন্তু খড়্গপুর রয়ে গেছে আমার মনের মণিকোঠায় । খড়্গপুরের কথা মনে পড়লেই গলায় উঠে আসে একটা ডেলা, ঝাপসা হয়ে আসে দুই চোখ !

১৯৭৭ সালে বাঙ্গুর এভিনিউতে একটা ছোট্ট বাড়ি করে বাবা-মা শ্যামবাজারের পুরানো বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন । ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে আমি যখন কলকাতায় চাকরি নিয়ে গিয়েছি, বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেছেন নাগপুরে । ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে আমিও কলকাতা ছাড়লাম ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইডে চাকরি নিয়ে । এরপর আমি ও বাবা দু’জনেই ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় ফিরে এলাম ১৯৮৩ সালের অগাস্ট মাসে । ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে বাবা রিটায়ার করলেন আর আমাদের বাঙ্গুরের বাড়ির দোতলা তৈরি হ’ল । ঐ বাড়ি থেকেই আমার বিয়ে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে । প্রায় সাত বছর চেষ্টার পর কলকাতায় ভালো কেরিয়ারের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে অবশেষে ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে আমাদের দিল্লী আগমন ।

প্রথমে কিছুদিন ভাড়াবাড়ি, তারপর Scientists’ Hostel – এরই মধ্যে আমাদের কন্যা তিন্নীর জন্ম ১৯৯২’র জানুয়ারিতে । ১৯৯৪ সালে পাওয়া গেল আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়িটা, একদমই পছন্দ হয়নি বাড়িটা আমাদের কারোরই, কিন্তু ‘out of turn’ allotment, প্রত্যাখান করা যাবে না। সে বাড়িতে থাকাকালীন আমাদের পুত্র তানের জন্ম ১৯৯৪’র অগাস্টে । সেখানে কেটে গেল আটটা বছর, দু’টো প্রমোশনের গন্ডী পেরিয়েছি আমি ততদিনে । ২০০২ সালে অগাস্ট মাসের শেষে পাওয়া গেল নিবেদিতা কুঞ্জের allotment – এ বাড়িতে এসে আমরা সবাই খুব খুশী । তিনটে ভালো সাইজের বেডরুম, আরও একটা বেশ বড় study আর ড্রইংরুমটা পেল্লায়, সঙ্গে servant’s quarters ও একতলায় ঢাকা গ্যারেজ । বাবা-মা আমাদের সঙ্গে দিল্লীতে পাকাপাকি ভাবে থাকেন ১৯৯২ সাল থেকেই – আমাদের ছ’জনের জন্য এ বাড়িতে অঢেল জায়গা । আর সবচেয়ে আকর্ষক ব্যাপারটা হ’ল বাড়ির ঠিক পেছনেই আমাদের কন্যা ও পুত্রের স্কুল, ডি পি এস-আর কে পুরম; বাড়ি থেকে মিনিট ছয়েকের হাঁটাপথ !

নিবেদিতা কুঞ্জের এই বাড়ি থেকেই তিন্নী ও তানের দশ ও বারো ক্লাসের বোর্ড পরীক্ষা ভালো ভাবে পাশ করে IIIT Delhi-তে ইঞ্জিনীরিয়ারিং পড়তে যাওয়া । এই বাড়িতেই মা’কে হারিয়েছি ২০১৩ সালের অগাস্ট মাসে, আশ্চর্যজনক ভাবে তার কিছুদিন পরেই বাবাও চলে গেলেন ২০১৪ সালের মার্চে – আমাদের বাড়ির লোকসংখ্যা ছয় থেকে কমে চারে দাঁড়ালো । অগাস্ট ২০১৪-তে তিন্নী উচ্চশিক্ষার্থে পাড়ি দিল সুদূর কানাডা, বাকি রইলাম আমরা তিনজন । ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তান বি-টেক পাশ করে চাকরি নিয়ে চলে গেল হায়দ্রাবাদ – আমরা দু’জন ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’! এরপর এল বড় ধাক্কা – এ’বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বুলবুল ট্রান্সফার হয়ে গেল মুম্বাই । ‘হারাধনের একটি ছেলে কাঁদে ভেউ ভেউ’…

নিবেদিতা কুঞ্জের বাড়ি’র সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, বারান্দায় দাঁড়ালে খোলা আকাশ ও সবুজ গাছগাছালির ছড়াছড়ি । আমাদের পূব-পশ্চিমের বাড়ি, তাই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি প্রতিদিন । সন্ধ্যায় সূর্যটা যখন স্থানীয় দুর্গামন্দিরের চূড়োর পিছনে মুখ লুকোয়, আকাশটাকে রাঙিয়ে দেয় কম করে তিন রকমের লাল রঙ, একটা এরোপ্লেন ধীরে এগিয়ে যায় ডুবে যাওয়া সূর্যের পথ ধরে এয়ারপোর্টের দিকে । প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে পাতা ঝরে যাওয়া ন্যাড়া শিমুল গাছটা একদিন লেলিহান আগুনশিখার মত ফুলে ফুলে লাল হয়ে ওঠে । আর দেওয়ালির রাতে একের পর এক আতসবাজীর আলো আকাশের সব কালিমা মুছে দেয় যেন । সকালে একঝাঁক টিয়া পাখি কর্কশ চিৎকার করে বারান্দার খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়, পায়রাগুলো বকবকম শব্দ করে ঘাড় উঁচিয়ে এগিয়ে আসে বাজরার দানার লোভে ।

নিবেদিতা কুঞ্জে আমার দিন সীমিত – অবসর গ্রহণের দিন এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, ছেড়ে দিতে হ’বে সরকারি এ আবাসন, খুঁজে নিতে হ’বে নতুন কোনও ঠিকানা !

নিজের কথা…

আমাদের ছোটবেলাটা কেটেছে একটু অন্যরকম ভাবে…খড়্গপুর রেলওয়ে টাউনশিপে ছিল বাবার কোয়াটার্স, আমাদের পাড়ায় সবাই সবাইকে মোটামুটি চিনত আর একটা সামাজিক শাসনের গন্ডী ছিল । বাবা-মায়ের বন্ধুস্থানীয়দের আমরা রীতিমত সমীহ করে চলতাম তখন । ওই সময়ে খড়্গপুরে ভালো স্কুল ছিল দু’টি – আমাদের রেলওয়ে বয়েজ স্কুল আর আই আই টি ক্যাম্পাসে হিজলি হাইস্কুল – দুটোই বাংলা ও হিন্দী মিডিয়াম স্কুল, তবে ক্লাস নাইন থেকে ইংরাজিতে সায়েন্স পড়ানো হ’ত । মিক্সড হায়ার সেকেন্ডারী নামে একটা ইংরাজি মিডিয়াম স্কুল ছিল বটে, আমরা বলতাম ট্যাঁশ স্কুল – অবাঙালি ছাত্র-ছাত্রী ও বেশ কিছু বখাটে গোছের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছেলে-মেয়ে সেখানে পড়তে যেত । আর ছিল রেলওয়ে গার্লস স্কুল, আমাদের অনেক বন্ধুদের দিদি ও বোনেরা পড়ত সেখানে । আমাদের স্কুলের তখন ডাকসাইটে রেজাল্ট – প্রতিবছর আই আই টি, যাদবপুর ও শিবপুর মিলিয়ে জনা দশেক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কমকরে আরও পাঁচজন ডাক্তারি পড়তে যেত !

