পথের সাথী…

অনিন্দ্য রায় কলকাতা ছেড়েছে বেশ কিছু বছর…যাদবপুরে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে এক বহুজাতিক কোম্পানীতে শাঁসালো মাইনের চাকরি নিয়ে তার পুণায় আসা । মেধা ও কর্মনিষ্ঠার জোরে কোম্পানী বেশ তাড়াতাড়িই অনিন্দ্যকে ম্যানেজার করেছে, কয়েক বছরের মধ্যেই আমেরিকা ও ইউরোপে দু’বার পাঠিয়েছে লম্বা এসাইনমেন্টে । সে এক নিরলস কর্মী, কাজে বড়ই ব্যস্ত … সুদর্শন অনিন্দ্য’র বয়স প্রায় তিরিশ ছুঁইছুঁই, কিন্তু বিয়েটা তার করা হয়ে ওঠেনি এখনও । আর তাছাড়া বিয়ের উদ্যোগটাই বা নেবে কে? অনিন্দ্য তার মা’কে হারিয়েছে ক্লাস টেনে পড়ার সময়, জামশেদপুরে বাবা থাকেন একা, তিনি বার কয়েক বলে ছিলেন; কিন্তু অনিন্দ্য ‘কাজের চাপ আছে’, ‘ছুটি পাবনা এখন’ ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিয়েছে এতদিন… অফিসে অনেক মহিলাই তার বেশ গুণমুগ্ধ, কয়েকজন বলেও ফেলেছে উইকেন্ড-এ দু’জনে লাঞ্চ বা ডিনার করতে গেলে কেমন হয় গোছের কথা, অনিন্দ্য মুচকি হেসে এড়িয়ে গেছে, মনের গভীরে তার কমিটমেন্টের কোনও অভাব কাজ করে বোধহয়…

ইদানীং অনিন্দ্য ঢুকেছে ফেসবুকে, জামশেদপুরের Loyola School ও যাদবপুর মিলিয়ে তার বন্ধু সংখ্যা বেশ ভালোই, এছাড়াও আছে তার কিছু তুতো ভাই-বোন… অনিন্দ্য হ’ল যাকে বলে নীরব দর্শক, সে মন দিয়ে অন্যদের দেশ-বিদেশ বেড়ানোর, জন্মদিনের কেক কাটার ছবি দেখে, বন্ধুদের বিবাহবার্ষিকীতে গদগদ ভাষায় তাদের বৌ’দের প্রশংসা বেশ বোকা-বোকা লাগে তার আবার কিছু বন্ধুদের হাস্যরসাত্মক লেখায় সে মজাও পায় বেশ… কিন্তু ঐ পর্যন্তই, অনিন্দ্য কোনও কমেন্ট করেনা, আর নিজে কোনও পোস্ট করা তো দূরের কথা ! এক শুক্রবার রাত দশটায় ডিনার সেরে ল্যাপটপ খুলে বসেছে অনিন্দ্য, অনেকদিন ধরে ভাবছে কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়, অনেক ছুটি তার পাওনা, দিন পনেরো ছুটি কোম্পানী খুব খুশী হয়েই দেবে কাজপাগল লোকটাকে একটু বিশ্রাম দিতে… কিন্তু একা একা বেড়াতে যাওয়াটা যে খুব বোরিং ব্যাপার, তার প্রায় সব বন্ধুদেরই বিয়ে হয়ে গেছে, কেই বা বৌ-বাচ্চা ছেড়ে তার মত ব্যাচেলরকে সঙ্গ দেবে, কি যে উপায়? তার অনেকদিনের শখ সাউথ-ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোয় যাওয়ার – থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি… ব্যাকপ্যাকিং-এর একেবারে আদর্শ জায়গা সব !

অনিন্দ্য ফেসবুকে দেখে ছোট্ট একফালি বিজ্ঞাপন, ‘Don’t travel alone… look for your travel buddies… বিজ্ঞাপনে আরও লেখা, ‘Register yourself for ideal travel mates…roam around the world in great company’. একটু অবাক হয়ে অনিন্দ্য সেই ওয়েবসাইটে ক্লিক করে – এতো মজার ব্যাপার, পৃথিবীতে অনেকেই তার মত একা, তারা ভ্রমণসঙ্গী খুঁজছে অথবা চাইছে কোনও ভ্রমণার্থী দলে ভিড়তে… অনেকটা খেলার ছলেই অনিন্দ্য রেজিস্টার করে নিজেকে, ‘Techie (30) working for MNC in Pune, India… love backpacking, swimming & photography… looking forward to meeting the travel buddy for a two-week holiday somewhere in SE Asia’… তারপর যথারীতি ফেসবুকের পাতা উল্টে, নিজের কিছু মেইল চেক করে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ শুতে যায় অনিন্দ্য…

সকাল ছ’টা নাগাদ পুণাতে সবে একটু আলো ফুটেছে পূবাকাশে, টুং করে মোবাইল জানালো অনিন্দ্য’র একটা মেইল এসেছে… চশমাটা পরে মেইলটা দেখে সে, ‘Hi, it’s Karen here…Karen Martin (27) from Sydney, NSW… planning a backpacking trip for about two weeks to Bali in March… would be happy to join you buddy’… অনিন্দ্য ফেসবুকে গিয়ে Karen Martin-এর প্রোফাইল চেক করে, দেখে ক্যারেন University of New South Wales থেকে কেমিস্ট্রি নিয়ে M.Sc করেছে, সিডনী-তে সে এক কেমিক্যাল ল্যাবোরেটরিতে কাজ করে Senior Analyst হিসেবে… অনিন্দ্য প্রথমে ক্যারেন-কে friend request পাঠায়, আধঘন্টার মধ্যেই ক্যারেন তার ফেসবুকের বন্ধু হয়…

বালি যাওয়ার প্ল্যান নিঃশব্দে সেরে ফেলে অনিন্দ্য, শুক্রবার রাতে বম্বে থেকে সাড়ে পাঁচ ঘন্টায় কুয়ালা লামপুর, তারপর সেখান থেকে প্রায় ঘন্টা তিনেক পর শনিবারের এক ঝকঝকে সকালে বালি’র ডেনপাসার বিমানবন্দরে পৌঁছয় অনিন্দ্য… ক্যারেন বলেছিল আধঘন্টা আগেই পৌঁছে যাবে ও সিডনি থেকে, অপেক্ষা করবে এয়ারপোর্টের বাইরে অনিন্দ্য’র জন্য … বালিতে ভারতীয়দের বিশেষ খাতির, ‘Visa on arrival’, ৩৫ ডলার ফি জমা করে একমাসের ভিসা পেয়ে যায় অনিন্দ্য, কাস্টমস পেরিয়ে এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে বেরোতেই অনিন্দ্য শোনে, ‘Hi Ani’… দেখে একমুখ উজ্জ্বল হাসি নিয়ে ক্যারেন দাঁড়িয়ে, সে বলে, ‘Hey, how was your flight? Any interesting co-passenger?’ অনিন্দ্য বলে, ‘No such luck buddy, a fat guy on the next seat… he was snoring so badly’… দু’জনেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে এবার… বালি ভ্রমণের খুঁটিনাটি সব প্ল্যান করেছে ক্যারেন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে, কাজে ব্যস্ত অনিন্দ্য এ ব্যবস্থায় খুব খুশী । এয়ারপোর্ট থেকে কাছেই কুটা নামের এক জায়গায় সমুদ্রের ধারে রিসোর্ট-এ দু’টো ঘর বুক করেছিল ক্যারেন, পাসপোর্ট দেখাতেই পাওয়া গেল ঘরের চাবি … বেশ উঁচুমানের কমপক্ষে চার তারকা মার্কা রিসোর্ট, কিন্তু অনিন্দ্য দেখে দেশের তুলনায় দাম অনেক কম…

