পথ চলতি…

দেখতে দেখতে নিবেদিতা কুঞ্জের সরকারি বাড়িতে আমাদের পনেরোটা বছর কেটে গেল – ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বাড়িটায় চলে আসি আমরা, আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়ি ছেড়ে । আনকোরা নতুন আটতলা বাড়ি, আমাদের ফ্ল্যাটটা পাঁচ তলায় – আমি প্রথম allotment পেয়েছি, নিবেদিতা কুঞ্জে সব বাড়ি তৈরি শেষ হয়নি তখনও । হিসেব করে দেখলে, এই বাড়িটায় জীবনে সবচেয়ে বেশী সময় থেকেছি এ পর্যন্ত ।

আমার জন্মের পর থেকে প্রায় প্রথম ছ’বছর ছিলাম আমাদের পুরানো পৈতৃক বাড়ি শ্যামবাজারে ভূপেন বোস অ্যাভিনিউতে । বাবার রেলের চাকরি – ১৯৬৩ সালে বাবা ট্রান্সফার হ’লেন খড়্গপুরে; আমি ও মা খড়্গপুরে এলাম ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে – তালেগোলে স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়াই হ’লনা আমার, বাড়িতেই মা’র কাছে পড়েছি ক্লাস ওয়ানের পাঠ । বাবা প্রথমে কোয়াটার্স পেয়েছিলেন ট্র্যাফিক সেটেলমেন্ট নামে এক পাড়ায়, সে বাড়িটা আমাদের কারোরই পছন্দ হ’য়নি একটুও – মাস তিনেক সেখানে থাকার পর আমরা চলে আসি ডেভেলাপমেন্ট কলোনীতে ৫৮৬ নম্বরে । সবই ঠিক ছিল বাড়িটায়, কিন্তু বাড়িতে রোদ্দুর ঢুকতো না একদম আর বাগান করারও জায়গা ছিল না বিশেষ । পাড়াটা মা-বাবার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল, প্রতিবেশী কাকিমা-মাসীমা’রা মায়ের বেশ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ।

বছরখানেকের মধ্যেই ঠিক উল্টো দিকে ৫৯৪ নম্বর বাড়িটায় চলে যাই আমরা, সেখানে কাঁটাতার ঘেরা বিরাট বাগান – মা অদম্য উৎসাহে বাগান করতে লেগে গেলেন । অচিরেই অনেক দোপাটি, অপরাজিতা ও গাঁদা ফুলে বাগান ভরে উঠলো – এছাড়াও ছিল শীতকালের মরশুমী ফুল । মায়ের লাগানো হাস্নুহানা গাছটা গরম কালের সন্ধ্যায় তার ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে বাতাস ভারী করে দিত যেন । বাগানের পেছন দিকটায় একটা বেশ ঝাঁকড়া কাঁঠাল গাছ ছিল আর তাতে ফল ধরত প্রচুর । নিজেদের খাওয়ার কথাতো বাদই দিলাম, প্রতিবেশীদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে এঁচোড় দিয়ে আসতাম আমি । বাড়িটার পেছনে একটা বিরাট সিমেন্ট বাঁধানো খোলা উঠোন আর সেই উঠোন পেরিয়ে পাঁচিলের গায়ে কলতলা । এ বাড়ি থেকেই ১৯৬৪ সালের গোড়ায় সাঊথ সাইড প্রাইমারী স্কুলে সরাসরি ক্লাস টু’তে ভর্তি হই আমি । আর সে বছরই দুর্গাপূজোর সময় লক্ষ্ণৌ বেড়াতে গিয়ে আমার ডান হাতটি ভাঙে – তার ফলে আমি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বসতেই পারিনি । হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফোর্থ হয়েছিলাম বলে ক্লাস থ্রি-তে প্রমোশন দিয়েছিল স্কুল, আর ‘Good Conduct’-এর একটা প্রাইজও দিয়েছিল । এই বাড়িতেই ১৯৬৯ সালে বাবা ম্যালিগন্যান্ট মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন । সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনও গা শিউরে উঠে কেমন যেন !

১৯৬৯ সালে জানুয়ারী মাসের এক সকালে আমরা কুঁচো-কাঁচারা খবর পেলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যাবেন আমাদের পাড়ার পাশের রাস্তা দিয়ে – প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছিলেন আই আই টি-তে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস উদ্বোধন করতে । খোলা জীপে করে আসছেন ইন্দিরা গান্ধী, আমরা জনা দশ-বারো বাগান থেকে ফুল তুলে ছোট ছোট তোড়া বানিয়ে তাঁর পথ আটকেছি । প্রধানমন্ত্রী সস্নেহে হাসিমুখে আমাদের হাত থেকে ফুল গ্রহণ করেন, করজোড়ে নমস্কার জানান আমাদের ! একজন পুলিসও এসে বকুনি দেয়নি আমাদের, হাসতে হাসতেই সরে গিয়েছি আমরা রাস্তা থেকে । একথা এখন একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হয়…

১৯৭০ সালের মাঝামাঝি আমরা চলে গেলাম খড়্গপুরের সাউথ সাইডে, ২২৫/ইউনিট-২ নম্বর বাড়িতে । এ বাড়িটা একটু বড় আর পাড়াটা বেশী অভিজাত ! অনতিদূরেই আমাদের রেলওয়ে স্কুল – সেটাই এই বাড়িতে যাওয়ার মূল কারণ যদিও । ডেভেলাপমেন্ট পাড়াটা ছাড়তে পেরে আমি যার পর নাই খুশী, আমার অসন্তোষের প্রধান কারণ পাড়ার ছেলে-ছোকরার দল –আমাদের কিছুটা সিনিয়ার হাতেগোনা দু’এক জনকে বাদ দিলে, সবাই লেখাপড়ায় একেবারে রদ্দিমার্কা, তার সঙ্গে নানারকম শয়তানি বুদ্ধি, নিজেদের মধ্যে মারপিট, যথেচ্য নোংরা ভাষার ব্যবহার – ভবিষ্যতের পথ ঝরঝরে করার সব উপাদানই মজুদ তাদের । ছেলেবেলায় ঐ রকম বুনিয়াদ নিয়ে তারা কে কোথায় সব হারিয়ে গেছে ।

নতুনপাড়ায় বন্ধুরা অন্যরকম, দুষ্টুমিতে কেউ কম যায়না তারসঙ্গে নিয়ম করে খেলাধূলো, গল্পের বইয়ের আদানপ্রদান কিন্তু লেখাপড়ায় সবাই সিরিয়াস, প্রায় সবার মধ্যেই জীবনে কিছু একটা করার বা হওয়ার অদম্য ইচ্ছে – নতুন পাড়ায় এসে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন ! ১৯৭৪ সালে ঐ বাড়ি থেকেই আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে আই আই টি’তে ভর্তি হই । আর ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি বাবা খড়্গপুর ছেড়ে কলকাতা চলে যান ট্রান্সফার হ’য়ে । ইঞ্জিনীরিয়ারিং পাশ করে, এম-টেক করে আমি খড়্গপুর ছাড়লাম ১৯৮১ সালে । এরপর দিল্লী থেকে খড়্গপুর আই আই টি’তে সরকারি কাজে গিয়েছি বহুবার, সপরিবারে গিয়েছি আই আই টি’র পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আর স্কুলের বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে বছর দু’য়েক আগে আমাদের ছোটখাটো গেট টুগেদারে… খড়্গপুর আমার প্রাণের শহর, আমার বাল্যের ও কৈশোরের অতি সুখস্মৃতি বিজড়িত রেলশহর, সে শহর আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে নিজের হাতে, সে শহরে বড় হয়ে গিয়েছি দুনিয়ার কোণে কোণে – খড়্গপুর থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি, কিন্তু খড়্গপুর রয়ে গেছে আমার মনের মণিকোঠায় । খড়্গপুরের কথা মনে পড়লেই গলায় উঠে আসে একটা ডেলা, ঝাপসা হয়ে আসে দুই চোখ !

১৯৭৭ সালে বাঙ্গুর এভিনিউতে একটা ছোট্ট বাড়ি করে বাবা-মা শ্যামবাজারের পুরানো বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন । ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে আমি যখন কলকাতায় চাকরি নিয়ে গিয়েছি, বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেছেন নাগপুরে । ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে আমিও কলকাতা ছাড়লাম ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইডে চাকরি নিয়ে । এরপর আমি ও বাবা দু’জনেই ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় ফিরে এলাম ১৯৮৩ সালের অগাস্ট মাসে । ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে বাবা রিটায়ার করলেন আর আমাদের বাঙ্গুরের বাড়ির দোতলা তৈরি হ’ল । ঐ বাড়ি থেকেই আমার বিয়ে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে । প্রায় সাত বছর চেষ্টার পর কলকাতায় ভালো কেরিয়ারের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে অবশেষে ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে আমাদের দিল্লী আগমন ।

প্রথমে কিছুদিন ভাড়াবাড়ি, তারপর Scientists’ Hostel – এরই মধ্যে আমাদের কন্যা তিন্নীর জন্ম ১৯৯২’র জানুয়ারিতে । ১৯৯৪ সালে পাওয়া গেল আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়িটা, একদমই পছন্দ হয়নি বাড়িটা আমাদের কারোরই, কিন্তু ‘out of turn’ allotment, প্রত্যাখান করা যাবে না। সে বাড়িতে থাকাকালীন আমাদের পুত্র তানের জন্ম ১৯৯৪’র অগাস্টে । সেখানে কেটে গেল আটটা বছর, দু’টো প্রমোশনের গন্ডী পেরিয়েছি আমি ততদিনে । ২০০২ সালে অগাস্ট মাসের শেষে পাওয়া গেল নিবেদিতা কুঞ্জের allotment – এ বাড়িতে এসে আমরা সবাই খুব খুশী । তিনটে ভালো সাইজের বেডরুম, আরও একটা বেশ বড় study আর ড্রইংরুমটা পেল্লায়, সঙ্গে servant’s quarters ও একতলায় ঢাকা গ্যারেজ । বাবা-মা আমাদের সঙ্গে দিল্লীতে পাকাপাকি ভাবে থাকেন ১৯৯২ সাল থেকেই – আমাদের ছ’জনের জন্য এ বাড়িতে অঢেল জায়গা । আর সবচেয়ে আকর্ষক ব্যাপারটা হ’ল বাড়ির ঠিক পেছনেই আমাদের কন্যা ও পুত্রের স্কুল, ডি পি এস-আর কে পুরম; বাড়ি থেকে মিনিট ছয়েকের হাঁটাপথ !

নিবেদিতা কুঞ্জের এই বাড়ি থেকেই তিন্নী ও তানের দশ ও বারো ক্লাসের বোর্ড পরীক্ষা ভালো ভাবে পাশ করে IIIT Delhi-তে ইঞ্জিনীরিয়ারিং পড়তে যাওয়া । এই বাড়িতেই মা’কে হারিয়েছি ২০১৩ সালের অগাস্ট মাসে, আশ্চর্যজনক ভাবে তার কিছুদিন পরেই বাবাও চলে গেলেন ২০১৪ সালের মার্চে – আমাদের বাড়ির লোকসংখ্যা ছয় থেকে কমে চারে দাঁড়ালো । অগাস্ট ২০১৪-তে তিন্নী উচ্চশিক্ষার্থে পাড়ি দিল সুদূর কানাডা, বাকি রইলাম আমরা তিনজন । ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তান বি-টেক পাশ করে চাকরি নিয়ে চলে গেল হায়দ্রাবাদ – আমরা দু’জন ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’! এরপর এল বড় ধাক্কা – এ’বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বুলবুল ট্রান্সফার হয়ে গেল মুম্বাই । ‘হারাধনের একটি ছেলে কাঁদে ভেউ ভেউ’…

নিবেদিতা কুঞ্জের বাড়ি’র সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, বারান্দায় দাঁড়ালে খোলা আকাশ ও সবুজ গাছগাছালির ছড়াছড়ি । আমাদের পূব-পশ্চিমের বাড়ি, তাই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি প্রতিদিন । সন্ধ্যায় সূর্যটা যখন স্থানীয় দুর্গামন্দিরের চূড়োর পিছনে মুখ লুকোয়, আকাশটাকে রাঙিয়ে দেয় কম করে তিন রকমের লাল রঙ, একটা এরোপ্লেন ধীরে এগিয়ে যায় ডুবে যাওয়া সূর্যের পথ ধরে এয়ারপোর্টের দিকে । প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে পাতা ঝরে যাওয়া ন্যাড়া শিমুল গাছটা একদিন লেলিহান আগুনশিখার মত ফুলে ফুলে লাল হয়ে ওঠে । আর দেওয়ালির রাতে একের পর এক আতসবাজীর আলো আকাশের সব কালিমা মুছে দেয় যেন । সকালে একঝাঁক টিয়া পাখি কর্কশ চিৎকার করে বারান্দার খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়, পায়রাগুলো বকবকম শব্দ করে ঘাড় উঁচিয়ে এগিয়ে আসে বাজরার দানার লোভে ।

নিবেদিতা কুঞ্জে আমার দিন সীমিত – অবসর গ্রহণের দিন এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, ছেড়ে দিতে হ’বে সরকারি এ আবাসন, খুঁজে নিতে হ’বে নতুন কোনও ঠিকানা !

Advertisements

নিজের কথা…

আমাদের ছোটবেলাটা কেটেছে একটু অন্যরকম ভাবে…খড়্গপুর রেলওয়ে টাউনশিপে ছিল বাবার কোয়াটার্স, আমাদের পাড়ায় সবাই সবাইকে মোটামুটি চিনত আর একটা সামাজিক শাসনের গন্ডী ছিল । বাবা-মায়ের বন্ধুস্থানীয়দের আমরা রীতিমত সমীহ করে চলতাম তখন । ওই সময়ে খড়্গপুরে ভালো স্কুল ছিল দু’টি – আমাদের রেলওয়ে বয়েজ স্কুল আর আই আই টি ক্যাম্পাসে হিজলি হাইস্কুল – দুটোই বাংলা ও হিন্দী মিডিয়াম স্কুল, তবে ক্লাস নাইন থেকে ইংরাজিতে সায়েন্স পড়ানো হ’ত । মিক্সড হায়ার সেকেন্ডারী নামে একটা ইংরাজি মিডিয়াম স্কুল ছিল বটে, আমরা বলতাম ট্যাঁশ স্কুল – অবাঙালি ছাত্র-ছাত্রী ও বেশ কিছু বখাটে গোছের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছেলে-মেয়ে সেখানে পড়তে যেত । আর ছিল রেলওয়ে গার্লস স্কুল, আমাদের অনেক বন্ধুদের দিদি ও বোনেরা পড়ত সেখানে । আমাদের স্কুলের তখন ডাকসাইটে রেজাল্ট – প্রতিবছর আই আই টি, যাদবপুর ও শিবপুর মিলিয়ে জনা দশেক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কমকরে আরও পাঁচজন ডাক্তারি পড়তে যেত !