আমাদের দুষ্টুমি সীমাবদ্ধ ছিল স্কুল ও খেলার মাঠের মধ্যেই – আমরা তথাকথিত ভালো ছেলে ছিলাম, মানে স্কুলে ভালো রেজাল্ট করতাম আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলত আমাদের দস্যিপনা – বাংলা টিচারকে উত্যক্ত করা, বিশেষ কোনও সহপাঠির পেছনে লাগা – এসবে আমরা ছিলাম সিদ্ধহস্ত ! প্রতিবছর গরমকালে ব্রাইটনের মাঠে ঘন্টা দেড়েক ফুটবল পেটানো আর শীতকালে মাঠে দড়ি ধরে কোর্ট কেটে ব্যডমিন্টন খেলা কিংবা ক্রিকেট – এছাড়াও গরমের ছুটিতে এক বন্ধুর বাড়ি সকাল এগারোটা থেকে বসত ক্যারাম খেলার আসর, কোনও দিন বিকেলে সাতঘুঁটি সাজিয়ে বল ছুঁড়ে ঘুঁটি ফেলে দেওয়ার চেষ্টা, এসবই আমাদের ব্যস্ত রাখত । কিন্তু স্কুলের শেষ ধাপে এসেও কোনও কিশোরীর প্রতি আসক্তি বা তার প্রকাশ ছিল আমাদের ভব্যতার বাইরে – ঐ যে বললাম রেলওয়ে গার্লস স্কুলে পড়া বন্ধুদের দিদি ও বোনেদের চোখে তাহলে আমরা ‘খারাপ ছেলে’ হয়ে যাবো যে ! খারাপ ছেলের তকমাটা যেন গায়ে না লেগে যায়, এ ব্যাপারে আমরা ছিলাম খুব সচেষ্ট।

আমাদের ছোটবেলায় রাখী’র এত রমরমা ছিলনা, তবে ভাইফোঁটা হ’ত বেশ ঘটা করেই…আমার নিজের কোনও ভাই-বোন নেই, কিন্তু তাইবলে ভাইফোঁটা আমার বাদ যেত না । ডাক পড়ত অন্তত দু-তিন জন বন্ধু’র বাড়ি থেকে, ফোঁটা দিতেন তাদের দিদিরা আর খাওয়া-দাওয়াটা ভালোই হ’ত বেশ । এইসব পাড়াতুতো দিদিরা আমাদের থেকে দু’তিন বছরের বড় কিন্তু তাদের দিদিসুলভ আচরণ ছিল বেশ সিনিয়র মার্কা !

সেটা বোধহয় জানুয়ারি মাস – সেদিন খবরের কাগজে মার্চ মাসে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার টাইম টেবিল বেরিয়েছে । তিন বছরের সিলেবাসের চাপে আমরা তখন ধুঁকছি – বিকেল পাঁচটা নাগাদ সাইকেল নিয়ে আমি একটু ঘুরতে বেরিয়েছি শুধুই নির্মল হাওয়া সেবনের উদ্দেশ্যে । হঠাৎ এক বন্ধুর দুই দিদির মুখোমুখি – সঙ্গে সঙ্গে ধমক, ‘সৌমিত্র, হায়ার সেকেন্ডারির রুটিন বেরিয়েছে না আজ, আর তুই এখন রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস?’ আমি মুখ নিচু করে গুঁইগাঁই করি, ‘এই বেরিয়েছি সারাদিনের পর, একটু পরেই বাড়ি ফিরে যাব’।

এই স্নেহমিশ্রিত শাসনের কালটা আর নেই – সবচেয়ে বড়কথাটা হ’ল সবাই বেশ আপনজন ভেবেই শাসন করতেন । আর অন্যের সাফল্যে আনন্দে মেতে উঠতেন সবাই, গর্ব করে বলতেন, ‘জানো, আমাদের পাড়ার ছেলে আই আই টিতে চান্স পেয়েছে’ !

স্কুল জীবনের কথা ঘুরে ফিরে আসে মনে, স্কুলে কি কাণ্ডটাই না করেছি আমরা এক সময় – অবশ্যই কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপকর্ম নয়, নিছকই মজার বশে – নব্য কৈশোরের দুর্নিবার উচ্ছ্বাসে ! এখন মনে হয় আমাদের সেদিনের কিছু দুষ্টুমি যে কোনও সুস্থ লোকেরই সহ্যের সীমা ছাড়াত…

ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট অবধি আমাদের স্কুলে ছিল ছ’টি সেকশান, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ – হিন্দী মিডিয়াম আর ‘ডি’, ‘ই’ ও ‘এফ’ ছিল আমাদের বাংলা মিডিয়াম – আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হ’ত ডিসেম্বরের দশ তারিখের মধ্যে । তারপর ২৪শে ডিসেম্বর রেজাল্ট বেরিয়ে আবার স্কুল খুলত ২রা জানুয়ারী, নতুন ক্লাস শুরু হ’ত । ক্লাস নাইনে আমাদের স্কুলের গতানুগতিক জীবনে এল এক পালাবদল – আমাদের stream ভাগ হ’বে; সায়েন্স, কমার্স বা হিউম্যানিটিজ নিয়ে হ’তে হ’বে আমাদের আলাদা । তাই ক্লাস নাইনে উঠে জানুয়ারী মাসে আমাদের আর একটা পরীক্ষা দিতে হ’বে – Stream Test; পরীক্ষা হ’ত দুই বিষয়ে, অঙ্ক ও ইংরাজি । আমার এখনও মনে আছে, ইংরাজিতে আমাদের অনুবাদ করতে দেওয়া হয়েছিল, ‘গোলবাজার গোল নয়’… অঙ্ক ও ইংরাজি উভয় বিষয়েই ভালো করলে ইংরাজি মিডিয়াম সায়েন্স পাওয়া যাবে; শুধু অঙ্কে ভালো করলে, বাংলা মিডিয়াম সায়েন্স; অবশ্য শুধু ইংরাজিতে ভালো করলে কি পাওয়া যেত তা জানিনা ! আমাদের স্কুলে সে সময়ে কমার্স ও হিউম্যানিটিজ পড়তে যেত একেবারে ওঁচার দল, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা কোনও ক্রমে উতরে যাওয়াই ছিল তাদের জীবনে বিরাট চ্যালেঞ্জ ! যাই হোক, সেই স্ট্রীম টেস্ট দিয়ে আমরা জনা তিরিশেক ছাত্র পড়তে গেলাম ইংরাজি মিডিয়াম সায়েন্স – ক্লাস নাইনের ‘জি’ সেকশান ।

নাইন ‘জি’র ক্লাসরুমটা ছিল দোতলায়, একতলায় টিচার্স রুমের ঠিক উপরে । আমাদের ক্লাস টিচার হ’য়ে বাংলা পড়াতে এলেন বসাকবাবু – শীর্ণ চেহারা, পরনে মোটা খদ্দরের ঢিলে পাঞ্জাবি, হ্যান্ডলুমের সরু পাড় আধময়লা খাটো ধুতি, পায়ে চামড়ার বিদ্যাসাগরি চটি, কদমছাঁট কাঁচা-পাকা চুল আর দু’তিন দিনের না কামানো দাড়ি সমেত মুখখানি সদাই বেজার, যেন সারা পৃথিবীর যত সমস্যা তাঁকেই তাড়া করে বেড়াচ্ছে । এরপর ছিল তাঁর কাঠ বাঙাল ভাষা – সব মিলিয়ে একেবারে সোজা কার্টুন থেকে উঠে আসা এক বর্ণময় চরিত্র ! আমাদের এক বছরের সিনিয়ররা বসাকবাবুর ক্লাসে তাদের কি রকম বাঁদরামির আসর বসত, তার পাঠ আমাদের ভালোই পড়িয়েছে । অতএব আমাদের ক্লাসে ভূতের নেত্য শুরু হ’ল শীঘ্রই ।

