রকি পর্বতের স্বর্গরাজ্যে

ব্যান্ফ ন্যাশনাল পার্ক (Banff National Park) – তিনটি শব্দ আমায় করেছিল মন্ত্রমুগ্ধ  । অনেক বছর আগে, আমার এক ভাগ্নী কানাডার অ্যালবার্টা প্রদেশের ক্যালগারি (Calgary) থেকে সে দেশের পশ্চিমপ্রান্তে ভ্যাঙ্কুভার (Vancouver) অবধি তার সড়কপথে যাত্রার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিল । কানাডার রকি পর্বতমালার মধ্য দিয়ে সে পথের অপরূপ বর্ণনা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল যেন । সুদূর কানাডার সে গন্তব্য ফিরে ফিরে আসত আমার অলীক কল্পনায় !

২০১৭ সালের মে মাসের শেষে আমরা গিয়েছি কন্যার কাছে ভ্যাঙ্কুভার শহরে – আমাদের আসার পরিকল্পনা শুনেই মেয়ে ব্যান্ফ ন্যাশনাল পার্কের এক তিন রাত্রি ও চার দিনের প্যাকেজ ট্যুরে আমাদের বুকিং করে রেখেছে । এতদিনের কল্পনা অবশেষে হতে চলেছে বাস্তবায়িত! এক শনিবার সকাল ছ’টায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি আমরা, বাড়ি থেকে একটু দূরে West 41st. Avenue ও Cambie Street-এর জংশন থেকে Grand Holidays Company’র গাড়ি আমাদের নিয়ে এল ভ্যাঙ্কুভার শহরের দক্ষিণ প্রান্তে Richmond নামের শহরতলি – সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষারত Mercedes Benz-এর এক সুপার ডিলাক্স বাস । সেই বাসে সওয়ার হয়ে আমরা ভ্যাঙ্কুভারের পূবদিকে এগোই, শহরপ্রান্ত ছাড়িয়ে আমাদের বাস Trans-Canada Highway (No. 1) ধরে । পশ্চিমে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার রাজধানী ভিক্টোরিয়া থেকে পূর্বে নিউ ফাউন্ডল্যান্ড প্রদেশে সেন্ট জন্স অবধি এই হাইওয়ের ব্যাপ্তি । দৈর্ঘ্যে ৭৮০০ কিমির বেশী প্রশান্ত মহাসাগর থেকে অ্যাটলান্টিক মহাসাগর যোগাযোগকারি হাইওয়েটি ছয়টি সময়সীমা (time zone) অতিক্রম করেছে, পার হয়েছে ক্যানাডিয়ান রকির দুর্গম অঞ্চল ।

ধীরে ধীরে আমাদের বাস সমতল ছেড়ে পাহাড়ি পথে এগিয়ে চলে – চারপাশে সবুজ মখমলে মোড়া পাহাড়সারি, পাহাড় থেকে আছড়ে পড়া উদ্দাম ঝর্ণা ও যাত্রাপথ ঘেঁষে কুলুকুলু স্রোতে বহতা পাহাড়ি নদী আমাদের সঙ্গী হয় । অদূরেই চোখে পড়ে রূপোলি বরফে ঢাকা পাহাড় চূড়ো, পার হয়ে আসি ছবির মত সব গ্রাম । বারোটা নাগাদ আমাদের বাস থামে Merritt নামে এক ছোট শহরে । এখানে কাঠচেরাই কারখানারই বাহুল্য – নানা মাপের কাঠের পাটাতন, বোর্ড ও প্লাইউডের veneer তৈরি হয় । অধিকাংশ অধিবাসী কৃষিজীবি – ছোট pick-up ট্রাকের ছড়াছড়ি কৃষিজাত পণ্য পরিবহনের জন্য । Merritt-এ আমাদের মধ্যাহ্নভোজের বিরতি প্রায় এক ঘন্টার, আমরা ‘Subway’- তে স্যান্ডউইচ, স্যালাড ও কফি দিয়ে লাঞ্চ সারি ।

আমাদের বাস চলে পাহাড় ও উপত্যকার পথ ধরে – প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর দেখতে পাই, Okanagan Lake । হিমবাহ থেকে বয়ে আসা জলে পুষ্ট এই লেক দৈর্ঘ্যে ১৩৫ কিমি, প্রস্থে ৪-৫ কিমি ও ২৩০ মি গভীর – দক্ষিণে এই লেক থেকে সৃষ্টি হয়েছে Okanagan নদী । আমরা Okanagan উপত্যকা ধরে এগিয়ে চলি, Okanagan Lake-এর পাড় ঘেঁষে । এ উপত্যকা আঙুরের চাষ ও কানাডার Icewine-এর জন্য বিখ্যাত । লেকের পাড়ে Okanagan শহর ছেড়ে কিছু দূরে আমাদের বাস Kelowna শহরে থামে । Kelowna লেকের ধারে এক ব্যস্ত রিসর্ট শহর, সপ্তাহান্তে সেখানে অনেক পর্যটকের আনাগোনা । Okanagan লেকের পাড় বাঁধানো প্রোমেনাড, তার পরেই লেকের মধ্যে কাঠের তৈরি বিরাট জেটি ও জাহাজঘাটা । সেখানে সার সার স্পীডবোট, পালতোলা নৌকা ও বড় বড় Yacht রয়েছে বাঁধা । আমরা জেটি ধরে হেঁটে পৌঁছই লেকের কাছে, অদূরে সবুজ পাহাড় আর ঝলমলে রোদ্দুরে লেকের শোভা প্রাণভরে করি উপভোগ, ছবি তুলে রাখি সে সৌন্দর্য্যের । স্কটল্যান্ডের Loch ness Monster-এর প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী Okanagan লেকেও আছে নাকি এক ভয়ঙ্কর জলজন্তু – ড্রাগনের মত দেখতে সেই জলজন্তুর এক কমিক রূপের শিল্পকলা রয়েছে প্রোমেনাডের কিছুটা জায়গা জুড়ে । বাচ্চাদের সে অদ্ভুত জন্তুর পিঠে চড়িয়ে, বাবা-মা’রা তাদের ছবি তুলতে ব্যস্ত ! প্রোমেনাড সংলগ্ন এক প্রশস্ত রাস্তা; সে রাস্তা ধরে পর পর অনেকগুলি রেস্তোরাঁ নানা দেশের খাবারের পশরা সাজিয়ে – তার মধ্যে খুঁজে পাই এক ভারতীয় খানার আয়োজনও ।

আরও এক ঘন্টা পর আমাদের বাস থামল Craigellachie, এ স্থানের মাহাত্ম্য বেশ চিত্তাকর্ষক – কানাডার পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল অবধি ট্রেন চালায় Canadian Pacific Railway, সে সুদীর্ঘ রেলপথের লাইন পাতার কাজ চলেছিল দুই উপকূল থেকে । পাহাড়ি উপত্যকা, অনেক সুড়ঙ্গ, হিমবাহ ও নদীর ওপর সেতু পেরিয়ে এ রেলপথ ইঞ্জিনীয়ারিং ও প্রযুক্তির এক জয়গাথা ! ১৮৮৫ সালে এখানে মিলিত হয় দু’দিক থেকে আসা লাইন, রেলপথের স্লীপার-এ সর্বশেষ spike বা পিন গেঁথে লাইন জোড়ার কাজ হয় সম্পন্ন ! পূর্ব কানাডা হাত মেলায় পশ্চিমের সঙ্গে । শেষ spike-টি বিশেষ ভাবে চিহ্নিত সোনালি রঙে – রেলপথের পাশ দিয়ে বয়ে যায় এক ছোট্ট নদী, চারপাশের পরিবেশ বেশ মনোরম !

গরমকালে কানাডার ও অঞ্চলে সূর্য ডোবে রাত ন’টায় – সাড়ে ছ’টা নাগাদ আমাদের বাস ঢুকল Revelstoke নামে এক ছোট শহরে, এখানেই আমাদের রাত্রিবাস । Revelstoke শহরটি উপত্যকার সমতলে, এক পাগলপারা পাহাড়ি নদীর তীরে । শহরটির চারদিক ঘিরে সবুজ পাহাড়, কিছু পাহাড়ের চূড়োয় তখনও তুষারের মোড়ক – অতি সুন্দর এক রিসর্ট টাউন । আমাদের বাস থামে Revelstoke-এর ডাউনটাউনে – সেখানে বেশ কিছু দোকানপাট ও অনেকগুলি রেস্তোরাঁ, সবই ট্যুরিস্টদের চাহিদা মেটাতে । আবিষ্কার করি Roxy নামে শহরের একমাত্র সিনেমাহল, সন্ধ্যা সাতটায় একটাই শো – এক সাম্প্রতিক হলিউডি ছবি দেখানো হচ্ছে । আমরা এক চাইনীজ রেস্তোরাঁ থেকে আমাদের ডিনার গুছিয়ে নিই, হোটেলে গিয়ে একটু দেরিতে খাওয়া যাবে । আমাদের বাস নিয়ে আসে ট্র্যাভেল কোম্পানীর আগে থেকে বুক করে রাখা Hotel Sandman-এ । হোটেলটি বেশ ভালো, আমাদের ঘরটিও বেশ বড় মাপের ।

পরদিন ঝকঝকে সকালে সাড়ে ছ’টায় আমাদের বাস ছেড়ে দেয় – আধঘন্টা বাদে বাস থামে আর এক সুন্দর শহর Golden-এ, সেখানে প্রাতরাশ সেরে আমরা এগিয়ে চলি । কিছুক্ষণ পর আমরা প্রবেশ করি Glacier National Park – কানাডার রকি পর্বতমালার স্বর্গরাজ্যে এক তুষারদেশ । প্রায় ৪০০ টি হিমবাহ ও সক্রিয় তুষার ধ্বসের (active avalanche) রুট এই পার্কে – রাস্তা ও রেলপথ তুষারমুক্ত রাখতে এখানে চলে প্রকৃতির সঙ্গে অহরহ লড়াই বিশেষ করে শীতকালে ! ধীরে ধীরে প্রকৃতির রূপ যায় বদলে, রাস্তার ধারে ঘন জঙ্গল, প্রায়ান্ধকার সে জঙ্গলের অনেক জায়গায় তুষাররাশি । পথের ধারেই দেখি তুষারাবৃত হিমবাহের বিস্তৃতি, পাহাড় থেকে নেমে আসা অনেক ঝর্নার জল তখনও জমাট বরফ । রাস্তায় অনেকগুলি কংক্রিটের তৈরি লম্বা সুড়ঙ্গ, পাহাড়ের মাথা থেকে আছড়ে পড়া তুষার ধ্বস থেকে বাঁচতে ! আমাদের বাস রাস্তার ধারেই Bow Lake-এ এসে দাঁড়ায়, বরফে ঢাকা পাহাড়সারির পাদদেশে লেকের ব্যাপ্তি বড়ই মনোরম । অনেক জায়গায় লেকের জল তখনও বরফ, গ্রীষ্মের প্রারম্ভে সে বরফ গলতে শুরু করেছে সদ্য । আমরা সুদীর্ঘ ও সুপ্রাচীন হেমলক, ফার, স্প্রুস ও সেডারের জঙ্গলে ঢাকা Yoho National Park ছাড়িয়ে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সীমানা অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী অ্যালবার্টা প্রদেশে প্রবেশ করি ।