আমাদের দুষ্টুমি সীমাবদ্ধ ছিল স্কুল ও খেলার মাঠের মধ্যেই – আমরা তথাকথিত ভালো ছেলে ছিলাম, মানে স্কুলে ভালো রেজাল্ট করতাম আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলত আমাদের দস্যিপনা – বাংলা টিচারকে উত্যক্ত করা, বিশেষ কোনও সহপাঠির পেছনে লাগা – এসবে আমরা ছিলাম সিদ্ধহস্ত ! প্রতিবছর গরমকালে ব্রাইটনের মাঠে ঘন্টা দেড়েক ফুটবল পেটানো আর শীতকালে মাঠে দড়ি ধরে কোর্ট কেটে ব্যডমিন্টন খেলা কিংবা ক্রিকেট – এছাড়াও গরমের ছুটিতে এক বন্ধুর বাড়ি সকাল এগারোটা থেকে বসত ক্যারাম খেলার আসর, কোনও দিন বিকেলে সাতঘুঁটি সাজিয়ে বল ছুঁড়ে ঘুঁটি ফেলে দেওয়ার চেষ্টা, এসবই আমাদের ব্যস্ত রাখত । কিন্তু স্কুলের শেষ ধাপে এসেও কোনও কিশোরীর প্রতি আসক্তি বা তার প্রকাশ ছিল আমাদের ভব্যতার বাইরে – ঐ যে বললাম রেলওয়ে গার্লস স্কুলে পড়া বন্ধুদের দিদি ও বোনেদের চোখে তাহলে আমরা ‘খারাপ ছেলে’ হয়ে যাবো যে ! খারাপ ছেলের তকমাটা যেন গায়ে না লেগে যায়, এ ব্যাপারে আমরা ছিলাম খুব সচেষ্ট।

আমাদের ছোটবেলায় রাখী’র এত রমরমা ছিলনা, তবে ভাইফোঁটা হ’ত বেশ ঘটা করেই…আমার নিজের কোনও ভাই-বোন নেই, কিন্তু তাইবলে ভাইফোঁটা আমার বাদ যেত না । ডাক পড়ত অন্তত দু-তিন জন বন্ধু’র বাড়ি থেকে, ফোঁটা দিতেন তাদের দিদিরা আর খাওয়া-দাওয়াটা ভালোই হ’ত বেশ । এইসব পাড়াতুতো দিদিরা আমাদের থেকে দু’তিন বছরের বড় কিন্তু তাদের দিদিসুলভ আচরণ ছিল বেশ সিনিয়র মার্কা !

সেটা বোধহয় জানুয়ারি মাস – সেদিন খবরের কাগজে মার্চ মাসে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার টাইম টেবিল বেরিয়েছে । তিন বছরের সিলেবাসের চাপে আমরা তখন ধুঁকছি – বিকেল পাঁচটা নাগাদ সাইকেল নিয়ে আমি একটু ঘুরতে বেরিয়েছি শুধুই নির্মল হাওয়া সেবনের উদ্দেশ্যে । হঠাৎ এক বন্ধুর দুই দিদির মুখোমুখি – সঙ্গে সঙ্গে ধমক, ‘সৌমিত্র, হায়ার সেকেন্ডারির রুটিন বেরিয়েছে না আজ, আর তুই এখন রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস?’ আমি মুখ নিচু করে গুঁইগাঁই করি, ‘এই বেরিয়েছি সারাদিনের পর, একটু পরেই বাড়ি ফিরে যাব’।

এই স্নেহমিশ্রিত শাসনের কালটা আর নেই – সবচেয়ে বড়কথাটা হ’ল সবাই বেশ আপনজন ভেবেই শাসন করতেন । আর অন্যের সাফল্যে আনন্দে মেতে উঠতেন সবাই, গর্ব করে বলতেন, ‘জানো, আমাদের পাড়ার ছেলে আই আই টিতে চান্স পেয়েছে’ !

স্কুল জীবনের কথা ঘুরে ফিরে আসে মনে, স্কুলে কি কাণ্ডটাই না করেছি আমরা এক সময় – অবশ্যই কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপকর্ম নয়, নিছকই মজার বশে – নব্য কৈশোরের দুর্নিবার উচ্ছ্বাসে ! এখন মনে হয় আমাদের সেদিনের কিছু দুষ্টুমি যে কোনও সুস্থ লোকেরই সহ্যের সীমা ছাড়াত…

ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট অবধি আমাদের স্কুলে ছিল ছ’টি সেকশান, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ – হিন্দী মিডিয়াম আর ‘ডি’, ‘ই’ ও ‘এফ’ ছিল আমাদের বাংলা মিডিয়াম – আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হ’ত ডিসেম্বরের দশ তারিখের মধ্যে । তারপর ২৪শে ডিসেম্বর রেজাল্ট বেরিয়ে আবার স্কুল খুলত ২রা জানুয়ারী, নতুন ক্লাস শুরু হ’ত । ক্লাস নাইনে আমাদের স্কুলের গতানুগতিক জীবনে এল এক পালাবদল – আমাদের stream ভাগ হ’বে; সায়েন্স, কমার্স বা হিউম্যানিটিজ নিয়ে হ’তে হ’বে আমাদের আলাদা । তাই ক্লাস নাইনে উঠে জানুয়ারী মাসে আমাদের আর একটা পরীক্ষা দিতে হ’বে – Stream Test; পরীক্ষা হ’ত দুই বিষয়ে, অঙ্ক ও ইংরাজি । আমার এখনও মনে আছে, ইংরাজিতে আমাদের অনুবাদ করতে দেওয়া হয়েছিল, ‘গোলবাজার গোল নয়’… অঙ্ক ও ইংরাজি উভয় বিষয়েই ভালো করলে ইংরাজি মিডিয়াম সায়েন্স পাওয়া যাবে; শুধু অঙ্কে ভালো করলে, বাংলা মিডিয়াম সায়েন্স; অবশ্য শুধু ইংরাজিতে ভালো করলে কি পাওয়া যেত তা জানিনা ! আমাদের স্কুলে সে সময়ে কমার্স ও হিউম্যানিটিজ পড়তে যেত একেবারে ওঁচার দল, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা কোনও ক্রমে উতরে যাওয়াই ছিল তাদের জীবনে বিরাট চ্যালেঞ্জ ! যাই হোক, সেই স্ট্রীম টেস্ট দিয়ে আমরা জনা তিরিশেক ছাত্র পড়তে গেলাম ইংরাজি মিডিয়াম সায়েন্স – ক্লাস নাইনের ‘জি’ সেকশান ।

নাইন ‘জি’র ক্লাসরুমটা ছিল দোতলায়, একতলায় টিচার্স রুমের ঠিক উপরে । আমাদের ক্লাস টিচার হ’য়ে বাংলা পড়াতে এলেন বসাকবাবু – শীর্ণ চেহারা, পরনে মোটা খদ্দরের ঢিলে পাঞ্জাবি, হ্যান্ডলুমের সরু পাড় আধময়লা খাটো ধুতি, পায়ে চামড়ার বিদ্যাসাগরি চটি, কদমছাঁট কাঁচা-পাকা চুল আর দু’তিন দিনের না কামানো দাড়ি সমেত মুখখানি সদাই বেজার, যেন সারা পৃথিবীর যত সমস্যা তাঁকেই তাড়া করে বেড়াচ্ছে । এরপর ছিল তাঁর কাঠ বাঙাল ভাষা – সব মিলিয়ে একেবারে সোজা কার্টুন থেকে উঠে আসা এক বর্ণময় চরিত্র ! আমাদের এক বছরের সিনিয়ররা বসাকবাবুর ক্লাসে তাদের কি রকম বাঁদরামির আসর বসত, তার পাঠ আমাদের ভালোই পড়িয়েছে । অতএব আমাদের ক্লাসে ভূতের নেত্য শুরু হ’ল শীঘ্রই ।

দিনের প্রথম ক্লাস – বসাকবাবু মাথানিচু করে রেজিস্টারের দিকে তাকিয়ে রোলকল শুরু করেছেন – লাস্ট বেঞ্চে কে একজন আস্তে করে গাইতে শুরু করলে, ‘রে মাম্মা রে মাম্মা… তারপর তিরিশ জনের সমবেত চিৎকার, ‘রে’… সেই শুনে বসাকবাবুর পাল্টা চিৎকার, ‘কে করলে, কে করলে?’ সারা ক্লাস নিশ্চুপ, সবাই ভালো মানুষের মত মুখ করে জুলজুল চোখে দেখছে ! … দেখতে একটু কচি আমাদের সহপাঠি নির্মল ঘোষ নিষ্পাপ হাসিমুখে একটি বিচ্ছু বিশেষ – বসাকবাবু তাকে বললেন, ‘তুই ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাডা পইড়া শোনাদিকি’ । অমনি নির্মল বই খুলে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঁচালির সুরে দুলে দুলে পড়তে লাগলো, ‘শুধু বিঘা দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে’ । সেই সুর শুনে সারা ক্লাসে বিরাট হাসির ছররা – বসাকবাবু দু’হাতে মাথাটা ধরে বসে আছেন । তাঁর একটা পেটেন্টেড্ কথা ছিল, ‘তুরা আমায় মাইরা ফ্যাল’। … আমাদের সময়ে প্রতি মাসে স্কুলফীস নেওয়াটা ছিল ক্লাসটিচারের কাজ – রেলওয়ে স্কুল, ক্লাস নাইনের ফী মাসে সাকুল্যে চার টাকা বাষট্টি পয়সা । ফীস জমা দেওয়ার দিন বসাকবাবু রসিদবই, টাকা, খুচরো পয়সা এসব সামলাচ্ছেন, তাঁর টেবিল ঘিরে বিরাট জটলা, সবাই গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, ‘আমারটা আগে, আমারটা আগে’ – সে এক চরম বিশৃঙ্খলা ! এর মধ্যে একজন খবরের কাগজ পাকিয়ে গাধার টুপি বানিয়েছে, টুপিতে বড় বড় অক্ষরে লিখেছে ‘গাধা’ – সে টুপি ধরে আছে বসাকবাবুর মাথা’র বেশ একটু ওপরে, হঠাৎ আমাদের তিমিরবরণ তার হাতে মারলে এক বিরাট চাপড়, হাত ফস্কে টুপি গিয়ে একেবারে বসাকবাবুর মাথায় – মুহূর্তের মধ্যে ভীড় ফাঁকা – সবাই যে যার জায়গায়, বসাকবাবু গাধার টুপি পরে দু’হাতে মাথা ধরে বসে আছেন আর বলে চলেছেন, ‘তুরা আমায় মাইরা ফ্যাল’! … পূজোর ছুটি শেষ হয়েছে, কালীপূজো-ভাইফোঁটার পর স্কুল খুলেছে – নির্মল পকেটে করে নিয়ে এসেছে একটা চকোলেট বোম আর দেশলাই । বাংলার ক্লাস সবে শুরু হয়েছে – বসাকবাবু রোলকল শুরু করেছেন, লাস্ট বেঞ্চ এর পেছন থেকে প্রচণ্ড আওয়াজ, ক্লাসরুম ধোঁয়াচ্ছন্ন, পোড়া বারুদের গন্ধ – আমাদের স্কুল বাড়ি থরথর করে কেঁপে উঠেছে ! আর তিমির বরণ লাফ দিয়ে উঠে চিল চিৎকার করে বলে, ‘নকশাল, নকশাল ! স্যার পালান, নকশালরা স্কুল অ্যাটাক করেছে!!’ (সেটা ১৯৭১ সাল, পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলন তখন তুঙ্গে, যদিও আমাদের স্কুলে তার কোনও প্রকোপ পড়েনি)। ক্লাসের সবাই হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছে, অন্যান্য ক্লাস থেকে ছুটে এসেছেন টিচাররা, কিছুক্ষণ পর হেডমাস্টার মশাই দৌড়ে এসেছেন বেত হাতে, সবাই খুব উত্তেজিত – হেডস্যারের হুকুম হল প্রত্যেকের পকেট চেক করা হ’বে, দেশলাই-এর খোঁজে । কোথায় দেশলাই, ঐ হাঙ্গামার মধ্যে নির্মল কখন টুক করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে স্কুলের পেছনে নালায় দেশলাই ফেলে দিয়ে এসেছে !

আর একটু পিছিয়ে যাই, আমাদের ক্লাস এইটে ইতিহাস পড়াতেন কুন্ডুবাবু, তাঁর কাজ ছিল ইতিহাসের টেক্সট বই থেকে গড়গড় করে রীডিং পড়ে যাওয়া, ক্লাসের সবাইকে তাঁর পড়ার সঙ্গে বইয়ের পাতায় চোখ রাখতে হ’বে । কুন্ডুবাবু মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ পড়ছেন/পড়াচ্ছেন, আমি ও আশিস দাশগুপ্ত (কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও AIIMS, নিউ দিল্লীর প্রাক্তনী ও বর্তমানে এক নামী শিশু চিকিৎসক) লাস্ট বেঞ্চে বসে ইতিহাসের বইয়ে লুকিয়ে স্বপনকুমারের রুদ্ধশ্বাস ডিটেকটিভ উপন্যাস গোগ্রাসে গিলছি – গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জী ও তার সহকারি রতনলাল চরম বিপদের মুখোমুখি… স্কুল ছুটি হওয়ার আগেই বইটা শেষ করে ফেরত দিতে হবে যে ! আমাদের বইয়ের পাতা ওল্টানো দেখে কুন্ডুবাবুর কেমন একটা সন্দেহ হয়েছে, হঠাৎ হুঙ্কার, ‘কি পড়ছিস রে তোরা দু’জন’? ব্যাস, ইতিহাসের বই থেকে স্বপনকুমারের আত্মপ্রকাশ, আর আমাদের কপালে জোটে বেদম প্রহার !