দিনের প্রথম ক্লাস – বসাকবাবু মাথানিচু করে রেজিস্টারের দিকে তাকিয়ে রোলকল শুরু করেছেন – লাস্ট বেঞ্চে কে একজন আস্তে করে গাইতে শুরু করলে, ‘রে মাম্মা রে মাম্মা… তারপর তিরিশ জনের সমবেত চিৎকার, ‘রে’… সেই শুনে বসাকবাবুর পাল্টা চিৎকার, ‘কে করলে, কে করলে?’ সারা ক্লাস নিশ্চুপ, সবাই ভালো মানুষের মত মুখ করে জুলজুল চোখে দেখছে ! … দেখতে একটু কচি আমাদের সহপাঠি নির্মল ঘোষ নিষ্পাপ হাসিমুখে একটি বিচ্ছু বিশেষ – বসাকবাবু তাকে বললেন, ‘তুই ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাডা পইড়া শোনাদিকি’ । অমনি নির্মল বই খুলে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঁচালির সুরে দুলে দুলে পড়তে লাগলো, ‘শুধু বিঘা দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে’ । সেই সুর শুনে সারা ক্লাসে বিরাট হাসির ছররা – বসাকবাবু দু’হাতে মাথাটা ধরে বসে আছেন । তাঁর একটা পেটেন্টেড্ কথা ছিল, ‘তুরা আমায় মাইরা ফ্যাল’। … আমাদের সময়ে প্রতি মাসে স্কুলফীস নেওয়াটা ছিল ক্লাসটিচারের কাজ – রেলওয়ে স্কুল, ক্লাস নাইনের ফী মাসে সাকুল্যে চার টাকা বাষট্টি পয়সা । ফীস জমা দেওয়ার দিন বসাকবাবু রসিদবই, টাকা, খুচরো পয়সা এসব সামলাচ্ছেন, তাঁর টেবিল ঘিরে বিরাট জটলা, সবাই গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, ‘আমারটা আগে, আমারটা আগে’ – সে এক চরম বিশৃঙ্খলা ! এর মধ্যে একজন খবরের কাগজ পাকিয়ে গাধার টুপি বানিয়েছে, টুপিতে বড় বড় অক্ষরে লিখেছে ‘গাধা’ – সে টুপি ধরে আছে বসাকবাবুর মাথা’র বেশ একটু ওপরে, হঠাৎ আমাদের তিমিরবরণ তার হাতে মারলে এক বিরাট চাপড়, হাত ফস্কে টুপি গিয়ে একেবারে বসাকবাবুর মাথায় – মুহূর্তের মধ্যে ভীড় ফাঁকা – সবাই যে যার জায়গায়, বসাকবাবু গাধার টুপি পরে দু’হাতে মাথা ধরে বসে আছেন আর বলে চলেছেন, ‘তুরা আমায় মাইরা ফ্যাল’! … পূজোর ছুটি শেষ হয়েছে, কালীপূজো-ভাইফোঁটার পর স্কুল খুলেছে – নির্মল পকেটে করে নিয়ে এসেছে একটা চকোলেট বোম আর দেশলাই । বাংলার ক্লাস সবে শুরু হয়েছে – বসাকবাবু রোলকল শুরু করেছেন, লাস্ট বেঞ্চ এর পেছন থেকে প্রচণ্ড আওয়াজ, ক্লাসরুম ধোঁয়াচ্ছন্ন, পোড়া বারুদের গন্ধ – আমাদের স্কুল বাড়ি থরথর করে কেঁপে উঠেছে ! আর তিমির বরণ লাফ দিয়ে উঠে চিল চিৎকার করে বলে, ‘নকশাল, নকশাল ! স্যার পালান, নকশালরা স্কুল অ্যাটাক করেছে!!’ (সেটা ১৯৭১ সাল, পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলন তখন তুঙ্গে, যদিও আমাদের স্কুলে তার কোনও প্রকোপ পড়েনি)। ক্লাসের সবাই হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছে, অন্যান্য ক্লাস থেকে ছুটে এসেছেন টিচাররা, কিছুক্ষণ পর হেডমাস্টার মশাই দৌড়ে এসেছেন বেত হাতে, সবাই খুব উত্তেজিত – হেডস্যারের হুকুম হল প্রত্যেকের পকেট চেক করা হ’বে, দেশলাই-এর খোঁজে । কোথায় দেশলাই, ঐ হাঙ্গামার মধ্যে নির্মল কখন টুক করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে স্কুলের পেছনে নালায় দেশলাই ফেলে দিয়ে এসেছে !

আর একটু পিছিয়ে যাই, আমাদের ক্লাস এইটে ইতিহাস পড়াতেন কুন্ডুবাবু, তাঁর কাজ ছিল ইতিহাসের টেক্সট বই থেকে গড়গড় করে রীডিং পড়ে যাওয়া, ক্লাসের সবাইকে তাঁর পড়ার সঙ্গে বইয়ের পাতায় চোখ রাখতে হ’বে । কুন্ডুবাবু মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ পড়ছেন/পড়াচ্ছেন, আমি ও আশিস দাশগুপ্ত (কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও AIIMS, নিউ দিল্লীর প্রাক্তনী ও বর্তমানে এক নামী শিশু চিকিৎসক) লাস্ট বেঞ্চে বসে ইতিহাসের বইয়ে লুকিয়ে স্বপনকুমারের রুদ্ধশ্বাস ডিটেকটিভ উপন্যাস গোগ্রাসে গিলছি – গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জী ও তার সহকারি রতনলাল চরম বিপদের মুখোমুখি… স্কুল ছুটি হওয়ার আগেই বইটা শেষ করে ফেরত দিতে হবে যে ! আমাদের বইয়ের পাতা ওল্টানো দেখে কুন্ডুবাবুর কেমন একটা সন্দেহ হয়েছে, হঠাৎ হুঙ্কার, ‘কি পড়ছিস রে তোরা দু’জন’? ব্যাস, ইতিহাসের বই থেকে স্বপনকুমারের আত্মপ্রকাশ, আর আমাদের কপালে জোটে বেদম প্রহার !

স্কুল জীবন ছিল আমাদের ঘটনাবহুল, উচ্ছ্বাসভরা প্রাক-যৌবনের দিন ! অনুশাসন একটা ছিল বটে, কিন্তু তা মোটেই কড়া মিলিটারি মেজাজের নয়, একটু ঢিলেঢালা গোছের – তাই সহজেই আমরা খুঁজে নিতাম নিত্যনতুন দুষ্টুমির পথ । এবারের কিছু ঘটনা আমার সহপাঠীদের নিয়ে… অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রয়েছে বা নতুন করে গড়ে উঠেছে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে, আবার অনেকেই হারিয়ে গেছে কালের নিয়মে…

ক্লাস নাইন-জি সেকশানে আমাদের সঙ্গে পড়তে এল এক যমজ ভাই – তাদের দেখতে খুব একটা এক রকম নয়, কিন্তু হাবভাব একেবারে এক – সব ব্যাপারে তাদের গুরুগম্ভীর মন্তব্য আর সব সময়েই এক ধরণের মতামত । সদাই প্রমাণ করার চেষ্টা তারা অন্যদের থেকে একটু বেশী জানে ! তার ওপর তাদের অ্যালবার্ট করা চুলে সামনে সিঙ্গাড়া দাঁড়িয়ে আছে, শার্টে ঝুলে পড়া ‘ডগ-কলার’, আস্তিনে ‘কাফ-লিঙ্ক’, একটু ‘উড়ু-উড়ু’ ভাব… কয়েকদিনের মধ্যেই ক্লাসে বেশ একটা নতুন খোরাক যোগাড় হ’ল, তাদের নামকরণ হ’ল জগাই-মাধাই…

