দ্বীপের শহর ভিক্টোরিয়ায়…

 

 

মে মাসে দিল্লীর প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে বাঁচতে আমরা কত্তা-গিন্নী এবার পাড়ি দিয়েছি সুদূর ক্যানাডায়  – মূল কারণটি অবশ্য অন্য, আমাদের কন্যার মাস্টার অফ সায়েন্স (MS) ডিগ্রী পাওয়ার সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আমাদের নিমন্ত্রণ ! তবে রথ দেখার সঙ্গে কলা না বেচলে হয় ? সমাবর্তন তো আছেই, এছাড়া কাছাকাছি নানা জায়গায় ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা শুরু হল জোর কদমে, কন্যার সঙ্গে ই-মেল ও হোয়াটসএ্যাপ-এর মাধ্যমে । বেশ কম সময়েই পরিকল্পনার সিংহভাগই সেরে ফেললো আমাদের কন্যা ।

অতঃপর এক শুক্রবার গভীর রাতে দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমরা রওয়ানা দিলাম ক্যানাডার উদ্দ্যেশ্যে । আমাদের গন্তব্য ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বন্দর-শহর ভ্যাঙ্কুভার (Vancouver) । চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের বিমান প্রায় পাঁচ ঘন্টা পর আমাদের পৌঁছে  দিল সাংহাই, সেখানে ঘন্টা দুয়েকের বিরতি – এরপর আর এক উড়ানে প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে প্রায় ১২ ঘন্টার সফর শেষে আমরা পৌঁছলাম ভ্যাঙ্কুভার । সেখানে তখন শনিবারের এক ঝকঝকে সকাল, ১৯ ঘন্টায় আমরা পেরিয়ে এসেছি ১১,০০০ কিমি’র বেশী পথ, আমাদের ঘড়ি পিছিয়ে গেছে সাড়ে বারো ঘন্টা ! ‘জেট ল্যাগের’ সমস্যাটা সেরকম কিন্তু বাড়াবাড়ি মনে হল’না – দুপুরে একটু বিশ্রাম নিয়েই আমরা বেশ তরতাজা !

রাণী ভিক্টোরিয়া তাঁর শাসনকালে (১৮৩৭–১৯০১) যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ক্যানাডিয়ান কনফেডারেশন তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশগুলির কনফেডারেশনে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে খুবই সচেষ্ট ছিলেন, তাঁরই প্রচেষ্টায় সব প্রদেশগুলি একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় আজকের বিশাল দেশ ক্যানাডা । ক্যানাডার ইতিহাসে এই অবদানের জন্য সে দেশে তাঁকে বিশেষ সম্ভ্রমের চোখে দেখা হয় । রাণী ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে মে মাসে ২৫ তারিখের আগে শেষ সোমবারটি পালিত হয় ‘ভিক্টোরিয়া ডে’ হিসাবে – সারা ক্যানাডা জুড়ে তিনদিনের ছুটির ‘লং উইকএন্ড’!  এবছর ২০ – ২২শে মে ছিল লং উইকএন্ড – আমরা পৌঁছেছি ২০শে মে, কন্যার আরো দু’দিন ছুটি বাকি । তাই ২১শে মে প্রায় ভোর ছটায় আমরা তিনজনে বেরিয়ে পড়ি ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের রাজধানী, ‘ভিক্টোরিয়া’র দিকে ।

মানচিত্র একটু ঘাঁটলেই বোঝা যাবে, ক্যানাডার মূল ভূখন্ডে ভ্যাঙ্কুভার শহরের পশ্চিমে বিশালাকায় ‘ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপ’ – সে দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বন্দর, Swartz Bay, এরপর স্থলপথে  যেতে হবে ভিক্টোরিয়া । আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস ধরে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাই West 41st. Avenue ও Cambie Street-এর জংশনে SkyTrain ষ্টেশনে – পুরোপুরি স্বয়ংচালিত মেট্রো ট্রেনে নেই কোনও ড্রাইভারের অস্তিত্ব ! আমরা নেমে পড়ি Bridgeport ষ্টেশনে, সেখান থেকে দুই কোচ বিশিষ্ট বাসে প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমরা পৌঁছই, Tsawwassen Bay । এটি সমুদ্রের ধারে এক সুন্দর জাহাজঘাটা, সেখান থেকে সময়সারণী অনুযায়ী ফেরী ছাড়ছে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দ্যেশ্যে ।

‘Self service’ kiosk থেকে তিনটি টিকিট নিয়ে আমরা প্রবেশ করি ভিক্টোরিয়াগামী জাহাজে, জাহাজটির নির্মাণ শৈলী যথেষ্ট উন্নতমানের ও অভ্যন্তর বেশ সুন্দর – বাতানুকূল পরিবেশ, বড় বড় কাঁচের জানালার পাশে আরামদায়ক বসার জায়গা । জাহাজে শুধু ট্যুরিস্টদের ভীড়, সপ্তাহান্তের মজা আহরণে দলে দলে সবাই চলেছে ভিক্টোরিয়া । কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ ছেড়ে দিলে, আমরা প্রাতরাশের খোঁজে নীচের ডেকে ক্যাফেটারিয়াতে লাইনে দাঁড়াই । ফলের রস, টোস্টেড ব্রেড, স্ক্র্যাম্বল্ড এগস, এগ বেনেডিক্ট, সসেজ ও কফি দিয়ে বেশ পরিপাটি করেই সাঙ্গ হয় আমাদের প্রাতরাশ ! আমাদের জাহাজ পাহাড়সারির মধ্যে খাঁড়ি থেকে বেরিয়ে আদিগন্ত সমুদ্রে ভাসে, চারিপাশে অনেক পাহাড়, আমরা পেরিয়ে আসি ছোট দ্বীপ, পালতোলা ও মোটর চালিত নৌকা, অন্য দিকে থেকে আসা ফেরী; আমাদের সঙ্গী  হয় কর্কশ চিৎকাররত সী গালের দল খাবারের আশায় । দেখতে দেখতে কেটে যায় দেড় ঘন্টা সময়, আমাদের জাহাজ পৌঁছয় ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপে Swartz Bay ফেরী টার্মিনাল ।

Swartz Bay থেকে ভিক্টোরিয়া প্রায় ৩২ কিমি দূরে – একটি ডাবল ডেকার বাসে ওপর তলায় সীট পাই আমরা । আমাদের বাস ধীরে এগিয়ে চলে – পথে পড়ে ফার, স্প্রুস, সেডার, ওক ও মেপল-এর জঙ্গল; সুউচ্চ, প্রাচীন চিরহরিৎ বৃক্ষের সমাবেশ, কুলকুল করে বয়ে চলা ছোট নদী, ছোট-বড় শান্ত জলাশয়, ঘন সবুজ ঘাসের কার্পেট  বিছানো উঁচু নিচু ময়দান, সেখানে জাবর কাটতে ব্যস্ত অলস গাভীর দল । পেরিয়ে আসি ছবির মত সুন্দর ঘরবাড়ি নিয়ে ছোট ছোট শহর, স্কুল, দোকানপাট, পাব ও রেস্তোরাঁ । আমাদের বাস চলে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে – রাস্তার ধারে সমুদ্রমুখি প্রাসাদোপম বাড়ি ।

আমাদের বাস প্রবেশ করে ভিক্টোরিয়া শহরে – সমুদ্রের তীরে সাজানো অতি সুন্দর শহর, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র বিশেষ । শহরে নানা মাপের ও দামের অসংখ্য হোটেল আর রাস্তায় দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকের ঢল । ডাউনটাউন ছাড়িয়ে এসে আমাদের বাস থামে, বাস থেকে নেমেই চোখে পড়ে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিধানসভা – ১৮৯৮ সালে ফরাসী ‘বারোক’ শিল্পশৈলীতে নির্মিত সে এক সুবিশাল প্রাসাদপুরী । শহরের প্রাণকেন্দ্রে তার অবস্থিতি, সামনে সুবিস্তৃত সবুজ মাঠে রানী ভিক্টোরিয়ার বিরাট ধাতব প্রতিমূর্তি । তার অনতিদূরেই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এবং কোরিয়ান যুদ্ধে শহীদ ক্যানাডিয়ান সেনাদের স্মারক । বিধানসভার পাশ দিয়ে হেঁটে এগোই আমরা ভিক্টোরিয়ায় আস্তানার খোঁজে ।

ইন্টারনেটে খুঁজে পেতে আমাদের কন্যা, Albion Manor নামে Bed & Breakfast-এ একরাত্রির জন্য অগ্রিম বুকিং করে রেখেছিল । মিনিট দশেক হেঁটে Albion Manor-এ পৌঁছে আমরা অবাক –১৮৯২ সালে তৈরি সেটি নগরনিগম দ্বারা স্বীকৃত এক ঐতিহ্যশালী ভবন বিশেষ ! বাড়িটির চারপাশে বাগান অনেক রঙিন ফুলে সুশোভিত,  বাগানে এক কৃত্রিম ফোয়ারা ও প্রস্তরমূর্তি । বাড়িটিতে থাকার জায়গা সীমিত, সব মিলিয়ে নয়টি ঘর ও স্যুট – ঘরগুলি নম্বর নয়, বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত । আমাদের জন্য বুক করে রাখা ঘরটির নাম, ‘অস্কার ওয়াইল্ড’ ! আমাদের ঘরে কাঠের মেঝে, পুরানো দিনের কাঠের কাজ করা একটি কিং সাইজ খাট, সমস্ত আসবাবপত্র উনবিংশ শতাব্দীর ডিজাইনে তৈরি । বিছানা, গদী, লেপ-কম্বল, তোয়ালে সবই উচ্চ মানের । বাথটব ও অন্যান্য উঁচুদরের ফিটিংস সমেত বাথরুমটিও অতি চমৎকার । Albion Manor-এ অ্যান্টিক শিল্প ও চিত্রকলার ছড়াছড়ি – বিশ্বের নানা জায়গা থেকে সংগৃহীত ধাতু, সিরামিক আর পাথরের কারুকাজের হস্তশিল্প ।

ঘরে জিনিসপত্র রেখে একটু জিরিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি ভিক্টোরিয়ার রাস্তায়, পৌঁছে যাই বিধানসভার সামনের মাঠে । সেখানে তখন ‘ভিক্টোরিয়া ডে’ উপলক্ষ্যে উৎসবের মেজাজ – নানান স্কুল, কলেজ থেকে আসা পড়ুয়াদের ব্যান্ডবাদ্যের আসর, ১০-১৫ জনের দলের বাদ্যসঙ্গীত পরিবেশন আর তাদের উৎসাহ যোগাতে অনেক স্থানীয় অধিবাসী ও ভ্রমণার্থীদের সমাগম । বিধানসভার ভিতরে বিনামূল্যে গাইডেড গ্রুপ ট্যুর-এর ব্যবস্থা আছে, দুপুর সাড়ে তিন’টের ট্যুর-এর টিকিট সংগ্রহ করে আমরা মধ্যাহ্নভোজনের উদ্দ্যেশে পা চালাই । বিধানসভার সামনে মাঠ পেরোলেই চওড়া রাস্তা, সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে । আর সেখানেই ভিক্টোরিয়া হারবার – নানা সাইজের yacht, পালতোলা নৌকা ও সী-প্লেনের ভীড় । হারবারের ধারে প্রমেনাড যেন এক মেলা প্রাঙ্গণ – অনেক শিল্পী সাজিয়ে বসেছে তাদের আঁকা ছবি ও হস্তশিল্পের পশরা নিয়ে, কেউ দেখায় ম্যাজিকের খেলা, কেউবা বিরাট উঁচু একচাকার সাইকেল নিয়ে কসরত দেখায় ! হারবার সংলগ্ন বেশ কিছু রেস্তোরাঁ, সবাই দেখি সীফুড পরিবেশনে সিদ্ধহস্ত !      

