পথের সাথী…

অনিন্দ্য রায় কলকাতা ছেড়েছে বেশ কিছু বছর…যাদবপুরে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে এক বহুজাতিক কোম্পানীতে শাঁসালো মাইনের চাকরি নিয়ে তার পুণায় আসা । মেধা ও কর্মনিষ্ঠার জোরে কোম্পানী বেশ তাড়াতাড়িই অনিন্দ্যকে ম্যানেজার করেছে, কয়েক বছরের মধ্যেই আমেরিকা ও ইউরোপে দু’বার পাঠিয়েছে লম্বা এসাইনমেন্টে । সে এক নিরলস কর্মী, কাজে বড়ই ব্যস্ত … সুদর্শন অনিন্দ্য’র বয়স প্রায় তিরিশ ছুঁইছুঁই, কিন্তু বিয়েটা তার করা হয়ে ওঠেনি এখনও । আর তাছাড়া বিয়ের উদ্যোগটাই বা নেবে কে? অনিন্দ্য তার মা’কে হারিয়েছে ক্লাস টেনে পড়ার সময়, জামশেদপুরে বাবা থাকেন একা, তিনি বার কয়েক বলে ছিলেন; কিন্তু অনিন্দ্য ‘কাজের চাপ আছে’, ‘ছুটি পাবনা এখন’ ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিয়েছে এতদিন… অফিসে অনেক মহিলাই তার বেশ গুণমুগ্ধ, কয়েকজন বলেও ফেলেছে উইকেন্ড-এ দু’জনে লাঞ্চ বা ডিনার করতে গেলে কেমন হয় গোছের কথা, অনিন্দ্য মুচকি হেসে এড়িয়ে গেছে, মনের গভীরে তার কমিটমেন্টের কোনও অভাব কাজ করে বোধহয়…

ইদানীং অনিন্দ্য ঢুকেছে ফেসবুকে, জামশেদপুরের Loyola School ও যাদবপুর মিলিয়ে তার বন্ধু সংখ্যা বেশ ভালোই, এছাড়াও আছে তার কিছু তুতো ভাই-বোন… অনিন্দ্য হ’ল যাকে বলে নীরব দর্শক, সে মন দিয়ে অন্যদের দেশ-বিদেশ বেড়ানোর, জন্মদিনের কেক কাটার ছবি দেখে, বন্ধুদের বিবাহবার্ষিকীতে গদগদ ভাষায় তাদের বৌ’দের প্রশংসা বেশ বোকা-বোকা লাগে তার আবার কিছু বন্ধুদের হাস্যরসাত্মক লেখায় সে মজাও পায় বেশ… কিন্তু ঐ পর্যন্তই, অনিন্দ্য কোনও কমেন্ট করেনা, আর নিজে কোনও পোস্ট করা তো দূরের কথা ! এক শুক্রবার রাত দশটায় ডিনার সেরে ল্যাপটপ খুলে বসেছে অনিন্দ্য, অনেকদিন ধরে ভাবছে কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়, অনেক ছুটি তার পাওনা, দিন পনেরো ছুটি কোম্পানী খুব খুশী হয়েই দেবে কাজপাগল লোকটাকে একটু বিশ্রাম দিতে… কিন্তু একা একা বেড়াতে যাওয়াটা যে খুব বোরিং ব্যাপার, তার প্রায় সব বন্ধুদেরই বিয়ে হয়ে গেছে, কেই বা বৌ-বাচ্চা ছেড়ে তার মত ব্যাচেলরকে সঙ্গ দেবে, কি যে উপায়? তার অনেকদিনের শখ সাউথ-ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোয় যাওয়ার – থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি… ব্যাকপ্যাকিং-এর একেবারে আদর্শ জায়গা সব !

অনিন্দ্য ফেসবুকে দেখে ছোট্ট একফালি বিজ্ঞাপন, ‘Don’t travel alone… look for your travel buddies… বিজ্ঞাপনে আরও লেখা, ‘Register yourself for ideal travel mates…roam around the world in great company’. একটু অবাক হয়ে অনিন্দ্য সেই ওয়েবসাইটে ক্লিক করে – এতো মজার ব্যাপার, পৃথিবীতে অনেকেই তার মত একা, তারা ভ্রমণসঙ্গী খুঁজছে অথবা চাইছে কোনও ভ্রমণার্থী দলে ভিড়তে… অনেকটা খেলার ছলেই অনিন্দ্য রেজিস্টার করে নিজেকে, ‘Techie (30) working for MNC in Pune, India… love backpacking, swimming & photography… looking forward to meeting the travel buddy for a two-week holiday somewhere in SE Asia’… তারপর যথারীতি ফেসবুকের পাতা উল্টে, নিজের কিছু মেইল চেক করে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ শুতে যায় অনিন্দ্য…

সকাল ছ’টা নাগাদ পুণাতে সবে একটু আলো ফুটেছে পূবাকাশে, টুং করে মোবাইল জানালো অনিন্দ্য’র একটা মেইল এসেছে… চশমাটা পরে মেইলটা দেখে সে, ‘Hi, it’s Karen here…Karen Martin (27) from Sydney, NSW… planning a backpacking trip for about two weeks to Bali in March… would be happy to join you buddy’… অনিন্দ্য ফেসবুকে গিয়ে Karen Martin-এর প্রোফাইল চেক করে, দেখে ক্যারেন University of New South Wales থেকে কেমিস্ট্রি নিয়ে M.Sc করেছে, সিডনী-তে সে এক কেমিক্যাল ল্যাবোরেটরিতে কাজ করে Senior Analyst হিসেবে… অনিন্দ্য প্রথমে ক্যারেন-কে friend request পাঠায়, আধঘন্টার মধ্যেই ক্যারেন তার ফেসবুকের বন্ধু হয়…