শুরু হয় তাদের বালি ভ্রমণ… আদ্যন্ত এডভেঞ্চার স্পোর্টস পাগল ক্যারেন এক উচ্ছল অস্ট্রেলিয়ান তরুণী – সমুদ্রে উইন্ড সার্ফিং, প্যারাসেলিং, স্নর্কেলিং, স্কুবা ডাইভিং এসবে তার বিশেষ আগ্রহ… সকাল ছ’টায় ইন্টারকমে ফোন আসে তার, ‘Ani, get ready in 15 minutes. Let’s go jogging on the beach’. কুটার সমুদ্রসৈকতে প্রায় একঘন্টা দৌড়ে অনিন্দ্য তো গলদঘর্ম… অফিসের ঠান্ডাঘরে বসে মগজমারি করে সে, ক্যারেনের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে অনিন্দ্য… একটু একটু করে জানতে পারে সে ক্যারেনকে; ওর বাবা নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশে এক ছোট শহরে প্রাইমারী স্কুলের টীচার আর মা এক অতিনিষ্ঠ হোমমেকার; আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই তাদের প্রথম বিয়ে বছর ৩৫ আগের… ক্যারেনের দাদা ও বৌদি দু’জনেই ডাক্তার, দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তারা থাকে সিডনিতেই; ভাইপো-ভাইঝি দু’জন ক্যারেন-এর বিরাট ফ্যান, প্রায় প্রতি উইকএন্ড-এই ক্যারেন তার দাদার বাড়ি চলে যায় । বাচ্চাদের বড়ই ভালোবাসে ক্যারেন, অন্যান্য দেশে শিশু অধিকার, তাদের প্রতি অবিচার এসব নিয়ে অনেক পড়াশোনা তার । ভারতে শিশুদের প্রতি জঘন্য সব অপরাধের ঘটনা সবই তার জানা, এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে ক্যারেন… অনিন্দ্য বলতে বাধ্য হয়, ‘Hey Karen, please stop this now. I’m no child molester… I simply adore kids’. মাঝে মাঝে একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করে তারা; অনিন্দ্য বলে, ‘Karen, aren’t we just wasting our money? We can save big time if we share room in the hotel… I don’t snore much’. ক্যারেন জবাব না দিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায় । কোনওদিন আবার ক্যারেন বলে, ‘Ani, you have a funny name. It sounds like calling you as Honey’… হো হো করে হেসে ওঠে ওরা দুজন ।

অনিন্দ্য ও ক্যারেন বালির সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে যায়, একদিন ওরা যায় কিন্তামনি – কিছুটা গাড়িতে আর অনেকটাই ট্রেক করে ওরা পৌঁছয় ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি ‘মাউন্ট বাটুর’… পাহাড়ের চূড়ো থেকে নীচে ‘লেক বাটুর’-এর শোভা বড়ই মনোরম… কোনও দিন আবার ওরা ঘুরে বেড়ায় ‘উবুদ’, অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে মধ্য বালির এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল; উবুদ নানারকম শিল্পকলা ও বালিনীজ্ নৃত্যগীতের কেন্দ্রস্থল । অনেক পর্যটকের, বিশেষত ‘ব্যাকপ্যাকার’ দের আস্তানা সেখানে । রাস্তার দুধারে ওরা দেখে বড় বড় আর্টগ্যালারিতে আঁকা ছবি, কাঠ ও পাথরের ভাস্কর্যের সম্ভার, অসংখ্য বুটিক হোটেল, ইউরোপীয় খানার রেস্তোরাঁ ও কাফে । ওরা থামে ‘তেগালালাং’ গ্রামে – ক্যামেরায় বন্দী করে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধানচাষের (terrace farming) দৃশ্য । ‘তাম্পাক সিরিং’ গ্রামে ওরা যায় ‘তির্তা এম্পুল’ (পবিত্র প্রস্রবণের মন্দির) দেখতে – মন্দিরটির একপাশে সবুজ পাহাড়, চত্বরে অনেকগুলি ছোট মন্দির, দীর্ঘ ও প্রাচীন গাছের ছড়াছড়ি, একটি বেশ বড় ও কয়েকটি ছোট ছোট জলাশয় – পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা এক প্রস্রবণই এই জলের উৎস । দেখে আসে ওরা সমুদ্রতীরে ‘পুরা টানা লট’, ভাষান্তরে ‘সমুদ্রে ভাসমান মন্দির’; বালির দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে হিন্দু জলদেবতা বরুণ বন্দনার মন্দির, তীর থেকে অল্প দূরে এক ছোট্ট দ্বীপে । ভাঁটার সময় সমুদ্রের জল যায় সরে, হেঁটে পৌঁছনো যায় মন্দির চত্বরে ।নীচে থেকে প্রায় দৌড়ে পৌঁছে যায় ক্যারেন পাহাড়ের মাথায় ‘উলুওয়াটু’ মন্দিরে – বালির একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে এক পাহাড়ের শীর্ষে মন্দিরটি, খাড়াই ‘ক্যানিয়ন’-এর নীচে নীল-সবুজ রঙ মেশানো ভারত মহাসাগরের আছড়ে পড়া ঢেউ – বড়ই মনোমুগ্ধকর !

দেখতে দেখতে কেটে যায় দু’টো সপ্তাহ, ফিরে যাওয়ার আগের দিন এক পড়ন্ত বিকেলে অনিন্দ্য ও ক্যারেন পৌঁছয় ‘জিম্বারন বীচ’ – সূর্যাস্তের পর সমুদ্রের পাড়েই সী-ফুড ডিনার সেরে নেবে তারা । রক্তিম গোলাকৃতি সূর্যদেব ধীরে এগিয়ে চলেছেন দিক চক্রবাল পানে – সমুদ্রে ঠোঁট ছোঁয়ালেন সুয্যিমামা – আকাশে লালিমার পরশ, একদল পাখির ঘরে ফেরা – পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছিল ওরা সূর্য ডোবার পালা… অনিন্দ্যর আঙুলে ক্যারেনের আঙুলের ছোঁয়া, ক্যারেন বলে, ‘Ani, I would like to visit India… would love to explore your country with you dear’. অনিন্দ্য নীচু স্বরে জবাব দেয়, ‘Karen, please don’t visit India…come over to stay back forever’… ডুবন্ত সূর্যের অস্তরাগে চারটি চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে যেন… ক্যারেনকে বুকে টেনে নেয় অনিন্দ্য নিবিড় আলিঙ্গনে…

After the sunset @ Kuta
After the sunset, Kuta
Advertisements

নইলে আমার লাথি খাবে…

আমার শ্বশুরমশায়ের ব্যক্তিত্ব ছিল বেশ গুরুগম্ভীর গোছের; বিয়ের পর একটু দূরত্ব বজায় রেখেই চলতেন তিনি আমার সঙ্গে । আমি হাল ছাড়িনি, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি সম্পর্কের বরফ গলানোর… বিয়ের প্রায় মাস তিনেক পর কলকাতা থেকে ভোপালে আমার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছি, একদিন দুপুরে শ্বশুরমশায়ের পাশে খেতে বসেছি আমি । তখন আনকোরা নতুন জামাই, আপ্যায়ণ হচ্ছে ভালোই; বেশ বড় সাইজের দু’খানা পাবদা মাছ পড়ল পাতে, দোষের মধ্যে আমি বলে ফেলেছি, ‘বাঃ, দারুণ মাছ তো’… অমনি শ্বাশুড়ি-মা আরও একটি মাছ দিতে উদ্যোগী হ’লেন । আমি সভয়ে বলে উঠি, ‘আরে না না, কি করছেন, আর খেতে পারবো না’। শ্বাশুড়ি জোরাজুরি করলে, আমি বলি, ‘এতো আমার লাথি খাবে, সেই ঘটনা হয়ে গেল’… সে কথা শুনে মা বলেন, ‘সে আবার কি ঘটনা?’ আর বাবা কোনও কথা না বলে গম্ভীর ভাবে আমার দিকে তাকালেন…

আমি বলি, তা সে অনেককাল আগের কথা, কলকাতা থেকে একটু দূরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে অতি ধার্মিক, তিলক কাটা এক বোস্টম দম্পতি থাকতেন । তাঁদের প্রথম পুত্র সন্তান জন্মালে তার নাম রাখলেন, কৃষ্ণ, তা সে কেষ্ট সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই পটল তুললো । পরের সন্তান হ’ল একটি মেয়ে, তার নাম হ’ল রাধা; ওমা, রাধাও দিন দশেক পর অক্কা পেল । এর পরে আবার ছেলে হ’লে নাম রাখা হ’ল রাম… রামও এক মাসেই ফুড়ুৎ ! ভীষণ রেগে গিয়ে তিলক মুছে সে দম্পতি ঘোর মাংসাশী হ’লেন, আর এক মেয়ে জন্মাতে তার নাম রাখলেন ‘লাথি’… লাথি বেঁচে গেল । বছর তিনেক পর লাথি’র এক ভাই জন্মাল, তার নাম রাখা হ’ল ঝাঁটা; ওমা, সেও বেঁচে গেল । ধীরে ধীরে লাথি-ঝাঁটা বেশ বড় হয়ে উঠলো, তাদের পোষাকি নাম ছিল কিছু একটা, কিন্তু লাথি-ঝাঁটা ডাকনামেই তারা বেশী পরিচিত … দুই ভাই-বোন আবার এক ছাগল পুষেছে, তার নাম দিয়েছে ‘জুতো’ !