একজন সহপাঠী ক্লাস ফাইভের পর আর বাড়েনি, সাড়ে ৪ ফুট উচ্চতায় সে ছিল আমাদের বিখ্যাত ‘গিড্ডু’ । পড়াশোনায় বেশ ভালো কিন্তু তার হাবভাব টিপিক্যাল ক্লাস মনিটর গোছের – বিধি বহির্ভূত কেউ কিছু করলেই টীচারকে নালিশ, কোনও শিক্ষক প্রশ্ন করলে সব সময়ে হাত তুলে আগেভাগে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা, সব টীচারদের আমড়াগাছি – ব্যাস আর যাবে কোথায়, আমরা চার-পাঁচ জন তার পেছনে লেগে গেলাম…

ক্লাস নাইনে আমরা সবাই ফুলপ্যান্ট পরতে শুরু করেছি, গিড্ডু তখনও হাফপ্যান্ট; কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে সে দাঁড়ালেই পেছন থেকে তিমিরবরণ তার প্যান্টটা টেনে খুলে দেবার চেষ্টা করত ! এছাড়া একটু ভীড়ের মধ্যে তার মাথায় চাঁটি, শার্টের পেছনে পেনের কালি ঝেড়ে দেওয়া – জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল গিড্ডুর, এখন এসব ভাবলে কষ্ট হয় বড়ই । নিছক মজার নেশায় বেশ বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিলাম হয়তো !

আমরা বোধহয় তখন ক্লাস ইলেভেন – আগেভাগে কোনও উত্তর দিতে গিড্ডু দাঁড়িয়েছে, আর ক্লাসের একেবারে উঁচু দিকের ছাত্র, আশিস দাশগুপ্ত (বর্তমানে এক নামী শিশু চিকিৎসক) একটা কলম খুলে বেঞ্চে ধরে আছে । এরপর গিড্ডুর ধপ করে বসে পড়া আর তার পশ্চাদ্দেশে কলম প্রবেশ ! ভাগ্যিস স্কুল ইউনিফর্মের মোটা খাকি প্যান্টের দৌলতে সে শূলবিদ্ধ হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল । পরের ক্লাসে পরেশবাবুর ফিজিক্স পড়ানো চলছে – দেখি স্কুলের পিওন এক স্লিপ নিয়ে এসেছে, স্লিপ পড়ে পরেশবাবু বলেন, ‘সৌমিত্র ও আশিস, তোদের হেডস্যার ডেকেছেন’… আমরা দুরুদুরু বক্ষে হেডস্যারের ঘরে । তিনি বেশ চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফিজিক্সে কত পেয়েছো?’ বললাম আমরা, ‘আর অঙ্কে?’, তাও বললাম, ‘ইংরাজিতে?’ মিনমিনে গলায় জবাব দিই …হেডস্যার হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘পড়াশোনায় তো ভালোই দেখছি, ক্লাসে এত বাঁদরামি কর কেন? হাত পাতো’ – সপাং, সপাং করে আমাদের দুজনের হাতের তালুতে এক একটি বেত্রাঘাত । ‘এরপর যদি কোনও কমপ্লেন পাই, বাবাকে ডেকে পাঠাবো’। বেতের বাড়ি নয়, বাবাকে ডেকে পাঠালে চরম অনর্থ – ওতেই আমাদের ভীষণ ভয় ! বুঝতেই পারলাম গিড্ডু একেবারে খোদ হেডস্যারকে নালিশ ঠুকে দিয়ে এসেছে…

ক্লাস নাইন থেকে আমার খুব কাছের বন্ধু, সুকুমার চন্দ্র (আই আই টি খড়্গপুরের প্রাক্তনী ও বর্তমানে ফিজিক্সের এক ঞ্জানীগুণী শিক্ষক) – কটা চোখ, অতি গৌরবর্ণ, প্রায় সোনালি চুল আর হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে এক দ্রষ্টব্য বিশেষ ! ওই রোগা চেহারা নিয়ে কিন্তু ফুটবল খেলায় তার পারদর্শিতা ছিল উঁচু দরের, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বল নিয়ে দৌড়ে তিন-চারজনকে ড্রিবল করে গোল দিয়ে আসতো সুকুমার । গরমকালে ব্রাইটনের মাঠে আমরা সবাই ফুটবল খেলতাম অন্তত ঘন্টা দেড়েক । একদিন সাউথ ইন্সটিটিউট সংলগ্ন বোলিং ক্লাব আমাদের ফুটবলে চ্যালেঞ্জ করলে, সে ক্লাবের খেলোয়াড় ষন্ডা মার্কা সব অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছোকরা । ম্যাচ শুরু হল, দশ মিনিটেই তারা বুঝে নিল কারা ভালো খেলোয়াড়, এরপর শুরু হ’ল একেবারে বডিলাইন চার্জ, স্রেফ মেরে বসিয়ে দেওয়ার প্ল্যান । সুকুমার লাফিয়েছে হেড দেওয়ার জন্য, প্রতিপক্ষ বল ছেড়ে তার মুখে সজোরে মাথা ঠুকেছে – সুকুমারের নাক থেকে ঝরঝর করে রক্তপাত ! আমরা কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গে ওকে সাইকেলে বসিয়ে ছুটেছি কাছেই রেলের ডিস্পেনসারিতে – ডাক্তারবাবু এক নজর দেখেই বলেন, ‘এতো নাকের হাড় ভেঙেছে দেখছি’। এরপর সুকুমারের নাকে ফরসেপ ঢুকিয়ে হাড় সোজা করার চেষ্টা ডাক্তারবাবুর – যন্ত্রণায় সুকুমারের দু’চোখ থেকে অশ্রুধারা কিন্তু মুখে টুঁ শব্দটি নেই – কি অপরিসীম সহ্যশক্তি!

আমাদের আই আই টি’র এনট্রান্সের ফল বেরিয়েছিল সোমবার, ৩রা জুন – সেবছর জয়েন্ট এনট্রান্সের সঞ্চালক আই আই টি কানপুর থেকে খড়্গপুরে রেজাল্ট পৌঁছেছিল শনিবার বিকেলে, সোমবার সকালে সে রেজাল্ট নোটিস বোর্ডে সাঁটা হ’বে । খড়্গপুর কলেজের এক প্রফেসারের ভাই তখন আই আই টি’তে MSc পড়ে, সে নাকি খড়্গপুর সেন্টার থেকে যে ক’জন সফল হয়েছে তাদের রোল নাম্বার টুকে নিয়ে এসেছে – একথা শুনে আমি ও সুকুমার দৌড়েছি সেই প্রফেসারের বাড়ি, তিনি প্রচণ্ড গোপনীয়তার সঙ্গে আমাদের রোল নাম্বার দু’টো একটা কাগজে লিখে নিয়ে বাড়ির ভেতরে গিয়ে ভাইয়ের টুকে আনা লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে এসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমাদের নাম আছে, কিন্তু সঠিক ফলাফল সোমবারই জানতে পারবে’ । ব্যাস ! আমাদের দু’দিন রাতে ঘুম নেই, সোমবার সকালের জন্য অধীর প্রতীক্ষা! অবশেষে সোমবার এলো – সকাল আটটা নাগাদ আমি সুকুমারের বাড়ি ছুটেছি। ও হরি, সুকুমার বাড়িতে নেই, সে তাদের বাড়ির গরু নিয়ে ইন্দায় ভেটেরিনারি হাসপাতালে গেছে, ডাক্তার দেখাতে । আমাদের সাউথ সাইড থেকে ইন্দা অনেকটা পথ, সাইকেলে যেতে কম করে আধঘন্টা লাগে – সুকুমার গরু নিয়ে হেঁটে গেছে । এখন ভাবতেও অবাক লাগে সুকুমার গরুর দড়ি ধরে, মুখে ‘হ্যাট, হ্যাট’ আওয়াজ করে গরু নিয়ে চলেছে অতটা পথ ! আমি আবার গেছি সুকুমারের বাড়ি সাড়ে ন’টায়, তিনি ফেরেন নি । বোধহয় সাড়ে দশ’টা নাগাদ রোদে মুখ লাল, গলদঘর্ম সুকুমার এসেছে আমার বাড়ি, বলে ‘গালাগালিটা পরে করবি, চল যাই এখন রেজাল্ট দেখতে’। ঊর্ধ্বশ্বাসে সাইকেল চালিয়ে আমরা ছুটেছি আই আই টি – নোটিস বোর্ডের সামনে অল্পবিস্তর ভীড় । কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের দু’জনেরই নাম খুঁজে পাই সিলেকশানের লিস্টে – উচ্চৈঃস্বরে গান গাইতে গাইতে সাইকেল চালিয়ে আমরা বাড়ির রাস্তা ধরি !