স্কুল জীবন ছিল আমাদের ঘটনাবহুল, উচ্ছ্বাসভরা প্রাক-যৌবনের দিন ! অনুশাসন একটা ছিল বটে, কিন্তু তা মোটেই কড়া মিলিটারি মেজাজের নয়, একটু ঢিলেঢালা গোছের – তাই সহজেই আমরা খুঁজে নিতাম নিত্যনতুন দুষ্টুমির পথ । এবারের কিছু ঘটনা আমার সহপাঠীদের নিয়ে… অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রয়েছে বা নতুন করে গড়ে উঠেছে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে, আবার অনেকেই হারিয়ে গেছে কালের নিয়মে…

ক্লাস নাইন-জি সেকশানে আমাদের সঙ্গে পড়তে এল এক যমজ ভাই – তাদের দেখতে খুব একটা এক রকম নয়, কিন্তু হাবভাব একেবারে এক – সব ব্যাপারে তাদের গুরুগম্ভীর মন্তব্য আর সব সময়েই এক ধরণের মতামত । সদাই প্রমাণ করার চেষ্টা তারা অন্যদের থেকে একটু বেশী জানে ! তার ওপর তাদের অ্যালবার্ট করা চুলে সামনে সিঙ্গাড়া দাঁড়িয়ে আছে, শার্টে ঝুলে পড়া ‘ডগ-কলার’, আস্তিনে ‘কাফ-লিঙ্ক’, একটু ‘উড়ু-উড়ু’ ভাব… কয়েকদিনের মধ্যেই ক্লাসে বেশ একটা নতুন খোরাক যোগাড় হ’ল, তাদের নামকরণ হ’ল জগাই-মাধাই…

একজন সহপাঠী ক্লাস ফাইভের পর আর বাড়েনি, সাড়ে ৪ ফুট উচ্চতায় সে ছিল আমাদের বিখ্যাত ‘গিড্ডু’ । পড়াশোনায় বেশ ভালো কিন্তু তার হাবভাব টিপিক্যাল ক্লাস মনিটর গোছের – বিধি বহির্ভূত কেউ কিছু করলেই টীচারকে নালিশ, কোনও শিক্ষক প্রশ্ন করলে সব সময়ে হাত তুলে আগেভাগে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা, সব টীচারদের আমড়াগাছি – ব্যাস আর যাবে কোথায়, আমরা চার-পাঁচ জন তার পেছনে লেগে গেলাম…

ক্লাস নাইনে আমরা সবাই ফুলপ্যান্ট পরতে শুরু করেছি, গিড্ডু তখনও হাফপ্যান্ট; কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে সে দাঁড়ালেই পেছন থেকে তিমিরবরণ তার প্যান্টটা টেনে খুলে দেবার চেষ্টা করত ! এছাড়া একটু ভীড়ের মধ্যে তার মাথায় চাঁটি, শার্টের পেছনে পেনের কালি ঝেড়ে দেওয়া – জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল গিড্ডুর, এখন এসব ভাবলে কষ্ট হয় বড়ই । নিছক মজার নেশায় বেশ বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিলাম হয়তো !

আমরা বোধহয় তখন ক্লাস ইলেভেন – আগেভাগে কোনও উত্তর দিতে গিড্ডু দাঁড়িয়েছে, আর ক্লাসের একেবারে উঁচু দিকের ছাত্র, আশিস দাশগুপ্ত (বর্তমানে এক নামী শিশু চিকিৎসক) একটা কলম খুলে বেঞ্চে ধরে আছে । এরপর গিড্ডুর ধপ করে বসে পড়া আর তার পশ্চাদ্দেশে কলম প্রবেশ ! ভাগ্যিস স্কুল ইউনিফর্মের মোটা খাকি প্যান্টের দৌলতে সে শূলবিদ্ধ হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল । পরের ক্লাসে পরেশবাবুর ফিজিক্স পড়ানো চলছে – দেখি স্কুলের পিওন এক স্লিপ নিয়ে এসেছে, স্লিপ পড়ে পরেশবাবু বলেন, ‘সৌমিত্র ও আশিস, তোদের হেডস্যার ডেকেছেন’… আমরা দুরুদুরু বক্ষে হেডস্যারের ঘরে । তিনি বেশ চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফিজিক্সে কত পেয়েছো?’ বললাম আমরা, ‘আর অঙ্কে?’, তাও বললাম, ‘ইংরাজিতে?’ মিনমিনে গলায় জবাব দিই …হেডস্যার হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘পড়াশোনায় তো ভালোই দেখছি, ক্লাসে এত বাঁদরামি কর কেন? হাত পাতো’ – সপাং, সপাং করে আমাদের দুজনের হাতের তালুতে এক একটি বেত্রাঘাত । ‘এরপর যদি কোনও কমপ্লেন পাই, বাবাকে ডেকে পাঠাবো’। বেতের বাড়ি নয়, বাবাকে ডেকে পাঠালে চরম অনর্থ – ওতেই আমাদের ভীষণ ভয় ! বুঝতেই পারলাম গিড্ডু একেবারে খোদ হেডস্যারকে নালিশ ঠুকে দিয়ে এসেছে…

ক্লাস নাইন থেকে আমার খুব কাছের বন্ধু, সুকুমার চন্দ্র (আই আই টি খড়্গপুরের প্রাক্তনী ও বর্তমানে ফিজিক্সের এক ঞ্জানীগুণী শিক্ষক) – কটা চোখ, অতি গৌরবর্ণ, প্রায় সোনালি চুল আর হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে এক দ্রষ্টব্য বিশেষ ! ওই রোগা চেহারা নিয়ে কিন্তু ফুটবল খেলায় তার পারদর্শিতা ছিল উঁচু দরের, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বল নিয়ে দৌড়ে তিন-চারজনকে ড্রিবল করে গোল দিয়ে আসতো সুকুমার । গরমকালে ব্রাইটনের মাঠে আমরা সবাই ফুটবল খেলতাম অন্তত ঘন্টা দেড়েক । একদিন সাউথ ইন্সটিটিউট সংলগ্ন বোলিং ক্লাব আমাদের ফুটবলে চ্যালেঞ্জ করলে, সে ক্লাবের খেলোয়াড় ষন্ডা মার্কা সব অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছোকরা । ম্যাচ শুরু হল, দশ মিনিটেই তারা বুঝে নিল কারা ভালো খেলোয়াড়, এরপর শুরু হ’ল একেবারে বডিলাইন চার্জ, স্রেফ মেরে বসিয়ে দেওয়ার প্ল্যান । সুকুমার লাফিয়েছে হেড দেওয়ার জন্য, প্রতিপক্ষ বল ছেড়ে তার মুখে সজোরে মাথা ঠুকেছে – সুকুমারের নাক থেকে ঝরঝর করে রক্তপাত ! আমরা কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গে ওকে সাইকেলে বসিয়ে ছুটেছি কাছেই রেলের ডিস্পেনসারিতে – ডাক্তারবাবু এক নজর দেখেই বলেন, ‘এতো নাকের হাড় ভেঙেছে দেখছি’। এরপর সুকুমারের নাকে ফরসেপ ঢুকিয়ে হাড় সোজা করার চেষ্টা ডাক্তারবাবুর – যন্ত্রণায় সুকুমারের দু’চোখ থেকে অশ্রুধারা কিন্তু মুখে টুঁ শব্দটি নেই – কি অপরিসীম সহ্যশক্তি!

আমাদের আই আই টি’র এনট্রান্সের ফল বেরিয়েছিল সোমবার, ৩রা জুন – সেবছর জয়েন্ট এনট্রান্সের সঞ্চালক আই আই টি কানপুর থেকে খড়্গপুরে রেজাল্ট পৌঁছেছিল শনিবার বিকেলে, সোমবার সকালে সে রেজাল্ট নোটিস বোর্ডে সাঁটা হ’বে । খড়্গপুর কলেজের এক প্রফেসারের ভাই তখন আই আই টি’তে MSc পড়ে, সে নাকি খড়্গপুর সেন্টার থেকে যে ক’জন সফল হয়েছে তাদের রোল নাম্বার টুকে নিয়ে এসেছে – একথা শুনে আমি ও সুকুমার দৌড়েছি সেই প্রফেসারের বাড়ি, তিনি প্রচণ্ড গোপনীয়তার সঙ্গে আমাদের রোল নাম্বার দু’টো একটা কাগজে লিখে নিয়ে বাড়ির ভেতরে গিয়ে ভাইয়ের টুকে আনা লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে এসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমাদের নাম আছে, কিন্তু সঠিক ফলাফল সোমবারই জানতে পারবে’ । ব্যাস ! আমাদের দু’দিন রাতে ঘুম নেই, সোমবার সকালের জন্য অধীর প্রতীক্ষা! অবশেষে সোমবার এলো – সকাল আটটা নাগাদ আমি সুকুমারের বাড়ি ছুটেছি। ও হরি, সুকুমার বাড়িতে নেই, সে তাদের বাড়ির গরু নিয়ে ইন্দায় ভেটেরিনারি হাসপাতালে গেছে, ডাক্তার দেখাতে । আমাদের সাউথ সাইড থেকে ইন্দা অনেকটা পথ, সাইকেলে যেতে কম করে আধঘন্টা লাগে – সুকুমার গরু নিয়ে হেঁটে গেছে । এখন ভাবতেও অবাক লাগে সুকুমার গরুর দড়ি ধরে, মুখে ‘হ্যাট, হ্যাট’ আওয়াজ করে গরু নিয়ে চলেছে অতটা পথ ! আমি আবার গেছি সুকুমারের বাড়ি সাড়ে ন’টায়, তিনি ফেরেন নি । বোধহয় সাড়ে দশ’টা নাগাদ রোদে মুখ লাল, গলদঘর্ম সুকুমার এসেছে আমার বাড়ি, বলে ‘গালাগালিটা পরে করবি, চল যাই এখন রেজাল্ট দেখতে’। ঊর্ধ্বশ্বাসে সাইকেল চালিয়ে আমরা ছুটেছি আই আই টি – নোটিস বোর্ডের সামনে অল্পবিস্তর ভীড় । কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের দু’জনেরই নাম খুঁজে পাই সিলেকশানের লিস্টে – উচ্চৈঃস্বরে গান গাইতে গাইতে সাইকেল চালিয়ে আমরা বাড়ির রাস্তা ধরি !

 

 

ফিরে দেখা…

আজ থেকে ৪৩ টি বসন্ত আগে প্রায় ১৭ ছুঁই ছুঁই বয়সে আমরা স্কুলবন্ধুরা হয়েছিলাম বিছিন্ন (মনে রাখতে হ’বে আমরা ১১ ক্লাসের পর হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিয়েছিলাম, অতএব অনেকের বয়সই তখন ১৭ পেরোয়নি) – দুনিয়াটাকে পালটে দেওয়ার স্বপ্ন  দেখে বেছে নিয়েছিলাম নিজেদের পথ ! এক ছোট মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের শান্ত ছত্রছায়া থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম আমরা আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে । মধ্যবিত্ত মুল্যবোধ, মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গী আর যৌথ পরিবারের স্নেহ-মমতা মাখা কৈশোর থেকে পা বাড়িয়েছিলাম দুর্নিবার যৌবনের হাতছানিতে !

আমার মনে পড়ে যে ১৯৭৪ সালে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি ১৯শে মার্চ বাংলা পরীক্ষা দিয়ে শুরু হয়ে ১লা এপ্রিল বায়োলজি পরীক্ষা দিয়ে শেষ হয়েছিল । তিনবছরের সিলেবাসের গুরুভার মাথা থেকে নামিয়ে কেমন যেন বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মত অবস্থা আমাদের । পরের দিনই ২রা এপ্রিল খড়্গপুর রেলওয়ে স্কুলের আমরা একদল ছুটেছিলাম মেদিনীপুরের মহুয়া সিনেমায় তখনকার সুপারহিট ছবি টীন-এজার লাভস্টোরি, ‘ববি’ দেখতে । আমাদের এক বন্ধু সুকুমার ‘ববি’ দেখতে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তার বাবা এমন চোখে তাকিয়েছিলেন সুকুমার যেন মানুষ খুন করে এসেছে; বেচারা সুকুমারের ‘ববি’ দেখা আর হয়নি ! বলাই বাহুল্য এ ছবি দেখার পর উদ্ভিন্ন যৌবনা ডিম্পল কাপাডিয়া আমার বেশ কিছু রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল । ৩রা এপ্রিল আমরা ভীড় করেছি খড়্গপুরের বম্বে সিনেমায় রাজকুমার অভিনীত ইন্দো-পাক যুদ্ধের বিষয় নিয়ে ছবি, ‘হিন্দুস্তান কি কসম’ দেখতে । তার পরদিন ৪ঠা এপ্রিল ডিম্পল কাপাডিয়ার মোহিনী আকর্ষণে সাড়া দিয়ে আমি গিয়েছি আবার ‘ববি’ দেখতে । এর ফলস্বরূপ পাওয়া গেল মায়ের কাছ থেকে এক কড়া বকুনি; ‘সাপের পাঁচ পা দেখেছো নাকি? সামনে লাইন দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্ট, সেগুলোতে ভালো ফল না করলে জীবনে তো কিছুই করতে পারবে না !’

এখানে বলে রাখা উচিত যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার শিকার ছিলাম আমরা সবাই, তাই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া আর কোন কেরিয়ার পছন্দের বিলাসিতা ছিল আমাদের একেবারেই ব্রাত্য । লেখাপড়ায় ভালো করে ওই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এই ঢুকতে হবে, ওটাই মূললক্ষ্য ! পড়াশোনায় একটু অমনোযোগী হলেই বাবার একটা খুব চালু উক্তি ছিল, ‘তবে কি রেলের খালাসী হবি ?’ রেলের খালাসী সম্বন্ধে খুব একটা সম্যক ধারণা ছিলনা, তবে ব্যপারটা যে বেশ খারাপ সেটা বুঝতাম !

আই আই টির অ্যাডমিশনের জন্য অ্যাপ্লিকেশন ফর্মের কথাটা বলি – আমরা খড়্গপুরের ছেলে, তাই ফর্ম ভরতে সোজা আই আই টি পৌঁছেছি । ফর্মের সঙ্গে ১৫ টাকার পোস্টাল অর্ডার জমা দিতে হবে, কোথায় পাব পোস্টাল অর্ডার ? আই আই টির মধ্যেই পোস্ট অফিসে পাওয়া যায় নাকি, তা আমি কুড়ি টাকা দিতে কাউন্টার থেকে ১৬.৫০ টাকা কেটে আমাকে ৩.৫০ টাকা ফেরত দিলে । আমার মুখ চুন, আমাকে ঠকিয়ে ১.৫০ টাকা বেশী নিয়ে নিল, পোস্টাল অর্ডারে যে কমিশন লাগে তা জানা ছিলনা তখন !