বালি যাওয়ার প্ল্যান নিঃশব্দে সেরে ফেলে অনিন্দ্য, শুক্রবার রাতে বম্বে থেকে সাড়ে পাঁচ ঘন্টায় কুয়ালা লামপুর, তারপর সেখান থেকে প্রায় ঘন্টা তিনেক পর শনিবারের এক ঝকঝকে সকালে বালি’র ডেনপাসার বিমানবন্দরে পৌঁছয় অনিন্দ্য… ক্যারেন বলেছিল আধঘন্টা আগেই পৌঁছে যাবে ও সিডনি থেকে, অপেক্ষা করবে এয়ারপোর্টের বাইরে অনিন্দ্য’র জন্য … বালিতে ভারতীয়দের বিশেষ খাতির, ‘Visa on arrival’, ৩৫ ডলার ফি জমা করে একমাসের ভিসা পেয়ে যায় অনিন্দ্য, কাস্টমস পেরিয়ে এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে বেরোতেই অনিন্দ্য শোনে, ‘Hi Ani’… দেখে একমুখ উজ্জ্বল হাসি নিয়ে ক্যারেন দাঁড়িয়ে, সে বলে, ‘Hey, how was your flight? Any interesting co-passenger?’ অনিন্দ্য বলে, ‘No such luck buddy, a fat guy on the next seat… he was snoring so badly’… দু’জনেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে এবার… বালি ভ্রমণের খুঁটিনাটি সব প্ল্যান করেছে ক্যারেন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে, কাজে ব্যস্ত অনিন্দ্য এ ব্যবস্থায় খুব খুশী । এয়ারপোর্ট থেকে কাছেই কুটা নামের এক জায়গায় সমুদ্রের ধারে রিসোর্ট-এ দু’টো ঘর বুক করেছিল ক্যারেন, পাসপোর্ট দেখাতেই পাওয়া গেল ঘরের চাবি … বেশ উঁচুমানের কমপক্ষে চার তারকা মার্কা রিসোর্ট, কিন্তু অনিন্দ্য দেখে দেশের তুলনায় দাম অনেক কম…

শুরু হয় তাদের বালি ভ্রমণ… আদ্যন্ত এডভেঞ্চার স্পোর্টস পাগল ক্যারেন এক উচ্ছল অস্ট্রেলিয়ান তরুণী – সমুদ্রে উইন্ড সার্ফিং, প্যারাসেলিং, স্নর্কেলিং, স্কুবা ডাইভিং এসবে তার বিশেষ আগ্রহ… সকাল ছ’টায় ইন্টারকমে ফোন আসে তার, ‘Ani, get ready in 15 minutes. Let’s go jogging on the beach’. কুটার সমুদ্রসৈকতে প্রায় একঘন্টা দৌড়ে অনিন্দ্য তো গলদঘর্ম… অফিসের ঠান্ডাঘরে বসে মগজমারি করে সে, ক্যারেনের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে অনিন্দ্য… একটু একটু করে জানতে পারে সে ক্যারেনকে; ওর বাবা নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশে এক ছোট শহরে প্রাইমারী স্কুলের টীচার আর মা এক অতিনিষ্ঠ হোমমেকার; আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই তাদের প্রথম বিয়ে বছর ৩৫ আগের… ক্যারেনের দাদা ও বৌদি দু’জনেই ডাক্তার, দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তারা থাকে সিডনিতেই; ভাইপো-ভাইঝি দু’জন ক্যারেন-এর বিরাট ফ্যান, প্রায় প্রতি উইকএন্ড-এই ক্যারেন তার দাদার বাড়ি চলে যায় । বাচ্চাদের বড়ই ভালোবাসে ক্যারেন, অন্যান্য দেশে শিশু অধিকার, তাদের প্রতি অবিচার এসব নিয়ে অনেক পড়াশোনা তার । ভারতে শিশুদের প্রতি জঘন্য সব অপরাধের ঘটনা সবই তার জানা, এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে ক্যারেন… অনিন্দ্য বলতে বাধ্য হয়, ‘Hey Karen, please stop this now. I’m no child molester… I simply adore kids’. মাঝে মাঝে একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করে তারা; অনিন্দ্য বলে, ‘Karen, aren’t we just wasting our money? We can save big time if we share room in the hotel… I don’t snore much’. ক্যারেন জবাব না দিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায় । কোনওদিন আবার ক্যারেন বলে, ‘Ani, you have a funny name. It sounds like calling you as Honey’… হো হো করে হেসে ওঠে ওরা দুজন ।

অনিন্দ্য ও ক্যারেন বালির সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে যায়, একদিন ওরা যায় কিন্তামনি – কিছুটা গাড়িতে আর অনেকটাই ট্রেক করে ওরা পৌঁছয় ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি ‘মাউন্ট বাটুর’… পাহাড়ের চূড়ো থেকে নীচে ‘লেক বাটুর’-এর শোভা বড়ই মনোরম… কোনও দিন আবার ওরা ঘুরে বেড়ায় ‘উবুদ’, অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে মধ্য বালির এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল; উবুদ নানারকম শিল্পকলা ও বালিনীজ্ নৃত্যগীতের কেন্দ্রস্থল । অনেক পর্যটকের, বিশেষত ‘ব্যাকপ্যাকার’ দের আস্তানা সেখানে । রাস্তার দুধারে ওরা দেখে বড় বড় আর্টগ্যালারিতে আঁকা ছবি, কাঠ ও পাথরের ভাস্কর্যের সম্ভার, অসংখ্য বুটিক হোটেল, ইউরোপীয় খানার রেস্তোরাঁ ও কাফে । ওরা থামে ‘তেগালালাং’ গ্রামে – ক্যামেরায় বন্দী করে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধানচাষের (terrace farming) দৃশ্য । ‘তাম্পাক সিরিং’ গ্রামে ওরা যায় ‘তির্তা এম্পুল’ (পবিত্র প্রস্রবণের মন্দির) দেখতে – মন্দিরটির একপাশে সবুজ পাহাড়, চত্বরে অনেকগুলি ছোট মন্দির, দীর্ঘ ও প্রাচীন গাছের ছড়াছড়ি, একটি বেশ বড় ও কয়েকটি ছোট ছোট জলাশয় – পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা এক প্রস্রবণই এই জলের উৎস । দেখে আসে ওরা সমুদ্রতীরে ‘পুরা টানা লট’, ভাষান্তরে ‘সমুদ্রে ভাসমান মন্দির’; বালির দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে হিন্দু জলদেবতা বরুণ বন্দনার মন্দির, তীর থেকে অল্প দূরে এক ছোট্ট দ্বীপে । ভাঁটার সময় সমুদ্রের জল যায় সরে, হেঁটে পৌঁছনো যায় মন্দির চত্বরে ।নীচে থেকে প্রায় দৌড়ে পৌঁছে যায় ক্যারেন পাহাড়ের মাথায় ‘উলুওয়াটু’ মন্দিরে – বালির একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে এক পাহাড়ের শীর্ষে মন্দিরটি, খাড়াই ‘ক্যানিয়ন’-এর নীচে নীল-সবুজ রঙ মেশানো ভারত মহাসাগরের আছড়ে পড়া ঢেউ – বড়ই মনোমুগ্ধকর !