 

 

ফিরে দেখা…

আজ থেকে ৪৩ টি বসন্ত আগে প্রায় ১৭ ছুঁই ছুঁই বয়সে আমরা স্কুলবন্ধুরা হয়েছিলাম বিছিন্ন (মনে রাখতে হ’বে আমরা ১১ ক্লাসের পর হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিয়েছিলাম, অতএব অনেকের বয়সই তখন ১৭ পেরোয়নি) – দুনিয়াটাকে পালটে দেওয়ার স্বপ্ন  দেখে বেছে নিয়েছিলাম নিজেদের পথ ! এক ছোট মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের শান্ত ছত্রছায়া থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম আমরা আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে । মধ্যবিত্ত মুল্যবোধ, মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গী আর যৌথ পরিবারের স্নেহ-মমতা মাখা কৈশোর থেকে পা বাড়িয়েছিলাম দুর্নিবার যৌবনের হাতছানিতে !

আমার মনে পড়ে যে ১৯৭৪ সালে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি ১৯শে মার্চ বাংলা পরীক্ষা দিয়ে শুরু হয়ে ১লা এপ্রিল বায়োলজি পরীক্ষা দিয়ে শেষ হয়েছিল । তিনবছরের সিলেবাসের গুরুভার মাথা থেকে নামিয়ে কেমন যেন বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মত অবস্থা আমাদের । পরের দিনই ২রা এপ্রিল খড়্গপুর রেলওয়ে স্কুলের আমরা একদল ছুটেছিলাম মেদিনীপুরের মহুয়া সিনেমায় তখনকার সুপারহিট ছবি টীন-এজার লাভস্টোরি, ‘ববি’ দেখতে । আমাদের এক বন্ধু সুকুমার ‘ববি’ দেখতে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তার বাবা এমন চোখে তাকিয়েছিলেন সুকুমার যেন মানুষ খুন করে এসেছে; বেচারা সুকুমারের ‘ববি’ দেখা আর হয়নি ! বলাই বাহুল্য এ ছবি দেখার পর উদ্ভিন্ন যৌবনা ডিম্পল কাপাডিয়া আমার বেশ কিছু রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল । ৩রা এপ্রিল আমরা ভীড় করেছি খড়্গপুরের বম্বে সিনেমায় রাজকুমার অভিনীত ইন্দো-পাক যুদ্ধের বিষয় নিয়ে ছবি, ‘হিন্দুস্তান কি কসম’ দেখতে । তার পরদিন ৪ঠা এপ্রিল ডিম্পল কাপাডিয়ার মোহিনী আকর্ষণে সাড়া দিয়ে আমি গিয়েছি আবার ‘ববি’ দেখতে । এর ফলস্বরূপ পাওয়া গেল মায়ের কাছ থেকে এক কড়া বকুনি; ‘সাপের পাঁচ পা দেখেছো নাকি? সামনে লাইন দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্ট, সেগুলোতে ভালো ফল না করলে জীবনে তো কিছুই করতে পারবে না !’

এখানে বলে রাখা উচিত যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার শিকার ছিলাম আমরা সবাই, তাই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া আর কোন কেরিয়ার পছন্দের বিলাসিতা ছিল আমাদের একেবারেই ব্রাত্য । লেখাপড়ায় ভালো করে ওই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এই ঢুকতে হবে, ওটাই মূললক্ষ্য ! পড়াশোনায় একটু অমনোযোগী হলেই বাবার একটা খুব চালু উক্তি ছিল, ‘তবে কি রেলের খালাসী হবি ?’ রেলের খালাসী সম্বন্ধে খুব একটা সম্যক ধারণা ছিলনা, তবে ব্যপারটা যে বেশ খারাপ সেটা বুঝতাম !

আই আই টির অ্যাডমিশনের জন্য অ্যাপ্লিকেশন ফর্মের কথাটা বলি – আমরা খড়্গপুরের ছেলে, তাই ফর্ম ভরতে সোজা আই আই টি পৌঁছেছি । ফর্মের সঙ্গে ১৫ টাকার পোস্টাল অর্ডার জমা দিতে হবে, কোথায় পাব পোস্টাল অর্ডার ? আই আই টির মধ্যেই পোস্ট অফিসে পাওয়া যায় নাকি, তা আমি কুড়ি টাকা দিতে কাউন্টার থেকে ১৬.৫০ টাকা কেটে আমাকে ৩.৫০ টাকা ফেরত দিলে । আমার মুখ চুন, আমাকে ঠকিয়ে ১.৫০ টাকা বেশী নিয়ে নিল, পোস্টাল অর্ডারে যে কমিশন লাগে তা জানা ছিলনা তখন !

যাই হোক ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ও ৫ই মে আমরা বসেছিলাম আই আই টির জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় – পরীক্ষার সেন্টারও আই আই টিতেই । দিনে দু’টো তিন ঘন্টার পরীক্ষা, প্রথম দিন অঙ্ক আর কেমিস্ট্রী, পরদিন ইংরাজি ও ফিজিক্স । পরীক্ষা কিরকম দিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই, কিন্তু পরিস্কার মনে আছে দু’টো পরীক্ষার মধ্যে এক ঘন্টার বিরতিতে কিছু খাওয়ার জন্য মা আমাকে দু’দিন একটা করে টাকা দিয়েছিলো – সে টাকায় আই আই টির ক্যান্টিনে ৫৫ পয়সা দিয়ে কোকা কোলা খেয়েছিলাম স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে । আর একটা ব্যাপার বেশ মনে আছে, শেষ পরীক্ষা ছিল ফিজিক্সের – পরীক্ষা শুরুর আধঘন্টা পর হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি ৪-৫ টা বেঞ্চ দূরে বসা আমাদের রেলওয়ে গার্লস স্কুলের এক প্রথম দিকের ছাত্রীর (নামটা উহ্যই রাখলাম) চোখে অঝোর বারিধারা, হাতে ধরা প্রশ্নপত্রের প্রতি অসহায় দৃষ্টি ! শুনেছিলাম পরের বছর সে নাকি ডাক্তারি তে ভর্তির সু্যোগ পেয়েছিল ।

তারপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন – ৮ই মে, ১৯৭৪; অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেন্স ফেডারেশনের সভাপতি জর্জ ফার্নান্ডেজের ডাকে সারা ভারতে একযোগে শুরু রেল ধর্মঘট । তার জোরালো প্রকোপ পড়েছিল রেল শহর খড়্গপুরে – সরকারের তরফ থেকে ধরপাকড়, বাড়ী থেকে ড্রাইভার-গার্ডদের  জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ট্রেন চালানোর বিফল প্রচেষ্টা । ১৭ থেকে ১৯শে মে হওয়ার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স, কিন্তু রেল ধর্মঘটের প্রভাবে সে পরীক্ষা পিছিয়ে গেল জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে – আমাদের প্রিপারেশনেও ঢিলে পড়লো ।

৩রা জুন সোমবার আমাদের আই আই টি জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল বেরোলো, আমাদের স্কুল থেকে আমাকে নিয়ে তিনজন চান্স পেয়েছে । জুনের মাঝামাঝি কাউন্সেলিং, সেদিনই  সাকুল্যে ৬০০-৬৫০ টাকা জমা দিয়ে আই আই টিতে ভর্তিও হয়ে গেলাম আমরা ।  এরপর আমায় আর পায় কে, মনে মনে ঠিক করেই রেখে ছিলাম পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আর বসবো না । আমার বড়মামা তখন মেদিনীপুরে খুব নামী ডাক্তার, তাঁর বরাবরের ইচ্ছে আমি ডাক্তার হই – আমি পরীক্ষাই দিইনি শুনে, ভীষণ রাগারাগি করে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন !

এরপর অগাস্ট মাসে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ – আমরা মফঃস্বলের ছেলে, হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করাটাই ছিল সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি । আই আই টি তে ঢোকার পরেও মনে ভয়, ফার্স্ট ডিভিশন পাব তো ? রেজাল্ট বেরিয়েছে, হেড মাস্টার মশাইয়ের ঘরে মার্কশীট এসে পৌঁছেছে ডাক মারফত । আমরা দুরুদুরু বক্ষে বাইরে অপেক্ষা করছি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম । আমাদের ইংরাজির শিক্ষক, শ্রী এন কে রায়কে আমরা কোনও দিন হাসতে দেখিনি, তিনি দেখি মৃদু হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলি, ‘স্যার, আপনি কি রেজাল্ট দেখেছেন, ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি স্যার?’ উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরিয়ে রায় মশাই বলেন, ‘স্টার পেয়েছিস তো রে, দু’টো সাবজেক্টে লেটার পেয়েছিস’ ।

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে ! সাইকেল নিয়ে ঊর্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটি মায়ের হাসিমুখটা দেখবো বলে…

[প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমাদের সময়ে ৭৫% নম্বর পেলে বোর্ড থেকে প্রকাশিত রেজাল্ট বুকলেটে রোল নম্বরের পাশে একটি * দেওয়া থাকতো; লেটার মানে কোনও বিষয়ে ৮০% বা তার বেশী মার্কস পাওয়া । আর ওই রকম ডাকসাইটে রেজাল্টের পর বড়মামা মেদিনীপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন অভিনন্দন জানাতে ।]

 

মনে কি দ্বিধা…

ভোরবেলা এ-সময়টা বড় ভালো লাগে অপর্ণার । সেই ছোটবেলা থেকেই খুব ভোরে স্নান সেরে নেওয়ার অভ্যাস – সাড়ে পাঁচটা বাজতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর । ঐ সময়ে গুড়গুড় আওয়াজ করে কলে জল আসে, তাড়াতাড়ি স্নান করে ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় চলে আসেন তিনি । সকাল ছ’টা নাগাদ দিল্লী অন্ধকার – পূবদিক সবে ফরসা হচ্ছে । অপর্ণা বারান্দায় বসে একমনে নামজপ করেন; সেই কম বয়সে মা’র হাত ধরে ভারত সেবাশ্রমে স্বামী পরমানন্দজির কাছে দীক্ষা নেওয়া । অপর্ণাকে বড়ই স্নেহ করতেন গুরুদেব, নিয়মিত চিঠি লিখতেন পোস্টকার্ড ভর্তি করে, মুক্তোর মত হাতের লেখা ছিল তাঁর ! দেহ রাখার আগের দিনও গুরুদেব অপর্ণাকে চিঠি লিখে গেছেন ।

দক্ষিণ দিল্লীর এদিকটা বেশ সবুজ – চারপাশে গাছগাছালিতে ভরা । একটা বড় শহরে এত গাছের ছড়াছড়ি – চারদিক তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে ওঠে ! এই বারান্দায় বসেই অপর্ণা অনেক পাখির দেখা পান । ধীরে ধীরে আলো ফোটে – দূরে রাও তুলারাম মার্গ দিয়ে একটা গাড়ি চলে যায় মৃদু শব্দ করে, স্থানীয় হিন্দিভাষীদের দুর্গামন্দির থেকে ভেসে আসা শিবস্তোত্র আর মসজিদের আজানের ডাক মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । হঠাৎ সমস্ত নিঃশব্দতা চিরে একঝাঁক টিয়াপাখি কর্কশ ডাক দিয়ে উড়ে যায় সামনের রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের বড় অশ্বত্থ গাছটার দিকে । পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস মেহরা বারান্দায় বাজরার দানা আর পাত্রে জল রেখে দেন – সেগুলো খুঁজে পেয়ে একদল শালিখ বেজায় কিচিরমিচির জুড়ে দেয় ।  দু’টো বুলবুলি নিজের মনে শিস দিয়ে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়ায় । অপর্ণা লক্ষ্য করেন পাশের বাড়ির সানশেডে একজোড়া পায়রা নিজেদের মধ্যে খুনসুটিতে ব্যস্ত । একজন তেড়ে যায় আর অন্যজন ঘাড়ের পালক উঁচিয়ে তাকে ভয় দেখায়, তারপর নিজেদের মধ্যেই কি রকম অদ্ভুত সুরে বকবকম ডাক তোলে – অপর্ণা বুঝতে পারেননা, সেটা ঠাট্টার টিটকিরী না প্রেমের অভিব্যক্তি !

একটু পরেই ছোট বেডরুমের দরজাটা খুলে যায় – নাতনি টুসি হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে আসে, ‘গুড মর্নিং দিম্মা, রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?’ টুসি ওরফে আত্রেয়ী, অপর্ণার ছোট নাতনি, ক্লাস ইলেভেনে পড়া তন্বী টীন-এজার । ডিপিএস-আর কে পুরম্ স্কুলে প্রথমে দিকের ছাত্রী – লেখাপড়া ও ডিবেটে তুখোড়, বাস্কেটবল আর সাঁতারেও সমান পারদর্শী । দিদির দেখাদেখি সেও সায়েন্স নিয়ে পড়ে, তারও ইচ্ছে দিদির মত ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ার । তার দিদি মানে অপর্ণার বড় নাতনি, সুমি ওরফে আদৃতা কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছে । দু’ই নাতনিই অপর্ণার সমান ন্যাওটা – ছোটবেলা থেকেই দু’পাশে শুয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনত । অপর্ণার গল্পের স্টক অফুরন্ত – রূপকথার রাজারানী, বিশ্বভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী বা ভূত-পেত্নীর গা ছমছমে গল্প বলে অপর্ণা ঘুম পাড়াতেন দুই নাতনিকে । ওরা কেমন তাড়াতাড়িই সব বড়  হয়ে গেল যেন !