যাই হোক ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ও ৫ই মে আমরা বসেছিলাম আই আই টির জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় – পরীক্ষার সেন্টারও আই আই টিতেই । দিনে দু’টো তিন ঘন্টার পরীক্ষা, প্রথম দিন অঙ্ক আর কেমিস্ট্রী, পরদিন ইংরাজি ও ফিজিক্স । পরীক্ষা কিরকম দিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই, কিন্তু পরিস্কার মনে আছে দু’টো পরীক্ষার মধ্যে এক ঘন্টার বিরতিতে কিছু খাওয়ার জন্য মা আমাকে দু’দিন একটা করে টাকা দিয়েছিলো – সে টাকায় আই আই টির ক্যান্টিনে ৫৫ পয়সা দিয়ে কোকা কোলা খেয়েছিলাম স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে । আর একটা ব্যাপার বেশ মনে আছে, শেষ পরীক্ষা ছিল ফিজিক্সের – পরীক্ষা শুরুর আধঘন্টা পর হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি ৪-৫ টা বেঞ্চ দূরে বসা আমাদের রেলওয়ে গার্লস স্কুলের এক প্রথম দিকের ছাত্রীর (নামটা উহ্যই রাখলাম) চোখে অঝোর বারিধারা, হাতে ধরা প্রশ্নপত্রের প্রতি অসহায় দৃষ্টি ! শুনেছিলাম পরের বছর সে নাকি ডাক্তারি তে ভর্তির সু্যোগ পেয়েছিল ।

তারপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন – ৮ই মে, ১৯৭৪; অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেন্স ফেডারেশনের সভাপতি জর্জ ফার্নান্ডেজের ডাকে সারা ভারতে একযোগে শুরু রেল ধর্মঘট । তার জোরালো প্রকোপ পড়েছিল রেল শহর খড়্গপুরে – সরকারের তরফ থেকে ধরপাকড়, বাড়ী থেকে ড্রাইভার-গার্ডদের  জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ট্রেন চালানোর বিফল প্রচেষ্টা । ১৭ থেকে ১৯শে মে হওয়ার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স, কিন্তু রেল ধর্মঘটের প্রভাবে সে পরীক্ষা পিছিয়ে গেল জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে – আমাদের প্রিপারেশনেও ঢিলে পড়লো ।

৩রা জুন সোমবার আমাদের আই আই টি জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল বেরোলো, আমাদের স্কুল থেকে আমাকে নিয়ে তিনজন চান্স পেয়েছে । জুনের মাঝামাঝি কাউন্সেলিং, সেদিনই  সাকুল্যে ৬০০-৬৫০ টাকা জমা দিয়ে আই আই টিতে ভর্তিও হয়ে গেলাম আমরা ।  এরপর আমায় আর পায় কে, মনে মনে ঠিক করেই রেখে ছিলাম পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আর বসবো না । আমার বড়মামা তখন মেদিনীপুরে খুব নামী ডাক্তার, তাঁর বরাবরের ইচ্ছে আমি ডাক্তার হই – আমি পরীক্ষাই দিইনি শুনে, ভীষণ রাগারাগি করে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন !

এরপর অগাস্ট মাসে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ – আমরা মফঃস্বলের ছেলে, হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করাটাই ছিল সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি । আই আই টি তে ঢোকার পরেও মনে ভয়, ফার্স্ট ডিভিশন পাব তো ? রেজাল্ট বেরিয়েছে, হেড মাস্টার মশাইয়ের ঘরে মার্কশীট এসে পৌঁছেছে ডাক মারফত । আমরা দুরুদুরু বক্ষে বাইরে অপেক্ষা করছি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম । আমাদের ইংরাজির শিক্ষক, শ্রী এন কে রায়কে আমরা কোনও দিন হাসতে দেখিনি, তিনি দেখি মৃদু হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলি, ‘স্যার, আপনি কি রেজাল্ট দেখেছেন, ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি স্যার?’ উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরিয়ে রায় মশাই বলেন, ‘স্টার পেয়েছিস তো রে, দু’টো সাবজেক্টে লেটার পেয়েছিস’ ।

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে ! সাইকেল নিয়ে ঊর্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটি মায়ের হাসিমুখটা দেখবো বলে…

[প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমাদের সময়ে ৭৫% নম্বর পেলে বোর্ড থেকে প্রকাশিত রেজাল্ট বুকলেটে রোল নম্বরের পাশে একটি * দেওয়া থাকতো; লেটার মানে কোনও বিষয়ে ৮০% বা তার বেশী মার্কস পাওয়া । আর ওই রকম ডাকসাইটে রেজাল্টের পর বড়মামা মেদিনীপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন অভিনন্দন জানাতে ।]

 

মনে কি দ্বিধা…

ভোরবেলা এ-সময়টা বড় ভালো লাগে অপর্ণার । সেই ছোটবেলা থেকেই খুব ভোরে স্নান সেরে নেওয়ার অভ্যাস – সাড়ে পাঁচটা বাজতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর । ঐ সময়ে গুড়গুড় আওয়াজ করে কলে জল আসে, তাড়াতাড়ি স্নান করে ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় চলে আসেন তিনি । সকাল ছ’টা নাগাদ দিল্লী অন্ধকার – পূবদিক সবে ফরসা হচ্ছে । অপর্ণা বারান্দায় বসে একমনে নামজপ করেন; সেই কম বয়সে মা’র হাত ধরে ভারত সেবাশ্রমে স্বামী পরমানন্দজির কাছে দীক্ষা নেওয়া । অপর্ণাকে বড়ই স্নেহ করতেন গুরুদেব, নিয়মিত চিঠি লিখতেন পোস্টকার্ড ভর্তি করে, মুক্তোর মত হাতের লেখা ছিল তাঁর ! দেহ রাখার আগের দিনও গুরুদেব অপর্ণাকে চিঠি লিখে গেছেন ।

দক্ষিণ দিল্লীর এদিকটা বেশ সবুজ – চারপাশে গাছগাছালিতে ভরা । একটা বড় শহরে এত গাছের ছড়াছড়ি – চারদিক তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে ওঠে ! এই বারান্দায় বসেই অপর্ণা অনেক পাখির দেখা পান । ধীরে ধীরে আলো ফোটে – দূরে রাও তুলারাম মার্গ দিয়ে একটা গাড়ি চলে যায় মৃদু শব্দ করে, স্থানীয় হিন্দিভাষীদের দুর্গামন্দির থেকে ভেসে আসা শিবস্তোত্র আর মসজিদের আজানের ডাক মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । হঠাৎ সমস্ত নিঃশব্দতা চিরে একঝাঁক টিয়াপাখি কর্কশ ডাক দিয়ে উড়ে যায় সামনের রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের বড় অশ্বত্থ গাছটার দিকে । পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস মেহরা বারান্দায় বাজরার দানা আর পাত্রে জল রেখে দেন – সেগুলো খুঁজে পেয়ে একদল শালিখ বেজায় কিচিরমিচির জুড়ে দেয় ।  দু’টো বুলবুলি নিজের মনে শিস দিয়ে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়ায় । অপর্ণা লক্ষ্য করেন পাশের বাড়ির সানশেডে একজোড়া পায়রা নিজেদের মধ্যে খুনসুটিতে ব্যস্ত । একজন তেড়ে যায় আর অন্যজন ঘাড়ের পালক উঁচিয়ে তাকে ভয় দেখায়, তারপর নিজেদের মধ্যেই কি রকম অদ্ভুত সুরে বকবকম ডাক তোলে – অপর্ণা বুঝতে পারেননা, সেটা ঠাট্টার টিটকিরী না প্রেমের অভিব্যক্তি !

একটু পরেই ছোট বেডরুমের দরজাটা খুলে যায় – নাতনি টুসি হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে আসে, ‘গুড মর্নিং দিম্মা, রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?’ টুসি ওরফে আত্রেয়ী, অপর্ণার ছোট নাতনি, ক্লাস ইলেভেনে পড়া তন্বী টীন-এজার । ডিপিএস-আর কে পুরম্ স্কুলে প্রথমে দিকের ছাত্রী – লেখাপড়া ও ডিবেটে তুখোড়, বাস্কেটবল আর সাঁতারেও সমান পারদর্শী । দিদির দেখাদেখি সেও সায়েন্স নিয়ে পড়ে, তারও ইচ্ছে দিদির মত ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ার । তার দিদি মানে অপর্ণার বড় নাতনি, সুমি ওরফে আদৃতা কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছে । দু’ই নাতনিই অপর্ণার সমান ন্যাওটা – ছোটবেলা থেকেই দু’পাশে শুয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনত । অপর্ণার গল্পের স্টক অফুরন্ত – রূপকথার রাজারানী, বিশ্বভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী বা ভূত-পেত্নীর গা ছমছমে গল্প বলে অপর্ণা ঘুম পাড়াতেন দুই নাতনিকে । ওরা কেমন তাড়াতাড়িই সব বড়  হয়ে গেল যেন !

এরপর টুসি দৌড়বে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হ’তে । অপর্ণার মেয়ে, অনুরাধা অন্য বেডরুম থেকে বেরিয়ে  এলো, ‘মা, তোমার চান হয়ে গেছে তো ? চা করি?’ । অনুরাধা কাছেই এক পাবলিক স্কুলে সিনিয়র ক্লাসে ইতিহাস পড়ায়, সেও বেরিয়ে যাবে সকাল আটটার মধ্যে । জামাই, অম্লান হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরে মর্নিং ওয়াকের জন্য তৈরি, হাসিমুখে বললো, ‘মা, শরীর ভাল তো ?’ অম্লান ভারত সরকারে বেশ উঁচু পোস্টে কাজ করে, ইকনমিক্স-এর মেধাবী ছাত্র ছিল সে । মেয়ে অনুরাধার জন্য যখন সুযোগ্য পাত্র খুঁজছিলেন অনিলবাবু, হঠাৎ জব্বলপুর থেকে ওঁর ছেলেবেলার বন্ধু সুবিনয়ের চিঠি এলো তাঁর ছেলে অম্লান-এর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে । সুঠাম, সপ্রতিভ অম্লানকে  দেখে ও তার সঙ্গে কথা বলে অনিলবাবু ও অপর্ণার খুব পছন্দ হয়েছিল । অম্লান সত্যিই বড় ভাল ছেলে – অনিলবাবু ও অপর্ণার প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান আর কাজকর্মেও তার খুব নামডাক ।

অনুরাধার থেকে বছর চারেকের বড় তার দাদা, অপর্ণার একমাত্র পুত্র, অনির্বাণ গুড়গাওঁতে থাকে – সেও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন এক মাল্টিন্যাশনাল  কোম্পানি-তে ভাইস প্রেসিডেন্ট । প্রায়ই অফিসের কাজে বিদেশ যায় অনির্বাণ, কখনও এক সপ্তাহ কখনওবা একমাসের জন্য –আজ জাপান, কাল জর্ডন অথবা পরশু ব্রাজিল – সারা পৃথিবী চষে বেড়ায় সে । ম্যানচেস্টারে পোস্টেডও ছিল বছর পাঁচেক । ছেলের কথা মনে পড়লেই অপর্ণার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, অভিমানে বুক ঠেলে উঠে আসে চাপা কান্না !

অনিলবাবু রেলে কাজ করতেন,  কলকাতা থেকে বদলী হয়েছিলেন চক্রধরপুরে – দু’টি কামরা, রান্নাঘর,  বাথরুম, সামনে ও পেছনে জাফরি দেওয়া বারান্দা আর পেছন দিকে একটা খোলা উঠোন  নিয়ে নতুন তৈরি রেলের কোয়ার্টার্স, সামনে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা অনেকটা বাগান করার জায়গা । সাবেকি উত্তর কলকাতার জয়েন্ট ফ্যামিলির প্রায়ান্ধকার বাড়ি ছেড়ে এসে অপর্ণা চক্রধরপুরে যেন মুক্তির স্বাদ পেলেন ! শনিবারের হাট থেকে খুরপি-কোদাল কিনে নিয়ে এসে জোর উদ্যমে অপর্ণা অনেক গাছপালা লাগিয়েছিলেন বাগানে । বিকেলে কলে জল এলে রোজ বালতি করে গাছে জল দিতেন অপর্ণা  – উর্বর মাটি আর তাঁর স্নেহমাখা স্পর্শ পেয়ে গাছগুলো সব লকলক করে বেড়ে উঠেছিল । চৈত্রের শেষ দিকে সারাদিন আগুন ঝরিয়ে যখন সূর্য ডুবত আর ধীরে ধীরে নেমে আসতো ছায়াঘন সন্ধ্যা, অপর্ণার বাগান ম-ম করতো যুঁই আর হাস্নুহানার গন্ধে – অনিলবাবু অফিস ফেরত বাগানে বসে চায়ের পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মৃদুহেসে বলতেন, ‘তুমি যে ওদের ভালোবাসো, গাছগুলো বোধহয় বুঝতে পারে’ ।

চক্রধরপুরে অনির্বাণ ছোট্ট ছেলে, তার তিন বছর বয়স, অনুরাধা তখনও পেটে আসেনি । এখনকার মত এত কম বয়সে কেউ স্কুলে ভর্তি হত না তখন, অনির্বাণ মা’র কাছেই পড়াশোনা করত – বর্ণপরিচয়, ছড়া ও ছবি, রবীন্দ্রনাথের সহজপাঠ এসবই পড়াতেন অপর্ণা । ছবি এঁকে শেখাতেন ভূগোল – উঁচুনিচু পাহাড়,  পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, নদীর স্রোত, সমতল বেয়ে এসে নদীর সমুদ্রে মিশে যাওয়া, নদী মোহনার ব-দ্বীপ – অতি আগ্রহে অনির্বাণ তার শিশুমনে গেঁথে নিত সব তথ্য । মাথাটা তার বরাবরই পরিস্কার, কোনও বিষয় একবারের বেশী দু’বার বোঝাতে হতনা ।