দেখতে দেখতে কেটে যায় দু’টো সপ্তাহ, ফিরে যাওয়ার আগের দিন এক পড়ন্ত বিকেলে অনিন্দ্য ও ক্যারেন পৌঁছয় ‘জিম্বারন বীচ’ – সূর্যাস্তের পর সমুদ্রের পাড়েই সী-ফুড ডিনার সেরে নেবে তারা । রক্তিম গোলাকৃতি সূর্যদেব ধীরে এগিয়ে চলেছেন দিক চক্রবাল পানে – সমুদ্রে ঠোঁট ছোঁয়ালেন সুয্যিমামা – আকাশে লালিমার পরশ, একদল পাখির ঘরে ফেরা – পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছিল ওরা সূর্য ডোবার পালা… অনিন্দ্যর আঙুলে ক্যারেনের আঙুলের ছোঁয়া, ক্যারেন বলে, ‘Ani, I would like to visit India… would love to explore your country with you dear’. অনিন্দ্য নীচু স্বরে জবাব দেয়, ‘Karen, please don’t visit India…come over to stay back forever’… ডুবন্ত সূর্যের অস্তরাগে চারটি চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে যেন… ক্যারেনকে বুকে টেনে নেয় অনিন্দ্য নিবিড় আলিঙ্গনে…

After the sunset @ Kuta
After the sunset, Kuta
Advertisements

পণ্ডিচেরীর পোস্টকার্ড

‘সময়কে দিন বিরতি’, পণ্ডিচেরী ট্যুরিজম-এর বিজ্ঞাপনে চোখটা আটকে গেল – আমার মত শহুরে ঘুনপোকাদের জন্য এ যেন অন্তহীন আলস্যে ডুব দেওয়ার ডাক! তাই মার্চমাসে ছেলে-মেয়ের পরীক্ষান্তে, আমরা চারজনে পন্ডিচেরী অভিমুখে রওনা দিলাম – সময় থামানো ছুটির নেশায়।

চেন্নাই থেকে ইস্ট কোস্ট রোড ধরে পন্ডিচেরীর দুরত্ব ১৫০ কিমি, রাস্তা খুবই সুন্দর, বঙ্গোপসাগরের প্রায় ধার ঘেঁষে। সমুদ্রের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছলাম মহাবল্লিপুরম যার নাম অধুনা মামল্লপুরম। আমরা থামলাম মামল্ল হোটেলে; সদ্য তৈরী ধোঁয়া বেরোনো ইডলি-দোসার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্বর দিয়ে প্রাতঃরাশ – হোটেল মামল্লর জনপ্রিয়তা ভালোই, দক্ষিণী ট্যুরিস্টদের উপচে পড়া ভীড়।

মহাবল্লিপুরমের প্রথম দ্রষ্ট্যব্য সমুদ্রতীরে পরিত্যক্ত বিষ্ণুমন্দির – মন্দিরের ভেতরে অর্ধশায়িত বিষ্ণুমূর্তি, এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খ্রিস্টাব্দ নয় শতাব্দীতে বিজয়নগরের রাজবংশ। কালের প্রকোপে মন্দিরের ভগ্নদশা; ২০০৫ সালের সুনামির তান্ডবেও মন্দিরটি বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর্কীয়লোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (ASI) রক্ষনাবেক্ষনের কিন্তু প্রশংসা করতে হয় – মন্দিরের চারপাশের পরিবেশ সৌন্দর্যায়ন, সী-বীচের দেখভাল, বিরাট গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা, মন্দিরের প্রভূত সারাইকাজ সবই চলছে ASI -এর দৌলতে। বিষ্ণুমন্দিরের একটু দূরেই আরও পাঁচটি মন্দির – পঞ্চপান্ডবের রথ নামে পরিচিত, স্যান্ডস্টোনের তৈরী মন্দিরের গায়ে বিভিন্ন দেবদেবী, হাতি, ঘোড়া ও গাভীর খোদাইকরা মূর্তি। সামুদ্রিক আবহাওয়ার ঝড়ঝাপটায় ক্ষয়িষ্ণু সব ভাস্কর্য।

পায়ে হেঁটে একটু এগোলে চোখে পড়বে এক ছোট পাহাড়ের গায়ে বিশাল এক ভাস্কর্য – যার পরিচিতি, ‘অর্জুনের তপস্যা’। অনেক সাধু-সন্ত, রাজা-রাজড়া, পশু-পাখি সবাই অর্জুনের সঙ্গে একমনে তপস্যারত – ঐ বিশালাকায় ভাস্কর্যের মাপজোক একেবারে নিখুঁত। ভাস্কর্যটির নামকরণ নিয়ে দ্বিমত আছে – কেউ বলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুনের ‘পাশুপত’ অস্ত্র পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা এই ভাস্কর্যের থিম; আবার কারোর মতে ভগীরথের মর্ত্তে গঙ্গা আনার সাধনাই এখানে বিমূর্ত হয়েছে। ভাস্কর্যের একেবারে ওপরে যেন এক নদীর ধারা দ্বিতীয় থিওরী-টাকেই বেশি পুষ্ট করে। এরপরেই টিপিক্যাল ট্যুরিস্টদের ভীড় শ্রীকৃষ্ণের মাখনমন্ডের (butterball) চারপাশে, এক বিশাল গোলাকার বোল্ডার বেশ ভয়ংকর ভাবে পাহাড়ের ওপরে একচিলতে জায়গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বহু লোকের ঠেলাঠেলিতেও নড়ছেনা একচুল!