সমুদ্রের ওপর জেটিতে এক রেস্তোরাঁয় ফ্রায়েড স্কুইড, clam chowder soup ও ফিশ অ্যান্ড চিপস দিয়ে সমাধা হয় আমাদের মধ্যাহ্নভোজন । আমাদের রেস্তোরাঁর সামনে সমুদ্রে একের পর এক ওঠানামা করে সী-প্লেন, যাত্রীদের নিয়ে উড়ে যায় কাছের দ্বীপে ও ভ্যাঙ্কুভারে; আধঘন্টার জন্য ভিক্টোরিয়ার আকাশে কয়েক চক্করের ‘জয় রাইড’-এও সওয়ার হ’ন কেউ কেউ !

সাড়ে তিন’টের সময় বিধানসভায় ঢুকে পড়ি আমরা – ইউনিভার্সিটি অফ ভিক্টোরিয়ার স্নাতক স্তরের এক ছাত্রী আমাদের ঘুরিয়ে দেখায় বিধানসভা ও অধিবেশন কক্ষ, যত্ন সহকারে বোঝায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ইতিহাস, নির্বাচন পদ্ধতি, বিভিন্ন স্মারক । আমরা ভারত থেকে এসেছি শুনে মেয়েটি বলে সে ভারতে আসতে খুবই আগ্রহী !

ক্যনাডায় গরমকালে সূর্য ডোবে ন’টার পর, প্রায় রাত সাড়ে ন’টা অবধি বাইরে বেশ আলো – আটটা নাগাদ আমরা নৈশাহারের সন্ধানে পৌঁছে যাই, Fisherman’s Wharfসেখানে জেটির দু’ধারে সুন্দর দোতলা সব আধুনিক বাড়ি, সবগুলি বাড়িই জলে ভাসমান । জেটির এক দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ আর অন্য দিকে সার সার Yacht ও মোটরচালিত নৌকা নোঙর করা । দেখি জেটির কাছে দু’টি সীল সাঁতরে বেড়ায়, ট্যুরিস্টদের প্রায় হাত থেকে মাছ খেয়ে যায় তারা – জেটিতে সবাই ভীড় করে তাদের এহেন কসরত দেখে !

পরদিন সকালে Albion Manorএর ডাইনিং হ’লে বারোটি আসন বিশিষ্ট এক বিরাট টেবিলে আমাদের প্রাতরাশের ব্যবস্থা । সেখানে অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় – অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন এক বয়স্ক দম্পতি, আমেরিকার Salt Lake City থেকে এসেছেন আরও দুই দম্পতি, দুই মহিলা বন্ধু এসেছেন আমাদের মত ভ্যাঙ্কুভার শহর থেকে । কমলালেবুর রস, দু-তিন রকমের ফল, ব্লু-বেরী প্যানকেক, সসেজ ও কফি দিয়ে ভরপেট প্রাতরাশ সেরে আমরা বেরিয়ে পড়ি ভিক্টোরিয়ার এক বিশেষ দ্রষ্টব্য, Craigdarroch Castle দেখতে ।

????????????????????????????????????
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি Robert Dunsmuir নামে এক স্কটিশ ভাগ্যান্বেষী কয়লা খনিতে কাজ নিয়ে   ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপে এসে পৌঁছান । পরবর্তী কালে ভিক্টোরিয়ার উত্তরে Nanaimo শহরের কাছে তিনি এক কয়লা খনির মালিক হ’ন ও কয়লার ব্যবসায়ে প্রচুর ধন-সম্পত্তি উপার্জন করেন । ১৮৮৭-১৮৯০ সালে Robert Dunsmuir নির্মাণ করেন Craigdarroch Castle, কিন্তু ১৮৮৯ সালে মৃত্যুর জন্য ঐ প্রাসাদে বাস করার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর । Dunsmuir-এর বিধবা পত্নী, Joan Olive, তাঁদের তিন অবিবাহিতা কন্যা ও দুই অনাথ নাতি-নাতনী নিয়ে ঐ প্রাসাদে বাস করতে আসেন ১৮৯০ সালে, বসবাস করেন ১৯০৮ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ।  উনবিংশ শতাব্দীতে উত্তর আমেরিকার ধনীজন নির্মিত প্রাসাদগুলির ধনাঢ্য আড়ম্বরের অন্যতম Craigdarroch Castle । প্রায় দুই একর জমিতে ২৫,০০০ স্কোয়ার ফুট আয়তনে ৩৯ টি কামরা নিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদটি বেশ সম্ভ্রমের উদ্রেক করে ! মাথাপিছু ১৪.২৫ ক্যানাডিয়ান ডলার দিয়ে টিকিট কেটে প্রাসাদে প্রবেশ করি আমরা । সুদূর স্পেন, Chicago, Hawaii-থেকে আমদানি করা আখরোট, মেপল, রেড সেডার, রোজঊড, চেরী, ওক ইত্যাদি কাঠ দিয়ে তৈরি প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ও আসবাবপত্র । প্রাসাদের জানালায় রঙিন কাঁচের (stained glass) কারুকাজ দেখার মত ! অভ্যাগত ও পরিবারের সদস্যদের বসার ঘর, ব্যাঙ্কোয়েট হ’ল, একান্ত ডাইনিং হ’ল, বিভিন্ন সদস্যের শয়নকক্ষ ও তাদের আড়ম্বরের বাহুল্য সবই ঊনবিংশ শতাব্দীর ভিক্টোরিয়ান জমানার – সব ঘরেই বহুমূল্য অ্যান্টিক ও চিত্রকলার নিদর্শন ! এহেন প্রাসাদে আমাদের ঘড়ির কাঁটাও যায় যেন থেমে, কেটে যায় দুঘণ্টারও বেশী সময় ।

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে বাস ধরে আমরা পৌঁছই ভিক্টোরিয়ার ডাউনটাউন – এক ইতালিয়ান রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজন সেরে আমরা গিয়েছি ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে James Bay-তে, সমুদ্রতীর বেয়ে চলেছে রাস্তা । রাস্তা সংলগ্ন প্রমেনাড ধরে হেঁটে যাই আমরা, সমুদ্র সেখানে অপ্রশস্ত, খাঁড়ির অপরপ্রান্তে দেখতে পাই আমেরিকার ওয়াশিংটন প্রদেশে অলিম্পিক পর্বতমালা – তার চূড়োয় রূপোলি বরফের উজ্জ্বল মুকুট ! আমার ক্যামেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে অনুপম নিসর্গকে ধরে রাখতে ।

অবশেষে ভিক্টোরিয়ার মায়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসি আমরা; ফিরতি পথে Swartz Bay থেকে ভ্যাঙ্কুভারের ফেরীতে উঠি, জাহাজে কাঁচের দেওয়াল ঘেরা ডাইনিং হলে বসে ডিনারের সাথে অবলোকন করি প্রকৃতির আর এক বর্ণময় রূপ  – স্বর্ণালী সন্ধ্যার শেষে সুয্যিমামার ঘুমের দেশে পাড়ি ।

[মাতৃমন্দির সংবাদ, নিউ দিল্লী, জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত]

From Hot Springs to A Mighty River

We zipped down the Sud Autobahn-A2 from Vienna International Airport taking in the sights & sounds of the Austrian countryside. As we drove into Baden on an early Sunday morning of a glorious European summer, I simply fell in love with the town. A picturesque place hemmed in by lush green hillocks, verdant meadows and vistas of vineyards, Baden transports one to eternal bliss…

To distinguish their town from Baden-Baden of Germany and Baden of Switzerland, Austrians refer to the place as Baden bei Wien (Baden near Vienna). The town located 26 km. south of Vienna, is at the base of Wienerwald mountain range and surrounded by 120 vineyards. The name, Baden originates from its thermal springs and warm public baths as in German, Baden means to bathe. The town is home to thirteen such warm baths with their sulphate of lime-rich water gurgling at 22 to 36 deg. C.  The history of Baden can be traced back to the Roman era and the town’s fame was linked to its warm baths. The town was attacked several times by the Hungarians and Turks in olden days. Baden became a preferred destination as the summer residence by many members of the Austrian royal family and several villas & castles were built by them.  Many a time the most famous Austrian composer, Ludwig van Beethoven (1770–1827) lived in Baden staying at seven different houses. The town was headquarters of Austro-Hungarian army command during World War I and that of the Soviet forces after World War II for the allied administered Austria till 1955. As the town hotspot, the casino opened its doors in 1934, Baden gradually emerged as the best spa town of Austria.

We stayed at Hotel Schloss Weikersdorf, an erstwhile palace and now converted to a 4-star hotel with all its old world charms preserved with care. The hotel was located right next to a large rose garden, known as Rosarium in Doblhoffpark….quite naturally, the hotel spa chose rose and wine as its USP…the rose water with its fragrance wafting in a relaxed and harmonious ambiance…rose oil working wonders with its anti-depressant & aphrodisiac actions on harried souls…grape seed oil improving the circulation and strengthening collagen fibre for a youthful skin…the spa promises utopia on earth! After the ethereal spa experience, one may choose from the sauna available in its various forms & trappings for improved metabolism and cardiac health. The hotel also has a well-equipped gym for its guests desperate to cut the flab of over indulgence. We saw many tourists driving in from Germany and other parts of Austria for that much-desired break! Schloss Weikersdorf boasts of two in-house restaurants, Rosenkavalier and Schlosskeller complete with Lippizzaner bar well stocked with exotic wines from the thermal region of Austria. The breakfast served in Rosenkavalier was simply a lavish affair with a veritable spread of fresh fruits, large variety of bread, croissant, pancake with honey, cornflakes, porridge, mashed potato, eggs the way you like it, salamis, bacons, sausages…after gorging into such a feast, one has to dash off to the gym to remain in shape!

Without wasting much time, we proceeded to Vienna…we ambled across the rosarium watching the colours & forms of varieties of roses. Such beautiful blossoms all around the huge park attracted a sizeable gathering of local Badeners enjoying the sunny Sunday. We passed through cobbled roads, small eateries, delicatessen, chapels…we walked along narrow lanes with shop windows displaying local curios and finally reached the ‘down town’ Baden, Josefsplatz, named after the powerful Austrian Emperor, Kaiser Franz Joseph I (1830-1916). The central plaza, built around a hot spring gushing with a sulfurous smell, housed the tram station and its ticket office…the tramline, known as Badner Bahn, links Josefplatz with the State Opera in Vienna. It takes about an hour and costs €4.50 one-way for 30 km. long journey by the two-coach electric tram. We positioned ourselves on window-side seats to enjoy the canvas of nature that unfolded during the journey…the tram meandered through small hamlets with picture perfect homes, pensions (B&B guest-houses), vast vineyards kissing the horizon, distant mountains, rivulets and fields aglow with bright yellow rapeseed flowers…after covering such naturally endowed countryside, the tram approached the peripheries of the big city and went underground as it reached the busier inner precincts of Vienna.