দিনগুলো যেন বড়ই দ্রুত কেটে গেল এরপর – অনুরাধার জন্ম, অনির্বাণের স্কুলে ভর্তি । ধাপে ধাপে অনির্বাণ পার হল স্কুলের নিচু থেকে উঁচু ক্লাস – একগাল হাসি নিয়ে রেজাল্টের দিন ছেলে বাড়ি ফিরত, ‘মা, এবারেও আমি ফার্স্ট।’ ক্লাস টেন-এর বোর্ড পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করে অনির্বাণ ভর্তি হল নরেন্দ্রপুরে – ওকে হস্টেলে রেখে বাড়ি ফেরার সময় অনিলবাবু আর অপর্ণার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল । এরপরেই অনিলবাবু বদলী হলেন নাগপুরে; অনির্বাণ হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় তিনটে লেটার নিয়ে পাশ করল – জয়েন্ট এনট্রান্সে তার র‍্যাঙ্ক হল ৩৭, আনন্দে আত্মহারা অনিলবাবু অফিসের সবাইকে সিঙ্গাড়া-মিষ্টি-কচুরি খাওয়ালেন পেট ভরে ! অনির্বাণ যাদবপুরে ভর্তি হল ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে ।

অনির্বাণ যখন থার্ড ইয়ারে পড়ে, ওর সহপাঠী শৌভিকের বোন, সুদীপা ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হল যাদবপুরে – শৌভিক অনির্বাণের খুব কাছের বন্ধু, ওদের বাড়ি কসবায় । যাদবপুরের হস্টেল থেকে শনি-রবিবারে ওদের বাড়ি প্রায়ই চলে যেত অনির্বাণ, হস্টেলের ডাল-ভাত-চচ্চড়িতে পেটে চড়া পড়ে গেলে মাসীমার হাতের রান্নায় মুখ বদলাতে । সুদীপা-কে মাঝে মাঝে অঙ্ক আর ফিজিক্স পড়াত, সুদীপা বলতো, ‘অনির্বাণদা’, তুমি কিন্তু দাদার চেয়ে ভালো বোঝাতে পারো ।’  একদিন কলেজের পর অনির্বাণ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল হস্টেলের দিকে, দেখে মেন গেটে সুদীপা দাঁড়িয়ে তার আর এক বন্ধুর সঙ্গে । ‘আরে, কি খবর, তোমাদের ক্লাস শেষ ?’ সুদীপা হাসিমুখে বলল, ‘অনির্বাণদা’, কেমন আছো ? তুমি কিন্তু অনেক দিন আসনি আমাদের বাড়িতে । আলাপ করিয়ে দিই, আমার ক্লাসমেট সুচেতনা, ও মডার্ন হাই স্কুলে পড়ত’ । ‘সুচেতনা, এ আমার দাদার বিশেষ বন্ধু অনির্বাণদা’, হ্যান্ডশেক করার চেষ্টা করিসনা, তোর হাত কেটে যাবে – অনির্বাণদা’ হীরের টুকরো কিনা’, খিলখিল করে হেসে উঠল ওরা দু’জনেই ।

এরপর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে অনির্বাণের যেন ঘনঘনই চোখে পড়তে লাগলো সুচেতনা – মৌখিক স্বল্পালাপ থেকে রেস্তোরাঁর ঘেরাটোপ – তারপর একদিন ওদের বাড়ি । সুচেতনার বাবা ইউনিয়ন কার্বাইডের জেনারাল ম্যানেজার, সানি পার্কে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিঙে আটতলায় ওদের ফ্ল্যাট – সেখান থেকে কলকাতা যেন এক মায়া নগরী, আকাশছোঁয়া সাফল্যের স্বর্গলোক, সব রকম দুঃখকষ্টের অনেক ওপরে । ক্যালকাটা ক্লাবের সুইমিং পুল দাপানো, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ‘কেয়ার ফ্রী’ স্বভাবের সুচেতনা অনির্বাণের মন জয় করে নিল সহজেই । যাদবপুরের পড়া শেষ করে অনির্বাণ আই আই টি কানপুরে এম টেক করতে গেল, সুচেতনা বি এস সি’র পর এম এস সি তে ভর্তি হ’ল – কানপুর থেকে বেরিয়ে অনির্বাণ আমেরিকায় যাওয়ার আগেই চারহাত এক হল এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় । বড়লোক বেয়াই বাড়ি – অনির্বাণের বিয়েতে যথেষ্টই খরচা করেছিলেন অনিলবাবু, তবু তাদের মন পাওয়া ভার । বৌভাতের সন্ধ্যায় সুচেতনার মা’ ঝেঁঝেঁ উঠলেন, ‘দেখবেন মিস্টার মিত্র, আমাদের বাড়ির লোকজনদের যেন কোনও অযত্ন না হয়’ ।

বিয়ের দু’সপ্তাহের মধ্যেই অনির্বাণ আর সুচেতনা চলে গেল আমেরিকা, বৌ আর শ্বাশুড়ির মধ্যে কোনও সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই দূরত্বের ব্যবধান তৈরি হ’ল অনেক । অনিলবাবু ও অপর্ণা অনির্বাণের চলে যাওয়াতে প্রথমে ভেঙ্গে পড়েছিলেন, পরে অনুরাধার সঙ্গে অম্লানের বিয়ের পর ওঁরা যেন মনের জোর ফিরে পেয়েছিলেন একটু ।

অনুরাধার ছোট মেয়ে টুসি জন্মাবার সময় অনিলবাবু ও অপর্ণা দিল্লী চলে এসেছিলেন – ওদের একটু সাহায্য হবে ভেবে । দেখতে দেখতে টুসি বড় হয়ে উঠলো – মেয়ে-জামাই আর ওঁদের ছাড়েনা, যাবার কথা বললেই বলে আর ক’দিন থেকে যাওনা মা, কলকাতায় তোমাদের আর কি বা কাজ? তাছাড়া ওখানে লোকজন  পাওয়া যায়না, বাড়ির সব কাজ সামলাতে মা’র কষ্ট হবে ! একদিন গভীর রাতে অনিলবাবু অপর্ণাকে ডেকে বললেন, ‘আমার বুকে একটু কষ্ট হচ্ছে’ । অম্লান সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে গেল অল ইন্ডিয়া ইন্সটিউটে – ডাক্তারদের সব চেষ্টাই বিফল করে সকাল সাতটায় চিরকালের মত চোখ বুজলেন অনিলবাবু । সুমি আর টুসি এসে অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরল, ‘দিম্মা, তুমি আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবেনা’ । তখন অনির্বাণ গুড়গাওঁ-এ চাকরি নিয়ে চলে এসেছে, খবর পেয়ে সেও দৌড়ে এল – বাবার শ্রাদ্ধশান্তি সবই করলে নিয়ম মেনে । অপর্ণা রয়ে গেলেন মেয়ের কাছে, কর্তব্যপরায়ণ ছেলে সপ্তাহে একবার ফোন করে, মাসে-দুমাসে দেখা করতে আসে – কিন্তু ঐ পর্যন্তই, ছেলে বা বৌমা কেউ বলেনা, ‘মা, আমাদের কাছে ক’দিন থাকবে চলনা’ । তবুও যখন অনির্বাণের ফোনটা আসে, ‘মা, কেমন আছো ?’, অপর্ণার চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে যেন ।

সকালবেলায় এ সময়টা অপর্ণার মনে ঘুরে ঘুরে আসে কলকাতার বাড়িটার কথা । ছেলেকে হস্টেলে রেখে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়িয়ে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে বাড়িটা করেছিলেন অনিলবাবু – দমদম পার্কে প্রায় আড়াই কাঠা জমির ওপর একটা বসার ঘর, দু’টো শোবার ঘর, বাথরুম ও ছোট রান্নাঘর নিয়ে একতলা বাড়িটা । বড় শখ করে ওঁরা দুজনে বাড়ির নাম রেখে ছিলেন, ‘নোঙর’ । বাড়ির ঠিক পেছনে একটা বিরাট টলটলে পুকুর – ঐ পুকুরটা দেখেই জমিটা খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল অনিলবাবু আর অপর্ণার । বাড়িটা তৈরি হয়ে গেলে বিশুমালিকে কাজে লাগিয়ে একটা ছোট বাগান করেছিলেন অপর্ণা সামনের আর পাশের জমিতে । বাঁশ পুঁতে আর কঞ্চি লাগিয়ে বিশু মাচা তৈরি করেছিল –  বর্ষার জল পেয়ে সদ্য যুবতী লাউগাছটা মাচা জড়িয়ে আনন্দে নাচানাচি করত । আর তরতর করে বেড়ে যাওয়া শিম গাছটা দোতলার ছাতে পৌঁছে গিয়েছিল – ছাতে উঠলেই হাতে আসতো থোকা থোকা শিম । অপর্ণার বাড়ির পেছনের পাঁচিল থেকে পুকুরের ধার ঘেঁসে মালিরা গাছ লাগিয়েছিল অনেকরকম – ঝাঁকড়া আমগাছটায় যেবার প্রথম আম ফললো, বিশুমালির বউ শ্যামলী ডেকে বলল, ‘মাসীমা, এই নিন গাছের প্রথম কাঁচা আম, টক করে খাবেন’ ।  বিশুমালির মেয়ে বিন্তি আর ছেলে তাপসের জন্য ভালো রান্নাবান্না হ’লে একটু সরিয়ে রাখতেন অপর্ণা, পালাপার্বণে পাঁচ-দশটা টাকা ধরিয়ে দিতেন, বলতেন ‘এই নে, তোরা ফুচকা খাস’ । মালিদের গাছে এসে বসত অনেক পাখি, বসন্তবৌরি, টুনটুনি আর ফিঙে – পানকৌড়ি-টা দুচোখ  বুজে ঘুমোবার ভান করতো, কিন্তু পুকুরে কোনও ছোট মাছ দেখলেই ছোঁ মেরে তুলে নিত তার ঠোঁটের ফাঁকে ! শীতের দুপুরে বাড়ির পেছনে আচার রোদে দিতেন অপর্ণা । ভাতের সঙ্গে একটু আচার খেতে বড় ভালোবাসতেন যে অনিলবাবু ।

‘মা, ওরা সবাই বেরিয়ে গেছে, আমিও বেরোচ্ছি অফিসে, দরজাটা বন্ধ করে দিন’, অম্লানের গলার আওয়াজে সম্বিত ফিরল অপর্ণার ।

[মাতৃমন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৪]

 

নানারূপে কাঞ্চনজঙ্ঘা

পূর্ব হিমালয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা পৌঁছেছি উত্তরবঙ্গে – ডিসেম্বরের শুরুতে দিন আটেকের ভ্রমণ, বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ আহরণ । এবারে আমরা চারজন – কত্তা-গিন্নীর সঙ্গে আমাদের কন্যা ও পুত্রও সামিল; অনেকদিন পর চারজনের একত্র ভ্রমণে আনন্দ তাই লাগামহীন ! এক শনিবার ভরদুপুরে আমরা পৌঁছই দিল্লী থেকে বাগডোগরা – আগে থেকেই ঠিক করে রাখা একটি গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমরা বিমানবন্দর থেকে । বাগডোগরা, মাটিগাড়া হয়ে ক্ষীণস্রোতা মহানন্দা নদীর সেতু পেরিয়ে শিলিগুড়ি শহরকে বুড়ি ছুঁয়ে আমরা এগিয়ে চলি সালুগাড়ার জঙ্গলের পথে । চওড়া পিচের রাস্তা জঙ্গলের বুক চিরে এগিয়ে চলে, দুধারে পুরানো সুউচ্চ শাল ও সেগুনের ঘন বনানী, দিনের বেলায়ও বেশ অন্ধকার !

কিছুক্ষণ পরেই চোখে পড়ে তিস্তা নদীর খাত, আর একটু এগিয়ে দেখতে পাই ১৯৪১ সালে স্টীল ও কংক্রিট দিয়ে নির্মিত viaduct, সেবক সেতু  –  প্রবেশের মুখে দুইটি ব্রিটিশ প্রতীক স্বরূপ সিংহের মূর্তি, স্থানীয় লোকেরা বলে অবশ্য বাঘপুল । সেবক সেতু দিয়ে তিস্তা পেরিয়ে ডুয়ার্স হয়ে রাস্তা গিয়েছে ভূটানের দিকে । আমরা সেদিকে না গিয়ে তিস্তার ধার ঘেঁষে চলি কালিম্পঙের পথে – বাঁশঝাড় ও পাইনের জঙ্গলে আঁকাবাঁকা রাস্তা, দুপাশে খাড়াই পাহাড়ের মাঝে সুগভীর খাতে বয়ে চলা শান্তশ্রী তিস্তা । প্রায় ৩০ কিমি তিস্তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে আমরা পৌঁছই তিস্তার ওপর দ্বিতীয় সেতুতে, সেতু পেরিয়ে আমাদের গাড়ী ‘হেয়ারপিন’ বাঁক ধরে উঠতে থাকে পাহাড়ি পথের তীব্র চড়াই । ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে শৈলশহর  কালিম্পং প্রবেশের একটু আগেই নেমে আসে অন্ধকার । ছোট্ট শহরের এক প্রান্তে পশ্চিমবঙ্গ ট্যুরিজম-এর ‘মরগ্যান হাউস’ – সেখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা ।

১৯৩১ সালে পাটের ব্যবসায়ী ব্রিটিশ সাহেব জর্জ মরগ্যান কালিম্পঙে একটি টিলার মাথায় অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরি করেন ওই বাংলোটি – সাহেব ও মেমসাহেবের স্বপ্ননীড় ! কিন্তু তার কয়েকবছর পরেই মারা যান মিসেস মরগ্যান, সাহেবও ভারত ছেড়ে পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে । বহু মালিকানা হস্তান্তরিত হয়ে বাংলো-টির মালিকানা পায় রাজ্য সরকার, সেখানে গড়ে ওঠে ট্যুরিস্ট লজ । অতীতে মরগ্যান হাউসে পদধূলি পড়েছে অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তির– এখানে থেকে গেছেন চিত্রাভিনেত্রী নার্গিস, গায়ক কিশোরকুমার, মহানায়ক উত্তমকুমার… এমনকি ফরাসী ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতরাও ! ধীরে ধীরে সরকারি ঔদাসীন্যে মরগ্যান হাউসের হয় ভগ্নদশা – অযত্নে, অবহেলায় বাংলোটি পর্যবসিত হয় এক পোড়ো বাড়িতে। তার সঙ্গে চালু হয় ভূতের গল্প – প্রায়ই দেখা যায় এক মেমসাহেবকে বাংলোতে ঘুরে বেড়াতে, কেউবা দেখেন বাংলোর বাগানে ক্রন্দনরতা মেমসাহেব ! অবশেষে টনক নড়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের, বাংলোটির প্রভূত সংস্কার করা হয় তার পুরানো চরিত্রটিকে বজায় রেখে । নব কলেবরে ঐতিহ্যবাহী মরগ্যান হাউস কালিম্পঙে এখন পর্যটকদের এক অতিপ্রিয় গন্তব্য । এখনও নাকি কেউ কেউ দেখতে পান মেমসাহেবের সেই বিদেহী আত্মাকে !