মহাবল্লিপুরম থেকে পন্ডিচেরী প্রায় ১০০ কিমি দূরে; আমাদের গাড়ী ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই পণ্ডিচেরী শহরে ঢুকলো। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয় পণ্ডিচেরী তামিলনাডুর কোনও এক সম্পন্ন জনপদ কিন্তু শহরের ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার-এ প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পন্ডিচেরীর ঐতিহ্যময় অতীতের দৃষ্টান্ত।  ছড়ানো ছেটানো প্রাক্তন চারটি ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরীর চার জেলা, যার কেন্দ্র পন্ডিচেরী। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী পন্ডিচেরী থেকে ১৫০ কিমি দক্ষিনে ‘কারাইকাল’ আর ৮৭০ কিমি উত্তরে ‘ইয়ানাম’; চতুর্থ জেলা ‘মাহে’ আরব সাগরের তীরে পন্ডিচেরী থেকে প্রায় ৬৫০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখতে পাই ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৭৩ সালে পন্ডিচেরী আসে বাণিজ্যের হাত ধরে; ধীরে ধীরে পত্তন হয় ফরাসী শাসনের । ১৬৯৩ থেকে ১৬৯৯ সাল অবধি পন্ডিচেরী ছিল ডাচ দখলে, এর পরবর্তী ১৫০ বছর ধরে ফ্রেঞ্চ ও বৃটিশের হাতবদল হতে থাকে পন্ডিচেরীর শাসনভার। ১৮৫৭ সালে যখন ভারতের মূল ভূখন্ডে আধিপত্য বিস্তার করে ব্রিটিশ শাসন, ফরাসী ঔপনিবেশিকতাও ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় পন্ডিচেরী, কারাইকাল, ইয়ানাম, মাহে আর আমাদের চন্দননগরে। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পর ভারত সরকার সক্রিয় হয় এইসব উপনিবেশ অধিগ্রহন করতে। ১৯৪৯ সালে চন্দননগর হয় ফরাসী শাসনমুক্ত, এরপর ১৯৫৪ সালে বাকি উপনিবেশগুলি যোগ দেয় ভারত যুক্তরাজ্যে। ১৯৬৩ সালের জুলাই মাসে পন্ডিচেরী পৃথক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পায়।

উত্তর থেকে দক্ষিনে বয়ে চলা একটি সুপরিসর ক্যানাল পন্ডিচেরী শহরকে করেছে দ্বিখন্ডিত – ফ্রেঞ্চ আর তামিল কোয়ার্টার-এ। সাহেবদের বসবাসের জন্য চিহ্নিত ফ্রেঞ্চ অংশ শুধু সুপরিকল্পিতই নয়, সমুদ্রতীরের কাছে বলে সুন্দরও খুবই। শহরের এই অংশেই সব সরকারি অফিস, মিউজিয়াম, হাসপাতাল, এমনকি অরবিন্দ আশ্রমও। Rue Francois Martin, Rue Bussy, Rue Romain Roland…নামাঙ্কিত রাস্তাগুলি পন্ডিচেরীর ফরাসী উপনিবেশের নীরব সাক্ষী; দুপাশে পুরোনো আমলের villa – বড় বড় কাঠের দরজা, নকশাদার cast iron-এর বিরাট গেট, ছোট ছোট থামে ঘেরা ব্যালকনি, সময় সত্যিই যেন থমকে গেছে পন্ডিচেরীতে! আমার ক্যামেরার শাটার হল সচল, এক টুকরো ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টায়।   বেশ কিছু পুরোনো বাড়ী সংস্কার করে তৈরী হয়েছে ব্যুটিক হোটেল, রেস্তোরাঁ আর গেস্টহাউস…বিদেশী ট্যুরিস্টর ভীড়ই বেশী।

ফরাসী খাবারের খোঁজে লাঞ্চে আমরা পৌঁছলাম Suffren Street-এ রন্দেভু (Rendezvous)-তে; রেস্তোরাঁটি ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার-এ একটি পুরোনো বাড়ীতে। একতলায় কাঠের থাম, বিশাল মাটির পাত্র, ঘোড়াগাড়ীর চাকা এসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে; দোতলায় বাঁশ ও নারকোল পাতায় ঢাকা ছাদে খাবার জায়গা। রন্দেভুর খাবার তারিফ যোগ্য – আমাদের পছন্দের সীফুড ও চিকেন-এর sizzler তারসঙ্গে oyster baked with cheese মন দিল ভরিয়ে, আর শেষে dessert, ‘death by chocolate’ দেখলাম বেশ উপভোগ করলো ছোটরা। এরকম একটা গুরুভোজের পর দিবানিদ্রা অবশ্যম্ভাবী ! সূর্য যখন প্রায় অস্তমিত, আমরা পৌঁছলাম পন্ডিচেরীর promenade-এ, সমুদ্রের ধারে চওড়া রাস্তা – স্থানীয় মানুষ ও ট্যুরিস্টদের ভীড়। নানারকম খাবারের স্টল, হস্তশিল্প প্রদর্শনী, টুরিস্টদের জন্য টুকিটাকি, সব মিলিয়ে যেন এক মেলা প্রাঙ্গন ।

খাদ্যরসিকদের পন্ডিচেরী ভালো লাগবে খুবই; ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার-এর অলিতে গলিতে অনেক রেস্তোরাঁ, কারোও বৈশিষ্ট খাঁটি ফ্রেঞ্চ, কারোওবা creole (ভারতীয় রান্নায় প্রভাবিত ফরাসী খানা)। আমরা এক ইতালিয়ান Pizzeria খুঁজে পেলাম, যেখানে কাঠের আগুনে pizza বেক করা হচ্ছে। ডিনারে আমরা গিয়েছিলাম Hotel de l’Orient এ, এক প্রাচীন প্রাসাদোপম বাড়ীতে – হোটেলটি এখন চালায় দিল্লীর Neemrana Group। রেস্তোরাঁটি বাড়ীর বাইরে বাগানে, খোলা আকাশের নীচে, চারপাশে গাছ-গাছালি, মৃদু আলো ও live band-এ পাশ্চাত্ত্য সঙ্গীত – বেশ এক মায়াবী পরিবেশ! আমরা অর্ডার করলাম creole খাবার – crab soup, squid vindaloo আর dessert-এ chocolate mousse ও chocolate torte।

Promenade সংলগ্ন সী বীচ সে রকম উপভোগ্য না হলেও, পন্ডিচেরীতে কিন্তু সুন্দর সী বীচের অভাব নেই। পরদিন আমরা গেলাম পন্ডিচেরীর ৮ কিমি দক্ষিনে Chunnambar Water Sports Centre-এ, এখানে চুন্নাম্বার নদী সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে আর নদী মোহনার পাশেই Paradise বীচ। মোটরবোটে চুন্নাম্বার নদীপথে মিনিট ১৫ লাগে – নদীর দুধারে ঘন সবুজ জঙ্গল, আকাশে বকেদের ইতিউতি ওড়াউড়ি, মোটরবোটের চারপাশে রুপোলী মাছেদের নৃত্য দেখতে দেখতে আমরা Paradise বীচে পৌঁছলাম। এখানে বঙ্গোপসাগরের সুশান্ত রূপ, খুবই পরিষ্কার সী বীচ, লোকজনের ভীড় নেই বললেই চলে। ঢেউ-এর সঙ্গে ভেসে আসে অসংখ্য ছোট্ট ছোট্ট জীবন্ত ঝিনুক, শাঁখ…ঢেউ সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা সব বালিতে যায় সেঁধিয়ে।