Thanks to the internet, I knew about the cruises on Danube (Donau in German), the great trans-European river flowing through ten countries. Around 10% of 2900 km. long river lies in Austria and the city of Vienna has grown on both sides of Danube…what could be a better option than taking a river cruise on a Sunday afternoon? We got off the tram at Karlsplatz and changed into U-Bahn (underground metro) to reach Schwedenplatz, the starting point for the cruise. DDSG Blue Danube operates four double-decker boats for the local river cruise and also catamarans & hydrofoils for the inter-city trips to Bratislava and Budapest. We boarded MS Schlogen, a boat with a capacity of 230 passengers in her two decks… a ticket for the round trip lasting for three and half hours with a stop at Reichsbrucke cost us € 21.00. Schlogen left the jetty at 2 PM and cruised along the Danube canal unfurling Vienna suburbia with its old Gothic buildings carefully conserved, modern offices, town houses, villas & chalets, water front summer homes with fishing nets…we sailed into the main flow channel of wide Danube and soon reached the barrage constructed for the hydel-power station at Freudenau. Our ship along with two others entered the water channel secured by lock gates on both sides, we had approached the barrage from downstream end…the water level at upstream end was around 70 ft. higher…the downstream lock gate was closed and water was slowly released into the channel…the ships floated up and as the channel water level matched that on the upstream side, the lock gate was opened and we crossed over.

The catering services on board the ship MS Schlogen are offered by the restaurant Anton Pyringer…the menu was not so elaborate but a comprehensive one; a few of the items on offer are soups (soup with semolina dumplings or onion soup), salads (leaf salad with ham/turkey strips & garlic/herb dressing), main courses (barbecued turkey fillet with buttered rice, fried brook trout with parsley potatoes, roast beef with coloured pasta, grilled chops with bacons & potatoes, captain’s barbecue with chips & veg), followed by desserts (choice of cakes, pastries, whipped cream…) along with hot & cold beverages, beer & wines.

Floating along Danube and watching the Viennese enjoying their summer on speedboat rides and water-scooters, we reached the mid-point of our journey…the ship stopped at Reichsbrucke jetty, built close to the famous bridge…Reichsbrucke (Empire bridge in German), first constructed in 1876 and reconstructed in 1937, was the only bridge, which could be prevented from being damaged by the retreating German army after the World War II…unfortunately, the gigantic bridge collapsed in 1976 and was built in its present form in 1980. The Reichsbrucke linking the city centre at Stephanplatz with Donaustadt on the other side of Danube is the busiest bridge with six lanes of traffic used by 50,000 vehicles daily and U-Bahn tracks. After about 10 minutes stop-over at Reichsbrucke, MS Schlogen started off on a circular route…we sailed along Donauinsel, 21-km. long artificial island in the middle of Danube known for its recreational facilities…on our right a skyline of modern buildings housing the UN & other corporate offices appeared across the river …252-m high Danube Tower, used for cellular phone, VHF radio & other communication services and now a popular bungee jumping site, loomed large in the horizon on the north of Danube…all steel & glass over 200-m tall Millenium tower, opened in 1999, could be seen on the left bank of the river…we crossed the Nussdorf lock-gate, designed to maintain the difference in water levels between canal and the river and we entered Danube canal once again to head towards Schwedenplatz.

As our cruise came to an end at 5.30 PM, Vienna was getting ready for a glitzy Sunday evening…we trudged along to home into Baden with the everlasting memories of a mighty river, which has flowed through the annals of history and witnessed the triumphs & tribulations of the mankind!

 

(Published in the ‘Yearnings of Yore’, Vol. VIII, 8th. Annual Alumni Meet, IIT Kharagpur, January 2011)

 

Magical Malwa

The trailblazing campaign by Madhya Pradesh Tourism beckoning one to visit the heart of incredible India was enticing indeed! Catalyzed by a flash sale of discounted fares by Air India, we chose Malwa region of MP as our next destination and landed at Indore on a Valentine’s Day evening.  The spanking new all steel and glass airport, named after Devi Ahilyabai Holkar, pays a befitting tribute to the most revered ruler of Malwa. Indore today is the nerve centre of industry, trade and commerce in MP. With large industrial estates at Dewas on one end and Pitampur on another, Indore is home to thousands of professionals engaged in the development and manufacturing of automobiles, chemicals and varied other engineering products. The city has also positioned itself as the centre for quality education in MP with two campuses of prestigious Devi Ahilybai University and several institutions of technology, architecture, medical and dentistry. Indore has the unique distinction in India with both IIT and IIM located in the same city. The thriving city unfolds itself with the newly built high-rise townships, shopping malls with multiplexes, hotels and showrooms of leading brands spread all over.

We checked into our hotel, booked in advance through the internet, located in the central business area of the city. On the next morning, we set out to explore the ‘must sees’ of Indore and stopped first at Rajwada, the royal palace of the Holkars, Peshwa of Malwa. Rajwada was built in 1766 AD by Peshwa Malhar Rao Holkar as the royal abode. The seven storied facade was built with first three floors using stone following the Mughal style and the next four floors by wood as per Maratha style of architecture. The palace has been taken over by the archaeology department of MP government for its conservation and upkeep. We paid Rs.20/- per head as the entry fee and Rs.25/- for the still camera and ambled into the precincts of the palace through an arched wooden doorway. A large well-appointed courtyard separates the facade and the southern block of the palace. The two-storied block at the rear houses a Ganesha idol at a temple below and Darbar Hall at the upper level. Three marble ‘jharokhas’ or hanging balconies with ornate carvings adorn the exterior of Darbar Hall. The expansive Darbar Hall or King’s Court with the royal throne at the centre and large chandeliers hanging from the ceiling was quite impressive. The conservation efforts in restoring the glory of Darbar Hall after it was badly damaged by a fire in 1984 are truly praiseworthy. We visited a small museum at the adjoining wing on first floor displaying various memorabilia of the Holkars – photos & portraits of royalties, old coins of the native state, an array of items gifted by the visiting foreign dignitaries…

On navigating our way through the busy streets around Rajwada, wholesale markets and retail shops, we reached Kanch Mandir (Glass Temple) housed in an old but delicately decorated building. As the place of worship for Jains, the temple has a marble idol of Mahavir at the sanctum sanctorum. The flooring, ceiling, walls, columns, door knobs… are all inlaid with exquisite designs made of glass pieces of many shapes and hues. Sadly with the strict diktat of ‘no photography’ inside the temple, we could not capture the works of art.

Next, on our itinerary, we drove to the famed Lalbagh Palace located almost at the heart of the city. While construction of the palace began during the reigns (1886-1903) of Raja Shivaji Rao Holkar, it could only be completed in 1921 during the rule of his son and successor, Raja Tukoji Rao Holkar. Upkeep of this palace too comes under the aegis of the archaeology department of MP government. On paying Rs.20/- per head as the entry fee and Rs.25/- towards charges for the still camera, we were told photography was allowed only in the palace lawns but not inside. A little perturbed, we walked towards the sprawling garden around the palace. The garden with its manicured lawns surrounded by tall shading trees and interspersed by sandstone sculptures forced us to slow down to soak in the ambiance. We discovered a forlorn marble statue of Queen Victoria under an impromptu rusty shed at a corner of the garden. The palace designed by a blend of Renaissance, Palladian and Baroque styles of architecture transported us straight to medieval Europe. Doric, Ionian and Corinthian styled columns abound in the palace. We noticed very well-crafted sculptures and beautifully painted characters and scenes from Greek & Latin mythology adorning walls and ceilings of the rooms. We were awestruck watching the French windows with heavy drapes, huge chandeliers hanging from the ceiling, large Belgian mirrors on the walls… – the glories and opulence of native state, patronized by the British rule in colonial India!

On the next morning, we zipped down four-laned NH59, part of Golden Quadrilateral on our way to Mandu, the ancient capital town of Malwa. After about 95 km. covered in two hours flat, we reached the outer fringes of Mandu. The history of Mandu or Mandav dates back to 7th century. In the 11th century, the mighty Parmar King Bhoj visited Mandu from Dhar, the then capital of Malwa. He decided to build an impenetrable fort at Mandu at a height of 2000 ft. above the sea and flanked by deep mountain gorges on three sides and the plains of Neemarh on one end. The Mandavgarh Fort with a perimeter of 82 km. soon attracted a bustling settlement of nine lakh people.

In 1305 AD, Emperor Alauddin Khilji from Delhi defeated the ruling Parmar king of Malwa and took control of its reigns. Almost 100 years later, seizing the opportunity of an unstable Tughluqi rule in Delhi Afghan Governor of Malwa, Dilawar Khan Ghuri, declared independence in 1401 AD and started the reign of Ghuri dynasty in Malwa. He shifted the capital from Dhar to Mandu and renamed it as ‘Sahidabad’ or the ‘City of Joy’. Sadly Dilawar Khan did not live long, in 1406 he was killed by poisoning by his son, Alp Khan, who took the name of Hoshang Shah and ruled Malwa for the next 27 years. After his death, his son Muhammad Shah ruled for about four years as he was killed by his general, Mahmud Shah Khilji in 1436 establishing Khilji dynasty in Malwa, which was ruled by them for nearly 100 years till 1531 AD. Hushed anecdotes of sons slaying their fathers, sibling rivalry and unabashed treachery for usurping the throne waft through the alleys of Mandu and nooks & corners of its palaces.

We crossed Alamgir Darwaza, Bhangi Darwaza and Dilli Darwaza, insurmountable gateways of the fort to enter the habitation at Mandu. We checked into Malwa Retreat, a property by MP Tourism and were allotted an AC double-bed room on the first floor. The hotel had a small two storied building with a large lawn and parking area in the front. The garden around the lawn was well cared for with seasonal flowers and decorative potted plants. The reception-cum-cafeteria had a glass-walled kitchen serving hot food to the guests. A cozy balcony at the rear of our room offered an unhindered view of the mountain gorge, ‘Kokhra Kho’ and a patch of forest bordering our hotel.

We set out to explore the archaeological wonders of Mandu. The monuments at Mandu could broadly be classified into three major clusters. The oldest of them, ‘village cluster’ comprising Jami Masjid, Hoshang Shah’s tomb and Ashrafi Mahal is smack at the centre of the small town. About a kilometre away, stands the ‘Shahi Parisar’ or ‘Royal Cluster’ of Jahaz Mahal, Hindola Mahal, Jal Mahal etc. Baz Bahadur’s Palace, Rani Roopmati’s Pavilion and Rehwa Kund are located about 6 km. away from the village cluster.

We decide to spend an afternoon at the village cluster. Archaeological Survey of India (ASI) has taken all the monuments in Mandu under its wings for their conservation and upkeep. On paying Rs.5/- per head as the entry fee for village cluster (no charges for the still camera), we entered the gate and walked up a flight of stairs to reach the expansive courtyard of Jami Masjid. Construction of the mosque, styled after the great mosque of Damascus, was started by Hoshang Shah and completed by Mahmud Shah in 1440 AD. The large prayer hall of Jami Masjid, built using red sandstone with its many columns and arches has a royal throne at the centre raising doubts whether it was an erstwhile King’s court, converted to a mosque later.

We walked past the mosque to reach Hoshang Shah’s tomb, completely made of marble brought from Makrana of Rajasthan. The mausoleum, which precedes Taj Mahal by around 200 years, is the first marble memorial built in India. Emperor Shah Jahan had sent his team of architects and senior craftsmen to Mandu study its design and construction. Hoshang Shah had constructed his own mausoleum much before his death. The ruler, who had killed his father, could not perhaps rely on his son to do the honour for him after his death. At the centre of the mausoleum, lies the main sarcophagus of Hoshang Shah shaped into a casket with receding bands and a moulded mihrab at the top with Hindu designs. A few other graves are also seen in the main chamber with three of them made of marble. We discovered lotus motifs also on the mausoleum walls. Our guide informed that the mortal remains of Hoshang Shah were not interred there at all; his real grave is located somewhere near Hoshangabad in Madhya Pradesh.