বাস থামে Crossing নামে এক ছোট্ট জায়গায়, সেখানে এক রেস্তোরাঁয় আমাদের মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা । স্যুপ, স্যালাড, চার/পাঁচ রকমের নিরামিষ ও চার রকমের আমিষ পদ আর নানা dessert ও ফল নিয়ে চাইনীজ বুফে লাঞ্চের এক এলাহি আয়োজন । পরিপাটি করে খাওয়া সেরে আমরা এগোই Columbia Icefield-এর দিকে, আমাদের বাস পূব-পশ্চিমের হাইওয়ে ছেড়ে উত্তরের পথ ধরে । আমরা পৌঁছই Athabasca Glacier-এর উল্টোদিকে গ্লেসিয়ার ডিসকভারি সেন্টার – অনেকগুলি রেস্তোরাঁ, গিফ্ট শপ নিয়ে এক জমজমাট ট্যুরিজম কমপ্লেক্স । গ্লেসিয়ার ও Skywalk-এ যাওয়ার টিকিট নিতে হয় সেখান থেকে –সেসব জোগাড় করলো আমাদের ট্র্যাভেল কোম্পানী । ডিসকভারি সেন্টারের বাস আমাদের নিয়ে চলল গ্লেসিয়ারের দিকে – কিছু দূরে এক বড় সড় All Terrain Vehicle (ATV)-এ সওয়ার হ’লাম আমরা, গাড়িটির চাকার ব্যাস প্রায় পাঁচফুট, চাকায় গভীর খাঁজ কাটা, যে কোনও পথে সে গাড়ি চলতে সক্ষম । আর সেই বিরাট ATV-র চালকের আসনে উনিশ/কুড়ি বছরের এক তন্বী ! সে কলেজের গ্রীষ্মকালীন অবকাশে ATV চালানোর কাজ করে । অতি দুর্গম খাড়া চড়াই ও উতরাই পথ বেয়ে চলেছি আমরা, নুড়ি-পাথর বিছানো পথ, খরস্রোতা ছোট পাহাড়ি নদী ও সদ্য গলতে শুরু করা বরফে পিচ্ছিল – অন্য কোনও গাড়ি এখানে চালানো অসম্ভব । তরূণী সাবধানে ATV চালিয়ে আমাদের নামিয়ে দেয় একেবারে গ্লেসিয়ারের বুকে – চারিদিকে দুধসাদা হিমবাহ, তাপমান সেখানে শূন্যাঙ্কের ১০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের নিচে ।  জমাট বরফের প্রান্তরে বয়ে যায় সরু স্রোত, বোতলে ভরে রাখেন অনেকে অতিবিশুদ্ধ সে জল । ঐ ঠান্ডার মধ্যেই বরফ ছোঁড়াছুঁড়িতে মত্ত অনেক ট্যুরিস্ট, প্রায় সবাই ব্যস্ত নিজেদের ‘সেলফি’ তুলতে ।  সোয়েটার, মোটা জ্যাকেট, টুপিতে আপাদমস্তক ঢেকেও আমরা ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি যেন – হঠাৎ শুরু হয় বৃষ্টি, ভারী ফোঁটা নিয়ে আসে বরফগুঁড়ো, ছুরির ফলার মত কেটে বসে মুখের ওপর ! শীঘ্রই রণে ভঙ্গ দিই আমরা, বাসের ভিতর নিরাপদ আশ্রয় খুঁজি ।

গ্লেসিয়ার থেকে নেমে আসি, বৃষ্টি যায় থেমে – আমরা চলি Skywalk-এর দিকে । Sunwapta উপত্যকায় এক নদীখাত থেকে প্রায় ১০০০ ফুট উঁচুতে শূন্যে ঝুলে আছে সেই Skywalk । ভারি স্টীলের বীম ধরে আছে এক বিশালাকায় ধনুকাকৃতি পায়ে চলার পথ, সে পথের মেঝে স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি – যদি কোনও ব্যক্তির উচ্চতাভীতি থাকে, তবে সে পথে না হাঁটাই ভালো । চারিদিকে উপত্যকার উন্মুক্ত প্রান্তর, অদূরেই বরফে ঢাকা পাহাড়ের সারি, দৃশ্যপট অতীব মনোগ্রাহী ! আমার ক্যামেরা ধরে রাখে নিসর্গের টুকরো টুকরো ছবি ।

অবশেষে আমাদের বাস নিয়ে আসে ব্যান্ফ শহরে – প্রকৃতির লীলাভূমির কেন্দ্রে প্রার ৫০০০ ফিট উচ্চতায় ব্যান্ফ সম্পূর্ণ ট্যুরিস্ট প্রধান শহর । আমরা পৌঁছই এক বুটিক হোটেল, Banff Inn – সেখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা । পরদিন সকালে সোনালি রোদ্দুরে ব্যান্ফ উদ্ভাসিত, আমি ক্যামেরাকে সঙ্গী করে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি । ১৮৮০-এর দশকে ব্যান্ফ শহরের পত্তন, সে সময় রেলপথের কাজে আসা লোকজন বসবাস করতে শুরু করে সে শহরে । এখন অবশ্য ব্যান্ফ কানাডায় পর্যটনের মধ্যমণি – সারা বছর ধরেই অনেক ট্যুরিস্টের ভীড়, গ্রীষ্মকালে তো কথাই নেই ! সারা শহরে বিলাসবহুল হোটেল, বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট ও হোম-স্টে’র ছড়াছড়ি । বরফে ঢাকা পাহাড়সারি Mount Rundle, Sulphur Mountain, Mount Norquay ও Cascade Mountain ব্যান্ফকে ঘিরে রয়েছে । আমাদের হোটেলের ঠিক পিছনেই এক উঁচু পাহাড় । প্রকৃতির কোলে একেবারে ছবির মত সাজানো ব্যান্ফ; ডাউনটাউন দেখার মত – সুন্দর সব বিপণি, রেস্তোরাঁ ও কাফে । সেখানে প্রাতরাশ সেরে আমরা যাই Bow Falls দেখতে । জলপ্রপাতের উচ্চতা এমন কিছু নয়, কিন্তু জলরাশির প্রবাহ এতই বেশী যে আওয়াজে কান পাতা দায় ! সমতলে নেমে সেই প্রবল জলরাশি Bow River নামে বয়ে গেছে পাহাড়সারির মধ্যে ।

ব্যান্ফ ছাড়িয়ে আমরা আবার ১ নং হাইওয়ে ধরি । রাস্তার ধারে বরফঢাকা পাহাড়শ্রেণী, পথের বাঁকে বাঁকে দৃশ্যপট যায় পাল্টে, এক সারি পাহাড় শেষ হ’তেই অদূরে নতুন একদল তুষারচূড়োর সদর্প আবির্ভাব ।  পাহাড়, ঝর্ণা ও হিমবাহ সব মিলিয়ে এ যেন প্রকৃতির এক কল্পরাজ্য – নিসর্গ অকৃপণ হাতে তার শোভা বিলিয়েছে এ ধরার বুকে ! মোহিত হ’য়ে অবলোকন করি সুচিত্রিত ক্যানভাস, এ হেন সৌন্দর্য চাক্ষুষ করতে পেরে ধন্য হয়ে যাই । আমাদের বাস এসে থামে Lake Moraine-এ; Valley of Ten Peaks-উপত্যকায় ৬২০০ ফিট উচ্চতায় ১২০ একর ব্যাপ্তির লেক দশটি তুষারশৃঙ্গ পরিবেষ্টিত । উঁচু পাহাড়ের বেড়াটোপে সূর্যের আলো সরাসরি পৌঁছয় না লেকে, তাই তার জল তখনও বরফ – কিছু জায়াগায় বরফ গলতে শুরু করেছে মাত্র । তাপমান সেখানে বেশ কম, ওই ঠান্ডার মধ্যেই লেকের ধারে একটু হেঁটে আসি আমরা ।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য Lake Louise Skiing Centre, সে এক মস্ত পর্যটক কেন্দ্র, বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ ও গিফ্ট শপ, শীতকালে পাহাড়ের মাথা থেকে স্কি করার সব যোগাড় ভাড়াও পাওয়া যায় সেখানে । আর পাহাড়ের মাথায় চড়ার জন্য আছে Gondola Ride, আমরা যাকে বলি রোপওয়ে । বুফে লাঞ্চ সেরে আমরা তিনজন এগোই গন্ডোলা চড়ে পাহাড়ের মাথায় উঠতে । চারিদিক ঢাকা ক্যাপসুল ছেড়ে খোলা এক চেয়ারে বসি আমরা – কিছুক্ষণের মধ্যেই সে চেয়ার উঠতে থাকে ওপরে । ৭০০০ ফিট উঁচুতে এসে নামি – সেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে পুরু বরফের আস্তরণ, ট্যুরিস্টরা সব বরফে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে মশগুল । সামনেই এক উপত্যকা আর সে উপত্যকা পেরিয়ে অসম্ভব সুন্দর রূপোলী চূড়োর এক সারি পাহাড়, দেখতে পাই সে পাহাড়সারির কোলে নীলকান্তমণির মত Lake Louise – এহেন স্বর্গোদ্যানে প্রকৃতির অশেষ রূপ করি আহরণ ।

এরপর আমরা পৌঁছই Lake Louise – ব্যান্ফ ন্যাশনাল পার্কের কোহিনূর এই লেক । এ লেকের টলটলে জল ঘন নীল, চারিদিকে ছোট ছোট সবুজ পাহাড়, দূরে হিমবাহ – সূর্যকরোজ্জল নীল আকাশের নিচে এ লেকের শোভা বর্ণনাতীত ! লেকের জলে অনেকেই বোটিং করতে ব্যস্ত, অনেক ট্যুরিস্ট লেকের পাড়ে চুপচাপ বসে – আমরাও নীরবে নিসর্গের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই । এরপর আমাদের ফেরার পালা – ধীরপায়ে এগোই বাসের দিকে, ভালোলাগার আবেশে ভারাক্রান্ত মনকে দিই সান্ত্বনা ।

ব্যান্ফ ন্যাশনাল পার্ক ছেড়ে আমাদের বাস ফিরে চলে, আমরা আবার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় প্রবেশ করি ।  ফিরতি পথে অন্য এক রাস্তায় আমাদের সঙ্গী হয় দৈর্ঘ্যে ৮৯ কিমি ও প্রস্থে ৫ কিমি Shuswap Lake – চিনুক স্যামন ও রেনবো ট্রাউট মাছের জন্য এ লেক বিখ্যাত । আমাদের বাস পৌঁছে দেয় Salmon Arm নামে এক শহরে, সেখানে এক নতুন ও খুবই ছিমছাম হোটেল, Comfort Inn-এ আমাদের রাত্রিবাস ।

পরদিন বিকালে আমরা এসে পৌঁছই ভ্যাঙ্কুভার ।

স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে যায় ব্যান্ফ ন্যাশনাল পার্ক, সে পথের অপার্থিব রূপ ফিরে আসে শুধু স্বপ্নে – স্বপ্নেই হেঁটে যাই বার বার Lake Louise-এর পাড় ধরে, রকি পর্বতমালার কোলে, তুষারাবৃত হিমবাহে, সেডারের ঘন জঙ্গলে…

[মাতৃমন্দির সংবাদ, শারদীয়া (অক্টোবর ২০১৭) সংখ্যায় প্রকাশিত]

 

 

 

Advertisements

Vivacious Victoria!

An invite to attend our daughter’s graduation ceremony in Vancouver this summer could not be better timed to escape the scorching heat of Delhi. In the wee hours of a Saturday, we flew from Delhi to Shanghai and after a brief stopover, a trans-Pacific haul brought us to Vancouver in about 19 hours! We had gained nearly twelve and half hours but our jet lag was minimal for the quickest possible connection.

Queen Victoria championed formation of the Canadian Confederation by integrating all its provinces under one rule. In fact, today’s federal Canada took its shape for her vision and concurrent actions. Thus, the former British queen is held in high esteem in Canada and the queen’s birthday is observed as Victoria Day on the last Monday before May 25 every year making it a long weekend. We had arrived on Saturday in the long weekend and we set out for Victoria, the beautiful capital of British Columbia in the early morning on Sunday.

To the west of Vancouver city, lies the great Vancouver Island and Swartz Bay port on the South-East end of the island is connected to the mainland Canada by ferry.  Victoria is located at the southernmost tip of the island. A short bus journey followed by a ride in Vancouver’s SkyTrain (unmanned metro) reached us Bridgeport Station. Thereafter, we had reached Tsawwassen Ferry Terminal an hour later by a two-coach vestibule bus. The hourly ferry service run by BC Ferries between Tsawwassen jetty to Swartz Bay serves as the arterial connection between mainland and Vancouver Island.

Hordes of holiday revellers thronged the ferry…all of them were headed to Victoria for the weekend escapade! The ferry interiors were plush with very comfortable seats next to large glass windows overlooking the open decks bustling with ‘selfie’ shooters! As the ship had sailed off, we queued up at the cafeteria and enjoyed a hearty breakfast with juices, toasted bread, scrambled eggs, sausages, eggs Benedict and coffee.

The one & half hour journey to Vancouver Island got over rather too soon – we had crossed many small islands, sailed through narrow channels between mountain ranges and watched with awe snow-capped Olympic Mountains in the neighbouring Washington state of US. We spotted many large ferries, sailboats etc. crossing by and a flock of cacophonous seagulls kept us company.

We left for Victoria, located about 32 km away from Swartz Bay, by a double-decker bus. Vancouver Island soon unfolded its bountiful nature – verdure of the hills around gleaming in an early summer sun, snow-spangled peaks at a distance, pristine lakes, lush green forests and meadows. Our bus meandered through small towns with beautiful neighbourhoods, picturesque houses on the seafront, schools, shops, cafes, restaurants and pubs and finally brought us to downtown Victoria.