পন্ডিচেরী ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি বাদ পড়ে যায় ওখানের গীর্জাগুলি। আমরা প্রথমে দেখতে গিয়েছিলাম সাউথ বুলেভার্ডে Sacred Heart Church – গীর্জাটির তখন প্রভূত সংস্কার চলছিল। ধনুকাকৃতি খিলান দেওয়া গথিক শৈলীতে তৈরী গীর্জার অভ্যন্তর আর বিশাল জানালায় রঙ্গীন কাঁচের প্যানেলে যীশুর জীবনের নানান প্রতিচ্ছবি – সবমিলিয়ে এক মনোরম স্থাপত্য। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য Cathedral Street-এ Immaculate Conception Cathedral। প্রাচীন গীর্জাটি প্রথমে তৈরী হয় ১৬৯২ খ্রীস্টাব্দে, প্রায় একশ বছর বাদে ১৭৯১ সালে পুনঃনির্মাণের পর গীর্জাটি বর্তমান রূপ নেয়। বাইরে থেকে দেখলে অনেকটাই পর্তুগীজদের তৈরী গোয়ার গীর্জার কথা মনে পড়ে। ভেতরে অর্ধবৃত্তাকার খিলান, কারুকার্যময় সব থাম আর ঝুলন্ত বিরাট ঝাড়বাতি মনটাকে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে।

প্রাচ্যের ফ্রেঞ্চ Riviera পন্ডিচেরীর হাতছানিতে সাড়া দিয়ে এসেছে কত বনিক, পর্যটক, যোদ্ধা…পৃথিবীর দূর দূরান্ত থেকে। অধুনা পুঁজিবাদের উদারীকরণের হাওয়ায় যখন ভারতবর্ষ  এগোচ্ছে বিকাশের পথে, পন্ডিচেরীর ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার যেন জড়িয়ে রয়েছে সেই ফরাসী ঔপনিবেশিকতার রোমান্টিক মায়াজালে! পন্ডিচেরীতে চারদিনের সফরে আমাদের ঘড়ির কাঁটা সত্যিই গেছিল থেমে…বেশ কষ্ট করেই আমাদের ফিরতে হল দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায়।

[হাওয়াবদল, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১লা জুলাই, ২০১০]

এই পথ যদি না শেষ হয়…

অনেকদিন আগেকার কথা…১৯৯১ সালের মে-জুন নাগাদ একমাস ধরে বছর ৩২-৩৩এর আমরা পাঁচ ভারতীয় যুবা ব্রাজিলের সাও পাওলো স্টেট প্রায় চষে বেড়াচ্ছি । নয়া দিল্লীর রোটারী ক্লাব আমাদের ব্রাজিল পাঠিয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রোগ্রামে । বিশাল মহানগরী সাও পাওলো থেকে শুরু হয় আমাদের পথ চলা; মাইলের পর মাইল গাড়িপথে পেরিয়ে এসেছি ফার্নান্দোপোলিস, জালেস, কাফেলান্দিয়া… এরকম প্রায় ১০-১২ টি ছোট ছোট জনপদে আমাদের দু-চার দিনের বিরতি । ওখানকার স্থানীয় রোটারিয়ানরা আমাদের ‘জয় রাইডে’ নিয়ে গেছেন হেলিকপ্টারে, নদীবক্ষে প্রমোদতরী বিহারে আর ঘুরে দেখেছি অনেক স্কুল, হাসপাতাল, আদিগন্ত আখ-কমলা লেবু-সয়াবীনের খামার ও আখের রস থেকে এলকোহল তৈরির কারখানা । ছোট শহরের সংবাদপত্রে আমাদের ছবি, মেয়রদের উষ্ণ অভ্যর্থনা… আমরা রাতারাতি ভিআইপি একেবারে; ব্রাজিলের ঐসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভারতবর্ষ যেন ভিন্ন গ্রহের দেশ, অনেকেই ভারতীয়দের প্রথম দেখছেন… আমরা ব্রাজিলীয় বিশ্বকাপ ফুটবলারদের নাম গড়গড় করে বলে দিই, এতো অবাককাণ্ড একেবারে ! ব্রাজিল যাওয়ার আগে লন্ডনের বারলিটজ স্কুলে (Berlitz School) আমরা পর্তুগিজ শিখেছি এক সপ্তাহ ধরে, সে শিক্ষা ভাঙিয়ে ভাঙাচোরা পর্তুগিজ ভাষায় আমরা ম্যানেজ করছি ভালোই… যে কোনও কথার শেষে বারবার যোগ করি, ‘অব্রিগাদো’ (ধন্যবাদ) আর কোনও ব্রাজিলীয় তন্বীর সঙ্গে আলাপ করে বলি, ‘ভোসে এ বোনিতা’ (তুমি তো বেশ সুন্দরী)!

প্রায় একমাস ধরে এ পরিক্রমায় আমাদের হৃদয় যখন ব্রাজিলীয় রোমাঞ্চে পরিপূর্ণ, আমরা এসে পৌঁছেছি সাও জোস দো হিও প্রেতো (St. Joseph of the Black River) নামে এক ছোট শহরে – এখানেই আমাদের শেষ বিরতি, এর পরেই আমরা রিও ডি জেনিরো ঘুরে বাড়ি ফেরার প্লেন ধরবো । এক অলস দুপুরে স্থানীয় রোটারিয়ানের নিমন্ত্রণে ডাউনটাউনের এক রেস্তোরাঁয় আমরা ব্যস্ত মধ্যাহ্ন ভোজনে, দেখি শ্যামবর্ণ, দীর্ধদেহী এক যুবক লম্বা লম্বা পা ফেলে আমাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছেন । আমাদের রোটারিয়ান বন্ধু তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, ‘আলাপ করিয়ে দিই, এ হল জন আশফাক, আমাদের শহরে ইংরাজী শিক্ষক’ । পর্তুগিজ ভাষায় ‘সারভেজা’ বা বিয়ারের এক বোতল খুলে জন বসে পড়ে আমাদের টেবিলে । আমাদের সঙ্গে করমর্দন করে নাম জানতে চায় আমাদের, আমার নাম শুনে বলে, ‘আপনি বাঙালি’ ? বহুদিন বাদে বাংলা শুনে চমকে উঠে আমি চেয়ার থেকে পড়ে যাই আর কি…