সময়কালে লাথি’র বিয়ে হ’ল; তার বর কলকাতা শহরের এক নব্য যুবক, সে ডক্টরেট করে কলেজে ফিলসফি পড়ায়, তার নাম ত্রিদিব । সুন্দরী লাথি’র ছবি দেখেই পাত্র এক কথায় বিয়েতে রাজি; বিয়ের পর জামাই প্রথম শ্বশুরবাড়ি এসেছে, তার খুব আদর আপ্যায়ণ হচ্ছে । দুপুরে পাতে পড়েছে দু’টো বেশ বড় সাইজের গলদা চিংড়ি, তারপর ত্রিদিবের শ্বাশুড়ি-মা আরও দু’টো পেল্লায় ইলিশের পিস তাকে দিতে গেলে, সে সভয়ে বলে, ‘মা, এক পিস দিন, আমি অত খেতে পারিনা’ । শ্বাশুড়ি বলেন, তুমি যা পারো খাও বাবা, নইলে আমার লাথি খাবে’… একথা শুনে তো নতুন জামাই-এর তো কান লাল একেবারে ! রাতে খাওয়ার সময় শ্বাশুড়ি অনেকটা মুরগী’র মাংস দিয়েছেন, আরও একহাতা মাংস দিতে গেলে, ত্রিদিব বলে, ‘করছেন টা কি? আমি রাতে এমনিতেই কম খাই’… সঙ্গে সঙ্গে শ্বাশুড়ি বলে ওঠেন, ‘আরে, যা পারো খাও, নইলে আমার লাথি খাবে’ । পরপর দু’বার একথা শুনে ত্রিদিব খুব অপমানিত বোধ করলো, মনে মনে সে ভাবে যত্ত সব অশিক্ষিতের দল, এরকম প্রত্যন্ত গ্রামে তার বিয়ে করাই খুব অন্যায় হয়েছে…

পরদিন সকালে ত্রিদিব তার শ্বশুরমশাইকে একা পেয়ে বলে, ‘বাবা, এটা কি রকম কথা? কাল সকালে ও রাতে খাওয়ার সময় আমি আর খেতে পারবো না শুনে মা বললেন – যা পারো খাও নইলে আমার লাথি খাবে’ ! শ্বশুরমশাই উচ্চস্বরে হ্যা হ্যা করে হেসে উঠে বলেন, ‘আরে হয় লাথি খাবে নয়তো ঝাঁটা খাবে, এতে চিন্তার কি আছে?’ এই শুনে ত্রিদিব ভাবে এতো গুষ্টিসুদ্ধ পাগল, কথাবার্তা একেবারে অমার্জিত, এখানে আর থাকা নেই একদম…

পরদিন খুব ভোরে সবাই যখন ঘুমোচ্ছে, বাড়ির পাঁচিল টপকে ত্রিদিব যেই পালাতে গেছে, ঝাঁটা দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলে, ‘জামাইবাবু যাবেন না, আজ জুতো মারবো, জুতোটা খেয়ে যান’। এই শুনে ত্রিদিব প্রাণপনে দৌড়ে একেবারে পগার পার…

আমি থামলে হো হো করে হেসে উঠে বাবা বলেন,’ কোথা থেকে পাও এসব গল্প?’ এর পরেই তিনি আমার বেশ বন্ধু হয়ে ওঠেন !

 

মিতুল

মিতুলের আজ সকাল থেকেই বড্ড মন খারাপ…

মিতুলের সঙ্গে পরিচয় আছে আপনাদের? ছোট্ট মেয়ে মিতুলের বয়স বছর তিনেক, তার আছে এক পুঁচকে ভাই – টুটুল, তার বয়স মোটে ছ’মাস । তা সে টুটুল এতদিন শুধু ঘুমোতো, আর খিদে পেলেই কেঁদে উঠতো, আবার খেয়ে-দেয়েই লম্বা ঘুম, ইদানীং সে একটু-আধটু হাসতে শিখেছে । মিতুল তার কাছে গেলে সে হাত-পা ছুঁড়ে কিছু বলার চেষ্টা করে, আর তার ঝুমঝুমিটা নাড়িয়ে দিলে, বেশ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সে… আছেন মিতুলের মা ও বাবা – মিতুল তাদের মাম্মা ও বাবাইয়া বলে ডাকে। ওদের সঙ্গেই থাকেন মিতুলের ঠাম্মা ও দাদু, ছোটবেলায় ঠাম্মা বলতে পারতো না মিতুল, সে তাঁকে আম্মা বলে ডাকে । আর থাকে কাঁথির কাছে এক গ্রাম থেকে আসা রূপাদিদি – সে মাম্মা ও ঠাম্মাকে রান্নায় সাহায্য করে, মাঝে মাঝে বেশ ভালো চিকেনকারি রান্না করে, মিতুল-টুটুলকে চান করিয়ে দেয়, গুনগুন করে গান গেয়ে টুটুলকে ঘুম পাড়ায়, রূপাদিদি খুব ভালোবাসে তাদের…

দক্ষিণ দিল্লীর আর কে পুরমে আটতলা উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ির চারতলায় থাকে মিতুলরা, লম্বা করিডোরের দু’পাশ ধরে ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজা । গরমকালে সেই ঢাকা করিডোর থাকে বেশ ঠাণ্ডা, আর সেই করিডোরে শতরঞ্চি পেতে সকালবেলা মিতুল, তারই সমবয়সী বর্নিকা, পল্লবী, বৈশালী আর ও’দের চেয়ে একটু বড় নিধিদিদি ও স্বাতীদিদিদের সঙ্গে তাদের খেলার সংসার সাজিয়ে বসে । ছোট্ট গ্যাসের উনুনে ঠান্ডা জলেই তাদের ভাত ফোটে, গাছের পাতা দিয়ে সবজি হয় আর সাদা প্লাস্টিকের বোতল থেকে মিছিমিছি দুধ ঢেলে ক্ষীরও তৈরি করে তারা, পুতুলদের জন্য এলাহি ভোজের বন্দোবস্ত একেবারে।

বারো’টা বাজলে আম্মা’র ডাকাডাকিতে মিতুল বাড়ি ঢোকে, রূপাদিদির কাছে চান করে সে । এরপর আম্মা তার খোপকাটা খাবারের থালায় আলু-ডিম-বীন্স সেদ্ধ দিয়ে ডাল মেখে ভাত খাইয়ে দেন; মাছের কাঁটা বেছে দিলে সে মাছও খেয়ে নেয় টপাটপ ! কিন্তু মিতুলের তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়ার আসল কারণটা হ’ল খেতে খেতে আম্মা’র কাছে গল্প শোনা; আম্মা একটা গল্প শেষ করেননা কখনও, খাওয়া সেরে বিছানায় তাঁর পাশে শুয়ে গল্পটা’র শেষ শুনতে শুনতে মিতুল ঘুমিয়ে পড়ে… রাতেও একই রুটিন; আম্মার ভাঁড়ারে গল্পের স্টক অফুরন্ত – রাজা-রাণী, রাজপুত্তুর-রাজকন্যে, রামায়ণ-মহাভারত আর ভূত-পেত্নী, দত্যি-দানো’র গল্প সব; দু’হাতে আম্মা’র গলা জড়িয়ে সেসব গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ে মিতুল…

বিকেলটা মিতুলের কাটে তার দাদুর সঙ্গে – সাড়ে পাঁচটা-ছ’টার সময় সূর্যের তাপ একটু কমলেই মিতুলকে তৈরি করে দেয় রূপাদিদি, একগ্লাস দুধ খেয়ে, ছোট ছোট ফুলের প্রিন্টের ফ্রক কিংবা জীন্সের হাফপ্যান্ট ও টি-শার্ট পরে মিতুল দাদুর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে । দাদু কোনও দিন নিয়ে যান বাড়ির কাছেই দূর্গামন্দিরে, একটু দূরের ‘রক গার্ডেন’ বা শান্তিনিকেতনের পার্কে, সেখানে স্লাইড ও দোলনা আছে… বেশী অন্ধকার হওয়ার আগেই ফিরে আসে তারা তাদের ফ্ল্যাট বাড়ির ক্যাম্পাসের মধ্যে; গেটের ঠিক বাইরেই এক চীনে বাদামওয়ালা বসে, এক ঠোঙা বাদাম কিনে তাদের ক্যাম্পাসের বাগানে বসে দাদু খান আর খোসা ছাড়িয়ে কয়েকটা বাদাম মিতুলকে দেন । দাদু-নাতনির সখ্য এভাবেই বেড়ে চলে…