আমাদের অগ্রিম বুকিং-এর কাগজপত্র দেখাতেই দু’টি দ্বি-শয্যা বিশিষ্ট ঘর পাওয়া গেল মরগ্যান হাউসের দোতলায় ।  আমাদের ঘরে কাঠের মেঝে, ফায়ার প্লেস…পাক্কা কলোনিয়াল নিদর্শন সব ! অতঃপর রুটি-ডাল-আলুকপির তরকারি ও চিকেন কারী দিয়ে নৈশাহার সেরে নিদ্রাদেবীর আরাধনায় উদ্যোগী হই আমরা । পরদিন ভোরে কানে আসে এক মৃদু গুঞ্জন, ক্রমে গুঞ্জন পরিণত হয় বেশ শোরগোলে । ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখি সামনের ছাদে এক ছোট জটলা ; একদল বাঙালী ট্যুরিস্টদের সমবেত হর্ষ – উত্তর দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘা উদীয়মান সূর্যের গোলাপী আলোয় উদ্ভাসিত ! আমার ক্যামেরার শাটার ব্যস্ত হয়ে পড়ে বরফ ঘেরা পাহাড় চূড়োয় অপরূপ রঙের শোভা ধরে রাখতে ।

প্রাতরাশ সেরে একটি গাড়ি নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি কালিম্পঙের আশেপাশে দ্রষ্টব্য সব ঘুরে দেখতে । সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট ছাড়িয়ে আমরা পৌঁছই কালিম্পং মনাস্ট্রি – ধর্মগুরু দালাই লামার করস্পর্শে ১৯৭৬ সালে উৎসর্গীকৃত এই পবিত্র মনাস্ট্রি । কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে আমরা উঠে আসি মনাস্ট্রির মূল মন্দিরে, যেখানে ধ্যানমগ্ন তথাগত । মনাস্ট্রির চারপাশে অনেকগুলি ধর্মচক্র – সেগুলি ঘুরিয়ে প্রার্থনারত ভক্তের দল । মনাস্ট্রির পিছন থেকে দেখতে পাই দিনের আলোয় ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা । এরপর আমাদের গন্তব্য, ‘হিল টপ’ – আমাদের গাড়ী ঘুরে ঘুরে ওঠে পাহাড়ী চড়াই রাস্তা ধরে । এক পাহাড়ের মাথায় দোতলা সুন্দর বাংলো, ‘হিল টপ’ – কালিম্পঙে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের দ্বিতীয় ট্যুরিস্ট লজ, বাংলোর চারপাশে অনেক মরশুমী ফুলের কেয়ারি করা বাগান, বাগানে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে উত্তরে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতমালার মনোমুগ্ধকর ব্যাপ্তি !  ট্যুরিস্ট লজের ম্যানেজার আমাদের সযত্নে ঘুরিয়ে দেখান বাংলোটি – অত্যুৎসহকারে জানান হিন্দী চলচ্চিত্র, ‘কাহানী ২’-এর শুটিং হয়েছিল পাশের বাড়ীতেই, এই বাংলোতে ছিলেন শুটিং ইউনিটের অনেকে । ট্যুরিস্ট লজের একতলায় সবচেয়ে ভালো ঘরটিতে এক সপ্তাহ থেকেছিলেন নায়িকা বিদ্যা বালান – ঘরটি সত্যিই সুন্দর, বড় বড় ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার শোভা !

আমরা এগিয়ে চলি ডেলোর পথে… ব্যস্ত কালিম্পং বাজারের দোকানপাট, বাস ও ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, শহর প্রান্তের বাড়িঘর এসব পিছনে ফেলে আমাদের গাড়ি বড়রাস্তা ছেড়ে ডেলোর দিকে বাঁক নেয় । আমরা এসে পৌঁছই ডেলো পাহাড়ের মাথায় ইকো পার্কে – পার্কটির দেখভালের দায়িত্ব Gorkha Territorial Administration (GTA)-এর ট্যুরিজম বিভাগের । ল্যান্ডস্কেপিং করা পার্কটিতে চারদিকে মরশুমি ফুলের শোভা, সুদীর্ঘ মহীরুহের সারি, মাঝেমধ্যে গোলাকৃতি ছাউনিতে বসার জায়গা । ইকো পার্কের বেশ একটু উঁচু জায়গায় GTA-এর তৈরি একটি ট্যুরিস্ট বাংলো । পার্কের এক দিকে অনেক দূর পর্যন্ত সুগভীর খাদ, সেখানে তিনকোনা ঘুড়িতে সওয়ার হয়ে Paragliding-এ ব্যস্ত অনেকেই । আর উত্তরে তাকালেই অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপের পশরা ।  কিছুক্ষণ বসে থাকি আমরা পার্কের ধারে একটি বেঞ্চে, নীরবে একাত্ম হই নিসর্গের সাথে !

পরদিন সকালে কালিম্পং বাজারে আমরা খুঁজে পাই একটি ভালো চায়ের দোকান – বন্ধুদের উপহারস্বরূপ কেনাকাটা করি দার্জিলিং-এর বিখ্যাত চা । আর একটি হস্তশিল্পের দোকান থেকে সংগ্রহ করি তিব্বতী মুখোশ । বাজারের কাছে মেইন রোডের ধারে এক বেশ পুরানো তিব্বতী রেস্তোরাঁয় মোমো ও থুকপা দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারি আমরা ।

কালিম্পঙে তিনদিন কেটে যায় শীঘ্রই; আমরা একদিন সকালে বেরিয়ে পড়ি লোলেগাঁও-এর পথে – এবারে আমাদের গাড়ীর চালক, কৃষ্ণ শেরপা । সদা হাস্যমুখে কৃষ্ণ টাটা সুমো নিয়ে এগোয় রেলি নদীর পথে, কালিম্পং ছাড়িয়ে কিছুদূর যেতেই রাস্তার হাল অত্যন্ত খারাপ, রাস্তায় গভীর গর্ত, আলগা নুড়ি-পাথরে ভর্তি, তার মধ্যেই তীব্র ‘হেয়ারপিন’ বাঁকে চড়াইয়ের পথ । খুবই সাবধানে গাড়ী চালায় কৃষ্ণ, নানারকম গল্প-গাছায় কেটে যায় অনেকটা সময়, আমাদের গাড়ী পাহাড়ের খাতে বহতা রেলি নদীর ওপর সেতু পেরোয় । নদীর ধারেই নানাবিধ পণ্যসামগ্রীর এক মনোহারি দোকান – কৃষ্ণ সেখানে গাড়ী থামালে দোকানের মালকিন, নেপালি তনয়া অঞ্জু যত্নসহকারে আমাদের চা ও মোমো পরিবেশন করে ।

আমরা পৌঁছই লোলেগাঁও – কয়েকটি ‘হোম-স্টে’ আর রেস্তোরাঁ নিয়ে ছোট গ্রাম লোলেগাঁও ।  তার প্রসিদ্ধি কাঞ্চনজঙ্ঘার জন্যই, গ্রামের ‘ভিউ পয়েন্ট’ থেকে উত্তর আকাশে বিরাজমান মহান কাঞ্চনজঙ্ঘা ! GTA নির্মিত এক ‘ইকো পার্ক’ এখন অবহেলা ও অযত্নের শিকার । একটু এগিয়ে লোলেগাঁও রিজার্ভ ফরেস্ট – চারিপাশে সুপ্রাচীন ও সুদীর্ঘ মহীরুহের দল, পাইন গাছের প্রাধান্যই বেশী । আমরা বনপথে হেঁটে যাই ফরেস্ট বিভাগের ‘canopy walk’ দেখতে, সেটিও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো । বেশ কিছুটা সময় ওই অরণ্যে কাটিয়ে দিই আমরা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে !

লোলেগাঁও থেকে আমরা লাভার পথে চলি – কিছদূর এগিয়ে রাস্তার আবার সেই বেহাল অবস্থা, আমাদের গাড়ী চলে নাচতে নাচতে, লাভার কাছাকাছি গিয়ে রাস্তার হাল শুধরোয় । লাভা বাজারের কাছে রাস্তা বেশ সরু, দুধারে ব্যাঙয়ের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা সস্তার হোটেল ও রেস্তোরাঁ – বাঙালী পর্যটকদের জন্য লাভার মত প্রত্যন্ত অঞ্চলে আলু-পোস্ত ও মাছের ঝালের নিমন্ত্রণ !  বাজার পেরিয়ে আমরা পৌঁছই লাভা মনাস্ট্রী – লাভার একমাত্র দ্রষ্টব্য । অনেকটা জায়গা জুড়ে একটি টিলার মাথায় মনাস্ট্রী – মূল প্রার্থনা ঘরটি ছাড়াও চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকগুলি বিল্ডিং – লাইব্রেরী, লামাদের বাসস্থল, বিরাট ছাত্রাবাস… বেশ কিছু ভবন আবার নির্মীয়মাণ । মনাস্ট্রীর চারপাশে রংবেরঙের অনেক পতাকা হাওয়ায় ওড়ে, একদিকে সুগভীর নেওড়া ভ্যালি আর একদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোরম দৃশ্য । লাভা মনাস্ট্রী থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়ী গরুবাথানের রাস্তা ধরে, একটু পরেই বাঁক নেয় বাঁদিকে  জঙ্গলে কোলাখাম-এর পথে । চারিদিকে গভীর জঙ্গল, লম্বা লম্বা পাইন গাছের ভীড়, সূর্যের আলো প্রবেশের পথ নেই, তাই দিনের বেলায়ও প্রায়ান্ধকার পথ । অত্যন্ত খারাপ সেই রাস্তা দিয়ে আমরা ক্রমাগত নামতে থাকি – প্রায় একঘন্টা লেগে যায় আমাদের মাত্র ৮ কিমি রাস্তা পেরোতে । কোলাখাম গ্রামে একদম ঢোকার মুখেই আমাদের থাকার জায়গা, Neora Valley Eco Huts ।

দশ-বারোটি ‘হোম-স্টে’ নিয়ে কোলাখাম একটি ছোট্ট গ্রাম – রাস্তার ধারে তিন-চারটি কটেজ নিয়ে একেকটি হোম-স্টে, কটেজের নিচের তলায় ডাইনিং হল ও পরিচারিকাদের থাকার জায়গা । আমাদের কটেজটির নাম, ‘Drongo’ – বাংলায় যার নাম, ‘ফিঙে’ । কটেজের ভেতর ঢুকে দেখি, সেটি আদতে একটি ‘Log Hut’ – পালিশ করা পাইন গাছের তক্তা দিয়ে বানানো দেওয়াল ও মেঝে, ঘরের মধ্যে দিয়ে কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে Attic-এ । নিচে তিনজন ও ওপরে attic-এ একজনের বিছানা, আমাদের চারজনের জন্য যথেষ্ট । বাথরুমটি কিন্তু বেশ আধুনিক – টালি লাগানো, পাশ্চাত্য শৈলীর, LPG জ্বালিয়ে গিজার চলে ।  ঘরটিতে দু’টো জানালা – তার একটি দিয়ে দেখতে পাই দূরে পাহাড়ের মাথায় লাভা মনাস্ট্রী আর একটি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশাল ব্যাপ্তি !  আমাদের কটেজে দেখভাল ও রান্নার দায়িত্বে নেপালি তরুণী, তৃপ্তি – সে হাসিমুখে যোগান দেয় সন্ধ্যাবেলা চিলি চিকেন, ডিনারে আলু-স্কোয়াশের সবজি ও ডিম কারী, প্রাতরাশে আলু-পরোটা কিংবা চাউমিন… একদিন দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজনের  পর গিন্নী ছেলে ও মেয়ের সাথে দেখতে বেরোয় একটু দূরে ‘চাঙ্গে ফলস’ – জানালা দিয়ে ঘরে তখন সোনালী রোদের বন্যা, আমি ওদের তিনজনকে ঘুরতে পাঠিয়ে অলস দিবানিদ্রার সুযোগ খুঁজি ! কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়া কোলাখামে কিছুই নেই আর – দিনের বিভিন্ন সময়ে দেখি কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়োয় সূর্যের আলোর প্রতিফলন, গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত বড়জোর ৫০০ মি দূরত্ব উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটে যাই, একটি মাত্র দোকানে মালিকের সঙ্গে গল্প জুড়ি… কেটে যায় কোলাখামে আমাদের দু’টি দিন…

একদিন সকালে প্রাতরাশের পর করণ রাই এক শক্তপোক্ত ‘বোলেরো’ গাড়ী নিয়ে হাজির, সে আমাদের রিষ্যপ ঘুরিয়ে নিয়ে যাবে আর এক ছোট জনপদ, লামাহাট্টায় । আবার আমরা ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে খুবই খারাপ রাস্তা দিয়ে লাভা পৌঁছই – লাভা ছেড়ে কিছুপথ গিয়ে বড়রাস্তা থেকে আমাদের গাড়ী রিষ্যপের দিকে বাঁক নেয় । একে রাস্তা খুব খারাপ, তার ওপর বেশ চড়াই – বিশ্রী রাস্তায় লাফাতে লাফাতে একিয়ে চলে আমাদের গাড়ী । কিছুদূর  গিয়ে দেখি রাস্তা মেরামতির কাজ চলছে, পাথরকুচি বিছিয়ে, পিচ ঢেলে ও রোডরোলার চালিয়ে রাস্তা তৈরি হচ্ছে, অনেকটা কাজও এগিয়েছে । প্রায় ৮৫০০ ফিট উচ্চতায় রিষ্যপ কোনও এক সময় ছিল ছোট্ট একটি গ্রাম, এখন সেখানে অজস্র হোটেল ও হোম-স্টে’র ছড়াছড়ি । রিষ্যপে দিগন্ত জুড়ে শোভিত কাঞ্চনজঙ্ঘা – গ্রামের শেষে সুগভীর খাদের বিস্তৃতি, খাদ পেরোলেই বিরাজিত মহিমাময় কাঞ্চনজঙ্ঘা !