জনের সঙ্গে এরপরেও আমার বার দু’য়েক দেখা হয়েছিল – বাংলা ভাষা আমাদের সহজেই নিয়ে এল খুব কাছে । ওর সঙ্গে কথোপকথনে আবিষ্কার করলাম এক অতি বিচিত্র, চিত্তাকর্ষক চরিত্রকে… জন নিজের পরিচয় দেয় সে পেশায় এক ভ্রমণার্থী বা traveller! আমার সমবয়সী জনের জন্ম কলকাতায়, বাবা ছিলেন ইসলাম ধর্মী বাঙালি ও মা এংলো-ইন্ডিয়ান খ্রিস্টান, বোধগম্য হল তার মিশ্র নামের কারণ । জনের জন্মের কয়েক বছর পর তার পরিবার কলকাতা ছেড়ে চলে যায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, ঢাকা শহরে জনের বাবার ব্যবসা অচিরেই ফুলেফেঁপে ওঠে । জন ইংল্যান্ডে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হয়, স্কুলের পড়া সেরে সে চলে যায় পশ্চিম জার্মানি, সেখানে ছোটখাট কাজও জুটিয়ে নেয় শীঘ্রই । আর ছুটিছাটা পেলেই জন বেরিয়ে পড়ে ইউরোপের নানা দেশে, পশ্চিম ইউরোপের সবকটি দেশ মোটরবাইক নিয়ে বেড়ায় সে, পূর্ব ইউরোপের হাঙ্গেরী অবধি ঘুরে আসে । এক জার্মান তরুণীর প্রেমে পড়ে জন, কৃষ্ণবর্ণিয়ের সঙ্গে সম্পর্কে হবু শ্বাশুড়ির ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও তাদের বিয়ে হয়, জন্মায় একটি কন্যা সন্তানও । কিন্তু শ্বাশুড়ির ক্রমাগত প্ররোচনায় সে বিয়ে টেঁকেনা বেশীদিন, জন জার্মানি ছেড়ে অতলান্তিক টপকে পাড়ি দেয় আমেরিকায় । নিউ ইয়র্ক শহরে সে কাজ পায় এক ভারতীয় টিভি চ্যানেলে, অমিতাভ বচ্চন ও আরোও অনেক সেলিব্রিটিদের ইন্টারভিউ নেয় জন সে চ্যানেলের জন্য । তার সাথে চলতে থাকে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে তার অক্লান্ত ঘোরাঘুরি !

কিন্তু স্থায়িত্ব তার রক্তে নেই, আমেরিকা ছেড়ে জন চলে আসে ব্রাজিলে, ঘুরে বেড়ায় আমাজনের জঙ্গলে… প্রায় এক বছর ধরে ব্রাজিল ঘুরে সে মাস ছয়েক যাবৎ এসেছে এই শহরে । এখানের লোকেরা জোরাজুরি করে তাকে কিছুদিনের জন্য আটকে দিয়েছে, সে ভালো ইংরাজী পড়ায় বলে । জনকে শুধাই, ‘এরপর কোথায় যাওয়া?’ সে বলে, ‘একটাই মহাদেশ দেখা হয়নি এখনও, অস্ট্রেলিয়া যেতেই হবে আমাকে’ । বাংলা, ইংরাজী, জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও পর্তুগিজ বলতে পারে সে অনর্গল, আর কাজ চালিয়ে নিতে পারে হিন্দী, ইটালিয়ান ও স্প্যানীশ ভাষায়… জিজ্ঞাসা করি, ‘যদি কোনওদিন কোথাও পাকাপাকি ভাবে থাকতে চাও, তাহলে কোন দেশ তোমার সবচেয়ে বেশী পছন্দ’? চোখের পলক না ফেলে জন ঝটতি জবাব দেয়, ‘ব্রাজিল’; আমি কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে বলে, ‘এই একমাত্র দেশ যেখানে কোনওরকম বর্ণবৈষম্য নেই’ । একথা শুনে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসাটা আমার বেড়ে যায় কয়েক গুণ…

প্রত্যন্ত এক গ্রামে…

তরতর করে কেটে গেল জানুয়ারি মাসে নিটোল এক সপ্তাহ খড়্গপুরে… পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে নিছক আড্ডা, আশেপাশে ঘোরাঘুরি ও তার ওপর বেজায় খাওয়া-দাওয়া… অবসর জীবনের সেরা বিনোদন !

কাজের সূত্রে খড়্গপুর আই আই টি’র এগ্রিকালচারাল এঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ব্যানার্জির সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের; ২৬শে জানুয়ারি সকালে তিনি ফোন করে বলেন, ‘চলুন, আপনাকে বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম দেখিয়ে নিয়ে আসি, সাড়ে বারোটা নাগাদ তৈরি থাকবেন, যাবার পথে কোথাও লাঞ্চ সেরে নেব’ । অতঃপর প্রফেসর ব্যানার্জি, তাঁর এক রিসার্চ স্কলার ও আমি বেলা প্রায় একটা’র সময় আই আই টি ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে খড়্গপুর শহরের পথে চলি । খড়্গপুর কলেজ পেরিয়ে ‘Flavours’ নামের এক রেস্তোরাঁয় আমরা ঢুকি মধ্যাহ্নভোজনের আশায় – ও হরি, মেনুতে দেখি সব পাঞ্জাবী মার্কা খাবারের জয়-জয়কার… তড়কা, দাল মাখনি, মটর-পনীর ও বাটার চিকেনের ছড়াছড়ি, দিল্লী থেকে এসে এহেন খাবার আমার বিশেষ না-পসন্দ ! অনেক কষ্টে মেনুতে খুঁজে পাই, ‘ফিশকারি ও রাইস’, সে সামুদ্রিক ভেটকি মাছের অদ্ভুত মশালাদার রান্না কোনক্রমে গলাধঃকরণ করে, আমরা বেরিয়ে পড়ি আমাদের গন্তব্য, গৌড়দা’র পথে…