এরপর টুসি দৌড়বে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হ’তে । অপর্ণার মেয়ে, অনুরাধা অন্য বেডরুম থেকে বেরিয়ে  এলো, ‘মা, তোমার চান হয়ে গেছে তো ? চা করি?’ । অনুরাধা কাছেই এক পাবলিক স্কুলে সিনিয়র ক্লাসে ইতিহাস পড়ায়, সেও বেরিয়ে যাবে সকাল আটটার মধ্যে । জামাই, অম্লান হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরে মর্নিং ওয়াকের জন্য তৈরি, হাসিমুখে বললো, ‘মা, শরীর ভাল তো ?’ অম্লান ভারত সরকারে বেশ উঁচু পোস্টে কাজ করে, ইকনমিক্স-এর মেধাবী ছাত্র ছিল সে । মেয়ে অনুরাধার জন্য যখন সুযোগ্য পাত্র খুঁজছিলেন অনিলবাবু, হঠাৎ জব্বলপুর থেকে ওঁর ছেলেবেলার বন্ধু সুবিনয়ের চিঠি এলো তাঁর ছেলে অম্লান-এর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে । সুঠাম, সপ্রতিভ অম্লানকে  দেখে ও তার সঙ্গে কথা বলে অনিলবাবু ও অপর্ণার খুব পছন্দ হয়েছিল । অম্লান সত্যিই বড় ভাল ছেলে – অনিলবাবু ও অপর্ণার প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান আর কাজকর্মেও তার খুব নামডাক ।

অনুরাধার থেকে বছর চারেকের বড় তার দাদা, অপর্ণার একমাত্র পুত্র, অনির্বাণ গুড়গাওঁতে থাকে – সেও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন এক মাল্টিন্যাশনাল  কোম্পানি-তে ভাইস প্রেসিডেন্ট । প্রায়ই অফিসের কাজে বিদেশ যায় অনির্বাণ, কখনও এক সপ্তাহ কখনওবা একমাসের জন্য –আজ জাপান, কাল জর্ডন অথবা পরশু ব্রাজিল – সারা পৃথিবী চষে বেড়ায় সে । ম্যানচেস্টারে পোস্টেডও ছিল বছর পাঁচেক । ছেলের কথা মনে পড়লেই অপর্ণার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, অভিমানে বুক ঠেলে উঠে আসে চাপা কান্না !

অনিলবাবু রেলে কাজ করতেন,  কলকাতা থেকে বদলী হয়েছিলেন চক্রধরপুরে – দু’টি কামরা, রান্নাঘর,  বাথরুম, সামনে ও পেছনে জাফরি দেওয়া বারান্দা আর পেছন দিকে একটা খোলা উঠোন  নিয়ে নতুন তৈরি রেলের কোয়ার্টার্স, সামনে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা অনেকটা বাগান করার জায়গা । সাবেকি উত্তর কলকাতার জয়েন্ট ফ্যামিলির প্রায়ান্ধকার বাড়ি ছেড়ে এসে অপর্ণা চক্রধরপুরে যেন মুক্তির স্বাদ পেলেন ! শনিবারের হাট থেকে খুরপি-কোদাল কিনে নিয়ে এসে জোর উদ্যমে অপর্ণা অনেক গাছপালা লাগিয়েছিলেন বাগানে । বিকেলে কলে জল এলে রোজ বালতি করে গাছে জল দিতেন অপর্ণা  – উর্বর মাটি আর তাঁর স্নেহমাখা স্পর্শ পেয়ে গাছগুলো সব লকলক করে বেড়ে উঠেছিল । চৈত্রের শেষ দিকে সারাদিন আগুন ঝরিয়ে যখন সূর্য ডুবত আর ধীরে ধীরে নেমে আসতো ছায়াঘন সন্ধ্যা, অপর্ণার বাগান ম-ম করতো যুঁই আর হাস্নুহানার গন্ধে – অনিলবাবু অফিস ফেরত বাগানে বসে চায়ের পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মৃদুহেসে বলতেন, ‘তুমি যে ওদের ভালোবাসো, গাছগুলো বোধহয় বুঝতে পারে’ ।

চক্রধরপুরে অনির্বাণ ছোট্ট ছেলে, তার তিন বছর বয়স, অনুরাধা তখনও পেটে আসেনি । এখনকার মত এত কম বয়সে কেউ স্কুলে ভর্তি হত না তখন, অনির্বাণ মা’র কাছেই পড়াশোনা করত – বর্ণপরিচয়, ছড়া ও ছবি, রবীন্দ্রনাথের সহজপাঠ এসবই পড়াতেন অপর্ণা । ছবি এঁকে শেখাতেন ভূগোল – উঁচুনিচু পাহাড়,  পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, নদীর স্রোত, সমতল বেয়ে এসে নদীর সমুদ্রে মিশে যাওয়া, নদী মোহনার ব-দ্বীপ – অতি আগ্রহে অনির্বাণ তার শিশুমনে গেঁথে নিত সব তথ্য । মাথাটা তার বরাবরই পরিস্কার, কোনও বিষয় একবারের বেশী দু’বার বোঝাতে হতনা ।

দিনগুলো যেন বড়ই দ্রুত কেটে গেল এরপর – অনুরাধার জন্ম, অনির্বাণের স্কুলে ভর্তি । ধাপে ধাপে অনির্বাণ পার হল স্কুলের নিচু থেকে উঁচু ক্লাস – একগাল হাসি নিয়ে রেজাল্টের দিন ছেলে বাড়ি ফিরত, ‘মা, এবারেও আমি ফার্স্ট।’ ক্লাস টেন-এর বোর্ড পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করে অনির্বাণ ভর্তি হল নরেন্দ্রপুরে – ওকে হস্টেলে রেখে বাড়ি ফেরার সময় অনিলবাবু আর অপর্ণার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল । এরপরেই অনিলবাবু বদলী হলেন নাগপুরে; অনির্বাণ হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় তিনটে লেটার নিয়ে পাশ করল – জয়েন্ট এনট্রান্সে তার র‍্যাঙ্ক হল ৩৭, আনন্দে আত্মহারা অনিলবাবু অফিসের সবাইকে সিঙ্গাড়া-মিষ্টি-কচুরি খাওয়ালেন পেট ভরে ! অনির্বাণ যাদবপুরে ভর্তি হল ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে ।

অনির্বাণ যখন থার্ড ইয়ারে পড়ে, ওর সহপাঠী শৌভিকের বোন, সুদীপা ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হল যাদবপুরে – শৌভিক অনির্বাণের খুব কাছের বন্ধু, ওদের বাড়ি কসবায় । যাদবপুরের হস্টেল থেকে শনি-রবিবারে ওদের বাড়ি প্রায়ই চলে যেত অনির্বাণ, হস্টেলের ডাল-ভাত-চচ্চড়িতে পেটে চড়া পড়ে গেলে মাসীমার হাতের রান্নায় মুখ বদলাতে । সুদীপা-কে মাঝে মাঝে অঙ্ক আর ফিজিক্স পড়াত, সুদীপা বলতো, ‘অনির্বাণদা’, তুমি কিন্তু দাদার চেয়ে ভালো বোঝাতে পারো ।’  একদিন কলেজের পর অনির্বাণ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল হস্টেলের দিকে, দেখে মেন গেটে সুদীপা দাঁড়িয়ে তার আর এক বন্ধুর সঙ্গে । ‘আরে, কি খবর, তোমাদের ক্লাস শেষ ?’ সুদীপা হাসিমুখে বলল, ‘অনির্বাণদা’, কেমন আছো ? তুমি কিন্তু অনেক দিন আসনি আমাদের বাড়িতে । আলাপ করিয়ে দিই, আমার ক্লাসমেট সুচেতনা, ও মডার্ন হাই স্কুলে পড়ত’ । ‘সুচেতনা, এ আমার দাদার বিশেষ বন্ধু অনির্বাণদা’, হ্যান্ডশেক করার চেষ্টা করিসনা, তোর হাত কেটে যাবে – অনির্বাণদা’ হীরের টুকরো কিনা’, খিলখিল করে হেসে উঠল ওরা দু’জনেই ।