কয়েকমাস বাদেই স্কুলে যাওয়া শুরু করবে মিতুল, ডি পি এস-আর কে পুরম স্কুলের ইনফ্যান্ট সেকশনে তার এডমিশনও হয়ে গেছে । আরও দু’টো স্কুলে চান্স পেয়েছিল সে, তার বাবার পছন্দ ছিল এক মিশনারী স্কুল । কিন্তু ডি পি এস ইনফ্যান্ট স্কুলে মিতুল দেখে একটা বিরাট কাচের বাক্স, তাতে অনেক রঙিন মাছ আর একটা বড় খাঁচায় অনেকগুলো খরগোশ ছুটোছুটি করছে – ব্যাস, মিতুল বায়না ধরে, ওই খোগ্গসওয়ালা ডি পি এসেই পড়বো আমি ! মা তার বাবাকে বোঝায়, মিশনারী স্কুলটা তো শুধু মেয়েদের জন্য, টুটুলকে তাহলে আবার অন্য স্কুলে ভর্তির ঝামেলা হবে । আর ডি পি এস কো-এড স্কুল, ওখানে দিদি পড়ে বলে দু’বছর পর টুটুল এডমিশনের সময় একটু বাড়তি সুবিধেও পাবে । তাই ডি পি এস ইনফ্যান্ট স্কুলেই মিতুলের ভর্তির জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে ।

মিতুলের সব খেলনাগুলো একটা বড় প্লাস্টিকের বালতিতে রাখা থাকে… সন্ধ্যাবেলা তার পুতুলের সংসার ছড়িয়ে মিতুল খেলতে বসে । তার এক নীল রঙের শুঁড়তোলা হাসি হাসি মুখের হাতি আছে, বাবাইয়া তার নাম দিয়েছে ‘নীলমাধব’; এক পাটকিলে রঙের শান্তশিষ্ট শিম্পাঞ্জী, বাবা তার নামকরণ করেছে ‘ঘটোৎকচ’, এক সোনালি চুলের স্কার্ট পরা রোগাসোগা মেমসাহেব পুতুল, বাবা তাকে বলে ‘সুন্দরী শাঁকচুন্নি’… এসব নাম শুনে মিতুল খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে… কিন্তু কাচের আলমারিতে সাজানো দু’টো সিরামিকের সাহেব-মেম আছে, তাদের নিয়ে খেলা মিতুলের একদম মানা; সে সাহেব-মেম নাকি আম্মা’র মায়ের পুতুল, অনেক বছর আগে বিদেশ থেকে আনা… তবে হ্যাঁ, মাম্মা বলেছে যে মিতুল বড় হলে তাকে পুতুলগুলো নিয়ে খেলতে দেওয়া হবে… কে জানে কবে যে মিতুল বড় হবে ?

মিতুলের বাবাইয়া ভারত সরকারের অফিসার, কাজে তাঁকে দিল্লী’র বাইরে যেতে হয় প্রায়ই… বাবাইয়া হায়দ্রাবাদ, চেন্নাই, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, আহমেদাবাদ, ভোপাল, ইন্দোর… সব শহর চষে বেড়ান; মিতুল কিছুদিন আগেও ব্যাঙ্গালোর বলতে পারতো না, বলতো, ‘বাবাইয়া ব্যাঙ্গাদোলদোল গেছে’ । আর বাবাইয়া কাজে এক-দু’দিনের জন্য বাইরে গেলেই মিতুল তাঁর ফেরার সময় উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে, কাজের ফাঁকে সময় করে বাবাইয়া ঠিক মিতুলের জন্য একটা নতুন পোষাক বা খেলনা কিংবা নিদেনপক্ষে একটা চকলেটের বার নিয়ে আসে… তাতেই মিতুল মহাখুশী !

আজ সকালে কাচের আলমারি খুলে ভেতরের জিনিসের ধূলো ঝাড়ার সময় রূপাদিদির হাত থেকে সিরামিক সাহেব পুতুলটা পড়ে গিয়ে ভেঙে খানখান… এমনই টুকরো হয়ে ভেঙেছে যে তাকে কিছুতেই জোড়া দেওয়া সম্ভব নয় । রূপাদিদি এমনিতে খুবই সাবধানী, সে-ই মাঝে মাঝে আলমারির জিনিস পরিস্কার করে, কোনওদিন এমন হয়না… বাড়িসুদ্ধু সকলের ভীষণ মন খারাপ, রূপাদিদি তো কান্নাকাটি করছিল, আম্মার চোখেও জল । মিতুলের মনটা বিশেষ ভাবে খারাপ, আহারে ! ওই মেমসাহেবের এতদিনের বন্ধুটা চলে গেল; বড় হয়ে তারও আর ওই পুতুল দু’টো নিয়ে খেলে করা হবেনা !

দু’-তিনদিন পর বাবাইয়া অফিস থেকে ফিরে এসে বললে তাকে অফিসের বিশেষ কাজে এক সপ্তাহের জন্য জার্মানি যেতে হবে । মাম্মা একথা শুনে প্রথমেই বলে, ‘টুটুলের জন্য ওখান থেকে ভালো ডায়াপার নিয়ে এস তো, ওগুলো অনেক বেশী কাজের’ । মিতুল বলে, ‘বাবাইয়া, অনেক ছবি তুলো কিন্তু, জার্মানি কি রকম আমি দেখব’…

জার্মানির কাজ শেষে বাবাইয়া ফিরেছে ভোরবেলা, গলার আওয়াজ পেয়ে উঠে পড়েছে মিতুল তাড়াতাড়ি, বাবার স্যুটকেস থেকে বেরোচ্ছে অনেক জিনিস, একটা বিরাট প্লাস্টিকের থলে ভর্তি কতরকমের চকলেট, মিতুলের জন্য দারুণ ফ্রক ও একটা মেম পুতুল, টুটুলের জন্য টি-শার্ট আর ডায়াপারের বিরাট স্টক, মাম্মা’র জন্য পারফিউম, আম্মা-দাদু-দিম্মা ও দাদুভায়ের জন্য কার্ডিগান, রূপাদিদির জন্য একটা সুন্দর স্কার্ফ… সবশেষে বাবাইয়া বার করে খুব যত্ন করে মোড়া একটি প্যাকেট, মোড়ক খুলে বাবাইয়া বার করে একটা সিরামিকের পুতুল… অবিকল সেই ভেঙে যাওয়া সাহেবটি’র জোড়া যেন… সেটা দেখে আনন্দে হৈ হৈ করে ওঠে সবাই !

সেই রাত…

বাইশ তলায় নতুন অফিসে নরম গদী লাগানো চেয়ারটায় একটু হেলিয়ে বসলো অর্ণব; ওর বিশাল অফিস কামরার একদিকে ফ্লোর-টু-সিলিঙ কাচের দেওয়াল । অর্ণবের দৃষ্টি চলে যায় কাচের দেওয়ালের বাইরে – নভেম্বরের বিকেলে সোনালী আলোয় উদ্ভাসিত গুড়্গাঁও (অধুনা গুরুগ্রাম) স্কাইলাইন । অদূরে অনেক নামী নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বহুতল অফিস, সারা দেশের অগ্রণী ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিজনেস স্কুল থেকে পাশ করা বেশ কিছু ঝকঝকে ট্যালেন্ট সেখানে বিশ্বজোড়া কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত ।

অর্ণবের কোম্পানি সারা পৃথিবী জুড়ে সফটঅয়্যারের ব্যবসা করে; অর্ণব এর মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলির ব্যবসা সামলায় । গুড়্গাঁও-তে অফিস হ’লে কি হ’বে, প্রতিমাসেই তাকে সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্কক, জাকার্তা কিংবা ম্যানিলা যেতে হয়, মাসে ৭ থেকে ১০ দিন কেটে যায় দেশের বাইরে ! আর এই নিয়ে অনন্যার অনুযোগের আর শেষ নেই – বেশ বুঝতে পারে অর্ণব অনন্যার ওপর দিয়ে কি চলে । বাড়ির যাবতীয় কাজ, বাজার-হাট, বাচ্চাদের স্কুলের যত রকম ঝামেলা, তাদের পড়াশোনা করানোর দায়িত্ব, অর্ণবের বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভাল সবই কিন্তু হাসিমুখে করে অনন্যা ।

আই আই টি, খড়্গপুর ও আই আই এম, কলকাতা থেকে পাশ করে অর্ণব ক্যাম্পাস থেকে চাকরি পেয়েছিল হিন্দুস্তান ইউনিলিভারে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনী হিসেবে । সেখানে বছর দশেক কাজের পর এই কোম্পানিতে ঢুকে ছিল সে; তার দায়িত্বশীলতা ও বুদ্ধিমত্তার জোরে দশ বছরের মধ্যেই সে আজ ভাইস প্রেসিডেন্ট ! গুড়্গাওঁ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অফিসগুলি মিলিয়ে প্রায় হাজার দুয়েক ছেলে-মেয়ে কাজ করে অর্ণবের অধীনে, কিন্তু তারা সবাই অর্ণবকে খুব সম্মান করে ওর সততা আর যে কোনও সমস্যার সহজে সমাধান করার ক্ষমতার জন্য !