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় দাঁতন-২ নম্বর ব্লকে জাঙ্কাপুর গ্রাম পঞ্চায়তের অধীনে গৌড়দা এক ছোট্ট জনগোষ্ঠী বিশেষ, সে গ্রামে নেতাজী যুব সঙ্ঘের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে আয়োজিত হচ্ছে এক কৃষিকথার আসর, সঙ্গে আছে কৃষিমেলাও । গৌড়দা’র সে সভায় ‘অরগ্যানিক ফার্মিং’ বা ‘জৈব কৃষি পদ্ধতি’ নিয়ে আলোচনা করবেন প্রফেসর ব্যানার্জি… আমাদের গাড়ি খড়্গপুরের পুরাতন বাজার, কৌশল্যা, বেনাপুর ছাড়িয়ে মকরমপুরে কলকাতা-চেন্নাই রাষ্ট্রীয় রাজপথ ধরে, নারায়নগড় পেরিয়ে বেলদা শহর বাইপাস করে আমরা দীঘার রাস্তায় পড়ি । সে রাস্তায় বেশ কিছুটা এগিয়ে আমরা খাকুড়দায় ডানহাতি রাস্তা ধরি – একেবারে গ্রাম্য রাস্তা, ছোট ছোট জনপদ পেরিয়ে চলে আমাদের গাড়ি, আদিগন্ত ধানখেত ফসলরিক্ত, ধান কাটা হয়ে গেছে কিছুদিন আগেই, কেউ কেউ খেতে রয়ে যাওয়া ধানগাছের গোড়ায় আগুন ধরিয়েছে, দূরে দেখি ঘন ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠে যায় আকাশপানে… কিছুটা পথ এগিয়ে রাস্তা খুব খারাপ, শুরু হয় আমাদের গাড়ির নাচনকোদন… প্রায় পাঁচ কিমি পথ এভাবে পেরিয়ে আবার ভালো রাস্তায় উঠি আমরা । একটু পরেই আমাদের গাড়ি গৌড়দায় ঢোকে, সূর্য তখন অস্তাচলে…

গৌড়দা মিডল স্কুলের মাঠে বিরাট প্যান্ডেল টাঙিয়ে নেতাজী যুব সঙ্ঘের জমজমাট অনুষ্ঠান, মাইকে উচ্চগ্রামে সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা, আমরা পৌঁছতেই মাইকে ঘন ঘন ঘোষণা, ‘আমাদের মধ্যে এসে পড়েছেন খড়্গপুর আই আই টি’র বিজ্ঞানীর দল, আপনারা সদলবলে প্যান্ডেলে এসে আমাদের অনুষ্ঠান সাফল্যমন্ডিত করুন’… আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানান প্রফেসর ব্যানার্জি’র পরিচিত সে গ্রামের কর্মকর্তাদের কয়েকজন, আমরা স্কুলের এক ক্লাসরুমে গিয়ে বসি । জেলা পরিষদের সহ-সভাপতি এসে পড়তেই শুরু হয়ে যায় অনুষ্ঠান, আমাদের উত্তরীয় ও ফুলের স্তবক দিয়ে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান সহ-সভাপতি মহাশয় । জৈব সার ও জৈব কীটনাশক ব্যবহার করে চাষে সফল কৃষকদের করা হয় পুরস্কার প্রদান । প্রফেসর ব্যানার্জি কেমিক্যাল সার ও কীটনাশকের পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব নিয়ে বেশ জোরালো বক্তব্য রাখেন । তাঁকে আগেই আমি বলে রেখেছি বক্তৃতা যেন দীর্ঘায়িত না হয়, ফিরতে হবে যে আমাদের অনেকটা পথ ।

সভামঞ্চ থেকে নেমে বেরিয়ে আসার পথে দেখি জৈব কৃষি পদ্ধতিতে চাষ করা বিভিন্ন ধান ও চালের এক প্রদর্শনী; পরিচিত হই নতুন নতুন নামের সঙ্গে – বহুরূপী, বাম্পি গোল্ড, মুগাই, কালো কাখুরিয়া, খাড়া ধান… এছাড়াও অদ্ভুত ধরণের ‘ব্ল্যাক রাইস’ বা কালো চাল, দেখি সুগন্ধী ‘তুলসী ভোগ’, ‘বাদশা ভোগ’ ও ‘রাঁধুনীপাগল’ চাল । অতি আশ্চর্যজনক, ‘কোমল চাল’, সাধারণ তাপমাত্রার জল সে চালে ঢেলে দিলেই ভাত রান্না হয়ে যাবে, ফোটানোর প্রয়োজন নেই কোনও ! আরোও দেখি নানা ভেষজ উদ্ভিদের প্রদর্শন – চোখে পড়ে মধুমেহ রোগীদের অব্যর্থ ওষধি ‘গুড়মার’, এ গাছের ৪-৫টি পাতা চিবিয়ে খেলেই নাকি রক্তে শর্করা হ’বে নিয়ন্ত্রিত…

নেতাজী যুব সঙ্ঘের কর্মকর্তারা আমাদের নিয়ে আসেন অভিনব সব পুলি পিঠের এক স্টলে, কমকরে ছয় রকমের পিঠে প্যাক করে দেন আমাদের জন্য । গৌড়দাবাসীর সারল্যে ও ভালোবাসায় মনটা ভরে ওঠে আমাদের…

নিকষ কালো অন্ধকার চিরে জোরালো আলো ফেলে ফিরে চলে আমাদের গাড়ি… আকাশের বুকে জ্বলজ্বলে নক্ষত্ররা হাতছানি দিয়ে ডাকে… দূরে কোথাও একদল শেয়াল নিরেট নৈঃশব্দ খানখান করে ডেকে ওঠে…

Bidding Adieu…

Today (December 29) is my last working day in TIFAC…after working for 27 years 8 months and 27 days in TIFAC, I would be superannuating on December 31, 2017!
It’s been a highly fulfilling and satisfying journey, which shaped me into a person, who I hope you all will care to remember with joy. 
I had the great fortune to work with the stalwarts in science & technology namely Dr Y S Rajan, Dr V S Ramamurthyand Dr APJ Abdul Kalam to name just a few… I was appointed as the Mission Director of Advanced Composites Mission by none other than Dr Kalam, when he was the Chairman-TIFAC. I would forever be grateful to Dr Rajan, who truly scripted the saga of my professional success. Not only for official work, on the personal front too I was blessed by and immensely benefitted from my close association with the kind-hearted and sharp-witted Dr Rajan, the first Executive Director of TIFAC. I’m indebted to him in many ways in life… At this hour of hanging my boots, I sincerely hope that I could live up to his expectations!
At this momentous juncture, I especially remember my junior colleagues, almost all of whom had joined starry-eyed and fresh after graduating from their respective institutions… I mentored them, guided them and initiated them into the wonders of new materials, nuances of chemical engineering and challenges of project management… hours, which rolled into days and years spent with them honed them into performing professionals, independent decision makers and worthy officers… on the personal front, they got married, owned houses and had kids, who would soon be finishing their schools…I would miss you all! 
On my personal front, I had the kids, who were born after I had joined TIFAC.  Our undisturbed stay in Delhi has truly enabled them find the moorings in their lives.They have grown into professionals in their own rights. Also, the major part of my stay in a gated green enclave of South Delhi, thanks to the Govt. accommodation, has squarely added to my family’s creature comforts. TIFAC has sent me to far-flung corners of this country and distant shores of the world on work thus enriching my worldview. 
The long innings in TIFAC studded with several projects, programmes, too many travels across the country and many abroad now appears like a haze… it went off rather too soon…
For my seniors, colleagues, associates and several others from TIFAC, DST and outside, I would like to be pardoned for if I had inadvertently hurt their feelings anytime.
While wishing you the best of times yet to come, I would like to say ‘bye’ and love to be in touch whenever you care to contact.
Best wishes & regards,
Soumitra Biswas
Scientist-G