রিষ্যপ থেকে নেমে এসে আমাদের গাড়ী কালিম্পঙের রাস্তা ধরে । কালিম্পং শহর ছাড়িয়ে তিস্তার সেতু পেরিয়ে আমরা দার্জিলিঙের পথে এগোই –  পার হই ওখানকার অন্যতম বানিজ্যিক কেন্দ্র, ‘তিস্তা বাজার’। রাস্তার দু’ধারে অনেক দোকানপাট নিয়ে জমজমাট তিস্তা বাজার, প্রত্যন্ত গ্রামবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মেটানোয় ব্যস্ত । বাজারের সামান্য যানজট ছাড়িয়ে গাড়ী এরপর ক্রমাগত ঘুরে ঘুরে চড়তে থাকে পাহাড়ী রাস্তা, কিছু পরেই ঘন পাইনের জঙ্গল নিচে ফেলে আসি, সঙ্গী হয় আমাদের ঢেউ খেলানো সবুজ গালিচা বিছানো চা-বাগান ।

দার্জিলিং চায়ের জন্য বিখ্যাত ‘লোপচু টী এস্টেট’ ছাড়িয়ে আসে আমাদের গাড়ী ; একটি প্রবেশতোরণ ঘোষণা করে, ‘লামাহাট্টায় সুস্বাগত’ !  রাস্তার একদিকে পাহাড়ের ঢালে সুদীর্ঘ পাইনের জঙ্গল, আর একদিকে এক সারি ‘হোম-স্টে’ ও কয়েকটি ছোট ছোট দোকান – পুরো গ্রামটাই রাস্তার ধারে, দৈর্ঘ্যে সাকুল্যে এক কিমি হবে ।  হোম-স্টে’র জন্য ভাড়া দেওয়া ঘরগুলি সব রাস্তার উচ্চতায়, নিচের তলায় থাকে মালিকের পরিবার । প্রত্যেকটি হোম-স্টে থেকেই আদিগন্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার অপার্থিব শোভা !  লামাহাট্টায় আমাদের বুকিং করা হয়েছিল ‘Everest Hut’ হোম স্টে – সেটি চালায় এক নেপালি পরিবার, তাশি শেরপা ও তার স্ত্রী সুশীলা, সঙ্গে তাদের বছর আটেকের কন্যা, Esther ও বছর পাঁচের পুত্র, Emanuel । তাশি ও সুশীলা সাগ্রহে জানায় আমাদের অভ্যর্থনা, আমাদের জন্য বুক করে রাখা ঘরটি খুলে দেয় । আদতে সেটি দু’টি কামরার স্যুইট – প্রথমটি ড্রইং-কাম-ডাইনিং রুম, দ্বিতীয়টি দু’টি ডাবল বেড বিশিষ্ট শোবার ঘর, সংলগ্ন বাথরুমটিও বেশ পরিস্কার । আমাদের ঘরের সামনে খোলা চাতালে বসে ধূমায়িত কফির কাপ নিয়ে অবলোকন করি দিনশেষের কাঞ্চনজঙ্ঘা, চূড়োয় তার ডুবন্ত সূর্যের সোনালি পরশ !

পরদিন আমাদের মোলাকাত পাহাড়ের রানীর সঙ্গে – এবারে তাশি আমাদের গাড়ির চালক-কাম-গাইড, সকালে লামাহাট্টা থেকে বেরিয়ে চা-বাগানের মধ্য দিয়ে আমাদের পথ । আমাদের প্রথম গন্তব্য ঘুম স্টেশনের কাছে ‘বাতাসিয়া লুপ’, যেখানে Darjeeling Himalayan Railway-এর টয় ট্রেনের লাইন ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে ট্রেনকে ১৪০ ফিট উচ্চতা লাভ করতে সাহায্য করে । বাতাসিয়া লুপে ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী কালে বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত গোর্খা সৈনিকদের শহীদ স্মারক – তার চারপাশে সুন্দর বাগিচা, অনেক বসার বেঞ্চ আর উত্তরের আকাশ জুড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতমালার সারি ! হঠাৎই স্টীম এঞ্জিনে টানা একটি টয় ট্রেন বাতাসিয়া লুপ ঘুরে দার্জিলিং স্টেশনের দিকে যায় – আমার ক্যামেরা ধরে রাখে  ছোট্ট ট্রেনটির  ছবি । এরপর ঘুম মনাস্ট্রী ঘুরে ও ছবি তুলে কাটে আমাদের কিছুটা সময় ।

অবশেষে আমরা পৌঁছই দার্জিলিং – তাশি নিচে বাজারের কাছে গাড়ী পার্ক করে, আমরা ধীরপায়ে নেহরু রোড ধরে এগোই । চোখে পড়ে সাহেবী আমলের bakery ও রেস্তোরাঁ – Glenary’s ; ১৯৩৫ সালে দার্জিলিঙে Glenary’s এর পথ চলা শুরু । দোতলা রেস্তোরাঁটির নিচের তলায় পেস্ট্রি, প্যাটিস, পিৎজার বিরাট সম্ভার নিয়ে এক bakery । সেখানে রাখা London Telephones-এর একটি ফুলসাইজ টেলিফোন বুথ । ওপরের তলায় ভারতীয়, চীনে ও কন্টিনেন্টাল খাবারের এলাহী মেনু নিয়ে এক বার-কাম-রেস্তোঁরা । Glenary’s-এর অঙ্গসজ্জা পুরোপুরি কলোনিয়াল শৈলীর । আমরা জানালার ধারে চারজনের বসার টেবিল পাই, জানালা দিয়ে দেখি দূর আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা ! লাঞ্চে আমরা কন্টিনেন্টাল মেনু থেকে ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’, ‘রোস্টেড চিকেন’ ও ‘ল্যাম্ব স্টেক উইথ ভেজিটেবলস’ অর্ডার করি । ডেসার্ট হিসাবে নেওয়া হয় ফ্রুট স্যালাড ও ব্রাউনির সাথে আইসক্রিম । Glenary’s-এ খাবারের মান এবং স্বাদ, দুইই খুব উঁচু দরের, পরিতৃপ্তিতে ভরে ওঠে সবার মন ! খাওয়া সেরে আমরা পৌঁছই মল চৌরাস্তায় ; সেদিন দুপুরে নরম রোদে দার্জিলিং করে ঝলমল – শৈলশহরের টুকরো টুকরো ছবিতে দেখি ব্লেজার পরিহিত স্কুলপড়ুয়াদের আনাগোনা, সুবেশ ট্যুরিস্টদের ‘আরও অনেককিছুই বাকি রয়ে গেল’ গোছের শপিং ও স্থানীয়দের শুধুই রোদ পোয়ানো… লাস্যময়ী পাহাড়ের রানী যেন মিটিমিটি হেসে বলে, ‘প্রেম করবি আমার সঙ্গে? আমি কিন্তু নিজেকে উজাড় করে দিতে জানি !’

তাশি পরদিন আমাদের নিয়ে চলে মিরিক লেক । পথে পড়ে ছোট গ্রাম লেপচাজগত – পাইনবন ও কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপমাধুরীতে মুগ্ধ পর্যটকদের জন্য অধুনা লেপচাজগতে অনেকগুলি ‘হোম স্টে’র ব্যবস্থা । একটু পরে আমরা পৌঁছই পাহাড়ের মাথায় জোরপোখরি, সেখানেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে GTA নির্মিত লেক পার্কের ভগ্নদশা । তবে একসারি পাইনের ফাঁকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ বড়ই সুন্দর ! এরপর আমাদের গাড়ী থামে ভারত-নেপাল বর্ডারে ; আধার কার্ড কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতেই মেলে নেপাল প্রবেশের অনুমতি – আমরা পায়ে হেঁটে কিছুদূর নেপাল থেকে ঘুরে আসি । কাছেই নেপালের শহর পশুপতি নগর, সেখানে আছে নাকি বিদেশী দ্রব্যের বিশাল বাজার ।  আমরা বাজারের প্রলোভন ছেড়ে মিরিকের পথ ধরি ।

মিরিক পৌঁছে প্রচুর ট্যুরিস্টদের ভীড়ে মনটা একটু দমে যায় যেন – লেকের পাড়ে অনেক লোকের জটলা, কাছেই অনেক খাবার দোকান, পরিবেশ তাই সেরকম পরিষ্কার নয় মোটেই । লেকের ওপর একটি ছোট সেতুতে উঠি আমরা, সেতু থেকে লেকের দৃশ্য কিন্তু বেশ মনোরম, মধ্যদিনের সূর্যের আলোয় লেকের অপর পাড়ে পাইনবনের ছায়া দীর্ঘায়ত – ঝলমলে দিনে নৌকাবিহারে ব্যস্ত অনেকেই । সেতু পেরিয়ে পাইনবনের মধ্যে পায়ে চলার পথ, লেকের পাড় ঘেঁষে হেঁটে ফিরি আমরা… লেকের একেবারে কাছেই, ‘কোলকাতা রেস্তোরাঁ’য় আড় মাছ ও গলদা চিংড়ীর ঝালের সাথে নিরামিষ থালি নিয়ে আমাদের মধ্যাহ্নভোজনটি হয় বেশ পরিপাটি ।

লামাহাট্টায় একদিন ভোরে উঠে দেখি বাদ্যগীত সহকারে ইকো পার্কে তিব্বতীদের কোনও বিশেষ পূজার আয়োজন – পার্কটি অনেক রংবেরঙের পতাকায় সাজানো । শেষবারের মত তাকিয়ে দেখি কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ, প্রায় জোর করেই সরিয়ে নিই নিজেকে । তাশি, সুশীলা ও তাদের পুত্র-কন্যার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একান্ত অনিচ্ছা সত্বেও উঠি গাড়ীতে, রওয়ানা হই আমরা ফিরতি পথে বাগডোগরার দিকে । মনে মনে বলি ফিরবো শীঘ্রই উত্তরবঙ্গে, আসতেই হ’বে এবার ডুয়ার্সের টানে…

[মাতৃ মন্দির সংবাদ, নিউ দিল্লী, এপ্রিল ২০১৭]

 

চিলিকায় চারদিন

Bottlenosed Dolphin, সাতপাড়া
সাতপাড়ায় ডলফিন
কালীজয় মন্দির-২
কালীজয় মন্দির
কালীজয় মন্দিরের পথে, বরকুল
কালীজয় মন্দিরে যাওয়ার পথে
e0a69ae0a6bfe0a6b2e0a6bfe0a695e0a6be-e0a6b2e0a787e0a695e0a787-e0a6b8e0a782e0a6b0e0a78de0a6afe0a78be0a6a6e0a79f-e0a6ace0a6b0e0a695.jpg
বড়কুলে সূর্যোদয়
চিলিকায় সূর্যাস্ত, সাতপাড়া
সাতপাড়ায় সূর্যাস্ত
চিলিকায় সূর্যাস্ত, সাতপাড়া-২
সাতপাড়ায় সূর্যাস্ত
দিনের শেষে ঘুমের দেশে... সাতপাড়া
দিনের শেষে, ঘুমের দেশে – সাতপাড়া
পান্থনিবাসের বারান্দা থেকে চিলিকা লেক, সাতপাড়া
পান্থনিবাস, সাতপাড়া থেকে চিলিকা লেক
বঙ্গোপসাগর, সাতপাড়া
সাতপাড়ায় বঙ্গোপসাগর

চিলিকা লেক ভ্রমণের সুযোগটা এলো হঠাৎই । এয়ার ইন্ডিয়ার বদান্যতায় দিল্লী থেকে ভুবনেশ্বর যাতায়াতের টিকিট পাওয়া গেল বেশ কম ভাড়ায় । হাতে সময় কম – তাই আমরা কত্তা-গিন্নী ঠিক করলাম শুধু চিলিকা দেখব এবার । বরকুলে দু’রাত্রি ও সাতপাড়ায় দু’রাত্রি – লেকের দুই ভিন্ন প্রান্ত থেকে রূপ আহরণ ! অতঃপর ওড়িশা ট্যুরিজম-এর ওয়েবসাইটে বরকুল ও সাতপাড়ায় পান্থনিবাস বুকিং ।

জানুয়ারীর শেষাশেষি ঘন কুয়াশাছন্ন দিল্লী ছেড়ে আমাদের বিমান এক ঝকঝকে সোনালী বিকেলে ভুবনেশ্বর পৌঁছল । আগে থেকেই বুক করে রাখা গাড়ী নিয়ে আমাদের চালক উপস্থিত বিমানবন্দরে । শহরের সামান্য যানজট ছাড়িয়ে আমাদের গাড়ী ছুটল সুপ্রশস্ত কলকাতা-চেন্নাই রাজপথ ধরে ভুবনেশ্বর থেকে দক্ষিণে । ছোট ছোট গ্রাম গঞ্জ পেরিয়ে, ইস্টার্ন ঘাট পাহাড়সারির গা বেয়ে ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যেই আমরা পৌঁছলাম বরকুল । আমাদের অগ্রিম বুকিং-এর কাগজপত্র দেখাতেই পাওয়া গেল একটি এসি কটেজ – ঘরটি বেশ বড়ই, সঙ্গে লাগোয়া এক চওড়া বারান্দা, কটেজের চারপাশে রঙবেরঙের মরশুমী ও গাঁদা ফুলের ছড়াছড়ি ।

ডিনারের আগে মাছ ভাজা খেতে চাইলে পান্থনিবাসের পরিবেশনকারী জানালে রুই অথবা চিলিকা লেকের ‘খংগ্যাঁ’ মাছ পাওয়া যাবে । আমরা নিলাম ‘খংগ্যাঁ’ মাছ (অনেকটা আমাদের বাটা মাছের মত) – টাটকা মাছের অবশ্য স্বাদই আলাদা ! এরপর ভাত ও চিলিকার বিখ্যাত কাঁকড়ার ঝাল দিয়ে সম্পন্ন হল নৈশাহার ।

পরদিন ভোর থাকতেই আমরা বেরিয়ে পড়ি চিলিকায় সূর্যোদয়ের টানে । পান্থনিবাসের ঠিক পেছনেই চিলিকা লেক – আদিগন্ত তার ব্যাপ্তি । কাকভোরে হালকা কুয়াশার চাদরে মোড়া চারিদিক, অতি নির্জন পরিবেশ – নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভঙ্গ করে কোনও এক মাছরাঙার ডাক ও দূরে উড়ে যাওয়া একঝাঁক হাঁসের কলকূজন !  দূর দিগন্তে দেখি কমলা রঙের ছোঁয়া – পূবাকাশ রাঙিয়ে ধীরে উঠে আসে নবীন সূর্য, তার রশ্মির পরশে সরে যায় কুয়াশার চাদর । আমার ক্যামেরার শাটার সচল হয় বিরল মুহূর্তটিকে ধরে রাখতে ।

চিলিকা এশিয়ার বৃহত্তম প্রাকৃতিক হ্রদ – প্রায় ১১৬৫ বর্গ কিমি জুড়ে তার বিস্তৃতি । উত্তরে দয়া নদী ও তার বেশ কিছু শাখা-প্রশাখা জল সরবরাহ করে হ্রদে আর চিলিকা লেকের দক্ষিণে ৩২ কিমি দীর্ঘ খাঁড়িপথ যোগাযোগ রাখে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে । জোয়ারে সমুদ্রের জল ঢোকে হ্রদে আর ভাঁটায় হ্রদের জল নিকাশিত হয় সমুদ্রে – স্বভাবতই হ্রদের জলের স্বাদ লোনা । নদী ও সমুদ্রের জলের এই অহরহ মিশ্রণে বহু বিশেষ প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী ও পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে চিলিকা লেক এক ‘biodiversity hotspot’ – জীববিজ্ঞানীদের কাছে অতি আকর্ষক স্থান !