আজ সকাল থেকে অনেক ধকল গেছে অর্ণবের; সকালে বিদেশ থেকে আসা দু’টো ক্লায়েন্ট টীমের কাছে প্রেজেন্টেশন – এক কোম্পানির ব্যবসা মাইনিং আর এক জনের ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত । এদের মধ্যে একটি কোম্পানি এসেছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে; সে বাজারে ঢোকার চেষ্টা করছে অর্ণবের কোম্পানি তাই অস্ট্রেলিয়ান অর্ডারটা খুব মূল্যবান । বিদেশী কোম্পানি ও নিজের টীমের কর্মী সব মিলে ১২ জন কে নিয়ে লাঞ্চে গিয়েছিল অর্ণব । তারপর বেশ কিছু ই-মেলের জবাব দিয়ে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ অর্ণব চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো ।

সাফল্যের প্রায় চূড়োয় পৌঁছে গিয়েছে অর্ণব – আর গোটা দুয়েক প্রোমোশন, তাহলেই ওর পোস্টিং হবে সিয়্যাটল; অর্ণব বিশ্বজোড়া কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ও বোর্ড মেম্বার হ’বে । অর্ণবের বয়স সবে ৪৫, লম্বা রেসের ঘোড়া, অনেক দূর দৌড়বে ও ! ভবিষ্যতের সাফল্য সোপানের কথা ভাবতে ভাবতে অর্ণবের হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেই রাতটার কথা – পরিস্থিতি কিভাবে আমূল পালটে যেতে পারতো সে ভেবে ও’র গায়ে কাঁটা দিল । মা’র কাছ থেকে প্রায়ই শোনা একটা কথা মনে পড়ে গেল অর্ণবের – যে ইস্পাতে রাজার তরবারি হতে পারতো, সেই ইস্পাত দিয়ে চাষার কাস্তে তৈরি হল ।

অনেক বছর আগেকার কথা – জানুয়ারী মাসের শেষদিক, অর্ণব তখন খড়্গপুর রেলওয়ে স্কুলে সবে ক্লাস সেভেনে উঠেছে, বয়স বারো পূর্ণ হ’তে মাস ছয়েক দেরী । স্কুল থেকে নতুন বইয়ের লিস্ট দিয়েছে কিন্তু বই তখনও কেনা হয় নি । নতুন বইয়ের জন্য হাপিত্যেস করে বসে আছে অর্ণব – প্রতি বছর নতুন বইগুলি বাড়ি নিয়ে এসে পাতা উলটিয়ে গন্ধ শুঁকতো সে আর বাংলা টেক্সটবুক ও দ্রুতপাঠ্য বইয়ের গল্পগুলি পড়ে ফেলতো এক নিঃশ্বাসে ! ক’দিন ধরে বাবার শরীরটা ভালো নেই – দিন তিনেক আগে বাবার রাতে ধুম জ্বর এসেছিল । সেদিন সোমবার, বাবার জ্বরটা সকালে একটু কম ছিল, বাবা ভালো হয়ে উঠছে মনে করে অর্ণব স্কুলে গিয়েছিল সেদিন । বেলা বারোটা নাগাদ দেখে ওদের চেয়ে বেশ কিছু বড় পাড়ার বাবলুদা তাদের ক্লাসে এসেছে, টীচারকে কি একটা স্লিপ দেখাচ্ছে । টীচার সে স্লিপটা পড়ে বললেন, ‘অর্ণব, ও তোমার পাড়া থেকে এসেছে, ওকে চেনোতো? তোমার বাবার শরীর খুব খারাপ, তাই হেডস্যার তোমাকে বাড়ি চলে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছেন’। অর্ণব তাড়াতাড়ি বাবলুদা’র সঙ্গে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে, তার সাইকেলের পিছনে বসে প্রশ্ন করে, ‘বাবলুদা, বাবার কি হয়েছে? আমি তো বাবাকে ভালোই দেখে এলাম’ । বাবলুদা’ বেশী কথার জবাব দেয় না, বলে, ‘তোর বাবাকে রেলের হাসপাতালে নিয়ে গেছে, তুই এখন বাড়ি চল’ ।

বাড়ির সামনে ওরা আসতেই পাশের বাড়ির কবিতাদি’র মা বেরিয়ে বলেন, ‘অর্ণব, তুমি বাবা আমাদের বাড়ি এসো, মা তো বাড়িতে নেই, মা বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছেন‘ । একটু একটু করে অর্ণব জানতে পারে, বাবার নাকি সকাল এগারোটা নাগাদ শরীর খুব খারাপ হয়, বাথরুমে যেতে গিয়ে পড়ে যান, চোখের চাহনি অস্থির, হাত-পা ছুড়তে থাকেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবা নাকি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, পাড়ার ছেলেরা রেলের হাসপাতাল থেকে ডাক্তার দাশগুপ্তকে ডেকে নিয়ে আসে, তিনি এসেই বাবার ঘাড়ে হাত দিয়ে বলেন, ‘একি, ঘাড় এতো শক্ত, মনে হচ্ছে মেনিনজাইটিস, এক্ষুনি হাসপাতালে ভরতি করতে হবে’ । তারপর এম্বুলেন্সে করে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ।

দুপুর দেড়টা নাগাদ মা ফিরে আসে বাড়িতে কিছু খেয়ে যেতে, অর্ণব দেখে প্রতিবেশী মাসীমা-কাকিমারা সবাই মিলে মা’কে মাছ খেতে জোরাজুরি করছে, মা’র মনমেজাজ একেবারেই ভালো নেই, চোখে কান্নার দাগ, বাবা কেমন আছে জিজ্ঞাসা করাতে মা অর্ণবের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেন শুধু…মা তাড়াতাড়িই ফিরে যান হাসপাতালে, যাওয়ার সময় অর্ণবকে বলে যান বাবা সিরিয়াস, প্রতি আধঘন্টায় বাবার লাম্বার পাঙ্কচার করে সংক্রমিত ফ্লুইড বের করে দেওয়া হচ্ছে, আর সঙ্গে চলছে কড়া ডোজের এন্টিবায়োটিক, এখনও বাবার জ্ঞান ফেরেনি । ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায় অর্ণবের, বিকেলে পাড়ার ছেলে-ছোকরা সবাই ও’র বাবার কথা আলোচনা করছে, মেনিনজাইটিস খুব খারাপ অসুখ, কেউ নাকি সেরে ওঠেনা…

রাতে কবিতাদি’দের বাড়িতেই একটু খাওয়া-দাওয়া সেরে শুতে যায় অর্ণব, ঘুম আসেনা ওর মোটেই…বাবা মারা গেলে ওর পড়াশোনার কি হবে? ওর মামারা এসে অর্ণব ও মা’কে নিয়ে যাবে, ওকে হয়ত ভরতি করে দেবে কলকাতার শহরতলীর কোনও স্কুলে, ওরকম স্কুলে পড়লে ওতো জীবনে কিছুই করতে পারবে না আর । অর্ণব খড়্গপুর রেলওয়ে স্কুলে প্রথম দিকের ছাত্র, ও’র যে অনেক স্বপ্ন, ও আই আই টিতে ভরতি হবে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে, আরও উচ্চশিক্ষা নেবে, সেসব স্বপ্নের মুকুল ঝরে যাবে একদিনেই ! অর্ণব একমনে ভগবানকে ডেকে চলে, বলে, ‘ভগবান, আমার বাবাকে ভালো করে দাও, আমার বাবা খুব ভালো লোক, সে কোনও দিন কারোর ক্ষতি করেনি, বাবাকে ভালো করে দাও ঠাকুর’…গভীর রাত অবধি জেগে অর্ণব একই কথা বলে যায় বারবার, নিজের অজান্তে কোনও এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে সে ।

ভোরের দিকে ঘুমটা তার ভেঙ্গে যায় হঠাৎ, ঘড়িতে দেখে সকাল সাড়ে ছটা । কবিতাদি’দের বাড়ির বাগানে বেরিয়ে আসতে অর্ণব লক্ষ্য করে দূরে একটা রিকশা আসছে, কাছে এলে বুঝতে পারে মা’ ফিরছে বাড়িতে… দূর থেকেই দেখে মা’য়ের মুখে স্মিত হাসি, দৌড়ে এগিয়ে যায় অর্ণব, ওকে দেখতে পেয়ে মা বলে ওঠেন, ‘বাবু, তোমার বাবা অনেক ভালো আছেন, জ্ঞান ফিরে এসেছে, ডাক্তার বলেছেন আর ভয়ের কিছু নেই, তিন-চারদিন পরে তাঁকে ছেড়ে দেবে হয়ত’…

অর্ণব পেরিয়ে এসেছে জীবনের ভয়ঙ্কর এক কালো রাত… সোনালী সকালটা বড়ই সুন্দর, নানারঙ্গের স্বপ্ন আবার ঘিরে ধরে অর্ণবকে, ঈশ্বর সত্যিই বড় দয়াময়…