Travel Travails – II

On a bright and sunny Saturday morning of late October, I was aboard the United Airlines flight from Tampa, Florida to Chicago. After a five-day stay in Tampa for attending and presenting a paper at an international conference, I was heading to Chicago to spend a few days with my cousin there before returning to New Delhi. As always I happily settled down in an aisle seat and discovered my wary looking co-passenger at the window with a vacant middle seat in between. The five feet nothing lady with a humongous girth could be termed a perfect ‘role poly’; she would be in her late twenties as evident from the youngish look on her face. She managed to flash a nervous smile as I had greeted her.

The captain’s voice crackled over the PA system, “Good morning dear passengers, welcome aboard United Airlines morning flight to ORD, Chicago! I’m sure you all had a very pleasant stay in Tampa. I am sorry to transport you from a fabulous Florida to the Windy City, where the current temperature is 46 degrees with a strong wind chill factor”! A collective sigh went up from all the passengers in anticipation of a cold and dreary destination.

I was rummaging through an in-flight magazine to keep myself busy for the three-hour long journey to Chicago. The cabin crews had finished serving the breakfast and followed it up with some freshly brewed coffee. And then suddenly all hell broke loose! Our aircraft had hit an air pocket and dropped no less than fifty feet in a minute. With frantic shouts of ‘Oh! My God’ from everywhere, wailing of babies and the cabin crews falling off in the aisle with steaming pots of coffee, it was quite a scene! A few seconds of free fall was enough for one to chicken out… I discovered my co-passenger badly panic-stricken with an ashen face appearing to collapse soon.

The captain immediately came back on the PA, “Extremely sorry, ladies and gentlemen! That was a bad air pocket indeed and our instruments failed to detect it. But please do not worry, your plane is in very safe hands and we hope to reach our destination very much on time. Sorry once again”, he signed off.

In order to soothe the frayed nerves of my co-passenger I gently struck up a conversation. Her name was Michelle and she worked for a local court in a town near Tampa. Her mother lived in Madison, Wisconsin further north of Chicago, where she would need to change her plane. She was on a vacation to spend a few days with her mom and other siblings. And surprise of surprises, this was the first flight in her life as she simply hated flying… Last time she went to see her mother, she drove all the way from Florida to Wisconsin!

I assured her that flying in modern time is much safer than the road journeys. I had flipped through the in-flight magazine and pointing to the world map, explained to her my extensive travels to distant shores with forays even to Latin American countries. After somewhat collecting herself she asked me, “What do you do?” As I proclaimed myself a Chemical Engineer, she immediately shot back, “Oh! You’re smart” – the typical American way of appreciation!

 

Travel Travails – I

Various official assignments took me across this great country… right from Moirang in Manipur bordering Myanmar on the east to Kaladungar in Kutch next to Pakistan on the western front, from Himachal in the north to Rameshwaram and Trivandrum in the south. I have literally crisscrossed the country setting out of Delhi almost once a week for onsite project reviews in remote corners, presenting papers in conferences & seminars…

 

One such assignment once took me to Nagpur, the city I had fallen in love with since my dad was posted there long ago. On a hot summer afternoon, I was returning from Sonegaon airport (now rechristened as Baba Saheb Ambedkar International Airport) at Nagpur by an old Boeing 737 of erstwhile Indian Airlines and I had settled down on my aisle seat like a veteran traveller. A tentative and fidgety person in his early thirties approached the row I was sitting in and showed me the boarding pass looking for his seat. I had got up and guided him to the window seat. On occupying his seat, he tried to fasten the seat belt and terribly messed it up… I immediately realized that he must be a first-time flier. Like a good Samaritan, I helped him fix the seat belt and he was profusely thankful for my help. He asked me quite innocently whether the food served in the flight would have to be paid for. That was quite unheard of those days sans the ‘no frill’ airlines and I had assured him that he could enjoy the food without any pinch on his pocket. As if to strike a conversation, he stated that he was flying for the first time in life for attending his employer’s some urgent business in Delhi. Minutes before the doors were closed, a young fellow had trudged in and occupied the middle seat. He introduced himself as an aircraft maintenance engineer with Indian Airlines; though he was posted in Delhi he had come to Nagpur to attend a maintenance problem in situ.

 

As the plane just lifted itself into the air, the man on the window seat exclaimed, ‘Arre, arre, pahiya gir gaya’! (Hey! the wheel has dropped off’!) Then he told us that he had seen the wheel rolling off the runway. The Indian Airlines engineer explained to him that was not possible, he must have hallucinated etc. After about five minutes the man on the window seat right behind our row had pressed the call button for the crew and spoke to the matronly air hostess in a hushed tone. And about 10 minutes later, we found the air hostess leading that person to the pilot’s cabin. On his return, we asked him what had happened. But he maintained a studied silence dismissing our query with a frivolous response.

 

One and half hours later we could see the vast expanse of Delhi below and after descending to a much lower height our plane started hovering around the city without showing any signs of touching down. After circling around the city about 10 times our plane had approached the runway. We spotted two fire tenders on two sides running at a breakneck speed to catch up with our plane. As the plane had finally touched down and canopies over the engines opened up for reverse thrusts to slow it down, there was a deafening sound of a tyre burst – the plane had badly tilted on one side and came to a stop!

 

The pilot announced over PA system thanking Mr Sharma from MOIL, Nagpur (the man on the window seat behind our row) for alerting him about a wheel falling off at Nagpur airport. Mr Sharma was suitably advised by the pilot not to divulge anything to prevent panic among the passengers. Our plane had to hover around Delhi’s sky for quite some time to burn off the extra fuel and ATC then permitted the pilot for a full emergency touchdown using the landing gear with three wheels instead of two pairs. The single wheel failed to cope with the load and finally gave way. All the passengers cheered and thanked the captain. Everyone was just too happy to come out unscathed from a potentially dangerous ordeal.

 

After about a month the Times of India, New Delhi reported that a crack team from DGCA had recovered the missing wheel of a Boeing 737 from the urchins playing with it in a village near the airport in Nagpur!