Our stay at Albion Manor, built in 1892 AD and certified as a heritage B&B facility was pure bliss. It had a great display of artefacts, curios and masks made of metals, ceramics and stones from all over the world in the common areas. The property had a well-manicured garden around with a small fountain of guzzling waters and guests could relax sitting amidst nature.

We went back to the downtown for a date with the legislative assembly of British Columbia. The majestic edifice, built in 1898 and styled on French Baroque architecture, was smack at the city’s centre with a very wide open vista in front. We enjoyed many bands playing at its entrance for celebrating the Victoria Day. The open ground saw a large congregation of locals and tourists all enjoying the long weekend to the fullest. A young lady student from the University of Victoria interning at the assembly took us around innards of the complex while explaining the history of British Columbia, its electoral process and showed us the main assembly hall. The wondrous architecture of the building is heightened by many stained glass windows, wide stairways and high domes. We spotted the statue of Queen Victoria seated on the royal throne at the open space in front. Nearby stood a sombre war memorial dedicated to the Canadian soldiers killed in WW I&II, Korean and recent Afghanistan wars.

We joined the stream of tourists gravitating to the waterfront of Victoria with many yachts, sailboats and seaplanes all jostling for space and dotted with many restaurants promising the freshest catches of seafood. The promenade hemming the waterfront turned into a makeshift exhibition with local artists displaying their paintings and craftwork, magicians showing off their sleigh of hands, someone riding a high monocycle…We walked around the waterfront and had our fill with ubiquitous fish & chips, clam chowder soup and fried Calamari accompanied by draft beer watching the seaplanes landing and taking off for a sortie around the island and also for flying off to nearby islands.

Next day after a filling breakfast at Albion Manor with orange juice, blue berry pancake, fruits, sausages and coffee at Albion Manor, we set out for Craigdarroch Castle. Robert Dunsmuir, a Scottish fortune seeker migrated to Vancouver Island in mid-19th. Century to work in a coal mine near Nanaimo. He went on to own a coal mine and amassed a lot of wealth in the business. Craigdarroch Castle, built by Dunsmuir during 1887-1890 AD was a flagrant display of opulence so typical of North American rich of that era. Standing tall with its turrets, towers and 39 well-appointed rooms in a 25,000 sq ft area, the castle is a veritable exhibition of antiquated elegance. Parts of the castle are made of wood from oak, maple and cherry and the furniture were crafted of walnut, red cedar and rosewood. Living rooms, banquets and private dining options of the family members were replete with rare paintings and artefacts sourced from all over the world. We spent over two hours imbibing the history and aristocracy oozing from the place!

On our way back, we boarded the ferry, ‘Coastal Celebration’ leaving at 8 pm and headed to the restaurant for an indulgent dinner buffet. The restaurant located on one end of the ship provided a panoramic vista of the sea with varying colours as painted by the setting sun.

We returned home with aching feet but hearts filled with Victorian exotica…

 

পথ চলতি…

দেখতে দেখতে নিবেদিতা কুঞ্জের সরকারি বাড়িতে আমাদের পনেরোটা বছর কেটে গেল – ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বাড়িটায় চলে আসি আমরা, আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়ি ছেড়ে । আনকোরা নতুন আটতলা বাড়ি, আমাদের ফ্ল্যাটটা পাঁচ তলায় – আমি প্রথম allotment পেয়েছি, নিবেদিতা কুঞ্জে সব বাড়ি তৈরি শেষ হয়নি তখনও । হিসেব করে দেখলে, এই বাড়িটায় জীবনে সবচেয়ে বেশী সময় থেকেছি এ পর্যন্ত ।

আমার জন্মের পর থেকে প্রায় প্রথম ছ’বছর ছিলাম আমাদের পুরানো পৈতৃক বাড়ি শ্যামবাজারে ভূপেন বোস অ্যাভিনিউতে । বাবার রেলের চাকরি – ১৯৬৩ সালে বাবা ট্রান্সফার হ’লেন খড়্গপুরে; আমি ও মা খড়্গপুরে এলাম ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে – তালেগোলে স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়াই হ’লনা আমার, বাড়িতেই মা’র কাছে পড়েছি ক্লাস ওয়ানের পাঠ । বাবা প্রথমে কোয়াটার্স পেয়েছিলেন ট্র্যাফিক সেটেলমেন্ট নামে এক পাড়ায়, সে বাড়িটা আমাদের কারোরই পছন্দ হ’য়নি একটুও – মাস তিনেক সেখানে থাকার পর আমরা চলে আসি ডেভেলাপমেন্ট কলোনীতে ৫৮৬ নম্বরে । সবই ঠিক ছিল বাড়িটায়, কিন্তু বাড়িতে রোদ্দুর ঢুকতো না একদম আর বাগান করারও জায়গা ছিল না বিশেষ । পাড়াটা মা-বাবার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল, প্রতিবেশী কাকিমা-মাসীমা’রা মায়ের বেশ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ।

বছরখানেকের মধ্যেই ঠিক উল্টো দিকে ৫৯৪ নম্বর বাড়িটায় চলে যাই আমরা, সেখানে কাঁটাতার ঘেরা বিরাট বাগান – মা অদম্য উৎসাহে বাগান করতে লেগে গেলেন । অচিরেই অনেক দোপাটি, অপরাজিতা ও গাঁদা ফুলে বাগান ভরে উঠলো – এছাড়াও ছিল শীতকালের মরশুমী ফুল । মায়ের লাগানো হাস্নুহানা গাছটা গরম কালের সন্ধ্যায় তার ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে বাতাস ভারী করে দিত যেন । বাগানের পেছন দিকটায় একটা বেশ ঝাঁকড়া কাঁঠাল গাছ ছিল আর তাতে ফল ধরত প্রচুর । নিজেদের খাওয়ার কথাতো বাদই দিলাম, প্রতিবেশীদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে এঁচোড় দিয়ে আসতাম আমি । বাড়িটার পেছনে একটা বিরাট সিমেন্ট বাঁধানো খোলা উঠোন আর সেই উঠোন পেরিয়ে পাঁচিলের গায়ে কলতলা । এ বাড়ি থেকেই ১৯৬৪ সালের গোড়ায় সাঊথ সাইড প্রাইমারী স্কুলে সরাসরি ক্লাস টু’তে ভর্তি হই আমি । আর সে বছরই দুর্গাপূজোর সময় লক্ষ্ণৌ বেড়াতে গিয়ে আমার ডান হাতটি ভাঙে – তার ফলে আমি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বসতেই পারিনি । হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফোর্থ হয়েছিলাম বলে ক্লাস থ্রি-তে প্রমোশন দিয়েছিল স্কুল, আর ‘Good Conduct’-এর একটা প্রাইজও দিয়েছিল । এই বাড়িতেই ১৯৬৯ সালে বাবা ম্যালিগন্যান্ট মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন । সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনও গা শিউরে উঠে কেমন যেন !

১৯৬৯ সালে জানুয়ারী মাসের এক সকালে আমরা কুঁচো-কাঁচারা খবর পেলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যাবেন আমাদের পাড়ার পাশের রাস্তা দিয়ে – প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছিলেন আই আই টি-তে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস উদ্বোধন করতে । খোলা জীপে করে আসছেন ইন্দিরা গান্ধী, আমরা জনা দশ-বারো বাগান থেকে ফুল তুলে ছোট ছোট তোড়া বানিয়ে তাঁর পথ আটকেছি । প্রধানমন্ত্রী সস্নেহে হাসিমুখে আমাদের হাত থেকে ফুল গ্রহণ করেন, করজোড়ে নমস্কার জানান আমাদের ! একজন পুলিসও এসে বকুনি দেয়নি আমাদের, হাসতে হাসতেই সরে গিয়েছি আমরা রাস্তা থেকে । একথা এখন একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হয়…

১৯৭০ সালের মাঝামাঝি আমরা চলে গেলাম খড়্গপুরের সাউথ সাইডে, ২২৫/ইউনিট-২ নম্বর বাড়িতে । এ বাড়িটা একটু বড় আর পাড়াটা বেশী অভিজাত ! অনতিদূরেই আমাদের রেলওয়ে স্কুল – সেটাই এই বাড়িতে যাওয়ার মূল কারণ যদিও । ডেভেলাপমেন্ট পাড়াটা ছাড়তে পেরে আমি যার পর নাই খুশী, আমার অসন্তোষের প্রধান কারণ পাড়ার ছেলে-ছোকরার দল –আমাদের কিছুটা সিনিয়ার হাতেগোনা দু’এক জনকে বাদ দিলে, সবাই লেখাপড়ায় একেবারে রদ্দিমার্কা, তার সঙ্গে নানারকম শয়তানি বুদ্ধি, নিজেদের মধ্যে মারপিট, যথেচ্য নোংরা ভাষার ব্যবহার – ভবিষ্যতের পথ ঝরঝরে করার সব উপাদানই মজুদ তাদের । ছেলেবেলায় ঐ রকম বুনিয়াদ নিয়ে তারা কে কোথায় সব হারিয়ে গেছে ।

নতুনপাড়ায় বন্ধুরা অন্যরকম, দুষ্টুমিতে কেউ কম যায়না তারসঙ্গে নিয়ম করে খেলাধূলো, গল্পের বইয়ের আদানপ্রদান কিন্তু লেখাপড়ায় সবাই সিরিয়াস, প্রায় সবার মধ্যেই জীবনে কিছু একটা করার বা হওয়ার অদম্য ইচ্ছে – নতুন পাড়ায় এসে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন ! ১৯৭৪ সালে ঐ বাড়ি থেকেই আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে আই আই টি’তে ভর্তি হই । আর ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি বাবা খড়্গপুর ছেড়ে কলকাতা চলে যান ট্রান্সফার হ’য়ে । ইঞ্জিনীরিয়ারিং পাশ করে, এম-টেক করে আমি খড়্গপুর ছাড়লাম ১৯৮১ সালে । এরপর দিল্লী থেকে খড়্গপুর আই আই টি’তে সরকারি কাজে গিয়েছি বহুবার, সপরিবারে গিয়েছি আই আই টি’র পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আর স্কুলের বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে বছর দু’য়েক আগে আমাদের ছোটখাটো গেট টুগেদারে… খড়্গপুর আমার প্রাণের শহর, আমার বাল্যের ও কৈশোরের অতি সুখস্মৃতি বিজড়িত রেলশহর, সে শহর আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে নিজের হাতে, সে শহরে বড় হয়ে গিয়েছি দুনিয়ার কোণে কোণে – খড়্গপুর থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি, কিন্তু খড়্গপুর রয়ে গেছে আমার মনের মণিকোঠায় । খড়্গপুরের কথা মনে পড়লেই গলায় উঠে আসে একটা ডেলা, ঝাপসা হয়ে আসে দুই চোখ !

১৯৭৭ সালে বাঙ্গুর এভিনিউতে একটা ছোট্ট বাড়ি করে বাবা-মা শ্যামবাজারের পুরানো বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন । ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে আমি যখন কলকাতায় চাকরি নিয়ে গিয়েছি, বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেছেন নাগপুরে । ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে আমিও কলকাতা ছাড়লাম ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইডে চাকরি নিয়ে । এরপর আমি ও বাবা দু’জনেই ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় ফিরে এলাম ১৯৮৩ সালের অগাস্ট মাসে । ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে বাবা রিটায়ার করলেন আর আমাদের বাঙ্গুরের বাড়ির দোতলা তৈরি হ’ল । ঐ বাড়ি থেকেই আমার বিয়ে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে । প্রায় সাত বছর চেষ্টার পর কলকাতায় ভালো কেরিয়ারের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে অবশেষে ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে আমাদের দিল্লী আগমন ।

প্রথমে কিছুদিন ভাড়াবাড়ি, তারপর Scientists’ Hostel – এরই মধ্যে আমাদের কন্যা তিন্নীর জন্ম ১৯৯২’র জানুয়ারিতে । ১৯৯৪ সালে পাওয়া গেল আর কে পুরমের সেক্টর নাইনের বাড়িটা, একদমই পছন্দ হয়নি বাড়িটা আমাদের কারোরই, কিন্তু ‘out of turn’ allotment, প্রত্যাখান করা যাবে না। সে বাড়িতে থাকাকালীন আমাদের পুত্র তানের জন্ম ১৯৯৪’র অগাস্টে । সেখানে কেটে গেল আটটা বছর, দু’টো প্রমোশনের গন্ডী পেরিয়েছি আমি ততদিনে । ২০০২ সালে অগাস্ট মাসের শেষে পাওয়া গেল নিবেদিতা কুঞ্জের allotment – এ বাড়িতে এসে আমরা সবাই খুব খুশী । তিনটে ভালো সাইজের বেডরুম, আরও একটা বেশ বড় study আর ড্রইংরুমটা পেল্লায়, সঙ্গে servant’s quarters ও একতলায় ঢাকা গ্যারেজ । বাবা-মা আমাদের সঙ্গে দিল্লীতে পাকাপাকি ভাবে থাকেন ১৯৯২ সাল থেকেই – আমাদের ছ’জনের জন্য এ বাড়িতে অঢেল জায়গা । আর সবচেয়ে আকর্ষক ব্যাপারটা হ’ল বাড়ির ঠিক পেছনেই আমাদের কন্যা ও পুত্রের স্কুল, ডি পি এস-আর কে পুরম; বাড়ি থেকে মিনিট ছয়েকের হাঁটাপথ !