We came out of Jami Masjid complex and crossed the road to approach Ashrafi Mahal.  On clambering up a steep flight of stairs, we reached the first floor of the huge structure. Muhammad Khilji had initially built a grand madrasa at Ashrafi Mahal and converted it later to a mausoleum. We saw the graves of Md. Khilji and his other family members at the upper level. The roof at that level had collapsed long ago; we saw relics of carved stone panels with Arabic scriptures, which once adorned the ceilings and pillars. The lower level was meant for the hostelry with rows of single-room dorms constructed all around.

For an appointment with the setting sun, we arrived at Lohani Caves located about a kilometre away from the village cluster. We walked down a good flight of stairs to reach the small caves carved out of the rocky walls. The gurgling flow of a stream and happy chirping by large flocks of birds returning to their nests only added to serenity of the place. We were witness to slow disappearance of the sun in Deccan plateau across the deep gorges painting a large canvas of the sky with various hues of orange. I got busy with the camera trying to capture the nature’s artwork.

All over Mandu, one would come across many stocky Baobab trees; these bereft of any leaves in February appeared like the ones planted upside down with their branches resembling intricate root system spreading in the sky! But Baobab is essentially an African tree variety, how could it find its way to Mandu? According to history, their origin dates back to around 600 years. As Mandu attained the pinnacle of glory during the 33-year long reign of Muhammad Khilji, its fame spread to distant shores beyond India. The Sultan took great initiatives in establishing diplomatic relations with West Asia, Egypt and other African countries.  The diplomats and visitors from those countries gifted Baobab fruits, known for their thirst-quenching actions to Sultan and that explained the presence of a strange flora in Mandu!

On the next morning, we visited the ‘Royal Cluster’. ASI’s efforts in maintaining the entire complex and its beautification are truly praiseworthy. After the demise of Muhammad Khilji in 1469 AD, his son Ghiyas-ud-din Khilji took over the reins of Malwa. Ghiyas-ud-din could be described as a person with peculiar traits – a man with secular credentials, who studied Hindu mythology and religion and never fought a single war. An avowed teetotaler, Ghiyas-ud-din developed a great penchant for womenfolk. He built the beautifully majestic palace, Jahaz Mahal and set up a harem of 1500 begums sourced from India, Arabia, Turkey, Central Asia and so on. The palace, hemmed in by two large water bodies, Manj Talao and Kapoor Talao appears to be a ship floating in the water. Extracts from aromatic and medicinal herbs were added to the water bodies, where the begums were required swim to maintain their figures and to prevent greying of their hair! Circulation of water within the double-walled space and presence of many small and large pools inside the palace aided the cooling effect in Jahaz Mahal. We climbed up to the rooftop of Jahaz Mahal to enjoy the beauty of expansive royal complex.

We walked down to Hindola Mahal, which was used for holding the royal court and public appearance by Sultan Ghiyas-ud-din Khilji. The palace has intricate subterranean passages for escaping from Mandu in the event of enemy attack. Some of them were wide enough for use by Roopmati for her furtive travels in a palanquin to Baz Bahadur’s Palace. A seemingly innocuous swimming pool had a secret passage underneath. All this went on to prove that Ghiyas-ud-din was suffering from an acute paranoia of anticipated aggression by his foes. Due to so many underground tunnels, Hindola Mahal has no foundation. It was built with walls and columns of very wide bases and their thickness gradually reduced upwards. The palace has no roof; temporary thatched roof was used during the rains. Inclined walls of the palace gave it the look of a swing and thus it was so named.

A little ahead, we visited the hammam

, royal bathhouse for the Begums. It had all the contraptions of a modern bathroom with large bathtubs filled with rose water and side panels with many small holes for steam to waft in for an invigorating sauna. Within a short radius we saw the relics of many other palaces, Rani Mahal, Jal Mahal… and Champa Baori, the stepped well for the potable water source in the Royal Cluster. I spent some time clicking around such beautiful archaeological remains. While resting at the lawns of Jahaz Mahal, we reminisced how time turns all the wealth, opulence and power into the annals of history!

Our last destination in Mandu happened to be Roopmati’s Pavilion. History tells us that Sher Shah Suri captured Mandu in 1542 AD and handed its reigns to his trusted general Shujat Khan. As Shujat Khan died after ruling Mandu for 12 years, his sons fought bitterly amongst themselves for usurping the throne. One of them, Miyan Bayezid emerged victorious; he took the name of Baz Bahadur and became the King of Malwa. While on a royal hunting expedition in nearby forests, he had reached Dharmapuri and was overwhelmed by an excellent rendition of Raga Vasanta by Roopmati, young daughter of the local Rajput chieftain. Baz Bahadur proposed that she should accompany him to Mandu for better nurture and expression of music. Roopmati, noted for her exquisite beauty had agreed to shift to Mandu on one condition that she should be able to see river Narmada very day guide informed us that Baz Bahadur mobilised all his resources to build Roopmati’s Pavilion within 48 hours on the hillock. Music brought Baz Bahadur and Roopmati very close emotionally but the love story had a tragic end. In 1561 AD, general Adham Khan was sent by Emperor Akbar to capture Mandu. Baz Bahadur, defeated in the war absconded and Roopmati committed suicide for the fear of getting humiliated in the hands of Adham Khan.

After a steep climb uphill and clambering up a set of stairs, we reached Roopmati’s Pavilion, located on the highest point of Mandu from where we could see the streaks of Narmada flowing in the plains of Deccan Plateau. I tried to capture the distant plains green with the crops, the ambiance of Roopmati’s pavilion and view of Baz Bahadur’s palace from there. Baz Bahadur’s Palace was located closely at the base of the hillock near Rewa Kund, a large pond considered sacred for its alleged underground connection with river Narmada. We saw an elaborate swimming pool at the central courtyard of Baz Bahadur’s Palace. How did water reach the pool? Our guide informed water from Rewa Kund used to be lifted by Ferris Wheels at two different levels to feed the pool!

On our way back, we stopped at echo point of Mandu. At a distance, we saw two ‘havelis’ (small palaces), named as ‘Dai-ki-Mahal’ and ‘Dai-ki-Behen-ki-Mahal’ meant for the royal midwives. At one point, the guide shouted, Hello – it echoed, Hello. A few feet away, he shouted again, Hello and the sound returned twice, Hello, Hello; how interesting!

 

 

 

 

 

 

সুন্দরী সাইপ্রাস

এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকার ঠিক যেন কেন্দ্রবিন্দুতে সাইপ্রাস – সুনীল, সফেন ভূমধ্যসাগরে সে এক অপরূপ দ্বীপরাজ্য । সুন্দরী সাইপ্রাসের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে পৌঁছেছিলাম এক নতুন দেশে – ইতিহাসে ও নিসর্গে সাইপ্রাস করেছিল বিভোর ।  সুযোগটা এসেছিল আকস্মিকই – Commonwealth Science & Technology বিভাগ আয়োজিত সাইপ্রাসে এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে প্রবন্ধ পড়ার আমন্ত্রণ; আমার যাত্রা শুরু এক রবিবারের ভোরে, দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দর থেকে দুবাই, Emirates-এর বিমানে; তারপর দুবাই থেকে Larnaca, সাইপ্রাসের আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার । ইউরোপের নামী সব বিমান কোম্পানি বড় বড় শহরগুলি থেকে সাইপ্রাসে উড়ান চালায় নিয়মিত, এছাড়াও আসে চার্টার্ড বিমানে দল দল পর্যটক – সাইপ্রাস ইউরোপের এক মুখ্য আকর্ষণ, সমুদ্রতট ও রুপোলী রোদ্দুরের সৌজন্যে ।

পূর্বের Larnaca থেকে আমি চললাম পশ্চিমপানে – আমার গন্তব্য Paphos, সাইপ্রাসের এক রিসর্ট শহর আর সেখানেই আমাদের কনফারেন্স । দ্বীপরাজ্যের দক্ষিন তটরেখা ধরে চলল আমাদের ট্যাক্সি । Larnaca বিমানবন্দর ছাড়াতেই সঙ্গী হল ভূমধ্যসাগর, শুরু নীল আকাশ ও সমুদ্রের নাচানাচি ! কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছলাম বন্দর-শহর Limassol-এ; ব্যস্ত বন্দর ছাড়াও Limassol এখন তথ্য-প্রযুক্তিতে অগ্রগন্য, তার দৌলতে বেশ কিছু ভারতীয়র বসবাস সেখানে । চারপাশে চুনাপাথরের ন্যাড়া পাহাড় আর সমতলে কমলালেবু ও আঙ্গুরের ক্ষেত ছাড়িয়ে আমাদের গাড়ি দ্রুতগতিতে চলল চওড়া হাইওয়ে ধরে । বেশ যেন তাড়াতাড়িই আমরা পৌঁছে গেলাম Paphos-এ ।

আমাদের কনফারেন্সএর আসর বসেছে Paphos -এর সেন্ট জর্জ হোটেলে, সেখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা । সেন্ট জর্জ এক নামী রিসর্ট সাগরতটে অনেকটা জায়গা নিয়ে; কিছুদিনের জন্য জীবনের ব্যস্ততা ভুলিয়ে দেওয়ার, নিজেকে ভুলে থাকার নানারকম বন্দোবস্ত – অবসর বিনোদনের অনেক উপচারই মজুত হোটেলে, মায় হোটেল সংলগ্ন গলফ কোর্স পর্যন্ত ! কিন্তু দেখি অনেক বিদেশী পর্যটকই স্রেফ অলস অবকাশে বিশ্বাসী – সমুদ্রের ধারে সুইমিং পুলের চারপাশে ডেক চেয়ারে শয়ান সবাই, বাদামী ত্বকএর সাধনায় । আমি পৌঁছেছি পড়ন্ত বিকেলে, তাই আর দেরী না করে আমি সটান দৌড়েছি হোটেলের নিজস্ব সী বীচে । সূর্য তখন ঘোষণা করছেন দিনের শেষ আর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন ঘুম পাড়ানির দেশে…ভূমধ্যসাগরের নীল রঙে লেগেছে লালিমা…আমার আঙ্গুল ব্যস্ত হয়ে উঠলো ক্যামেরার শাটারএ, ভুমধ্যসাগরে সূর্যাস্ত – এক অনন্য দৃশ্যের চিরসাক্ষী রইলাম আমি !