ভারতে সবচেয়ে বেশী পরিযায়ী পাখির সমাগম হয় চিলিকায় – সুদূর রাশিয়ার কাস্পিয়ান, বৈকাল হ্রদ ও সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং মঙ্গোলিয়া থেকে উড়ে আসে পাখির দল । পরিসংখ্যান জানাচ্ছে শীতকালে প্রায় দশ লক্ষ পাখির আস্তানা হয় চিলিকা লেক ! প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ, ২৮ প্রজাতির চিংড়ি মাছ ও ৩৪ রকমের কাঁকড়া পাওয়া যায় চিলিকায় । সমুদ্র পথে চিলিকায় প্রবেশ করে বাঙালীর অতি প্রিয় ইলিশ মাছও । এছাড়া পাওয়া যায় দু’রকমের ডলফিন – ‘Irrawaddy Dolphins’ যার দেখা মেলে মায়ানমারে ইরাবতী নদীতে ও ‘Bottlenose Dolphins’ । মাছের লোভে এক বিশেষ ধরণের   Otter বা ভোঁদড় বাসা বাঁধে লেকের ধারে । চিলিকায় বিপুল মাছের সম্ভার জীবিকা নির্বাহে সাহায্য করে প্রায় দেড় লক্ষ মৎসজীবির ! আন্তর্জাতিক জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য ‘Ramsar Convention’ অনুযায়ী ১৯৮১ সালে নথিকৃত হয় চিলিকা লেক ।

পান্থনিবাসের রেস্তোরাঁয় পুরি-সবজি সহযোগে সারা হল আমাদের প্রাতরাশ । আমরা বেরিয়ে পড়ি ‘কালীজয় মন্দির’-এর উদ্দ্যেশে । ওড়িশা ট্যুরিজম-এর সাতজন বসার উপযোগী মোটর চালিত ফাইবার গ্লাসের নৌকা – পুরো নৌকাটাই ভাড়া করি আমরা দু’জন । জেটি ছাড়িয়ে ধীরে এগিয়ে চলে আমাদের নৌকা, কিছুক্ষণের মধ্যে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয় বরকুলের কিনারা । মোটর চালিত কাঠের দেশী নৌকা (ভুটভুটি) নিয়ে দলে দলে চলেছেন স্থানীয় দর্শনার্থী, সবারই গন্তব্য কালীজয় মন্দির । মাঝে মাঝে আমাদের অতিক্রম করে স্পীডবোট – তাদের দ্রুত গতিতে ওঠে ঢেউ আর আমাদের নৌকা মোচার খোলার মত নাচে ! প্রায় ৪৫ মিনিটের রাস্তা জলপথে পেরিয়ে আমরা পৌঁছই একটি দ্বীপে, যেখানে মুখ্য আকর্ষণ কালীজয় মন্দির । জেটির কাছেই ছোট মন্দিরটি, উজ্জ্বল রঙে রাঙানো । দশমহাবিদ্যার প্রথম অবতার কালীমাতার মন্দির – স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে তাঁর অসীম মাহাত্ম্য । সামান্য উপচার নিয়ে পূজা দেন সবাই, আবার অনেকে দেখি সপরিবারে মন্দিরের সামনে বসে পুরোহিত সহযোগে মন্ত্রোচ্চারণে করেন পূজা নিবেদন । মন্দিরের চারপাশে ঘুরে আর চিলিকা লেকে রোদের ঝিকিমিকি দেখে কেটে যায় কিছুটা সময় । আমরা ফিরে চলি বরকুলের পথে । বরকুলে এক ছোট রেস্তোরাঁয় আমরা অর্ডার করি নিরামিষ থালি ও চিংড়ীর ঝাল । এক একটি প্লেটে চারটি মাঝারি সাইজের বাগদা চিংড়ী, দাম প্লেট প্রতি ১২০ টাকা – অবিশ্বাস্য !

পরদিন আমাদের গন্তব্য সাতপাড়া – স্থানীয় লোকেরা বলে বরকুল থেকে ভুটভুটি নিয়ে চলে যান, ঘন্টা তিনেক লাগবে । সাতপাড়া চিলিকা লেকের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, বরকুল থেকে আড়াআড়ি ভাবে পেরোতে হবে লেক ।  আমাদের সাহসে কুললো না, আমরা একটি গাড়ী ভাড়া করে চললাম স্থলপথে । প্রায় ঘন্টা চারেক পরে সাতপাড়ায় পান্থনিবাসের চত্বরে আমাদের গাড়ী প্রবেশ করলে । অগ্রিম বুকিং-এর দৌলতে আমরা সহজেই পেয়ে গেলাম একটি এসি সুইট – ঘরটি বেশ বড়, আসবাবপত্র বেশ আধুনিক, বাথরুমটিও পরিষ্কার । ঘরের পেছনে টানা বারান্দায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে অদূরে চিলিকা লেকের শোভা ।

পরদিন ২৬শে জানুয়ারী, পুরী থেকে দলে দলে বাঙালী পর্যটক এসেছেন সাতপাড়ায় ওড়িশা ট্যুরিজম-এর একদিনের প্যাকেজ ট্যুরে – ব্রেকফাস্টের পর পুরী থেকে বেরিয়ে সাতপাড়ায় ঘন্টা তিনেক নৌকা বিহার, পান্থনিবাসে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে সন্ধ্যার মধ্যে পুরী প্রত্যাবর্তন । রেস্তোরাঁয় বেজায় ভীড়, বসার জায়গা পাওয়াই মুস্কিল – খাবার অর্ডার সামলাতে হিমশিম সবাই । এসবের মধ্যেই পান্থনিবাসের ম্যানেজারবাবু যত্ন সহকারে আমাদের জন্য ব্যবস্থা করেন নিরামিষ থালি ও কাঁকড়ার ঝাল!

বিকেল চারটের মধ্যেই সাতপাড়া খালি – সকালে আসা ট্যুরিস্টরা সবাই গেছেন ফিরে । আমরা দু’জন পায়ে হেঁটে পৌঁছই পান্থনিবাস থেকে স্বল্প দূরেই Chilika Development Authority-র তৈরি ইকো পার্কে – লেকের ধারেই সুন্দর পার্ক, অনেক গাছপালা ও ছড়ানো ঘাসের লন দিয়ে সবুজায়নের প্রচেষ্টা । পার্কের ভেতরে গ্লাস হাউসে সংরক্ষিত এক বিশালাকায় Blue Whale (তিমি)-এর কঙ্কাল । পার্ক থেকে বেরিয়ে দশ টাকার টিকিট কেটে আমরা প্রবেশ করি Chilika Information Centre-এ । সেখানে চিলিকা লেকের প্রাণী ও উদ্ভিদ জগত (flora & fauna) নিয়ে একটি ছোট প্রদর্শনী । কেয়ারটেকার আমাদের ডেকে নিয়ে বসায় ছোট প্রেক্ষাগৃহে, আমরা দেখি চিলিকা লেকের অনেক তথ্যসমৃদ্ধ প্রায় আধ ঘন্টার একটি চিত্তাকর্ষক ফিল্ম ।

পান্থনিবাসে আলাপ হয় এক বিদেশী দম্পতির সঙ্গে, তাঁরা এসেছেন সুদূর ক্যানাডার টরন্টো থেকে । আমাদের কন্যা ক্যানাডায় উচ্চশিক্ষারত জেনে তাঁদের খুব আনন্দ; সাদরে আমন্ত্রন জানান আমাদের ক্যানাডায় ।  ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত কম্প্যুটার ইঞ্জিনীয়ার – হাতে সময় অফুরন্ত, তাই ভারত সফরে এসেছেন তিনমাসের জন্য । পুরী থেকে এসেছেন সাতপাড়া, এরপর বরকুল, রম্ভা হয়ে গোপালপুর-অন-সী; কলকাতা ফিরে গিয়ে সেখান থেকে যাবেন আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে । এরকম বল্গাহীন ভ্রমণ, প্রৌঢ় বিদেশী দম্পতির প্রতি মৃদু হিংসে হল যেন আমাদের !

পরদিন সকালে ঠিক করলাম চিলিকা লেকের sea-mouth দেখতে যাব । পান্থনিবাসের ম্যানেজারবাবু, মিঃ কর জানালেন সেদিন পুরী থেকে আসা ট্যুরিস্টদের সংখ্যা বেশী নয়; ওড়িশা ট্যুরিজম-এর নৌকায় আমাদের দু’জনের স্থান সঙ্কুলান হবে সহজেই । অতঃপর কুড়িটি আসন বিশিষ্ট মোটর চালিত ফাইবার গ্লাসের নৌকা সকাল সাড়ে দশটায় আমাদের নিয়ে ভাসল লেকের বুকে । জেটি থেকে বেরিয়ে দেখি মাঝে মাঝেই বাঁশের কঞ্চি ও নাইলনের জাল দিয়ে লেকের অনেকটা জায়গা ঘিরে মাছের চাষ, এখান থেকেই আসে সুস্বাদু বাগদা চিংড়ীর যোগান । আমাদের নৌকা সাবধানে সেসব ঘেরা জায়গা এড়িয়ে চলে, একটু এগিয়েই মাঝি বলে, ‘ঐ দেখুন ডলফিন’ – আমরা দেখতে পাই বিরল Irrawaddy Dolphin । কখনও জলের ওপর মুখ তুলে অক্সিজেন নিয়েই আবার জলে প্রবেশ, কখনও তিন-চারটি ডলফিনের দল জলের ওপর ডিগবাজি খায় মনের সুখে – প্রকৃতির আঙিনায় প্রাণের আনন্দ লীলা ! আমরা খুব কম করেও ১০-১৫ টি ডলফিন দেখলাম ।    Chilika Development Authority-র চিলিকা লেক সংরক্ষণের বিশেষ প্রকল্পে ভালো ফল পাওয়া গেছে – ইদানীং মাছ ও ডলফিন, দুইয়েরই সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে অনেক । আর এই ডলফিন দেখতে সাতপাড়ায় ঢল নেমেছে পর্যটকদের  যা স্থানীয় অর্থনীতিকে করছে চাঙ্গা ।

প্রায় একঘন্টা লেকে ভাসতে ভাসতে আমাদের নৌকা অবশেষে নোঙর করলো রাজহংস দ্বীপে । দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬০ কিমি রাজহংস দ্বীপ চিলিকা লেক ও বঙ্গোপসাগরের  মাঝে এক ‘sand bar’ যার পূব দিকে sea-mouth বা সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী খাঁড়ি । নৌকা থেকে নেমেই একসারি দোকান – টাটকা মাছ ভাজা ও ঠান্ডা বিয়ারের প্রলোভনে পর্যটক আকর্ষণের চেষ্টা । একজন দেখি শুক্তি ভেঙে চকচকে মুক্তো, লাল রঙের চূনী ও সবুজ রঙের পান্না বার করছে, সবই নাকি ন্যাচারাল ! কিছু পর্যটক বিশ্বাস করে কিনেও ফেললেন সেসব মণি-মাণিক্য । আমরা বালিয়াড়ি ঠেলে এগিয়ে চলি সমুদ্রপানে । কিছুদূর এগিয়েই শুনতে পাই সমুদ্রের গর্জন, তারপরেই চোখে পড়ে নয়নাভিরাম বঙ্গোপসাগর – তার অশান্ত, দুর্বার ঢেউ আছড়ে পড়ে বালুকাবেলায় ।

ফিরে আসি সাতপাড়া – বেলা প্রায় আড়াইটে, আমাদের পেটে খিদের মোচড় । পান্থনিবাসের পাশেই  আমরা আবিষ্কার করি এক রেস্তোরাঁ । অর্ডার করি সরু চালের ভাত, মুগের ডাল, আলু-কপির তরকারি এরপর মাছ – একটি বড় প্লেট জুড়ে আস্ত খংগ্যাঁ মাছের অতি সুস্বাদু ঝাল । মৎস্য প্রেমিকদের কাছে চিলিকা স্বর্গ বিশেষ !

সেদিন বিকেলে আবার ফিরে যাই সাতপাড়ার জেটিতে – সূর্যাস্তের সময় নৌকা বিহারের লোভে । জগন মাঝির ভুটভুটি নৌকা ভাড়া নিই আমরা এক ঘন্টার জন্য । সে আমাদের নিয়ে যায় তীর থেকে দূরে লেকের বুকে – শান্ত, সমাহিত চিলিকা লেক, নৈঃশব্দের আর এক সংজ্ঞা যেন । দেখি এক পানকৌড়ি বাঁশের খুঁটির ওপর বসে জিরোয়, একাকী সী গাল প্রতিক্ষা করে দিনশেষের । দূর আকাশে বকের দল উড়ে চলে তাদের নীড়ের খোঁজে ।  ডিমের কুসুমের মত সূর্যের নরম সোনালি আলোর প্রতিফলন লেকের জলে ।

চারদিনের সফরে চিলিকা করেছে চমৎকৃত – বিদায় বেলায় আমাদের বুক ভারী, শ্লথ গতি । মনকে দিই সান্ত্বনা, ‘আবার আসিব ফিরে’ চিলিকার টানে ।

[মাতৃ মন্দির সংবাদ, জুলাই ২০১৬]