নিবেদিতা কুঞ্জের এই বাড়ি থেকেই তিন্নী ও তানের দশ ও বারো ক্লাসের বোর্ড পরীক্ষা ভালো ভাবে পাশ করে IIIT Delhi-তে ইঞ্জিনীরিয়ারিং পড়তে যাওয়া । এই বাড়িতেই মা’কে হারিয়েছি ২০১৩ সালের অগাস্ট মাসে, আশ্চর্যজনক ভাবে তার কিছুদিন পরেই বাবাও চলে গেলেন ২০১৪ সালের মার্চে – আমাদের বাড়ির লোকসংখ্যা ছয় থেকে কমে চারে দাঁড়ালো । অগাস্ট ২০১৪-তে তিন্নী উচ্চশিক্ষার্থে পাড়ি দিল সুদূর কানাডা, বাকি রইলাম আমরা তিনজন । ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তান বি-টেক পাশ করে চাকরি নিয়ে চলে গেল হায়দ্রাবাদ – আমরা দু’জন ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’! এরপর এল বড় ধাক্কা – এ’বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বুলবুল ট্রান্সফার হয়ে গেল মুম্বাই । ‘হারাধনের একটি ছেলে কাঁদে ভেউ ভেউ’…

নিবেদিতা কুঞ্জের বাড়ি’র সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, বারান্দায় দাঁড়ালে খোলা আকাশ ও সবুজ গাছগাছালির ছড়াছড়ি । আমাদের পূব-পশ্চিমের বাড়ি, তাই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি প্রতিদিন । সন্ধ্যায় সূর্যটা যখন স্থানীয় দুর্গামন্দিরের চূড়োর পিছনে মুখ লুকোয়, আকাশটাকে রাঙিয়ে দেয় কম করে তিন রকমের লাল রঙ, একটা এরোপ্লেন ধীরে এগিয়ে যায় ডুবে যাওয়া সূর্যের পথ ধরে এয়ারপোর্টের দিকে । প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে পাতা ঝরে যাওয়া ন্যাড়া শিমুল গাছটা একদিন লেলিহান আগুনশিখার মত ফুলে ফুলে লাল হয়ে ওঠে । আর দেওয়ালির রাতে একের পর এক আতসবাজীর আলো আকাশের সব কালিমা মুছে দেয় যেন । সকালে একঝাঁক টিয়া পাখি কর্কশ চিৎকার করে বারান্দার খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়, পায়রাগুলো বকবকম শব্দ করে ঘাড় উঁচিয়ে এগিয়ে আসে বাজরার দানার লোভে ।

নিবেদিতা কুঞ্জে আমার দিন সীমিত – অবসর গ্রহণের দিন এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, ছেড়ে দিতে হ’বে সরকারি এ আবাসন, খুঁজে নিতে হ’বে নতুন কোনও ঠিকানা !

নিজের কথা…

আমাদের ছোটবেলাটা কেটেছে একটু অন্যরকম ভাবে…খড়্গপুর রেলওয়ে টাউনশিপে ছিল বাবার কোয়াটার্স, আমাদের পাড়ায় সবাই সবাইকে মোটামুটি চিনত আর একটা সামাজিক শাসনের গন্ডী ছিল । বাবা-মায়ের বন্ধুস্থানীয়দের আমরা রীতিমত সমীহ করে চলতাম তখন । ওই সময়ে খড়্গপুরে ভালো স্কুল ছিল দু’টি – আমাদের রেলওয়ে বয়েজ স্কুল আর আই আই টি ক্যাম্পাসে হিজলি হাইস্কুল – দুটোই বাংলা ও হিন্দী মিডিয়াম স্কুল, তবে ক্লাস নাইন থেকে ইংরাজিতে সায়েন্স পড়ানো হ’ত । মিক্সড হায়ার সেকেন্ডারী নামে একটা ইংরাজি মিডিয়াম স্কুল ছিল বটে, আমরা বলতাম ট্যাঁশ স্কুল – অবাঙালি ছাত্র-ছাত্রী ও বেশ কিছু বখাটে গোছের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছেলে-মেয়ে সেখানে পড়তে যেত । আর ছিল রেলওয়ে গার্লস স্কুল, আমাদের অনেক বন্ধুদের দিদি ও বোনেরা পড়ত সেখানে । আমাদের স্কুলের তখন ডাকসাইটে রেজাল্ট – প্রতিবছর আই আই টি, যাদবপুর ও শিবপুর মিলিয়ে জনা দশেক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কমকরে আরও পাঁচজন ডাক্তারি পড়তে যেত !

আমাদের দুষ্টুমি সীমাবদ্ধ ছিল স্কুল ও খেলার মাঠের মধ্যেই – আমরা তথাকথিত ভালো ছেলে ছিলাম, মানে স্কুলে ভালো রেজাল্ট করতাম আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলত আমাদের দস্যিপনা – বাংলা টিচারকে উত্যক্ত করা, বিশেষ কোনও সহপাঠির পেছনে লাগা – এসবে আমরা ছিলাম সিদ্ধহস্ত ! প্রতিবছর গরমকালে ব্রাইটনের মাঠে ঘন্টা দেড়েক ফুটবল পেটানো আর শীতকালে মাঠে দড়ি ধরে কোর্ট কেটে ব্যডমিন্টন খেলা কিংবা ক্রিকেট – এছাড়াও গরমের ছুটিতে এক বন্ধুর বাড়ি সকাল এগারোটা থেকে বসত ক্যারাম খেলার আসর, কোনও দিন বিকেলে সাতঘুঁটি সাজিয়ে বল ছুঁড়ে ঘুঁটি ফেলে দেওয়ার চেষ্টা, এসবই আমাদের ব্যস্ত রাখত । কিন্তু স্কুলের শেষ ধাপে এসেও কোনও কিশোরীর প্রতি আসক্তি বা তার প্রকাশ ছিল আমাদের ভব্যতার বাইরে – ঐ যে বললাম রেলওয়ে গার্লস স্কুলে পড়া বন্ধুদের দিদি ও বোনেদের চোখে তাহলে আমরা ‘খারাপ ছেলে’ হয়ে যাবো যে ! খারাপ ছেলের তকমাটা যেন গায়ে না লেগে যায়, এ ব্যাপারে আমরা ছিলাম খুব সচেষ্ট।

আমাদের ছোটবেলায় রাখী’র এত রমরমা ছিলনা, তবে ভাইফোঁটা হ’ত বেশ ঘটা করেই…আমার নিজের কোনও ভাই-বোন নেই, কিন্তু তাইবলে ভাইফোঁটা আমার বাদ যেত না । ডাক পড়ত অন্তত দু-তিন জন বন্ধু’র বাড়ি থেকে, ফোঁটা দিতেন তাদের দিদিরা আর খাওয়া-দাওয়াটা ভালোই হ’ত বেশ । এইসব পাড়াতুতো দিদিরা আমাদের থেকে দু’তিন বছরের বড় কিন্তু তাদের দিদিসুলভ আচরণ ছিল বেশ সিনিয়র মার্কা !

সেটা বোধহয় জানুয়ারি মাস – সেদিন খবরের কাগজে মার্চ মাসে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার টাইম টেবিল বেরিয়েছে । তিন বছরের সিলেবাসের চাপে আমরা তখন ধুঁকছি – বিকেল পাঁচটা নাগাদ সাইকেল নিয়ে আমি একটু ঘুরতে বেরিয়েছি শুধুই নির্মল হাওয়া সেবনের উদ্দেশ্যে । হঠাৎ এক বন্ধুর দুই দিদির মুখোমুখি – সঙ্গে সঙ্গে ধমক, ‘সৌমিত্র, হায়ার সেকেন্ডারির রুটিন বেরিয়েছে না আজ, আর তুই এখন রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস?’ আমি মুখ নিচু করে গুঁইগাঁই করি, ‘এই বেরিয়েছি সারাদিনের পর, একটু পরেই বাড়ি ফিরে যাব’।

এই স্নেহমিশ্রিত শাসনের কালটা আর নেই – সবচেয়ে বড়কথাটা হ’ল সবাই বেশ আপনজন ভেবেই শাসন করতেন । আর অন্যের সাফল্যে আনন্দে মেতে উঠতেন সবাই, গর্ব করে বলতেন, ‘জানো, আমাদের পাড়ার ছেলে আই আই টিতে চান্স পেয়েছে’ !

স্কুল জীবনের কথা ঘুরে ফিরে আসে মনে, স্কুলে কি কাণ্ডটাই না করেছি আমরা এক সময় – অবশ্যই কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপকর্ম নয়, নিছকই মজার বশে – নব্য কৈশোরের দুর্নিবার উচ্ছ্বাসে ! এখন মনে হয় আমাদের সেদিনের কিছু দুষ্টুমি যে কোনও সুস্থ লোকেরই সহ্যের সীমা ছাড়াত…

ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট অবধি আমাদের স্কুলে ছিল ছ’টি সেকশান, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ – হিন্দী মিডিয়াম আর ‘ডি’, ‘ই’ ও ‘এফ’ ছিল আমাদের বাংলা মিডিয়াম – আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হ’ত ডিসেম্বরের দশ তারিখের মধ্যে । তারপর ২৪শে ডিসেম্বর রেজাল্ট বেরিয়ে আবার স্কুল খুলত ২রা জানুয়ারী, নতুন ক্লাস শুরু হ’ত । ক্লাস নাইনে আমাদের স্কুলের গতানুগতিক জীবনে এল এক পালাবদল – আমাদের stream ভাগ হ’বে; সায়েন্স, কমার্স বা হিউম্যানিটিজ নিয়ে হ’তে হ’বে আমাদের আলাদা । তাই ক্লাস নাইনে উঠে জানুয়ারী মাসে আমাদের আর একটা পরীক্ষা দিতে হ’বে – Stream Test; পরীক্ষা হ’ত দুই বিষয়ে, অঙ্ক ও ইংরাজি । আমার এখনও মনে আছে, ইংরাজিতে আমাদের অনুবাদ করতে দেওয়া হয়েছিল, ‘গোলবাজার গোল নয়’… অঙ্ক ও ইংরাজি উভয় বিষয়েই ভালো করলে ইংরাজি মিডিয়াম সায়েন্স পাওয়া যাবে; শুধু অঙ্কে ভালো করলে, বাংলা মিডিয়াম সায়েন্স; অবশ্য শুধু ইংরাজিতে ভালো করলে কি পাওয়া যেত তা জানিনা ! আমাদের স্কুলে সে সময়ে কমার্স ও হিউম্যানিটিজ পড়তে যেত একেবারে ওঁচার দল, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা কোনও ক্রমে উতরে যাওয়াই ছিল তাদের জীবনে বিরাট চ্যালেঞ্জ ! যাই হোক, সেই স্ট্রীম টেস্ট দিয়ে আমরা জনা তিরিশেক ছাত্র পড়তে গেলাম ইংরাজি মিডিয়াম সায়েন্স – ক্লাস নাইনের ‘জি’ সেকশান ।