সেন্ট জর্জ হোটেলের পাশেই এক ছোট চ্যাপেল…অনেক দম্পতিকেই দেখলাম হানিমুন করতে এসে বিয়েটাও সেরে ফেলছেন ঐ চ্যাপেলে ! এদের মধ্যে এক ভারতীয মহিলাও শামিল, তিনদিনের হানিমুনের পর বিবাহ করলেন এক কৃষ্ণবর্ণকে ।

ভূমধ্যসাগরের দ্বীপগুলির মধ্যে আয়তনে সাইপ্রাস তিন নম্বরে – সিসিলি ও সার্দিনিয়ার পরেই, প্রায় সাড়ে নয়হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে তার বিস্তার । খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ বছরেরও পুরোনো মানবসভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে সাইপ্রাসে । ইউরোপ ও এশিয়ার বানিয্যপথে এক স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান সাইপ্রাসের, তাই পৃথিবীর সব পরাক্রমী শক্তিই চেষ্টা করেছে সাইপ্রাসকে তাদের তাঁবে রাখতে – ইতিহাসের হাত ধরে ছুটে এসেছে  Mycenaeans, Phoenicians, Assyrians, Egyptians আর Persians. আগ্রাসনের বহূ ঝড়ঝাপটাই সহ্য করেছে সাইপ্রাস – Alexander the Great তারপর Ptolemy, অবশেষে রোমানরা সাইপ্রাস দখল করে  খ্রিস্টপূর্ব ৫৮ সনে; তারা রাজত্ব করে আটশো বছরেরও বেশি – সেই সময় সাইপ্রাসে হয় সর্বাঙ্গ উন্নতি । এরপরে ৯০০ বছর চলে ক্ষমতার পালাবদল, ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে অটোমান সাম্রাজ্যভুক্ত হয় সাইপ্রাস, প্রায় তিনশো বছর পর ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে সাইপ্রাস আসে বৃটিশের অধীনে । অবশেষে ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা; কিন্তু সাইপ্রাসকে নিয়ে  শুরু হয় গ্রীস ও তুরস্কের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবল টানাপোড়েন যার ফলে ১৯৭৪ সনে সাইপ্রাস হয় দ্বিখন্ডিত । দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় Turkish Republic of North Cyprus. ২০০৩ সালে সাইপ্রাস লাভ করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ ।

এখন সাইপ্রাসে প্রায় আটলক্ষ দ্বীপবাসী – গ্রীক ভাষার চলই বেশি, ইংরাজি সাইপ্রাসের দ্বিতীয় ভাষা; বেশিরভাগ সিপ্রিয়টরাই গ্রীক সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন যদিও তুর্কি সবথেকে কাছের দেশ, মাত্র ৬৪ কিমি দূরে । ধর্মমতের বিচারে সিপ্রিয়টদের প্রায় ৮০% অর্থডক্স খ্রীস্চান, বাকিরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী । সরকারী প্রচেষ্টায় সাইপ্রাসে সাক্ষরতার হার যেকোনও উন্নত দেশের থেকেও বেশি, প্রায় ৯৯%; কারিগরী শিক্ষা বা হাইস্কুলে পড়াশোনা সরকারি বদান্যতায় সবই নিখরচায় । উচ্চশিক্ষার জন্য রয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ সাইপ্রাস, সেখানে গবেষনার জন্য ঢালাও অর্থের মঞ্জুরি আসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে । শিক্ষার পরেই জনস্বাস্থ্য – সেখানেও সাইপ্রাস অনেকটা এগিয়ে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সাইপ্রাসবাসীর স্বাস্থ্যপরিষেবায় সরকারি সাহায্য অপরিমিত ।

সাইপ্রাসের অনেক জায়গাই ইউনেস্কো ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্য ভূমি’ (World Heritage Site) তকমাধারি । এর মধ্যে বিশিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক স্থানে যাবার সুযোগ হয়েছিল আমার । Paphos -এর কাছেই মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে প্রায় আড়াইহাজার বছর আগের বেশ কিছু অভিজাত পরিবারবর্গের ও রাজকর্মীর সমাধি । পাথর কেটে সারি সারি চওড়া সুড়ঙ্গের মধ্যে সমাধিগুলি, ডরিক স্তম্ভ খোদাই করা সুড়ঙ্গের সামনে ।

Nicosia-র কাছে গিয়েছিলাম Choirokoitia দেখতে, প্রায় ৯০০০ বছরের পুরনো উপনিবেশের ধ্বংসাবশেষ । সাইপ্রাসের সবচেয়ে প্রাচীন বাসিন্দা neolithic গোষ্ঠী সেখানে বসবাস করত পাহাড়ের ঢলে নদীর ধারে । বৃত্তাকার ছোট ছোট চুনাপাথরের কুটীর, মাথায় পাথরের ছাদ; পাঁচটি কুটীর নতুন করে তৈরী করা হয়েছে আদি মালমশলা ব্যবহার করে উপনিবেশের চেহারাটা বোঝার জন্য ।

সাইপ্রাসের এক বিশেষ দ্রষ্টব্য Paphos মোজাইক, তৃতীয় থেকে পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দে তৈরী অনেক উচ্চবিত্তের বাড়ীর মেঝেতে ও দেয়ালে ছোট্ট ছোট্ট সেরামিক টালি নির্মিত অপূর্ব শিল্প নিদর্শন – গ্রীক পুরাণের নানান কাহিনী, গ্রীক দেব-দেবী ও সূক্ষ নকশার কারূকাজ, এ সবই সাইপ্রাসের শিল্পসমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী । সাইপ্রাস মোজাইকের জন্য বিখ্যাত Dionysos বাটীকা (House of Dionysos) দেখে খুব ভালো লাগলো এইসব মোজাইকের অমূল্য সম্ভার ইউনেস্কোর World Heritage Site হিসেবে বেশ যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত ।

আফ্রোদিতির কথা না লিখলে সাইপ্রাসের যে কোনও বর্ণনাই  অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে – আফ্রোদিতি গ্রীক পুরাণে প্রেমের দেবী, পৃথিবীতে আবির্ভূতা সর্বোত্তমা সুন্দরী । ‘Zephyr’ পবনে ভাসিয়ে নিয়ে আসা এক বিশালাকার শুক্তি থেকে আফ্রোদিতি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন সাইপ্রাসের সমুদ্রতটে । সেই জায়গা Petra Toy Romiue, আফ্রোদিতির জন্মস্থান, Paphos শহর থেকে ২৫ কিমি দূরে । সেখানে ভূমধ্যসাগর অর্ধচন্দ্রাকারে শায়িত, বেশ উঁচু ও খাড়াই এক পাহাড়ের পাদদেশে – পাক বেয়ে উঠে যাওয়া পাহাড়ি রাস্তা থেকে অনেকটা নীচুতে ঐ সমুদ্রতটের দৃশ্য বেশ রোমাঞ্চকর ।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য Paphos থেকে ১৪ কিমি দূরে Kouklia গ্রাম – খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত আফ্রোদিতি স্মারক । চারপাশে প্রত্নতত্বের অমূল্য নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে; প্রাসাদ, মন্দির ও প্রার্থনাগৃহের ধ্বংসাবশেষ – পাথরে খোদাই অপূর্ব শিল্পকলার ভগ্নস্তুপ । সেখানেই আফ্রোদিতি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত প্রস্তরমূর্তি, ভেঙ্গে পড়া পাথরের থাম, আফ্রোদিতি ব্যবহৃত বাথটাব, পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরী বিশালাকার পাত্র – এ যেন টাইম মেশিনে চড়ে হাজার হাজার বছর আগের ইতিহাসের কল্পরাজ্যে প্রবেশ !

খাদ্যরসিক পর্যটকের সাদর আমন্ত্রণ সাইপ্রাসে – যে কোনও শহরের আনাচে কানাচে রয়েছে অগুনতি রেস্তোরাঁ; দ্বীপ-দেশে সীফুডএর প্রাধান্যই বেশি । Paphos জেটির কাছে অনেকগুলি রেস্তোরাঁয় পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড় – সদ্য ধরা চিংড়ি, কাঁকড়া ও ঝিনুকের লোভে ! লাঞ্চ কিংবা ডিনারে জনপ্রিয় স্থানীয় খাদ্য গ্রীক ‘mezze’ – পাঁচ বা ছয় কোর্সে পরিবেশিত বিভিন্ন মাছ অথবা মাংসের ব্যঞ্জন । আমাদের কনফারেন্স ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিল Paphos শহরের উপকন্ঠে এক গ্রীক রেস্তোরাঁয়, Pinto’s এ । ‘Mezze’, সাইপ্রাসের বিখ্যাত স্থানীয় রেড wine ও তারসঙ্গে রেস্তোরাঁর ব্যান্ড পরিবেশিত উচ্চগ্রামের গ্রীক সঙ্গীত, সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ !

হঠাৎ দেখি এক শ্যামবর্ণ প্রৌড় ইংরাজিতে ‘আপনারা কি ভারতীয়?’ বলে এগিয়ে এলেন আমাদের সঙ্গে আসা শ্রীলংকার প্রতিনিধিদের কাছে । দলে আমিই একমাত্র ভারতীয় জানতে পেরে ভদ্রলোক সোজা চলে এলেন আমার দিকে, ‘আপনি ভারতবর্ষের কোথা থেকে?’ আমার প্রশ্নে জবাব পেলাম, ‘কলকাতা’ । অতঃপর শুরু দুজনের বাংলায় কথোপকথন সাইপ্রাসের সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ! ভদ্রলোক পেশায় চিকিৎসক, আর জি কর মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে MBBS, তারপর UK পাড়ি ও ব্রিটিশ হেলথ্ সার্ভিসে চাকরি, এখন অবসরপ্রাপ্ত । আলাপ হলো তাঁর মেম-পত্নীর সঙ্গে, জানতে পারলাম ডাক্তারবাবু সাইপ্রাসে বাড়ি কিনেছেন, প্রায়ই পালিয়ে আসেন বৃষ্টিভেজা, স্যাঁতসেঁতে ইংল্যান্ড থেকে রোদ ঝলমলে সাইপ্রাসে !

কনফারেন্সের শেষে আমরা গিয়েছিলাম সাইপ্রাসের রাজধানী Nicosia-তে, যার অধুনা নাম Lefkosia । সে এক  আশ্চর্য শহর, চারিদিকে বাস্তুকলার অসংখ্য নিদর্শন – মধ্যযুগীয় প্রাসাদ, অট্টালিকা, গীর্জা, মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারীর ছড়াছড়ি; সময় যেন থেমে গেছে হঠাৎ Nicosia-তে । শহরের অলিগলিতে ছড়ানো বাজার হস্তশিল্পের সূক্ষ কাজ, alabaster (এক বিশেষ ধরনের মাটি) এর তৈরী আফ্রোদিতি ও অন্যান্য গ্রীক দেবদেবীর মূর্তি, মুখোশ…সাইপ্রাসের স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহে অনেকটা সময়ই কাটলো আমাদের ।

হঠাৎই একদিন যেন হল স্বপ্নভঙ্গ – দিন ফুরোলো আমাদের সাইপ্রাসে । Paphos-এর সমুদ্রতীর, গ্রীক সঙ্গীতের মূর্ছনা ও অপরূপা আফ্রোদিতির কল্পলোক থেকে ফিরে এলাম দৈনন্দিন জীবনে !

[হাওয়াবদল, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১লা জুলাই, ২০১১]

Heavenly Havelock

We had just settled in for a leisurely dinner at Megapode Retreat, Port Blair and the local travel agent dropped a bombshell…we are booked for the trip to Havelock Island next morning. The travel agent was quite firm, “Sir, the ferry leaves at 6.30 sharp…my car will fetch you all at six o’clock from the hotel lobby”. It was quite a disturbing thought…getting up by 5.00 in the morning. Considering we just landed at Port Blair the same day by a flight, which had left Kolkata at an ungodly hour of 5.00 AM, we almost hated the idea!The bright & sunny morning next day dispelled a lot of our worries and saw us rushing towards the jetty for inter-island ferries leaving from Phoenix Bay of Port Blair. We boarded MV Kamorta, a ship sailing from Port Blair to Rangat in Middle Andaman with stopovers at Neil & Havelock islands on the way. We preferred Kamorta over MV Ramanujam, which was also leaving at the same time… Ramanujam was a bigger ship with

The bright & sunny morning next day dispelled a lot of our worries and saw us rushing towards the jetty for inter-island ferries leaving from Phoenix Bay of Port Blair. We boarded MV Kamorta, a ship sailing from Port Blair to Rangat in Middle Andaman with stopovers at Neil & Havelock islands on the way. We preferred Kamorta over MV Ramanujam, which was also leaving at the same time… Ramanujam was a bigger ship with the higher capacity of 800 passengers but it was also slower between the two. The ship, Kamorta, named after a tiny island belonging to Nicobar archipelago, is owned by Shipping Corporation of India and operated by the Directorate of Shipping Services, A&N Administration.