এলোমেলো…

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সিনিয়র সিটিজেনের তকমাটা পাকাপাকি ভাবে গায়ে এঁটে বসবে, তবে আশার কথা শুনছি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ঠিক করেছে যে ৭৫ বছর বয়স না হ’লে নাকি কাউকে বৃদ্ধ বলা হ’বে না ! সে যাই হোক, শীঘ্রই মাস মাইনে বন্ধ হয়ে পেনশন চালু হবে – পেনশনার কথাটা’র মধ্যে কোথাও একটা সামান্য শ্লেষ লুকিয়ে থাকে যেন, ‘দেখ, লোকটা কেমন সরকারের পয়সায় বসে বসে খাচ্ছে…’ সকাল ন’টার মধ্যে তৈরী হয়ে অফিস যাওয়ার তাগিদটা থাকবে না আর । জুনিয়র সহকর্মীরা আর এগিয়ে এসে বলবে না, ‘গুডমর্নিং স্যার, কেমন আছেন ?’, কেউ কেউ আবার আমার তোলা ছবি ও লেখার ভক্ত, কোনও জায়গায় বেড়াতে গেলেই তারা বলে, ‘ছবি কবে দেখতে পাবো? আর ট্র্যাভেলগ?’ পাঁচতলায় আমার অফিসের বিরাট কাঁচের জানালা থেকে উদাত্ত আকাশ, দক্ষিণ দিল্লীর শ্যামলিমা, দূরে কুতুব মিনারের চূড়ো আর ধীর গতিতে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যাওয়া উড়োজাহাজ – এদের কিন্তু বড়ই মিস করবো আমি !

কিছুদিন বাদে কোনও মিটিঙে জোরালো বক্তব্য রাখতে হবেনা আর, কোট-টাই পরে চমক লাগানো প্রেজেন্টেশন দেওয়ার প্রয়োজনও ফুরোবে তখন । সরকারি চাকরিতে ‘ইঁদুর দৌড়’ ছিল না ঠিকই, কিন্তু দৌড়টা ছিল ভালো রকমই । দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আর ছুটে বেড়াতে হবে’না নানা কাজে – দেশটাকে চষে ফেলা ‘পায়ের তলায় সর্ষে’তে অভ্যস্ত আমি হয়ত একটু মুষড়ে পড়ব তখন ।

বুঝতেই পারছি ধীরে চলার সময় এসেছে কাছে, বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা বাস আর ছুটে গিয়ে ধরতে ইচ্ছে করেনা, মনে হয় কি হবে তাড়াতাড়ি করে, পরের বাসটা ধরব না হয় । আর মনটা যেন আগের থেকে অনেক বেশী উদার হয়ে গেছে, রেস্তোরাঁয় বিল চুকিয়ে ১০০/২০০ টাকা টিপস দিয়ে দিই অনায়াসেই, অফিসের ড্রাইভারকে একটু দেরীতে ছাড়লে খুব সহজেই ১০০ টাকা দিয়ে বলি, ‘কিছু খেয়ে নিও ভাই’ । কেউ খারাপ ব্যবহার করলে প্রতিবাদ করি না চেঁচামেচি করে, মুচকি হেসে সরে যাই । অন্যের অনেক অন্যায়ই ক্ষমা করে দিই হাসিমুখে, আগের মত তার ভুল প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগিনা আর ।

ভালো লাগে, খুব ভালো লাগে আমার পরবর্তী প্রজন্মকে – আমার সব ঝকঝকে ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নী, আমার বন্ধুদের ছেলে-মেয়েরা, ছেলে-মেয়ে’র বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে ফেসবুকের দৌলতে যোগাযোগ বেশ নিয়মিত, তাদের দেখে নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে । তাদের আশা-আকাঙ্খা, সাফল্য, জীবনের বিভিন্ন মাইলফলক বড় আনন্দ দেয় আমায়, কত কিছুই যে শেখার আছে তাদের কাছ থেকে… বেশ কয়েকজন আবার মজার কমেন্ট লেখে আমার পোস্ট করা ছবিতে বা লেখায়, খুশীতে মনটা ভরে ওঠে !

অনেকেই বলেন রিটায়ারমেন্টের পর খুব ঘুরে বেড়াবেন আপনারা । আমি অবসর নিলেও স্ত্রী’র চাকরি এখনও বেশ কিছুদিন বাকি; পদোন্নতির সঙ্গে তার দায়িত্বও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে । তার ছুটিছাটার ব্যাপারটা মাথায় রেখে তবেই না ঘোরাঘুরি । আর সেই বিখ্যাত প্রবাদ – সময়, সঙ্গতি আর দৈহিক ক্ষমতার চিরাচরিত সংঘাত । কম বয়সে সময় ছিল, ক্ষমতা ছিল কিন্তু সঙ্গতি ছিলনা, মাঝ বয়সে সঙ্গতি হয়ত ছিল, ক্ষমতাও ছিল কিন্তু সময় ছিলনা একদম আর এখন সঙ্গতি আছে, সময়ও আছে অফুরাণ কিন্তু ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন ! একটা ‘Bucket List’ তৈরি আছে আমার, সব সময়ে কাছেই থাকে সেটি – স্বপ্নে ও টিভি’র ট্র্যাভেল চ্যানেলে ভেসে যাই দেশ-দেশান্তরে । কিন্তু স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হ’বে, সে হিসেবের ছক কষে রেখেছেন স্বয়ং বিধাতা ।

জন্মালে যেমন একদিন মরতে হবে’ই, কালের নিয়মে অবসর গ্রহণও তাই অবশ্যম্ভাবী । ব্যস্ত কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে ভালো কিছু করার সুযোগ পাব আশাকরি । মাথা খাটিয়ে কিছু হালকা কাজকর্ম করতে ভালোই লাগবে । অনেক বই পড়া হয়নি আমার, রবীন্দ্রনাথও পড়িনি সেভাবে – ভালো কিছু সাহিত্য পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি । নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে গানও শোনা হয়নি তেমন, মন ভালো করে দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীতই যথেষ্ট । আশা করব লেখালিখির জন্য সময়টা আরও একটু বেশী পাওয়া যাবে – ভ্রমণ না করলে তো ভ্রমণকাহিনী লেখা যাবেনা, তাই অন্য ধরণের লেখা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে একটু-আধটু । আর একটা জিনিস বেশ সিরিয়াসলি শুরু করতে চাই, ইন্টারনেট থেকে রেসিপি খুঁজে দেশ-বিদেশের পদ রান্না, অপরের জন্য রান্না করতে আমার অবশ্য বেশ ভালোই লাগে ।

সবচেয়ে বড় কথা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিটা আমার বজায় থাকে যেন, মনোভাব থাকে অসূয়া মুক্ত… পরমপিতার কাছে প্রার্থনা জানাই সবার কাছে যেন অপ্রয়োজনীয় না হয়ে যাই…

(December 13, 2017)Photo from Office Window

পরিতোষের পৃথিবী

পরিতোষবাবু একা মানুষ, প্রায় নিজেকে নিয়েই থাকেন তিনি । ডালহাউসি পাড়ায় এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হেড অফিসে তিনি বছর দুই আগে তাঁর সেকশানের বড়বাবু হয়েছেন, রিটায়ারমেন্টের আগে এটাই অবশ্য শেষ প্রমোশন – তা মাইনেপত্র, বোনাস এসব মিলিয়ে উপার্জন তাঁর একার জন্য যথেষ্ট । বাহুল্যবর্জিত তাঁর জীবন, শাক চচ্চড়ি আর মাছের ঝোল-ভাতেই পরিতৃপ্ত পরিতোষবাবু, তবে সপ্তাহান্তে পেগ দুয়েক হুইস্কি তাঁর গতানুগতিক জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে যেন ! তাঁর আর এক বিলাসিতা মাসের প্রথমে বাড়ি ফেরার সময় রাসবিহারীর মোড়ের মিষ্টির দোকানে এক ভাঁড় রাবড়ি সেবন । এই পঞ্চান্ন বছর বয়স অবধি কোনওদিন রেসের মাঠমুখো হননি তিনি আর নারীসঙ্গের অভাবটাও বিশেষ বোধ হয়নি তাঁর । এমনকি কম্প্যাশনেট গ্রাউন্ডে তাঁরই সেকশানে চাকরি নিয়ে আসা বছর পঁয়তাল্লিশের বিধবা ইলা চক্রবর্তী তাঁর প্রতি ছায়াঘন চোখে তাকালেও পরিতোষবাবু বেশ উচিত গাম্ভীর্যের সঙ্গেই মোকাবিলা করেছেন পরিস্থিতির সঙ্গে । তবে কিনা অফিসের ছেলে-ছোকরার দল আড়ালে তাঁকে কিপটে বলে নিন্দে করে । বলে ইলাদি শত চেষ্টা করেও সফল হবেনা, পরিতোষবাবু মোটেই টলবেননা, পা হড়কালে অনেক খরচা হয়ে যাবে যে !