নাইন ‘জি’র ক্লাসরুমটা ছিল দোতলায়, একতলায় টিচার্স রুমের ঠিক উপরে । আমাদের ক্লাস টিচার হ’য়ে বাংলা পড়াতে এলেন বসাকবাবু – শীর্ণ চেহারা, পরনে মোটা খদ্দরের ঢিলে পাঞ্জাবি, হ্যান্ডলুমের সরু পাড় আধময়লা খাটো ধুতি, পায়ে চামড়ার বিদ্যাসাগরি চটি, কদমছাঁট কাঁচা-পাকা চুল আর দু’তিন দিনের না কামানো দাড়ি সমেত মুখখানি সদাই বেজার, যেন সারা পৃথিবীর যত সমস্যা তাঁকেই তাড়া করে বেড়াচ্ছে । এরপর ছিল তাঁর কাঠ বাঙাল ভাষা – সব মিলিয়ে একেবারে সোজা কার্টুন থেকে উঠে আসা এক বর্ণময় চরিত্র ! আমাদের এক বছরের সিনিয়ররা বসাকবাবুর ক্লাসে তাদের কি রকম বাঁদরামির আসর বসত, তার পাঠ আমাদের ভালোই পড়িয়েছে । অতএব আমাদের ক্লাসে ভূতের নেত্য শুরু হ’ল শীঘ্রই ।

দিনের প্রথম ক্লাস – বসাকবাবু মাথানিচু করে রেজিস্টারের দিকে তাকিয়ে রোলকল শুরু করেছেন – লাস্ট বেঞ্চে কে একজন আস্তে করে গাইতে শুরু করলে, ‘রে মাম্মা রে মাম্মা… তারপর তিরিশ জনের সমবেত চিৎকার, ‘রে’… সেই শুনে বসাকবাবুর পাল্টা চিৎকার, ‘কে করলে, কে করলে?’ সারা ক্লাস নিশ্চুপ, সবাই ভালো মানুষের মত মুখ করে জুলজুল চোখে দেখছে ! … দেখতে একটু কচি আমাদের সহপাঠি নির্মল ঘোষ নিষ্পাপ হাসিমুখে একটি বিচ্ছু বিশেষ – বসাকবাবু তাকে বললেন, ‘তুই ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাডা পইড়া শোনাদিকি’ । অমনি নির্মল বই খুলে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঁচালির সুরে দুলে দুলে পড়তে লাগলো, ‘শুধু বিঘা দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে’ । সেই সুর শুনে সারা ক্লাসে বিরাট হাসির ছররা – বসাকবাবু দু’হাতে মাথাটা ধরে বসে আছেন । তাঁর একটা পেটেন্টেড্ কথা ছিল, ‘তুরা আমায় মাইরা ফ্যাল’। … আমাদের সময়ে প্রতি মাসে স্কুলফীস নেওয়াটা ছিল ক্লাসটিচারের কাজ – রেলওয়ে স্কুল, ক্লাস নাইনের ফী মাসে সাকুল্যে চার টাকা বাষট্টি পয়সা । ফীস জমা দেওয়ার দিন বসাকবাবু রসিদবই, টাকা, খুচরো পয়সা এসব সামলাচ্ছেন, তাঁর টেবিল ঘিরে বিরাট জটলা, সবাই গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, ‘আমারটা আগে, আমারটা আগে’ – সে এক চরম বিশৃঙ্খলা ! এর মধ্যে একজন খবরের কাগজ পাকিয়ে গাধার টুপি বানিয়েছে, টুপিতে বড় বড় অক্ষরে লিখেছে ‘গাধা’ – সে টুপি ধরে আছে বসাকবাবুর মাথা’র বেশ একটু ওপরে, হঠাৎ আমাদের তিমিরবরণ তার হাতে মারলে এক বিরাট চাপড়, হাত ফস্কে টুপি গিয়ে একেবারে বসাকবাবুর মাথায় – মুহূর্তের মধ্যে ভীড় ফাঁকা – সবাই যে যার জায়গায়, বসাকবাবু গাধার টুপি পরে দু’হাতে মাথা ধরে বসে আছেন আর বলে চলেছেন, ‘তুরা আমায় মাইরা ফ্যাল’! … পূজোর ছুটি শেষ হয়েছে, কালীপূজো-ভাইফোঁটার পর স্কুল খুলেছে – নির্মল পকেটে করে নিয়ে এসেছে একটা চকোলেট বোম আর দেশলাই । বাংলার ক্লাস সবে শুরু হয়েছে – বসাকবাবু রোলকল শুরু করেছেন, লাস্ট বেঞ্চ এর পেছন থেকে প্রচণ্ড আওয়াজ, ক্লাসরুম ধোঁয়াচ্ছন্ন, পোড়া বারুদের গন্ধ – আমাদের স্কুল বাড়ি থরথর করে কেঁপে উঠেছে ! আর তিমির বরণ লাফ দিয়ে উঠে চিল চিৎকার করে বলে, ‘নকশাল, নকশাল ! স্যার পালান, নকশালরা স্কুল অ্যাটাক করেছে!!’ (সেটা ১৯৭১ সাল, পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলন তখন তুঙ্গে, যদিও আমাদের স্কুলে তার কোনও প্রকোপ পড়েনি)। ক্লাসের সবাই হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছে, অন্যান্য ক্লাস থেকে ছুটে এসেছেন টিচাররা, কিছুক্ষণ পর হেডমাস্টার মশাই দৌড়ে এসেছেন বেত হাতে, সবাই খুব উত্তেজিত – হেডস্যারের হুকুম হল প্রত্যেকের পকেট চেক করা হ’বে, দেশলাই-এর খোঁজে । কোথায় দেশলাই, ঐ হাঙ্গামার মধ্যে নির্মল কখন টুক করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে স্কুলের পেছনে নালায় দেশলাই ফেলে দিয়ে এসেছে !

আর একটু পিছিয়ে যাই, আমাদের ক্লাস এইটে ইতিহাস পড়াতেন কুন্ডুবাবু, তাঁর কাজ ছিল ইতিহাসের টেক্সট বই থেকে গড়গড় করে রীডিং পড়ে যাওয়া, ক্লাসের সবাইকে তাঁর পড়ার সঙ্গে বইয়ের পাতায় চোখ রাখতে হ’বে । কুন্ডুবাবু মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ পড়ছেন/পড়াচ্ছেন, আমি ও আশিস দাশগুপ্ত (কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও AIIMS, নিউ দিল্লীর প্রাক্তনী ও বর্তমানে এক নামী শিশু চিকিৎসক) লাস্ট বেঞ্চে বসে ইতিহাসের বইয়ে লুকিয়ে স্বপনকুমারের রুদ্ধশ্বাস ডিটেকটিভ উপন্যাস গোগ্রাসে গিলছি – গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জী ও তার সহকারি রতনলাল চরম বিপদের মুখোমুখি… স্কুল ছুটি হওয়ার আগেই বইটা শেষ করে ফেরত দিতে হবে যে ! আমাদের বইয়ের পাতা ওল্টানো দেখে কুন্ডুবাবুর কেমন একটা সন্দেহ হয়েছে, হঠাৎ হুঙ্কার, ‘কি পড়ছিস রে তোরা দু’জন’? ব্যাস, ইতিহাসের বই থেকে স্বপনকুমারের আত্মপ্রকাশ, আর আমাদের কপালে জোটে বেদম প্রহার !

স্কুল জীবন ছিল আমাদের ঘটনাবহুল, উচ্ছ্বাসভরা প্রাক-যৌবনের দিন ! অনুশাসন একটা ছিল বটে, কিন্তু তা মোটেই কড়া মিলিটারি মেজাজের নয়, একটু ঢিলেঢালা গোছের – তাই সহজেই আমরা খুঁজে নিতাম নিত্যনতুন দুষ্টুমির পথ । এবারের কিছু ঘটনা আমার সহপাঠীদের নিয়ে… অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রয়েছে বা নতুন করে গড়ে উঠেছে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে, আবার অনেকেই হারিয়ে গেছে কালের নিয়মে…

ক্লাস নাইন-জি সেকশানে আমাদের সঙ্গে পড়তে এল এক যমজ ভাই – তাদের দেখতে খুব একটা এক রকম নয়, কিন্তু হাবভাব একেবারে এক – সব ব্যাপারে তাদের গুরুগম্ভীর মন্তব্য আর সব সময়েই এক ধরণের মতামত । সদাই প্রমাণ করার চেষ্টা তারা অন্যদের থেকে একটু বেশী জানে ! তার ওপর তাদের অ্যালবার্ট করা চুলে সামনে সিঙ্গাড়া দাঁড়িয়ে আছে, শার্টে ঝুলে পড়া ‘ডগ-কলার’, আস্তিনে ‘কাফ-লিঙ্ক’, একটু ‘উড়ু-উড়ু’ ভাব… কয়েকদিনের মধ্যেই ক্লাসে বেশ একটা নতুন খোরাক যোগাড় হ’ল, তাদের নামকরণ হ’ল জগাই-মাধাই…

একজন সহপাঠী ক্লাস ফাইভের পর আর বাড়েনি, সাড়ে ৪ ফুট উচ্চতায় সে ছিল আমাদের বিখ্যাত ‘গিড্ডু’ । পড়াশোনায় বেশ ভালো কিন্তু তার হাবভাব টিপিক্যাল ক্লাস মনিটর গোছের – বিধি বহির্ভূত কেউ কিছু করলেই টীচারকে নালিশ, কোনও শিক্ষক প্রশ্ন করলে সব সময়ে হাত তুলে আগেভাগে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা, সব টীচারদের আমড়াগাছি – ব্যাস আর যাবে কোথায়, আমরা চার-পাঁচ জন তার পেছনে লেগে গেলাম…

ক্লাস নাইনে আমরা সবাই ফুলপ্যান্ট পরতে শুরু করেছি, গিড্ডু তখনও হাফপ্যান্ট; কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে সে দাঁড়ালেই পেছন থেকে তিমিরবরণ তার প্যান্টটা টেনে খুলে দেবার চেষ্টা করত ! এছাড়া একটু ভীড়ের মধ্যে তার মাথায় চাঁটি, শার্টের পেছনে পেনের কালি ঝেড়ে দেওয়া – জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল গিড্ডুর, এখন এসব ভাবলে কষ্ট হয় বড়ই । নিছক মজার নেশায় বেশ বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিলাম হয়তো !

আমরা বোধহয় তখন ক্লাস ইলেভেন – আগেভাগে কোনও উত্তর দিতে গিড্ডু দাঁড়িয়েছে, আর ক্লাসের একেবারে উঁচু দিকের ছাত্র, আশিস দাশগুপ্ত (বর্তমানে এক নামী শিশু চিকিৎসক) একটা কলম খুলে বেঞ্চে ধরে আছে । এরপর গিড্ডুর ধপ করে বসে পড়া আর তার পশ্চাদ্দেশে কলম প্রবেশ ! ভাগ্যিস স্কুল ইউনিফর্মের মোটা খাকি প্যান্টের দৌলতে সে শূলবিদ্ধ হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল । পরের ক্লাসে পরেশবাবুর ফিজিক্স পড়ানো চলছে – দেখি স্কুলের পিওন এক স্লিপ নিয়ে এসেছে, স্লিপ পড়ে পরেশবাবু বলেন, ‘সৌমিত্র ও আশিস, তোদের হেডস্যার ডেকেছেন’… আমরা দুরুদুরু বক্ষে হেডস্যারের ঘরে । তিনি বেশ চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ফিজিক্সে কত পেয়েছো?’ বললাম আমরা, ‘আর অঙ্কে?’, তাও বললাম, ‘ইংরাজিতে?’ মিনমিনে গলায় জবাব দিই …হেডস্যার হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘পড়াশোনায় তো ভালোই দেখছি, ক্লাসে এত বাঁদরামি কর কেন? হাত পাতো’ – সপাং, সপাং করে আমাদের দুজনের হাতের তালুতে এক একটি বেত্রাঘাত । ‘এরপর যদি কোনও কমপ্লেন পাই, বাবাকে ডেকে পাঠাবো’। বেতের বাড়ি নয়, বাবাকে ডেকে পাঠালে চরম অনর্থ – ওতেই আমাদের ভীষণ ভয় ! বুঝতেই পারলাম গিড্ডু একেবারে খোদ হেডস্যারকে নালিশ ঠুকে দিয়ে এসেছে…

ক্লাস নাইন থেকে আমার খুব কাছের বন্ধু, সুকুমার চন্দ্র (আই আই টি খড়্গপুরের প্রাক্তনী ও বর্তমানে ফিজিক্সের এক ঞ্জানীগুণী শিক্ষক) – কটা চোখ, অতি গৌরবর্ণ, প্রায় সোনালি চুল আর হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে এক দ্রষ্টব্য বিশেষ ! ওই রোগা চেহারা নিয়ে কিন্তু ফুটবল খেলায় তার পারদর্শিতা ছিল উঁচু দরের, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বল নিয়ে দৌড়ে তিন-চারজনকে ড্রিবল করে গোল দিয়ে আসতো সুকুমার । গরমকালে ব্রাইটনের মাঠে আমরা সবাই ফুটবল খেলতাম অন্তত ঘন্টা দেড়েক । একদিন সাউথ ইন্সটিটিউট সংলগ্ন বোলিং ক্লাব আমাদের ফুটবলে চ্যালেঞ্জ করলে, সে ক্লাবের খেলোয়াড় ষন্ডা মার্কা সব অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছোকরা । ম্যাচ শুরু হল, দশ মিনিটেই তারা বুঝে নিল কারা ভালো খেলোয়াড়, এরপর শুরু হ’ল একেবারে বডিলাইন চার্জ, স্রেফ মেরে বসিয়ে দেওয়ার প্ল্যান । সুকুমার লাফিয়েছে হেড দেওয়ার জন্য, প্রতিপক্ষ বল ছেড়ে তার মুখে সজোরে মাথা ঠুকেছে – সুকুমারের নাক থেকে ঝরঝর করে রক্তপাত ! আমরা কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গে ওকে সাইকেলে বসিয়ে ছুটেছি কাছেই রেলের ডিস্পেনসারিতে – ডাক্তারবাবু এক নজর দেখেই বলেন, ‘এতো নাকের হাড় ভেঙেছে দেখছি’। এরপর সুকুমারের নাকে ফরসেপ ঢুকিয়ে হাড় সোজা করার চেষ্টা ডাক্তারবাবুর – যন্ত্রণায় সুকুমারের দু’চোখ থেকে অশ্রুধারা কিন্তু মুখে টুঁ শব্দটি নেই – কি অপরিসীম সহ্যশক্তি!