The passenger sitting area on the covered deck of Kamorta was cramped and sultry… the non-functional ACs added to the woes!  While the passengers initially scrambled to grab their seats, they soon gave up the idea and rushed out to upper decks for cooler climes. As the shorelines of Port Blair receded fast and Kamorta hit the main channel, we experienced a bit of bounce sideways. That caused enough uneasiness for the first timers. Going down into the hull, there was an option of lying on the cushioned bunks and thankfully the ACs worked there. Our group gradually settled into the bunks…some of us catching a nap too in the process. Eventually, we located the ideal resting place…the main door opening at the deck tunnelling in a strong breeze.Within two hours, we reached Neil Island, a small island situated 36 Kms. north-east of Port Blair. The island has about 4000 inhabitants, mostly resettlers from erstwhile East Pakistan after Indian independence. The island has come to be known as ‘vegetable bowl’ of Andaman; having worked hard for it, the local Bengali population now enjoys good income from the harvests. Neil has a nice beach and now boasts of a few ‘resorts’ with thatched huts, mostly frequented by foreign tourists. The stopover was for 15 brief minutes and Kamorta sailed again for Havelock.

Within two hours, we reached Neil Island, a small island situated 36 Kms. north-east of Port Blair. The island has about 4000 inhabitants, mostly resettlers from erstwhile East Pakistan after Indian independence. The island has come to be known as ‘vegetable bowl’ of Andaman; having worked hard for it, the local Bengali population now enjoys good income from the harvests. Neil has a nice beach and now boasts of a few ‘resorts’ with thatched huts, mostly frequented by foreign tourists. The stopover was for 15 brief minutes and Kamorta sailed again for Havelock.I met Tarak Saha, an elderly Bengali travelling with his daughter by

I met Tarak Saha, an elderly Bengali travelling with his daughter by ship. After spending a few days with his relatives at Neil, Tarak was returning to his home at Havelock. He migrated to Kolkata from Faridpur district of East Pakistan in 1960 and was resettled in Havelock under rehabilitation programme of Ind the Indian government. Tarak proudly informed that Bengali resettlers in Havelock reaped great harvests from the fertile land – the income from the betel nuts, coconuts & paddy harvested

annually was enough deterrent for them to seek any job as such! He readily invited us to visit his village in Havelock.

We reached Havelock at about 9.30 in the morning. Havelock Island, located 54 Kms. from Port Blair, is known for its pristine beaches, lush green rain forest and exotic marine life. The island has become a major tourist destination these days with many Indian & foreign nationals thronging in. Indian families mostly arrive by the morning ferry and depart by the evening with a ‘must-see’ visit to Radhanagar beach. Foreigners take to unwinding themselves by spending weeks at a stretch and imbibing in the slow paced life in the island. The authorities strive to promote eco-tourism in Havelock with numerous signboards appealing to the visitors for improved sensitivity to the environment. Havelock is dotted with so called ‘resorts’, mostly with basic facilities. A few of them though offer upmarket amenities and activities like scuba diving, snorkelling etc. Their presence on the Internet is mostly targeted to woo the foreign tourists…some of them have been known to charter flights in recent times for groups of tourists from Thailand too.Our jeep took the narrow metalled road meandering through small villages and thick plantation of betel nut & coconut trees. We headed to Dolphin Yatri Nivas, a property owned by Andaman Tourism. The resort, 3 Kms. from the jetty and located right next to Vijaynagar beach, scores full marks for its proximity to the sea but needs to catch up miles in food, service, maintenance etc. The deluxe cottages, quite moderately priced, are newly constructed and spacious with attached toilets & front verandahs for an uninterrupted view of the sea. We went straight to the beach lined with arching trees. The colour of the seawater ranging from azure blue to turquoise green spoke volumes about its unpolluted nature. The beach was strewn with large pieces of driftwood, dead corals and shells. We saw many hermit crabs in colourful shells befitting their sizes. The waves were gentle almost lulling into one’s feet. To top it all, the beach had hardly any visitors.

Our jeep took the narrow metalled road meandering through small villages and thick plantation of betel nut & coconut trees. We headed to Dolphin Yatri Nivas, a property owned by Andaman Tourism. The resort, 3 Kms. from the jetty and located right next to Vijaynagar beach, scores full marks for its proximity to the sea but needs to catch up miles in food, service, maintenance etc. The deluxe cottages, quite moderately priced, are newly constructed and spacious with attached toilets & front verandahs for an uninterrupted view of the sea. We went straight to the beach lined with arching trees. The colour of the seawater ranging from azure blue to turquoise green spoke volumes about its unpolluted nature. The beach was strewn with large pieces of driftwood, dead corals and shells. We saw many hermit crabs in colourful shells befitting their sizes. The waves were gentle almost lulling into one’s feet. To top it all, the beach had hardly any visitors.In the afternoon, we drove down to Radhanagar beach, located at the western part of the island. Radhanagar, rated the best beach in Asia by the Time magazine, is a killer combination of silver sands, crescent forming hillocks and green vegetation all around! The water was crystal clear and the waves were so gentle, they were hardly carrying any sand with them. We spent full three hours in the sea…as the sun had set behind the clouds, we felt dog-tired and deserved some sleep after a long day.

In the afternoon, we drove down to Radhanagar beach, located at the western part of the island. Radhanagar, rated the best beach in Asia by the Time magazine, is a killer combination of silver sands, crescent forming hillocks and green vegetation all around! The water was crystal clear and the waves were so gentle, they were hardly carrying any sand with them. We spent full three hours in the sea…as the sun had set behind the clouds, we felt dog-tired and deserved some sleep after a long day.

Our jeep driver, Rabindra Mandal, has been a third generation young islander…his grandfather settled in Havelock in late 50’s. Rabindra reiterated the prosperity of Bengali resettlers basking on the agricultural income from their New Found Land. He showed us the newly commissioned solar power facility for the island with a large array of silicon panels. Rabindra pointed out the excellent health of island roads, courtesy recent visit by the President of India. In the ensuing summer break, Rabindra along with his group of friends & family members planned to travel by ship to Chennai and thereafter to Mumbai by train. The Islander ID card, issued by the local authorities, entitles one to avail concessional fares for travels by ship & air. Surprisingly for all the resettler Bengalis, Kolkata does not figure much in their scheme of things…be it for tourism, medical treatment or education, Chennai scores over Kolkata. Is it due to a hurt somewhere deep within that they were not accommodated in West Bengal but pushed several miles away into an unfriendly island?

Next morning we checked out from the hotel after the breakfast, dumped our bags at Nala Restaurant near the jetty and carried the towels & costumes with us…we were all set for the famed Elephant beach, the snorkelling haven of Havelock. Elephant beach, located at the north-western part of the island, is best approached by a boat from the jetty sailing along the eastern & northern coastline as otherwise, one has to traverse through a thick rainforest without a good motorable road. Six of us boarded quite a rickety wooden boat fitted with an outboard engine…two lanky juvenile boatmen looked very confident of giving us a taste of adventure!The boat sputtered on its way to Elephant Beach and bounced & tossed a little for all of us to sit stiffly! It took good 30 minutes to reach the destination where groups of families had already gathered for the novel experience of snorkelling. The initial process of using snorkelling gear, getting used to breathing through the mouth and floating on the life-belt with our heads below the water took us some time. The kids were fast learners and they were first to venture out. Our boatmen, who also doubled as our snorkelling guides, took turns to push us into the deeper & calmer zones of the sea. But the view down below was simply breathtaking, really worth all the troubles…colourful live corals, sea anemones & sea urchins with more colourful fishes wafting by…we were in nature’s garden with bounties of beauty!

The boat sputtered on its way to Elephant Beach and bounced & tossed a little for all of us to sit stiffly! It took good 30 minutes to reach the destination where groups of families had already gathered for the novel experience of snorkelling. The initial process of using snorkelling gear, getting used to breathing through the mouth and floating on the life-belt with our heads below the water took us some time. The kids were fast learners and they were first to venture out. Our boatmen, who also doubled as our snorkelling guides, took turns to push us into the deeper & calmer zones of the sea. But the view down below was simply breathtaking, really worth all the troubles…colourful live corals, sea anemones & sea urchins with more colourful fishes wafting by…we were in nature’s garden with bounties of beauty!

Finally, all good things must come to an end…we returned to harsher reality to Havelock, savoured the South-Indian buffet lunch at Nala restaurant and waited for the return ferry to Port Blair. The voyage by MV Strait Island leaving Havelock at 4.30 in the afternoon was uneventful…it was a faster journey with no stopping over at Neil this time. Gradually the dusk approached with all its hues of paint brushing the clouds and the sea…we spotted the North Bay lighthouse near Port Blair from a good distance and soon after the town appeared prominent in the horizon bedecked with its string of lights beckoning us to its folds!

সেন্ট ল্যুইস-এর গেটওয়ে আর্চ

আমেরিকার মিসৌরি প্রদেশে সেন্ট ল্যুইস শহরের কথা মনে হলেই বিশালাকায় স্টেনলেস স্টীল আর্চের ছবিটা ভেসে ওঠে । আমাদের আগ্রা মানেই যেমন তাজমহল, দিল্লি মানেই কুতুব মিনার, সেন্ট ল্যুইস-এর পরিচিতি ঐ ‘গেটওয়ে আর্চ’! পোষাকি নামটা অবশ্য Jefferson National Expansion Memorial – প্রেসিডেন্ট জেফারসন স্মারক । সেন্ট ল্যুইস শহরে এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে প্রবন্ধ পড়তে গিয়েছিলাম আমি; কনফারেন্স শেষ হতেই অক্টোবরের এক সোনালী সকালে রওনা দিলাম আর্চ অভিমুখে।  হোটেলের কাছ থেকে মেট্রো ধরে নামলাম Laclede’s Landing নামে স্টেশনে, স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়েই মিসিসিপি নদীর পশ্চিম পাড় ঘেঁষে  জেফারসন মেমোরিয়াল পার্ক, ৯১ একর জুড়ে । পার্কের আর এক দিকে ঐতিহ্যময় Old Courthouse । মেমোরিয়াল পার্কের দেখভাল, পরিবেশ সৌন্দর্যায়ন-এর দায়িত্বে রয়েছে আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকার অধীনস্থ  ‘ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস’ । বছরে প্রায় চল্লিশ লক্ষ পর্যটকের আনাগোনা এই পার্কে । ল্যান্ডস্কেপ করা বিশাল এই পার্ক, তার মাঝে স্নিগ্ধ জলাশয়, পার্ক-এর মধ্যে আঁকাবাঁকা বাঁধানো পায়ে চলার পথ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাইপ্রেস, রোজহিল ও স্যুইটগাম গাছের সারি – সব মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশ ! আমি লক্ষ্য করলাম পর্যটকরা সবাই চললেন সোজা আর্চের দিকে, তাড়াতাড়ি আর্চের মাথায় চড়ে সেন্ট ল্যুইস শহর ও মিসিসিপি নদীর রূপ ‘পাখির চোখে’ দেখতে ।