যে যাই বলুক পরিতোষবাবু মোটামুটি সুখী পুরুষ – রামনগর হাইস্কুল তারপর কাঁথি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেছিলেন পরিতোষ, তাঁর স্কুল-কলেজের বন্ধু-বান্ধব সব গ্রামাঞ্চলেই থেকে গেছে আর কলকাতা শহরে বিশ্বাস করে নতুন বন্ধু করে উঠতে পারেননি তিনি । তাতে কিছু যায় আসেনা তাঁর, একার পৃথিবীটা প্রতিদিনই এক অচেনা রূপ খুলে ধরে তাঁর সামনে – সন্ধ্যায় টিভিতে ডিসকভারি ও ট্র্যাভেল চ্যানেল, ছুটিছাটার দিনে গড়িয়াহাটের মোড় থেকে কিনে আনা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের পুরানো সংখ্যা আর সাত সকালে খুঁটিয়ে আনন্দবাজার পড়া, এসব খুচরো আনন্দ নিয়ে ভালোই দিন কেটে যায় পরিতোষবাবুর ।

তবে সঙ্গী তাঁর আছে বটে একজন – অনেক দিনের বিশ্বস্ত পবন, পরিতোষবাবুর সঙ্গেই থাকে সে; আদতে বালেশ্বরের লোক, তারও গ্রামদেশে কেউ আর বেঁচে নেই । পরিতোষবাবুই এখন তার ধ্যানজ্ঞান, সর্বক্ষণই তাঁকে আগলে রাখে সে । বহুবছরের সান্নিধ্যের ফলে মনিব-নফরের সম্পর্কটা বেশ একটা অম্লমধুর কাকা-ভাইপো মার্কা সম্পর্কে দাঁড়িয়েছে যেখানে ভাইপোই যেন অভিভাবক আর কাকাবাবুও নিজের মনে হেসে মেনে নেন এ উল্টোপুরাণ !

রবিবার দিনটা নিজেকে কেমন রাজা রাজা মনে হয় পরিতোষবাবুর – শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর নিয়মমাফিক হুইস্কিপান; রবিবার একটু দেরী করে ঘুম থেকে উঠে লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে প্রাতরাশ তারপর হাতে দু’টো থলি ঝুলিয়ে বাজারে বেরোন পরিতোষবাবু, সারা সপ্তাহের বাজারটা সেরে ফেলেন একদিনেই । আনন্দবাজারটা আদ্যন্ত পড়ে বেলা সাড়ে বারোটা বাজলে পবনের তাড়াতে বাথরুমে ঢোকেন তিনি । একটা নাগাদ পবন তাঁর খাবার থালা সাজিয়ে দেয় – বিশেষ কিছুই নয়, সাধারণ লাউছেঁচকি কিংবা শুক্তো আর গুলে মাছের ঝাল পবনের হাতের গুণে অসামান্য হয়ে দাঁড়ায় । এরপর এক অতি সুখ উদ্রেককারী ঘন্টা দু’য়েকের দিবানিদ্রা !

বছরদশেক আগে চেতলায় সাকুল্যে আড়াই কামরার এই একতলা বাড়িটা সস্তায় ভাড়া পেয়ে যান পরিতোষবাবু – মাঝারি সাইজের একটা শোবার ঘর, পবনের একটা ছোট ঘর, বেশ বড় বসার ঘর ও রান্নাঘর, বাথরুম নিয়ে বাড়িটা পরিতোষবাবুর বিশেষ পছন্দ, পাশেই একটা কর্পোরেশনের মাঠ, আর মাঠ পেরিয়ে বাচ্চাদের এক স্কুল, তা সে স্কুল বসে সকালে ঘন্টা চারেকের জন্য । প্রতিবেশীদের বাড়ি দূরে দূরে, তাই নেই কোনও প্রতিবেশীর গায়ে পড়া ঔৎসুক্য । গড়ে ওঠে নিরালায় পরিতোষবাবু ও পবনের একান্ত পৃথিবী…

গত রবিবার বিকেলে গড়িয়াহাটের মোড়ে একটা পুরানো ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে চোখটা আটকে গেল পরিতোষবাবুর, ‘Mystery of the Universe’ । দরদাম করে পঞ্চাশ টাকায় ম্যাগাজিনটা কিনেও ফেললেন তিনি । বাড়ি পৌঁছে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে গোগ্রাসে যেন গিলতে থাকেন  লেখাগুলি – পরিতোষবাবুর চোখের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য ! এতদিন তাঁর জ্ঞান সীমিত ছিল আমাদের নবগ্রহে, তার বাইরে ব্রহ্মাণ্ডের অনেক কিছুই ছিল তাঁর অজানা । পরিতোষবাবু পড়লেন গ্রহ, তাদের উপগ্রহ, তারকা সমূহ নিয়ে কয়েক যোজন লক্ষ মাইল জুড়ে আমাদের এই আকাশগঙ্গা (Galaxy) যার নাম ছায়াপথ বা Milky Way – এরকম  অসংখ্য আকাশগঙ্গা রয়েছে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে, প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে যার সৃষ্টির ব্যাখ্যা করেছে বিজ্ঞান ‘Big Bang’ থিয়োরির মাধ্যমে । ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে পেরোতে হবে প্রায় ৫০,০০০ কোটি আলোকবর্ষের পথ (তাঁর মনে পড়ে গেল স্কুলের বিজ্ঞান বইতে পড়েছিলেন যে আলো এক সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল পথ অতিক্রম করে) । ব্রহ্মাণ্ডের এই অসীম ব্যাপ্তির কথা জেনে হতবাক হয়ে গেলেন পরিতোষবাবু, বিপুলা এ বিশ্বের পরিধির কাছে নিজেকে বড়ই তুচ্ছ বলে মনে হতে লাগলো তাঁর । ছাদে উঠে বেশ কিছুক্ষণ ধরে একমনে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি; গ্রহাদি ও নক্ষত্র মন্ডলকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন এই পরিণত বয়সে ।

সোমবার অফিস থেকে ফেরার পথে একটা অদ্ভুত কাজ করে ফেললেন পরিতোষবাবু – পার্ক স্ট্রীটে এক অ্যান্টিক ও কিউরিও’র দোকানে গিয়ে একটা টেলিস্কোপ দেখতে চাইলেন তিনি । দোকানের মালিক মিঃ লালওয়ানি জানালে তার কাছে ৪” ব্যাস ও ৭৫ গুণ ম্যাগনিফিকেশন সম্পন্ন পেতলের একটি টেলিস্কোপ আছে, সেটি ব্যবহৃত হত কোনও এক জাহাজে, গুজরাতে পুরানো জাহাজটি ভাঙা হ’লে বহু হাত ঘুরে টেলিস্কোপটি পৌঁছয় তার দোকানে । জীবনে প্রথম শখ করে কড়কড়ে ৫,০০০ টাকা খরচ করে টেলিস্কোপটা দুম করে কিনেই ফেললেন পরিতোষবাবু । ট্যাক্সি চেপে বাড়ি ফিরে সটান ছাদে উঠে ট্রাইপডে টেলিস্কোপটি বসিয়ে তাতে চোখ লাগিয়ে তিনি তাজ্জব – একি শনির বলয় একেবারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আর বৃহস্পতির চারধারে মেঘের আবরণ ! শুরু হল পরিতোষবাবুর নতুন প্রেম জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে…

রোজই  অফিস থেকে ফিরে এসে ছাদে চলে যান পরিতোষবাবু, সাতটা থেকে রাত সাড়ে ন’টা অবধি টেলিস্কোপে মহাকাশ পরিদর্শন করেন তিনি; গ্রহ-তারা জগতের নেশায় বুঁদ হয়ে যান যেন, অতঃপর পবনের চেঁচামেচিতে নীচে নামতে বাধ্য হ’ন খাওয়াদাওয়া সারতে । টেলিস্কোপে রাতের আকাশ চষে ফেলার পাশাপাশি পরিতোষবাবু পড়তে শুরু করলেন মহাকাশ জগত সম্বন্ধে । বেশ কিছু বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের বই কিনে ফেললেন তিনি, জানতে পারলেন Unidentified Flying Object বা ইউএফও’র কথা । ১৯৪৭ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে পৃথিবীর নানা জায়গায় দেখা গেছে ইউএফও – বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা, জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স ও সুইডেন সরকার এবং তাদের সামরিক বিভাগ অনেক অনুসন্ধান চালিয়েছে ইউএফও নিয়ে । অনেক রিপোর্টই জনসমক্ষে আসেনি, কিন্তু কেউই জোর গলায় ইউএফও’র সম্ভবনা উড়িয়েও দিতে পারে নি ।  ব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও প্রাণীর অস্তিত্ব আছে কিনা এ নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে দ্বিমত, অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন মানুষের চেয়েও মেধায় উৎকৃষ্ট প্রাণী আছে হয়ত দূরদূরান্তের কোনও গ্রহে । মহাকাশ থেকে ভেসে আসা কিছু অদ্ভুত সিগন্যাল এই থিয়োরিকে সমর্থন যোগায় । চীনদেশে ৫০০ মিটার ব্যাসের এক বিশালাকায় রেডিও টেলিস্কোপ বসানো হয়েছে ভিন্ন গ্রহের প্রাণীদের পাঠানো সিগন্যাল রেকর্ড করে অনুধাবন করার জন্য – মানুষের চেয়ে উন্নত মেধার প্রাণীদের খোঁজে সারা বিশ্ব খুবই তৎপর ।