আমাদের আই আই টি’র এনট্রান্সের ফল বেরিয়েছিল সোমবার, ৩রা জুন – সেবছর জয়েন্ট এনট্রান্সের সঞ্চালক আই আই টি কানপুর থেকে খড়্গপুরে রেজাল্ট পৌঁছেছিল শনিবার বিকেলে, সোমবার সকালে সে রেজাল্ট নোটিস বোর্ডে সাঁটা হ’বে । খড়্গপুর কলেজের এক প্রফেসারের ভাই তখন আই আই টি’তে MSc পড়ে, সে নাকি খড়্গপুর সেন্টার থেকে যে ক’জন সফল হয়েছে তাদের রোল নাম্বার টুকে নিয়ে এসেছে – একথা শুনে আমি ও সুকুমার দৌড়েছি সেই প্রফেসারের বাড়ি, তিনি প্রচণ্ড গোপনীয়তার সঙ্গে আমাদের রোল নাম্বার দু’টো একটা কাগজে লিখে নিয়ে বাড়ির ভেতরে গিয়ে ভাইয়ের টুকে আনা লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে এসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমাদের নাম আছে, কিন্তু সঠিক ফলাফল সোমবারই জানতে পারবে’ । ব্যাস ! আমাদের দু’দিন রাতে ঘুম নেই, সোমবার সকালের জন্য অধীর প্রতীক্ষা! অবশেষে সোমবার এলো – সকাল আটটা নাগাদ আমি সুকুমারের বাড়ি ছুটেছি। ও হরি, সুকুমার বাড়িতে নেই, সে তাদের বাড়ির গরু নিয়ে ইন্দায় ভেটেরিনারি হাসপাতালে গেছে, ডাক্তার দেখাতে । আমাদের সাউথ সাইড থেকে ইন্দা অনেকটা পথ, সাইকেলে যেতে কম করে আধঘন্টা লাগে – সুকুমার গরু নিয়ে হেঁটে গেছে । এখন ভাবতেও অবাক লাগে সুকুমার গরুর দড়ি ধরে, মুখে ‘হ্যাট, হ্যাট’ আওয়াজ করে গরু নিয়ে চলেছে অতটা পথ ! আমি আবার গেছি সুকুমারের বাড়ি সাড়ে ন’টায়, তিনি ফেরেন নি । বোধহয় সাড়ে দশ’টা নাগাদ রোদে মুখ লাল, গলদঘর্ম সুকুমার এসেছে আমার বাড়ি, বলে ‘গালাগালিটা পরে করবি, চল যাই এখন রেজাল্ট দেখতে’। ঊর্ধ্বশ্বাসে সাইকেল চালিয়ে আমরা ছুটেছি আই আই টি – নোটিস বোর্ডের সামনে অল্পবিস্তর ভীড় । কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের দু’জনেরই নাম খুঁজে পাই সিলেকশানের লিস্টে – উচ্চৈঃস্বরে গান গাইতে গাইতে সাইকেল চালিয়ে আমরা বাড়ির রাস্তা ধরি !

 

 

দ্বীপের শহর ভিক্টোরিয়ায়…

মে মাসে দিল্লীর প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে বাঁচতে আমরা কত্তা-গিন্নী এবার পাড়ি দিয়েছি সুদূর ক্যানাডায়  – মূল কারণটি অবশ্য অন্য, আমাদের কন্যার মাস্টার অফ সায়েন্স (MS) ডিগ্রী পাওয়ার সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আমাদের নিমন্ত্রণ ! তবে রথ দেখার সঙ্গে কলা না বেচলে হয় ? সমাবর্তন তো আছেই, এছাড়া কাছাকাছি নানা জায়গায় ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা শুরু হল জোর কদমে, কন্যার সঙ্গে ই-মেল ও হোয়াটসএ্যাপ-এর মাধ্যমে । বেশ কম সময়েই পরিকল্পনার সিংহভাগই সেরে ফেললো আমাদের কন্যা ।

অতঃপর এক শুক্রবার গভীর রাতে দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমরা রওয়ানা দিলাম ক্যানাডার উদ্দ্যেশ্যে । আমাদের গন্তব্য ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বন্দর-শহর ভ্যাঙ্কুভার (Vancouver) । চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের বিমান প্রায় পাঁচ ঘন্টা পর আমাদের পৌঁছে দিল সাংহাই, সেখানে ঘন্টা দুয়েকের বিরতি – এরপর আর এক উড়ানে প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে প্রায় ১২ ঘন্টার সফর শেষে আমরা পৌঁছলাম ভ্যাঙ্কুভার । সেখানে তখন শনিবারের এক ঝকঝকে সকাল, ১৯ ঘন্টায় আমরা পেরিয়ে এসেছি ১১,০০০ কিমি’র বেশী পথ, আমাদের ঘড়ি পিছিয়ে গেছে সাড়ে বারো ঘন্টা ! ‘জেট ল্যাগের’ সমস্যাটা সেরকম কিন্তু বাড়াবাড়ি মনে হল’না – দুপুরে একটু বিশ্রাম নিয়েই আমরা বেশ তরতাজা !

রাণী ভিক্টোরিয়া তাঁর শাসনকালে (১৮৩৭–১৯০১) যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ক্যানাডিয়ান কনফেডারেশন তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশগুলির কনফেডারেশনে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে খুবই সচেষ্ট ছিলেন, তাঁরই প্রচেষ্টায় সব প্রদেশগুলি একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় আজকের বিশাল দেশ ক্যানাডা । ক্যানাডার ইতিহাসে এই অবদানের জন্য সে দেশে তাঁকে বিশেষ সম্ভ্রমের চোখে দেখা হয় । রাণী ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে মে মাসে ২৫ তারিখের আগে শেষ সোমবারটি পালিত হয় ‘ভিক্টোরিয়া ডে’ হিসাবে – সারা ক্যানাডা জুড়ে তিনদিনের ছুটির ‘লং উইকএন্ড’!  এবছর ২০ – ২২শে মে ছিল লং উইকএন্ড – আমরা পৌঁছেছি ২০শে মে, কন্যার আরো দু’দিন ছুটি বাকি । তাই ২১শে মে প্রায় ভোর ছটায় আমরা তিনজনে বেরিয়ে পড়ি ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের রাজধানী, ‘ভিক্টোরিয়া’র দিকে ।

মানচিত্র একটু ঘাঁটলেই বোঝা যাবে, ক্যানাডার মূল ভূখন্ডে ভ্যাঙ্কুভার শহরের পশ্চিমে বিশালাকায় ‘ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপ’ – সে দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বন্দর, Swartz Bay, এরপর স্থলপথে  যেতে হবে ভিক্টোরিয়া । আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস ধরে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাই West 41st. Avenue ও Cambie Street-এর জংশনে SkyTrain ষ্টেশনে – পুরোপুরি স্বয়ংচালিত মেট্রো ট্রেনে নেই কোনও ড্রাইভারের অস্তিত্ব ! আমরা নেমে পড়ি Bridgeport ষ্টেশনে, সেখান থেকে দুই কোচ বিশিষ্ট বাসে প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমরা পৌঁছই, Tsawwassen Bay । এটি সমুদ্রের ধারে এক সুন্দর জাহাজঘাটা, সেখান থেকে সময়সারণী অনুযায়ী ফেরী ছাড়ছে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দ্যেশ্যে ।

‘Self service’ kiosk থেকে তিনটি টিকিট নিয়ে আমরা প্রবেশ করি ভিক্টোরিয়াগামী জাহাজে, জাহাজটির নির্মাণ শৈলী যথেষ্ট উন্নতমানের ও অভ্যন্তর বেশ সুন্দর – বাতানুকূল পরিবেশ, বড় বড় কাঁচের জানালার পাশে আরামদায়ক বসার জায়গা । জাহাজে শুধু ট্যুরিস্টদের ভীড়, সপ্তাহান্তের মজা আহরণে দলে দলে সবাই চলেছে ভিক্টোরিয়া । কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ ছেড়ে দিলে, আমরা প্রাতরাশের খোঁজে নীচের ডেকে ক্যাফেটারিয়াতে লাইনে দাঁড়াই । ফলের রস, টোস্টেড ব্রেড, স্ক্র্যাম্বল্ড এগস, এগ বেনেডিক্ট, সসেজ ও কফি দিয়ে বেশ পরিপাটি করেই সাঙ্গ হয় আমাদের প্রাতরাশ ! আমাদের জাহাজ পাহাড়সারির মধ্যে খাঁড়ি থেকে বেরিয়ে আদিগন্ত সমুদ্রে ভাসে, চারিপাশে অনেক পাহাড়, আমরা পেরিয়ে আসি ছোট দ্বীপ, পালতোলা ও মোটর চালিত নৌকা, অন্য দিকে থেকে আসা ফেরী; আমাদের সঙ্গী  হয় কর্কশ চিৎকাররত সী গালের দল খাবারের আশায় । দেখতে দেখতে কেটে যায় দেড় ঘন্টা সময়, আমাদের জাহাজ পৌঁছয় ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপে Swartz Bay ফেরী টার্মিনাল ।

Swartz Bay থেকে ভিক্টোরিয়া প্রায় ৩২ কিমি দূরে – একটি ডাবল ডেকার বাসে ওপর তলায় সীট পাই আমরা । আমাদের বাস ধীরে এগিয়ে চলে – পথে পড়ে ফার, স্প্রুস, সেডার, ওক ও মেপল-এর জঙ্গল; সুউচ্চ, প্রাচীন চিরহরিৎ বৃক্ষের সমাবেশ, কুলকুল করে বয়ে চলা ছোট নদী, ছোট-বড় শান্ত জলাশয়, ঘন সবুজ ঘাসের কার্পেট বিছানো উঁচু নিচু ময়দান, সেখানে জাবর কাটতে ব্যস্ত অলস গাভীর দল । পেরিয়ে আসি ছবির মত সুন্দর ঘরবাড়ি নিয়ে ছোট ছোট শহর, স্কুল, দোকানপাট, পাব ও রেস্তোরাঁ । আমাদের বাস চলে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে – রাস্তার ধারে সমুদ্রমুখি প্রাসাদোপম বাড়ি ।

আমাদের বাস প্রবেশ করে ভিক্টোরিয়া শহরে – সমুদ্রের তীরে সাজানো অতি সুন্দর শহর, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র বিশেষ । শহরে নানা মাপের ও দামের অসংখ্য হোটেল আর রাস্তায় দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকের ঢল । ডাউনটাউন ছাড়িয়ে এসে আমাদের বাস থামে, বাস থেকে নেমেই চোখে পড়ে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিধানসভা – ১৮৯৮ সালে ফরাসী ‘বারোক’ শিল্পশৈলীতে নির্মিত সে এক সুবিশাল প্রাসাদপুরী । শহরের প্রাণকেন্দ্রে তার অবস্থিতি, সামনে সুবিস্তৃত সবুজ মাঠে রানী ভিক্টোরিয়ার বিরাট ধাতব প্রতিমূর্তি । তার অনতিদূরেই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এবং কোরিয়ান যুদ্ধে শহীদ ক্যানাডিয়ান সেনাদের স্মারক । বিধানসভার পাশ দিয়ে হেঁটে এগোই আমরা ভিক্টোরিয়ায় আস্তানার খোঁজে ।