স্টেশন থেকে পাক্কা ১০ মিনিট হেঁটে আমি পৌঁছলাম আর্চের কাছে – আর্চের দুই পায়ের মাঝে মাটির তলায় ৪৫,০০০ স্কোয়ার ফুট জুড়ে বিরাট ‘ভিজিটর সেন্টার’ ; প্রবেশদ্বারেই সুরক্ষার কড়াকড়ি, আপাদমস্তক  সার্চ ও ক্যামেরা ব্যাগ এক্স-রে করে তবেই প্রবেশের অনুমতি । সেন্টার–এর মধ্যেই দু’টি অডিটোরিয়াম, ‘টাকার’ ও ‘ওডিসি’ থিয়েটার আর এক ম্যুজিয়াম,  Museum of Westward Expansion যেখানে আমেরিকান সভ্যতার পশ্চিম পানে অগ্রগতির ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে । রেড ইন্ডিয়ানদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, পোষাক-পরিছ্বদ, নানারকম পাত্র…সযত্নে সংরক্ষিত লুপ্ত সভ্যতার চেহারাটা বোঝানোর প্রচেষ্টায় । টাকার থিয়েটারে দেখলাম আধঘণ্টার এক তথ্যচিত্র, ‘Monument to the Dream’; এটি প্রথম দিন থেকে ধাপে ধাপে আর্চ তৈরির দৃশ্য বন্দী করেছে তথ্যসমৃদ্ধ ভাষ্য সমেত । ম্যুজিয়াম দর্শন, আর্চের ওপর এই ফিল্ম দেখা আর আর্চের মাথায় চড়া এসব মিলিয়ে টিকিট ১১ ডলার । ভিজিটর সেন্টারে এক দোকানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় – আর্চের নানা স্মৃতিচিহ্ন, ছোট মডেল, ছবি, চাবির রিং, চকলেট…এসব সংগ্রহে । আর এক দোকান, লেভী জেনেরাল স্টোর উনিশ শতকের সেন্ট ল্যুইস  অঞ্চলে জনপ্রিয় খাবারদাবার, মাফিন, জ্যাম, সসেজ, প্রেটজেল…এর পসরা সাজিয়েছে ।

আমেরিকার প্রবাদ পুরুষ ও তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, টমাস জেফারসন-এর সম্বন্ধে কিছু আলোচনা না করলে গেটওয়ে আর্চের বর্ণনা একেবারেই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে । জেফারসন ১৮০১ থেকে ১৮০৯ সাল অবধি দু’বার আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ভার সামলান । প্রেসিডেন্ট জেফারসন ছিলেন এক বিচক্ষণ রাজনীতিক এবং পরাক্রমী নেতা; পরবর্তীকালে আমেরিকার অগ্রগতির জন্য তিনি অনেকাংশেই দায়ী । তাঁর ছিল এক বিরল বহুমুখী প্রতিভা, তিনি ছিলেন কৃষি বিশেষজ্ঞ ও ফল-ফুলের বিশারদ, প্রত্নতত্তবিদ ও বাস্তুকার, লেখক ও আবিষ্কারক…ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন  জেফারসন । প্রেসিডেন্ট জন কেনেডি ১৯৬২ সালে হোয়াইট হাউসে ৪৯ জন আমেরিকান নোবেল-বিজয়ীদের এক সম্বর্ধনা ডিনারে আমন্ত্রন করে বলেছিলেন, “হোয়াইট হাউসে একসঙ্গে এত ট্যালেন্টের ও গুণীজনদের সমাগম এই প্রথম…এর শুধুমাত্র ব্যতিক্রম বোধহয় যখন প্রেসিডেন্ট জেফারসন একা ডিনার করতেন ।” কি অসামান্য সম্মানজ্ঞাপন !

প্রেসিডেন্ট জেফারসনের আমলে ‘লুইসিয়ানা পারচেজ’- এর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, ১৮০৩ সালে সেই বিখ্যাত চুক্তিবলে আমেরিকা ফ্রান্স-এর কাছ থেকে কিনে নেয় ৫৩০ মিলিয়ন একর জমি, যা আজকের আমেরিকার প্রায় ২২ শতাংশ এলাকা ; আমেরিকা বিস্তৃত হয় পশ্চিম সীমান্তে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত । প্রেসিডেন্ট জেফারসন ‘ল্যুইস ও ক্লারক এক্সপিডিশনে (১৮০৪-১৮০৬)’ একদল আমেরিকানদের পাঠিয়েছিলেন মিসিসিপি নদী ধরে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বানিজ্যিক জলপথের সন্ধানে ।

১৯৩৫ সালে আমেরিকান সরকার সিদ্ধান্ত নেয় প্রেসিডেন্ট জেফারসনের স্মারক তৈরির; বেছে নেওয়া হয় সেন্ট ল্যুইস শহরে মিসিসিপি নদীর পাড় সংলগ্ন এলাকা । ১৯৪৭ সালে দেশজুড়ে হয় এই স্মারকের নকশা প্রতিযোগিতা, অনেক প্রতিদ্বন্দীর মধ্যে বাস্তুকার ইরো সারিনেনের পাঠানো নকশা, উলটো ‘ক্যাটেনারি’-র আকারে আর্চ হয় বিজয়ী । সারিনেনের নকশাই এক নম্বর, এ খবরটা পৌঁছয় তাঁর বাবা, ইলিএল সারিনেনের কাছে; তিনিও পাঠিয়েছিলেন তাঁর নিজের নকশা ঐ প্রতিযোগিতায় । জিতেছেন তিনিই এই ভেবে সারিনেন সিনিয়র আয়োজন করেন বন্ধুবান্ধব নিয়ে বিরাট পার্টির – পার্টি যখন তুঙ্গে, এক অপ্রস্তুত সরকারি কর্মচারী দেয় খবরটা…ইলিএল নয় ইরো সারিনেন হয়েছেন বিজয়ী; ছেলের সাফল্যে আনন্দে আত্মহারা বাবা সঙ্গে সঙ্গে খোলেন শ্যাম্পেনের বোতল!

স্টেনলেস স্টিল-এর তৈরি ৬৩০ ফুট দূরত্বে রাখা দুই পা আর ৬৩০ ফুট উঁচু এই আর্চ ইঞ্জিনীয়ারিং-এর এক অতি আশ্চর্য নিদর্শন ! ১৯৬৩-র ফেব্রুয়ারীতে শুরু হয় এটির নির্মাণ,  শেষ হয় ১৯৬৫-র অক্টোবরে; ১৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয় তখন আমেরিকান সরকারের । আর্চের দুই পায়ের কংক্রিটের ভিত মাটির ৬০ ফুট গভীরে তাই আর্চের একেবারে চুড়োয় হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিমি পর্যন্ত পৌঁছলেও আর্চটি দুলবে মাত্র ১৮ ইঞ্চি । সমবাহু ত্রিভুজাকৃতি আর্চের একেকটি দিক প্রস্থে ৫৪ ফুট ভূতলে ; বাহুর মাপ ক্রমশঃ কমতে কমতে হয়েছে ১৭ ফুট একেবারে ওপরে ‘ভিউইং গ্যালারি’-তে । আর্চের দু’টি বাহুর মধ্যে দিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি ও লিফট ।

ইরো সারিনেন তাঁর ডিজাইন করা আর্চ তৈরি দেখে যেতে পারেননি ; ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হয় অকালে । সারিনেন আর্চের দুই বাহুর মধ্যে সিঁড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন, কিন্তু ১০০০ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে আর্চের মাথায় চড়ার কষ্টর কথা ভেবে তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন । এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলেন গাড়ি পার্কিং-এর এলিভেটর ডিজাইনার ডিক বাউজার নামে এক কলেজ ড্রপ-আউট । দু’সপ্তাহের মধ্যেই তিনি এক অভূতপূর্ব লিফট ডিজাইন করলেন । ১৯৬৮ সালে আর্চের দুই বাহুর ভেতরে বসান হল সেই নতুন ধরনের লিফট – ফেরিস হুইল-এর নকশায় তৈরি আটটি ক্যাপসুল বিশিষ্ট এক ট্রাম সিস্টেম যেটা রেল বেয়ে ওপরে ওঠে । প্রতিটি ক্যাপসুলে পাঁচজনের বসার ব্যবস্থা,  একবারে আর্চের একটি বাহু দিয়ে ৪০ জনের ওঠানামার বন্দোবস্ত । আর্চের ওপরে উঠতে সময় লাগে চার মিনিট আর নামতে লাগে মিনিট তিনেক ।

পাঁচ ফুট ব্যাসের ওই ছোট্ট ক্যাপসুলে আরও চারজন সহযাত্রীর সঙ্গে প্রায় এক দমবন্ধ অভিজ্ঞতার পর আমি পৌঁছলাম আর্চের মাথায় ৬৫-ফুট লম্বা, ৭-ফুট চওড়া আর ৭-ফুটেরও কম উঁচু ‘ভিউইং গ্যালারি’-তে। গ্যালারির দু’ধারে অনেকগুলি কাঁচ আঁটা জানালা, নীচে তাকালে একদিকে মনোমুগ্ধকর মিসিসিপি, নদীর ওপর তিনটি সেতু ও হাইওয়ে দিয়ে যাওয়া পিঁপড়ের মত গাড়ির সারি । অন্যদিকে ওল্ড কোর্টহাউস আর বিশাল অট্টালিকায় সুসজ্জিত ডাউন-টাউন সেন্ট ল্যুইস । গেটওয়ে আর্চের মাথায় উচ্চতম বিন্দুতে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে গেল ছাত্রাবস্থায় দেখা একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্র, ‘How the west was won’… মনে হল গেটওয়ে আর্চ শুধুই এক স্মারক নয়, এ মানবসভ্যতার অগ্রগতির জয়গাথা, গত দুই শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়যাত্রার প্রতীক !

[হাওয়াবদল, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১লা এপ্রিল, ২০১২]

এক হারানো উপনিবেশের খোঁজে…

ঘুরে এলাম ত্রাঙ্কেবার (Tranquebar), অধুনা যার পরিচিতি তরঙ্গমবাড়ি, তামিলে তার মানে ‘ সমুদ্র যেখানে সঙ্গীতময়’ ! বর্তমানে তামিলনাডুর দক্ষিন-পূর্ব সমুদ্রতটে এক জনপদ যার অধিকাংশ অধিবাসীই মৎসজীবি । ২০০৪ সালে প্রথম নাম শুনেছিলাম তরঙ্গমবাড়ির, সুনামি-তে নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল গ্রামের উপকূলবর্তী অঞ্চল । আশেপাশের বিখ্যাত শহর ত্রিচিনাপল্লি, তাঞ্জোর, এমনকি নাগাপত্তিনাম-এর তুলনায় অতি নগন্য – মুসলিম তীর্থযাত্রী-দের নাগোরের নামী দরগা বা খ্রিস্টান-দের ভেলানকান্নির অপরূপ গীর্জা যাওয়ার পথে তরঙ্গমবাড়ি এখন নেহাত-ই এক অল্প সময়ের ‘চা-বিরতি’।এহেন জায়গায় আমি গিয়েছিলাম সরকারি কাজে, ফিরে এসেছিলাম এক সময়-থামানো অনুভূতির অভিজ্ঞতা নিয়ে !