শনিবার সন্ধ্যায় ঘন্টা তিনেক ধরে টেলিস্কোপে পূর্ণিমার চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে নীচে নামলেন পরিতোষবাবু, তারপর তাঁর নিয়মমাফিক সন্ধ্যাহ্নিক দুই পেগ হুইস্কি দু পিস মাছভাজা দিয়ে ।  সেদিন রাতের মেনুতে পাটশাক দিয়ে ডাল, আলু-ফুলকপির ডালনা ও কাজলি মাছের ঝাল – আহা ! মনে মনে পবনের জয়জয়কার করলেন পরিতোষবাবু । মহাকাশ নিয়ে লেখা একটা নতুন সায়েন্স ফিকশনের বই নিয়ে আরামকেদারায় বসলেন তিনি, Inter-galactic Travel-এর টান টান উত্তেজনার কাহিনী । প্রথম দু’টো পরিচ্ছেদ শেষ করতেই দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত বারোটা বাজল, ফাঁকা জায়গা, চারদিক বেশ নিঝুম; বইটা রেখে দিয়ে ঘরের আলোটা নিভিয়ে শুতে যাবেন পরিতোষবাবু – ওমা, এ কি কান্ড !  বাইরে থেকে এক তীব্র সার্চ লাইটের আলো তাঁর ঘরের মধ্যে ঘুরতে লাগলো ।  পরিতোষবাবু জানালায় গিয়ে দাঁড়ালেন – দেখলেন এক বিরাট গোলাকৃতি বস্তু ওই জোরালো আলো ফেলে ধীরে ধীরে নেমে আসছে পাশের মাঠে । সত্যি সত্যি ইউএফও দেখছেন নাকি পরিতোষবাবু ? ব্যাপারটা একটু ভালো করে বুঝতে পবনকে না ডেকে খুব সন্তর্পণে বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন তিনি ।

এক রূপোলী ধাতব গোলক, ব্যাস তার কমপক্ষে ১২ ফিট – মাটির কাছাকাছি আসতেই গোলকের নীচ থেকে তিনটে পায়া বেরিয়ে এল, সে পায়ায় ভর দিয়ে গোলক মাঠে দাঁড়ালো আর তার সামনের এক প্যানেল খুলে গেল নিঃশব্দে ।  কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনটি অদ্ভুত চেহারার জীব গোলকটি থেকে লাফিয়ে নেমে এল আর তাঁকে দেখতে পেয়েই তাঁর দিকে এগোল । কিম্ভুত ওই জীবগুলির দেহ বলতে এক চকচকে ধাতব বাক্স আর বাক্সের নীচে তিনটে পা নিয়ে বেশ জোরেই হেঁটে আসছে তারা । হাতের জায়গায় দু’টো স্প্রিং-এর মত জিনিস ঝুলছে; মুখ, চোখ, নাক, কান নেই কিছুই – বাক্সের ওপরের দিকে লাল, নীল, বেগুনী সব আলো জ্বলে উঠছে । পরিতোষবাবুর তো চোখ যাকে বলে ছানাবড়া !

তিনজনের মধ্যে লীডার গোছের একজন এগিয়ে এসে পরিতোষবাবুকে উদ্দ্যেশ্য করে কিছু অদ্ভুত আওয়াজ করলো, তিনি পরিস্কার বুঝতে পারলেন সে কি বলছে – ওদের ভাষায় কথা বললে কি হবে, সে কথা তাৎক্ষণিক বাংলায় তর্জমা হয়ে যাচ্ছে ! এ যে মানুষের চেয়ে প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে । পরিতোষবাবু শুনলেন, ‘কি হে, ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না? আমরা কিন্তু সত্যিই বহুদূর থেকে আসছি, আমাদের গ্রহটা পৃথিবী থেকে ৫০০ আলোকবর্ষ দূরে । অবশ্য আমাদের এখানে আসতে সময় লেগেছে তোমাদের হিসেবে মাত্র ১৫ দিন । দেখবে নাকি আমরা কোথা থেকে এসেছি?’ এই বলে সে স্প্রিং হাতটি তার বুকের কাছে ছোঁয়ালে আর তার বুকে ফুটে উঠলো টেলিভিশনের মত সব ছবি । পরিতোষবাবু দেখলেন মরুভূমির মত এক দেশ, শ্যামলিমার ছিটেফোঁটা নেই কোথাও, ঝাঁ চকচকে সব বিশালাকায় বাড়ি, চওড়া রাস্তা – সেসব রাস্তা দিয়ে ছোট-বড় অনেক ধাতব গোলক দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে রাস্তার একটু ওপরে শূন্যে ভাসতে ভাসতে । আরও দেখলেন নানা ল্যাবরেটরিতে ঐসব তিনপেয়ে বাক্সধারী জীব কাজ করছে অত্যন্ত উন্নত সব প্রযুক্তি নিয়ে ! ছবি দেখানো বন্ধ করে দিয়ে তিনপেয়ে লীডার বললো, ‘চলো, তোমাকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাই, আমাদের রাজা খুব খুশী হবে তোমার মত এরকম অদ্ভুত জীব দেখলে’। পরিতোষবাবু সভয়ে বলে ঊঠলেন, ‘আরে, না না, আমি এই পৃথিবীতেই খুব ভালো আছি, এই বয়সে নতুন কোথাও গিয়ে কাজ নেই আমার’ ।  লীডার বলে, ‘নিজের ইচ্ছেয় না গেলে, আমাদের জোর করতে হবে’ । সঙ্গে সঙ্গে তার দুই শাগরেদ চারটে স্প্রিং-এর হাত দিয়ে সাড়াঁশীর মত চেপে ধরলে পরিতোষবাবুকে, তিনি পবন, পবন বলে সজোরে চিৎকার করে উঠলেন !

বেলা প্রায় আটটা, বাইরে চড়া রোদ্দুর – পবন পরিতোষবাবুকে জোরে নাড়া দিয়ে বলছে, ‘কতদিন বলেছি ঐসব ছাইপাঁশ গিলবেননি, তা আমার কথা শুনবে কেন ? কি দুঃস্বপ্ন দেখছিলে, এরকম গোঁ গোঁ করে চেঁচাচ্ছো’?

 

 

A Moment of Pride…

Way back in 1993 I was driving my first car, a second hand Premier Padmini, always known as Fiat in Delhi’s parlance. Like its many cousins, my car also demanded routine servicing for its upkeep apart from frequent trips to the mechanic for some repair or the other. On a Friday morning, I took the car to Byford, an authorized service centre for Fiat near my office and dumped it with them for a regular service.

Byford while taking up routine service would change the components, whatever deemed necessary by them without seeking any consent from the owner. Around 5.30 pm I went to collect my car and the total bill raised for the works was Rs.480/- or so, which included replacement of a few minor components. I was carrying about Rs.300/-, which was sufficient for a routine service those days. Those primitive (!) days without credit cards or ATMs, being cashless would consign one to utter penury! It was after the bank business hours and I was at a complete loss for failing to meet the magic figure. I had promised a trip to Sarojini Nagar on Saturday morning for shopping to my dear wife and mom-in-law, who was visiting us then… I was aghast with Byford and its smart practices!

The accounts clerk told me, ‘Please meet our Director-Finance, only he can bail you out of this’. I ambled across to the room of Director-Finance with a lot of trepidation – I discovered an elderly bespectacled and elegantly dressed Punjabi gentleman in his seventies poring over some papers. I narrated my predicament with all sincerity and as I had stopped for catching my breath, I heard, ‘What did you say your name? Is it Mr Biswas? How can I not trust one who is called Biswas?’ That was a common joke in North India in my conjecture. But he continued, ‘You were not even born those days young man, I was a student of DAV College, Lahore. And Professor Biswas taught us English literature…I would never forget the lessons of Shakespeare by him. He was the best teacher I have ever had in my life! So anything for Mr Biswas…please take your car and whenever you feel comfortable, come back and make the payment.’ With these words, he happily signed on my bill allowing deferred payment!

So much love for a teacher! A rare moment to titillate my Bengali ego…thanks to my scholarly namesake, my family could enjoy the weekend outing as promised to them. And it goes without saying that as Byford had opened its shutters next Monday morning, I promptly paid the balance amount.

[Based on a true incident]