ইন্টারনেটে খুঁজে পেতে আমাদের কন্যা, Albion Manor নামে Bed & Breakfast-এ একরাত্রির জন্য অগ্রিম বুকিং করে রেখেছিল । মিনিট দশেক হেঁটে Albion Manor-এ পৌঁছে আমরা অবাক –১৮৯২ সালে তৈরি সেটি নগরনিগম দ্বারা স্বীকৃত এক ঐতিহ্যশালী ভবন বিশেষ ! বাড়িটির চারপাশে বাগান অনেক রঙিন ফুলে সুশোভিত,  বাগানে এক কৃত্রিম ফোয়ারা ও প্রস্তরমূর্তি । বাড়িটিতে থাকার জায়গা সীমিত, সব মিলিয়ে নয়টি ঘর ও স্যুট – ঘরগুলি নম্বর নয়, বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত । আমাদের জন্য বুক করে রাখা ঘরটির নাম, ‘অস্কার ওয়াইল্ড’ ! আমাদের ঘরে কাঠের মেঝে, পুরানো দিনের কাঠের কাজ করা একটি কিং সাইজ খাট, সমস্ত আসবাবপত্র উনবিংশ শতাব্দীর ডিজাইনে তৈরি । বিছানা, গদী, লেপ-কম্বল, তোয়ালে সবই উচ্চ মানের । বাথটব ও অন্যান্য উঁচুদরের ফিটিংস সমেত বাথরুমটিও অতি চমৎকার । Albion Manor-এ অ্যান্টিক শিল্প ও চিত্রকলার ছড়াছড়ি – বিশ্বের নানা জায়গা থেকে সংগৃহীত ধাতু, সিরামিক আর পাথরের কারুকাজের হস্তশিল্প ।

ঘরে জিনিসপত্র রেখে একটু জিরিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি ভিক্টোরিয়ার রাস্তায়, পৌঁছে যাই বিধানসভার সামনের মাঠে । সেখানে তখন ‘ভিক্টোরিয়া ডে’ উপলক্ষ্যে উৎসবের মেজাজ – নানান স্কুল, কলেজ থেকে আসা পড়ুয়াদের ব্যান্ডবাদ্যের আসর, ১০-১৫ জনের দলের বাদ্যসঙ্গীত পরিবেশন আর তাদের উৎসাহ যোগাতে অনেক স্থানীয় অধিবাসী ও ভ্রমণার্থীদের সমাগম । বিধানসভার ভিতরে বিনামূল্যে গাইডেড গ্রুপ ট্যুর-এর ব্যবস্থা আছে, দুপুর সাড়ে তিন’টের ট্যুর-এর টিকিট সংগ্রহ করে আমরা মধ্যাহ্নভোজনের উদ্দ্যেশে পা চালাই । বিধানসভার সামনে মাঠ পেরোলেই চওড়া রাস্তা, সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে । আর সেখানেই ভিক্টোরিয়া হারবার – নানা সাইজের yacht, পালতোলা নৌকা ও সী-প্লেনের ভীড় । হারবারের ধারে প্রমেনাড যেন এক মেলা প্রাঙ্গণ – অনেক শিল্পী সাজিয়ে বসেছে তাদের আঁকা ছবি ও হস্তশিল্পের পশরা নিয়ে, কেউ দেখায় ম্যাজিকের খেলা, কেউবা বিরাট উঁচু একচাকার সাইকেল নিয়ে কসরত দেখায় ! হারবার সংলগ্ন বেশ কিছু রেস্তোরাঁ, সবাই দেখি সীফুড পরিবেশনে সিদ্ধহস্ত !      

সমুদ্রের ওপর জেটিতে এক রেস্তোরাঁয় ফ্রায়েড স্কুইড, clam chowder soup ও ফিশ অ্যান্ড চিপস দিয়ে সমাধা হয় আমাদের মধ্যাহ্নভোজন । আমাদের রেস্তোরাঁর সামনে সমুদ্রে একের পর এক ওঠানামা করে সী-প্লেন, যাত্রীদের নিয়ে উড়ে যায় কাছের দ্বীপে ও ভ্যাঙ্কুভারে; আধঘন্টার জন্য ভিক্টোরিয়ার আকাশে কয়েক চক্করের ‘জয় রাইড’-এও সওয়ার হ’ন কেউ কেউ !

সাড়ে তিন’টের সময় বিধানসভায় ঢুকে পড়ি আমরা – ইউনিভার্সিটি অফ ভিক্টোরিয়ার স্নাতক স্তরের এক ছাত্রী আমাদের ঘুরিয়ে দেখায় বিধানসভা ও অধিবেশন কক্ষ, যত্ন সহকারে বোঝায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ইতিহাস, নির্বাচন পদ্ধতি, বিভিন্ন স্মারক । আমরা ভারত থেকে এসেছি শুনে মেয়েটি বলে সে ভারতে আসতে খুবই আগ্রহী !

ক্যনাডায় গরমকালে সূর্য ডোবে ন’টার পর, প্রায় রাত সাড়ে ন’টা অবধি বাইরে বেশ আলো – আটটা নাগাদ আমরা নৈশাহারের সন্ধানে পৌঁছে যাই, Fisherman’s Wharfসেখানে জেটির দু’ধারে সুন্দর দোতলা সব আধুনিক বাড়ি, সবগুলি বাড়িই জলে ভাসমান । জেটির এক দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ আর অন্য দিকে সার সার Yacht ও মোটরচালিত নৌকা নোঙর করা । দেখি জেটির কাছে দু’টি সীল সাঁতরে বেড়ায়, ট্যুরিস্টদের প্রায় হাত থেকে মাছ খেয়ে যায় তারা – জেটিতে সবাই ভীড় করে তাদের এহেন কসরত দেখে !

পরদিন সকালে Albion Manorএর ডাইনিং হ’লে বারোটি আসন বিশিষ্ট এক বিরাট টেবিলে আমাদের প্রাতরাশের ব্যবস্থা । সেখানে অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় – অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন এক বয়স্ক দম্পতি, আমেরিকার Salt Lake City থেকে এসেছেন আরও দুই দম্পতি, দুই মহিলা বন্ধু এসেছেন আমাদের মত ভ্যাঙ্কুভার শহর থেকে । কমলালেবুর রস, দু-তিন রকমের ফল, ব্লু-বেরী প্যানকেক, সসেজ ও কফি দিয়ে ভরপেট প্রাতরাশ সেরে আমরা বেরিয়ে পড়ি ভিক্টোরিয়ার এক বিশেষ দ্রষ্টব্য, Craigdarroch Castle দেখতে ।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি Robert Dunsmuir নামে এক স্কটিশ ভাগ্যান্বেষী কয়লা খনিতে কাজ নিয়ে ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপে এসে পৌঁছান । পরবর্তী কালে ভিক্টোরিয়ার উত্তরে Nanaimo শহরের কাছে তিনি এক কয়লা খনির মালিক হ’ন ও কয়লার ব্যবসায়ে প্রচুর ধন-সম্পত্তি উপার্জন করেন । ১৮৮৭-১৮৯০ সালে Robert Dunsmuir নির্মাণ করেন Craigdarroch Castle, কিন্তু ১৮৮৯ সালে মৃত্যুর জন্য ঐ প্রাসাদে বাস করার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর । Dunsmuir-এর বিধবা পত্নী, Joan Olive, তাঁদের তিন অবিবাহিতা কন্যা ও দুই অনাথ নাতি-নাতনী নিয়ে ঐ প্রাসাদে বাস করতে আসেন ১৮৯০ সালে, বসবাস করেন ১৯০৮ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ।  উনবিংশ শতাব্দীতে উত্তর আমেরিকার ধনীজন নির্মিত প্রাসাদগুলির ধনাঢ্য আড়ম্বরের অন্যতম Craigdarroch Castle । প্রায় দুই একর জমিতে ২৫,০০০ স্কোয়ার ফুট আয়তনে ৩৯ টি কামরা নিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদটি বেশ সম্ভ্রমের উদ্রেক করে ! মাথাপিছু ১৪.২৫ ক্যানাডিয়ান ডলার দিয়ে টিকিট কেটে প্রাসাদে প্রবেশ করি আমরা । সুদূর স্পেন, Chicago, Hawaii-থেকে আমদানি করা আখরোট, মেপল, রেড সেডার, রোজঊড, চেরী, ওক ইত্যাদি কাঠ দিয়ে তৈরি প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ও আসবাবপত্র । প্রাসাদের জানালায় রঙিন কাঁচের (stained glass) কারুকাজ দেখার মত ! অভ্যাগত ও পরিবারের সদস্যদের বসার ঘর, ব্যাঙ্কোয়েট হ’ল, একান্ত ডাইনিং হ’ল, বিভিন্ন সদস্যের শয়নকক্ষ ও তাদের আড়ম্বরের বাহুল্য সবই ঊনবিংশ শতাব্দীর ভিক্টোরিয়ান জমানার – সব ঘরেই বহুমূল্য অ্যান্টিক ও চিত্রকলার নিদর্শন ! এহেন প্রাসাদে আমাদের ঘড়ির কাঁটাও যায় যেন থেমে, কেটে যায় দুঘণ্টারও বেশী সময় ।

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে বাস ধরে আমরা পৌঁছই ভিক্টোরিয়ার ডাউনটাউন – এক ইতালিয়ান রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজন সেরে আমরা গিয়েছি ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে James Bay-তে, সমুদ্রতীর বেয়ে চলেছে রাস্তা । রাস্তা সংলগ্ন প্রমেনাড ধরে হেঁটে যাই আমরা, সমুদ্র সেখানে অপ্রশস্ত, খাঁড়ির অপরপ্রান্তে দেখতে পাই আমেরিকার ওয়াশিংটন প্রদেশে অলিম্পিক পর্বতমালা – তার চূড়োয় রূপোলি বরফের উজ্জ্বল মুকুট ! আমার ক্যামেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে অনুপম নিসর্গকে ধরে রাখতে ।

অবশেষে ভিক্টোরিয়ার মায়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসি আমরা; ফিরতি পথে Swartz Bay থেকে ভ্যাঙ্কুভারের ফেরীতে উঠি, জাহাজে কাঁচের দেওয়াল ঘেরা ডাইনিং হলে বসে ডিনারের সাথে অবলোকন করি প্রকৃতির আর এক বর্ণময় রূপ  – স্বর্ণালী সন্ধ্যার শেষে সুয্যিমামার ঘুমের দেশে পাড়ি ।

[মাতৃমন্দির সংবাদ, নিউ দিল্লী, জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত]

ফিরে দেখা…

আজ থেকে ৪৩ টি বসন্ত আগে প্রায় ১৭ ছুঁই ছুঁই বয়সে আমরা স্কুলবন্ধুরা হয়েছিলাম বিছিন্ন (মনে রাখতে হ’বে আমরা ১১ ক্লাসের পর হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষা দিয়েছিলাম, অতএব অনেকের বয়সই তখন ১৭ পেরোয়নি) – দুনিয়াটাকে পালটে দেওয়ার স্বপ্ন  দেখে বেছে নিয়েছিলাম নিজেদের পথ ! এক ছোট মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের শান্ত ছত্রছায়া থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলাম আমরা আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে । মধ্যবিত্ত মুল্যবোধ, মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গী আর যৌথ পরিবারের স্নেহ-মমতা মাখা কৈশোর থেকে পা বাড়িয়েছিলাম দুর্নিবার যৌবনের হাতছানিতে !