আমরা গিয়েছিলাম চেন্নাই থেকে ইস্ট কোস্ট রোড ধরে; বঙ্গোপসাগর-এর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে… মহাবল্লিপুরম, পণ্ডিচেরী, কাড্ডালোর, চিদাম্বরম (নটরাজ মন্দিরের জন্য বিখ্যাত), সিরকালি ছাড়িয়ে চেন্নাই থেকে প্রায় ২৭৫ কিমি দক্ষিনে তরঙ্গমবাড়ি । প্রথম দর্শনে মনে হয় এক ঘুমন্ত জেলে-দের গ্রাম – খোলা জায়গায় রোদ্দুরে শুকোতে দেওয়া রাশি রাশি মাছ, স্তূপীকৃত ছেঁড়া জাল ও নৌকোর ইঞ্জিন ইতঃস্তত ছড়ান মেরামতির জন্য । ছোট জনপদ ছাড়িয়ে দেখতে পেলাম বহু পুরনো এক প্রবেশদ্বার যার মধ্যে ঢুকতেই মনে হল যেন পেরিয়ে এসেছি কয়েকশো বছর ! রাস্তার দু-ধারে মিশনারি স্কুল, লুথেরান গির্জা, পুরনো সমাধি, বিশপ-এর বাংলো…চারপাশের দৃশ্যাবলী ধীরে ধীরে তুলে ধরলো তরঙ্গমবাড়ি-র ডেনিশ ঔপনিবেশিকতার অধ্যায় !

আজকের ছোট গ্রাম তরঙ্গমবাড়ি-র রোমাঞ্চকর অতীতের সাক্ষী ইতিহাস । সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে আমাদের শ্রীরামপুর, নিকোবার দ্বীপ আর তরঙ্গমবাড়ি ছিল ডেনিশদের দখলে । ১৬২০ সালে নভেম্বর মাসে চুক্তি হয়েছিল ডেনমার্কের রাজা চতুর্থ ক্রিস্টিয়ান প্রেরিত ডেনিশ নেভির অ্যাডমিরাল Ove Gjedde-এর সঙ্গে তাঞ্জোরের রাজা বিজয় রঘুনাথ নায়কের; যার ফলে ডেনিশ-রা তরঙ্গমবাড়ি-তে অধিকার পেয়েছিল এক বন্দর তৈরির । সমুদ্রের ধারে ১০ মাইল x ৩০ মাইল জায়গা ডেনিশ-রা ইজারা নিয়েছিল বছরে ৩১১১ টাকার বিনিময়ে, প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ত্রাঙ্কেবার । ডেনিশ-দের মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিন ভারত থেকে ইউরোপে মরিচ রপ্তানি – ইউরোপিয়ান স্বাদহীন রান্নায় ভারতীয় মরিচ তখন এনেছে এক নতুন স্বাদের জোয়ার, এই ‘কালো সোনা’ মরিচের আকর্ষণে ছুটে এসেছে ভারতে অনেক বিদেশী বনিকের দল !

তাঞ্জোরের রাজার সঙ্গে ডেনিশ-দের চুক্তিবলে পত্তন হল ‘ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’-র ১৬২০ সালেই আর তরঙ্গমবাড়ি-তে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে ডেনিশ-রা শুরু করল এক দুর্গ গড়তে । সেই দুর্গ, ‘ড্যান্সবর্গ’ তৈরি শেষ হল ১৬২২ সালে তরঙ্গমবাড়ির সমুদ্র উপকূলে । ‘ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’-র মূল কার্যালয় ও গভর্নর-এর অধিবাস হল ড্যান্সবর্গ, থাকার জায়গা হল কোম্পানি-র উচ্চ পদাধিকারীদেরও। দুর্গে ছিল অনেকগুলি ঘর; বেশ কিছু ব্যবহৃত হত সৈন্যদের ব্যারাক হিসাবে, মশলাপাতির গুদামও ছিল কিছু ঘরে, ছিল এক বিশাল সামুদায়িক রান্নাঘর । দুর্গস্থিত জেলখানার চোরকুঠরিতে উঁকি দিলে এখনও গা ছমছম করে ওঠে ! তারপাশেই বড় একটি আস্তাবল – ঘোড়সওয়ারিই তো ছিল তখন শাসনব্যবস্থার চাবিকাঠি ।

সমুদ্রধারে উঁচু দুর্গের rampart আর তার ওপরেই দোতলা দুর্গ, নীচের তলায় ছিল অস্ত্রাগার আর ওপরতলায় গভর্নর নিবাস, এক পাদ্রীর থাকার ব্যবস্থা ও একটি ছোট্ট চ্যাপেল । দুর্গ রক্ষায় পুবদিকে সমুদ্র আর তিন ধারে গভীর পরিখা কাটা ছিল, সেই পরিখা আজ কালের প্রকোপে নিশ্চিহ্ন । ২০০ বছর পর ১৮৪৫ সালে শেষ হয় ভারতে ডেনিশ ঔপনিবেশিকতার, তাদের সবকটি উপনিবেশ অধিগ্রহন করে ব্রিটিশ-রা । তখনও তরঙ্গমবাড়ি এক ব্যস্ত বন্দর, কিন্তু ধীরে ধীরে কমতে থাকে তার প্রাধান্য । ব্রিটিশ বদান্যতায় কাছেই নাগাপত্তিনাম পরিণত হয় বড় বন্দরে; উনিশ শতকে নাগাপত্তিনাম-এর সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চিরকালের মতো ঘুম পাড়িয়ে দেয় তরঙ্গমবাড়িকে । ড্যান্সবর্গ দুর্গের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বভার এখন তামিলনাডু সরকারের প্রত্নতত্ত বিভাগের হাতে, প্রায় চারশো বছরের পুরনো দুর্গটির দেখভাল বেশ ভালোভাবেই করছে সরকারি বিভাগ । দুর্গ পরিধিতে প্রবেশ করতে পাঁচ টাকার টিকিট লাগে, দুর্গের একতলায় ডেনিশ আমলে ব্যবহৃত পোর্সিলিন ও কাঁচের পাত্রাদি, ধাতব মুদ্রা, টেরাকোটা মূর্তি, অস্ত্রশস্ত্র, পুরনো দলিল-দস্তাবেজ, মানচিত্র ও দুর্গের নকশা সংরক্ষিত । দুর্গের পুরো চত্বরটা ভালোভাবে ঘুরে দেখতে লাগবে বড়জোর আধঘণ্টা তবে সমুদ্রমুখী rampart এ বসে বঙ্গোপসাগর-এর রূপ নিদর্শনে কেটে যাবে অনেকটা সময় !

মশলা-বানিজ্য ছাড়াও ভারতবর্ষের ইতিহাসে তরঙ্গমবাড়ির দু’টি অসামান্য অবদান আছে – তরঙ্গমবাড়িতে লুথেরান সম্প্রদায়ভুক্ত দুই জার্মান ধর্ম প্রচারকের পদার্পণ ১৭০৬ সালে । তাঁদের হাত ধরে ভারতে প্রথম আসে প্রতেস্তান্তিজম্ । পরে প্রতেস্তান্তিজম্ ছড়িয়ে পড়ে চেন্নাই, কাড্ডালোর ও তাঞ্জোর-এ । ২৩ বছর বয়সী জার্মান ধর্মযাজক, Bartholomeus Zeigenbalg শুরু করেন তামিল ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন, বাইবেল অনুবাদ করেন তামিল-এ ও হিন্দুস্তানি-তে; ভারতীয় ভাষায় অনূদিত বাইবেল বহুজনে বিলি করার জন্য ১৭১২ সালে তরঙ্গমবাড়ি-তে ডেনিশ দাক্ষিন্যে বসানো হয় ছাপাখানা । প্রায় তিনশো তামিল পুস্তক ছাপা হয়েছিল তরঙ্গমবাড়ির এই ছাপাখানায় – ভারতের আধুনিক শিক্ষার ইতিহাসে এটি ছিল এক মোড় ঘোরানো মাইলস্টোন ! Zeigenbalg স্থাপনা করেন মেয়েদের স্কুল । ১৭১৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় লুথেরান সম্প্রদায়ের নিউ জেরুজালেম গির্জা । মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান Zeigenbalg, তাঁর নশ্বর দেহ সমাধিস্থ হয় নিউ জেরুজালেম গির্জায় ।

আমরা উঠেছিলাম সমুদ্রের ধারে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এক বাংলোয় – সেখানে হোটেল চালায় দিল্লী-র এক নামী হোটেল কোম্পানি । সিমেন্ট-কংক্রিট নয়, শুধুমাত্র পাথর, চুন-সুরকি, কাঠ ও কাঁচ-এর সদ্ব্যবহারে বাংলো-টির আমূল সংরক্ষন করা হয়েছে । দোতলা সাদা বাড়ি, চারপাশে সুন্দর প্রশস্ত বাগান, লাল টালির ছাদ, দোতলায় ঘোরানো বারান্দা…সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরে সূর্যোদয়ের দৃশ্য বড়ই মনোরম! হোটেলে মাত্র আটটি ঘর, অন্য হোটেলের মত নম্বর নয়, ঘরগুলি নামাঙ্কিত হয়েছে ডেনিশ আমলে বানিজ্য করতে আসা জাহাজদের নামে । আমাদের ঘরটিতে সিলিং-এর উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট, দরজাটাই ১০ ফুট উঁচু – সিলিং-এ কাঠের কড়ি-বরগা, ভারী কাঠের দরজা, কাঠের টালি ঢাকা মেঝে, পুরনো আমলের আসবাবপত্র…সব মিলিয়ে এক পাক্কা কলোনিয়াল বাংলো ! প্রথমদিন ডিনারে আমরা নিয়েছিলাম ‘গ্রিলড্ ফিশ’, কম মশলার পাশ্চাত্য খাবার, ভালোই লাগলো । পরদিন ভারতীয় শৈলীতে তৈরি ‘স্কুইড মসালা’-তে গোল মরিচের আধিক্যে সী-ফুডের স্বাদটাই গেল বদলে ।

আমাদের হোটেল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের তীর ধরে একটু এগোতেই চোখে পড়ল ভগ্নপ্রায় পরিত্যক্ত মসিলামনি নাথ মন্দির, খ্রিষ্টাব্দ ১৩০৫ সালে তৈরি  – কোনও এক সময় শিবের পুজো প্রচলিত ছিল সেখানে। সুনামি-র প্রকোপে মন্দিরের অবস্থা খুবই শোচনীয় । মন্দিরের চারপাশে বড় বড়  অনেক বোল্ডার ফেলে সমুদ্রের ক্ষয় রোধ করার চেষ্টা হয়েছে বটে কিন্তু সংলগ্ন সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যটা গেছে হারিয়ে !

সী বিচ ধরে হাঁটতে বেরিয়ে আমার ক্যামেরা ধরে রাখলো তরঙ্গমবাড়ির টুকরো টুকরো দৃশ্য – ভোরবেলার নরম আলোয় দুর্গে তখন লেগেছে সোনালি রঙ, ফাইবার গ্লাসের নৌকা ভেসেছে মাছের খোঁজে, জাল থেকে সদ্য ধরে আনা মাছ ছাড়াতে ব্যস্ত জেলের দল, মাছ শিকারের আনন্দে আকাশে মুখর গাঙচিল…শুরু হল তরঙ্গমবাড়ির আর একটি দিন !

[হাওয়াবদল, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১লা মার্চ, ২০১৩]