এরপর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে অনির্বাণের যেন ঘনঘনই চোখে পড়তে লাগলো সুচেতনা – মৌখিক স্বল্পালাপ থেকে রেস্তোরাঁর ঘেরাটোপ – তারপর একদিন ওদের বাড়ি । সুচেতনার বাবা ইউনিয়ন কার্বাইডের জেনারাল ম্যানেজার, সানি পার্কে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিঙে আটতলায় ওদের ফ্ল্যাট – সেখান থেকে কলকাতা যেন এক মায়া নগরী, আকাশছোঁয়া সাফল্যের স্বর্গলোক, সব রকম দুঃখকষ্টের অনেক ওপরে । ক্যালকাটা ক্লাবের সুইমিং পুল দাপানো, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ‘কেয়ার ফ্রী’ স্বভাবের সুচেতনা অনির্বাণের মন জয় করে নিল সহজেই । যাদবপুরের পড়া শেষ করে অনির্বাণ আই আই টি কানপুরে এম টেক করতে গেল, সুচেতনা বি এস সি’র পর এম এস সি তে ভর্তি হ’ল – কানপুর থেকে বেরিয়ে অনির্বাণ আমেরিকায় যাওয়ার আগেই চারহাত এক হল এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় । বড়লোক বেয়াই বাড়ি – অনির্বাণের বিয়েতে যথেষ্টই খরচা করেছিলেন অনিলবাবু, তবু তাদের মন পাওয়া ভার । বৌভাতের সন্ধ্যায় সুচেতনার মা’ ঝেঁঝেঁ উঠলেন, ‘দেখবেন মিস্টার মিত্র, আমাদের বাড়ির লোকজনদের যেন কোনও অযত্ন না হয়’ ।

বিয়ের দু’সপ্তাহের মধ্যেই অনির্বাণ আর সুচেতনা চলে গেল আমেরিকা, বৌ আর শ্বাশুড়ির মধ্যে কোনও সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই দূরত্বের ব্যবধান তৈরি হ’ল অনেক । অনিলবাবু ও অপর্ণা অনির্বাণের চলে যাওয়াতে প্রথমে ভেঙ্গে পড়েছিলেন, পরে অনুরাধার সঙ্গে অম্লানের বিয়ের পর ওঁরা যেন মনের জোর ফিরে পেয়েছিলেন একটু ।

অনুরাধার ছোট মেয়ে টুসি জন্মাবার সময় অনিলবাবু ও অপর্ণা দিল্লী চলে এসেছিলেন – ওদের একটু সাহায্য হবে ভেবে । দেখতে দেখতে টুসি বড় হয়ে উঠলো – মেয়ে-জামাই আর ওঁদের ছাড়েনা, যাবার কথা বললেই বলে আর ক’দিন থেকে যাওনা মা, কলকাতায় তোমাদের আর কি বা কাজ? তাছাড়া ওখানে লোকজন  পাওয়া যায়না, বাড়ির সব কাজ সামলাতে মা’র কষ্ট হবে ! একদিন গভীর রাতে অনিলবাবু অপর্ণাকে ডেকে বললেন, ‘আমার বুকে একটু কষ্ট হচ্ছে’ । অম্লান সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে গেল অল ইন্ডিয়া ইন্সটিউটে – ডাক্তারদের সব চেষ্টাই বিফল করে সকাল সাতটায় চিরকালের মত চোখ বুজলেন অনিলবাবু । সুমি আর টুসি এসে অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরল, ‘দিম্মা, তুমি আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবেনা’ । তখন অনির্বাণ গুড়গাওঁ-এ চাকরি নিয়ে চলে এসেছে, খবর পেয়ে সেও দৌড়ে এল – বাবার শ্রাদ্ধশান্তি সবই করলে নিয়ম মেনে । অপর্ণা রয়ে গেলেন মেয়ের কাছে, কর্তব্যপরায়ণ ছেলে সপ্তাহে একবার ফোন করে, মাসে-দুমাসে দেখা করতে আসে – কিন্তু ঐ পর্যন্তই, ছেলে বা বৌমা কেউ বলেনা, ‘মা, আমাদের কাছে ক’দিন থাকবে চলনা’ । তবুও যখন অনির্বাণের ফোনটা আসে, ‘মা, কেমন আছো ?’, অপর্ণার চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে যেন ।

সকালবেলায় এ সময়টা অপর্ণার মনে ঘুরে ঘুরে আসে কলকাতার বাড়িটার কথা । ছেলেকে হস্টেলে রেখে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়িয়ে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে বাড়িটা করেছিলেন অনিলবাবু – দমদম পার্কে প্রায় আড়াই কাঠা জমির ওপর একটা বসার ঘর, দু’টো শোবার ঘর, বাথরুম ও ছোট রান্নাঘর নিয়ে একতলা বাড়িটা । বড় শখ করে ওঁরা দুজনে বাড়ির নাম রেখে ছিলেন, ‘নোঙর’ । বাড়ির ঠিক পেছনে একটা বিরাট টলটলে পুকুর – ঐ পুকুরটা দেখেই জমিটা খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল অনিলবাবু আর অপর্ণার । বাড়িটা তৈরি হয়ে গেলে বিশুমালিকে কাজে লাগিয়ে একটা ছোট বাগান করেছিলেন অপর্ণা সামনের আর পাশের জমিতে । বাঁশ পুঁতে আর কঞ্চি লাগিয়ে বিশু মাচা তৈরি করেছিল –  বর্ষার জল পেয়ে সদ্য যুবতী লাউগাছটা মাচা জড়িয়ে আনন্দে নাচানাচি করত । আর তরতর করে বেড়ে যাওয়া শিম গাছটা দোতলার ছাতে পৌঁছে গিয়েছিল – ছাতে উঠলেই হাতে আসতো থোকা থোকা শিম । অপর্ণার বাড়ির পেছনের পাঁচিল থেকে পুকুরের ধার ঘেঁসে মালিরা গাছ লাগিয়েছিল অনেকরকম – ঝাঁকড়া আমগাছটায় যেবার প্রথম আম ফললো, বিশুমালির বউ শ্যামলী ডেকে বলল, ‘মাসীমা, এই নিন গাছের প্রথম কাঁচা আম, টক করে খাবেন’ ।  বিশুমালির মেয়ে বিন্তি আর ছেলে তাপসের জন্য ভালো রান্নাবান্না হ’লে একটু সরিয়ে রাখতেন অপর্ণা, পালাপার্বণে পাঁচ-দশটা টাকা ধরিয়ে দিতেন, বলতেন ‘এই নে, তোরা ফুচকা খাস’ । মালিদের গাছে এসে বসত অনেক পাখি, বসন্তবৌরি, টুনটুনি আর ফিঙে – পানকৌড়ি-টা দুচোখ  বুজে ঘুমোবার ভান করতো, কিন্তু পুকুরে কোনও ছোট মাছ দেখলেই ছোঁ মেরে তুলে নিত তার ঠোঁটের ফাঁকে ! শীতের দুপুরে বাড়ির পেছনে আচার রোদে দিতেন অপর্ণা । ভাতের সঙ্গে একটু আচার খেতে বড় ভালোবাসতেন যে অনিলবাবু ।

‘মা, ওরা সবাই বেরিয়ে গেছে, আমিও বেরোচ্ছি অফিসে, দরজাটা বন্ধ করে দিন’, অম্লানের গলার আওয়াজে সম্বিত ফিরল অপর্ণার ।

[মাতৃমন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৪]