আমার মনে পড়ে যে ১৯৭৪ সালে আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি ১৯শে মার্চ বাংলা পরীক্ষা দিয়ে শুরু হয়ে ১লা এপ্রিল বায়োলজি পরীক্ষা দিয়ে শেষ হয়েছিল । তিনবছরের সিলেবাসের গুরুভার মাথা থেকে নামিয়ে কেমন যেন বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মত অবস্থা আমাদের । পরের দিনই ২রা এপ্রিল খড়্গপুর রেলওয়ে স্কুলের আমরা একদল ছুটেছিলাম মেদিনীপুরের মহুয়া সিনেমায় তখনকার সুপারহিট ছবি টীন-এজার লাভস্টোরি, ‘ববি’ দেখতে । আমাদের এক বন্ধু সুকুমার ‘ববি’ দেখতে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তার বাবা এমন চোখে তাকিয়েছিলেন সুকুমার যেন মানুষ খুন করে এসেছে; বেচারা সুকুমারের ‘ববি’ দেখা আর হয়নি ! বলাই বাহুল্য এ ছবি দেখার পর উদ্ভিন্ন যৌবনা ডিম্পল কাপাডিয়া আমার বেশ কিছু রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল । ৩রা এপ্রিল আমরা ভীড় করেছি খড়্গপুরের বম্বে সিনেমায় রাজকুমার অভিনীত ইন্দো-পাক যুদ্ধের বিষয় নিয়ে ছবি, ‘হিন্দুস্তান কি কসম’ দেখতে । তার পরদিন ৪ঠা এপ্রিল ডিম্পল কাপাডিয়ার মোহিনী আকর্ষণে সাড়া দিয়ে আমি গিয়েছি আবার ‘ববি’ দেখতে । এর ফলস্বরূপ পাওয়া গেল মায়ের কাছ থেকে এক কড়া বকুনি; ‘সাপের পাঁচ পা দেখেছো নাকি? সামনে লাইন দিয়ে অ্যাডমিশন টেস্ট, সেগুলোতে ভালো ফল না করলে জীবনে তো কিছুই করতে পারবে না !’

এখানে বলে রাখা উচিত যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার শিকার ছিলাম আমরা সবাই, তাই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া আর কোন কেরিয়ার পছন্দের বিলাসিতা ছিল আমাদের একেবারেই ব্রাত্য । লেখাপড়ায় ভালো করে ওই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এই ঢুকতে হবে, ওটাই মূললক্ষ্য ! পড়াশোনায় একটু অমনোযোগী হলেই বাবার একটা খুব চালু উক্তি ছিল, ‘তবে কি রেলের খালাসী হবি ?’ রেলের খালাসী সম্বন্ধে খুব একটা সম্যক ধারণা ছিলনা, তবে ব্যপারটা যে বেশ খারাপ সেটা বুঝতাম !

আই আই টির অ্যাডমিশনের জন্য অ্যাপ্লিকেশন ফর্মের কথাটা বলি – আমরা খড়্গপুরের ছেলে, তাই ফর্ম ভরতে সোজা আই আই টি পৌঁছেছি । ফর্মের সঙ্গে ১৫ টাকার পোস্টাল অর্ডার জমা দিতে হবে, কোথায় পাব পোস্টাল অর্ডার ? আই আই টির মধ্যেই পোস্ট অফিসে পাওয়া যায় নাকি, তা আমি কুড়ি টাকা দিতে কাউন্টার থেকে ১৬.৫০ টাকা কেটে আমাকে ৩.৫০ টাকা ফেরত দিলে । আমার মুখ চুন, আমাকে ঠকিয়ে ১.৫০ টাকা বেশী নিয়ে নিল, পোস্টাল অর্ডারে যে কমিশন লাগে তা জানা ছিলনা তখন !

যাই হোক ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ও ৫ই মে আমরা বসেছিলাম আই আই টির জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় – পরীক্ষার সেন্টারও আই আই টিতেই । দিনে দু’টো তিন ঘন্টার পরীক্ষা, প্রথম দিন অঙ্ক আর কেমিস্ট্রী, পরদিন ইংরাজি ও ফিজিক্স । পরীক্ষা কিরকম দিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই, কিন্তু পরিস্কার মনে আছে দু’টো পরীক্ষার মধ্যে এক ঘন্টার বিরতিতে কিছু খাওয়ার জন্য মা আমাকে দু’দিন একটা করে টাকা দিয়েছিলো – সে টাকায় আই আই টির ক্যান্টিনে ৫৫ পয়সা দিয়ে কোকা কোলা খেয়েছিলাম স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে । আর একটা ব্যাপার বেশ মনে আছে, শেষ পরীক্ষা ছিল ফিজিক্সের – পরীক্ষা শুরুর আধঘন্টা পর হঠাৎ পিছন ফিরে দেখি ৪-৫ টা বেঞ্চ দূরে বসা আমাদের রেলওয়ে গার্লস স্কুলের এক প্রথম দিকের ছাত্রীর (নামটা উহ্যই রাখলাম) চোখে অঝোর বারিধারা, হাতে ধরা প্রশ্নপত্রের প্রতি অসহায় দৃষ্টি ! শুনেছিলাম পরের বছর সে নাকি ডাক্তারি তে ভর্তির সু্যোগ পেয়েছিল ।

তারপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন – ৮ই মে, ১৯৭৪; অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেন্স ফেডারেশনের সভাপতি জর্জ ফার্নান্ডেজের ডাকে সারা ভারতে একযোগে শুরু রেল ধর্মঘট । তার জোরালো প্রকোপ পড়েছিল রেল শহর খড়্গপুরে – সরকারের তরফ থেকে ধরপাকড়, বাড়ী থেকে ড্রাইভার-গার্ডদের  জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ট্রেন চালানোর বিফল প্রচেষ্টা । ১৭ থেকে ১৯শে মে হওয়ার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স, কিন্তু রেল ধর্মঘটের প্রভাবে সে পরীক্ষা পিছিয়ে গেল জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে – আমাদের প্রিপারেশনেও ঢিলে পড়লো ।

৩রা জুন সোমবার আমাদের আই আই টি জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল বেরোলো, আমাদের স্কুল থেকে আমাকে নিয়ে তিনজন চান্স পেয়েছে । জুনের মাঝামাঝি কাউন্সেলিং, সেদিনই  সাকুল্যে ৬০০-৬৫০ টাকা জমা দিয়ে আই আই টিতে ভর্তিও হয়ে গেলাম আমরা ।  এরপর আমায় আর পায় কে, মনে মনে ঠিক করেই রেখে ছিলাম পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আর বসবো না । আমার বড়মামা তখন মেদিনীপুরে খুব নামী ডাক্তার, তাঁর বরাবরের ইচ্ছে আমি ডাক্তার হই – আমি পরীক্ষাই দিইনি শুনে, ভীষণ রাগারাগি করে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন !

এরপর অগাস্ট মাসে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ – আমরা মফঃস্বলের ছেলে, হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করাটাই ছিল সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি । আই আই টি তে ঢোকার পরেও মনে ভয়, ফার্স্ট ডিভিশন পাব তো ? রেজাল্ট বেরিয়েছে, হেড মাস্টার মশাইয়ের ঘরে মার্কশীট এসে পৌঁছেছে ডাক মারফত । আমরা দুরুদুরু বক্ষে বাইরে অপেক্ষা করছি, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম । আমাদের ইংরাজির শিক্ষক, শ্রী এন কে রায়কে আমরা কোনও দিন হাসতে দেখিনি, তিনি দেখি মৃদু হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলি, ‘স্যার, আপনি কি রেজাল্ট দেখেছেন, ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি স্যার?’ উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরিয়ে রায় মশাই বলেন, ‘স্টার পেয়েছিস তো রে, দু’টো সাবজেক্টে লেটার পেয়েছিস’ ।

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে ! সাইকেল নিয়ে ঊর্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটি মায়ের হাসিমুখটা দেখবো বলে…

[প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমাদের সময়ে ৭৫% নম্বর পেলে বোর্ড থেকে প্রকাশিত রেজাল্ট বুকলেটে রোল নম্বরের পাশে একটি * দেওয়া থাকতো; লেটার মানে কোনও বিষয়ে ৮০% বা তার বেশী মার্কস পাওয়া । আর ওই রকম ডাকসাইটে রেজাল্টের পর বড়মামা মেদিনীপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন অভিনন্দন জানাতে ।]

 

মনে কি দ্বিধা…

ভোরবেলা এ-সময়টা বড় ভালো লাগে অপর্ণার । সেই ছোটবেলা থেকেই খুব ভোরে স্নান সেরে নেওয়ার অভ্যাস – সাড়ে পাঁচটা বাজতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর । ঐ সময়ে গুড়গুড় আওয়াজ করে কলে জল আসে, তাড়াতাড়ি স্নান করে ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় চলে আসেন তিনি । সকাল ছ’টা নাগাদ দিল্লী অন্ধকার – পূবদিক সবে ফরসা হচ্ছে । অপর্ণা বারান্দায় বসে একমনে নামজপ করেন; সেই কম বয়সে মা’র হাত ধরে ভারত সেবাশ্রমে স্বামী পরমানন্দজির কাছে দীক্ষা নেওয়া । অপর্ণাকে বড়ই স্নেহ করতেন গুরুদেব, নিয়মিত চিঠি লিখতেন পোস্টকার্ড ভর্তি করে, মুক্তোর মত হাতের লেখা ছিল তাঁর ! দেহ রাখার আগের দিনও গুরুদেব অপর্ণাকে চিঠি লিখে গেছেন ।

দক্ষিণ দিল্লীর এদিকটা বেশ সবুজ – চারপাশে গাছগাছালিতে ভরা । একটা বড় শহরে এত গাছের ছড়াছড়ি – চারদিক তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে ওঠে ! এই বারান্দায় বসেই অপর্ণা অনেক পাখির দেখা পান । ধীরে ধীরে আলো ফোটে – দূরে রাও তুলারাম মার্গ দিয়ে একটা গাড়ি চলে যায় মৃদু শব্দ করে, স্থানীয় হিন্দিভাষীদের দুর্গামন্দির থেকে ভেসে আসা শিবস্তোত্র আর মসজিদের আজানের ডাক মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । হঠাৎ সমস্ত নিঃশব্দতা চিরে একঝাঁক টিয়াপাখি কর্কশ ডাক দিয়ে উড়ে যায় সামনের রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের বড় অশ্বত্থ গাছটার দিকে । পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস মেহরা বারান্দায় বাজরার দানা আর পাত্রে জল রেখে দেন – সেগুলো খুঁজে পেয়ে একদল শালিখ বেজায় কিচিরমিচির জুড়ে দেয় ।  দু’টো বুলবুলি নিজের মনে শিস দিয়ে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়ায় । অপর্ণা লক্ষ্য করেন পাশের বাড়ির সানশেডে একজোড়া পায়রা নিজেদের মধ্যে খুনসুটিতে ব্যস্ত । একজন তেড়ে যায় আর অন্যজন ঘাড়ের পালক উঁচিয়ে তাকে ভয় দেখায়, তারপর নিজেদের মধ্যেই কি রকম অদ্ভুত সুরে বকবকম ডাক তোলে – অপর্ণা বুঝতে পারেননা, সেটা ঠাট্টার টিটকিরী না প্রেমের অভিব্যক্তি !

একটু পরেই ছোট বেডরুমের দরজাটা খুলে যায় – নাতনি টুসি হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে আসে, ‘গুড মর্নিং দিম্মা, রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?’ টুসি ওরফে আত্রেয়ী, অপর্ণার ছোট নাতনি, ক্লাস ইলেভেনে পড়া তন্বী টীন-এজার । ডিপিএস-আর কে পুরম্ স্কুলে প্রথমে দিকের ছাত্রী – লেখাপড়া ও ডিবেটে তুখোড়, বাস্কেটবল আর সাঁতারেও সমান পারদর্শী । দিদির দেখাদেখি সেও সায়েন্স নিয়ে পড়ে, তারও ইচ্ছে দিদির মত ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ার । তার দিদি মানে অপর্ণার বড় নাতনি, সুমি ওরফে আদৃতা কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছে । দু’ই নাতনিই অপর্ণার সমান ন্যাওটা – ছোটবেলা থেকেই দু’পাশে শুয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনত । অপর্ণার গল্পের স্টক অফুরন্ত – রূপকথার রাজারানী, বিশ্বভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী বা ভূত-পেত্নীর গা ছমছমে গল্প বলে অপর্ণা ঘুম পাড়াতেন দুই নাতনিকে । ওরা কেমন তাড়াতাড়িই সব বড়  হয়ে গেল যেন !

এরপর টুসি দৌড়বে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হ’তে । অপর্ণার মেয়ে, অনুরাধা অন্য বেডরুম থেকে বেরিয়ে  এলো, ‘মা, তোমার চান হয়ে গেছে তো ? চা করি?’ । অনুরাধা কাছেই এক পাবলিক স্কুলে সিনিয়র ক্লাসে ইতিহাস পড়ায়, সেও বেরিয়ে যাবে সকাল আটটার মধ্যে । জামাই, অম্লান হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরে মর্নিং ওয়াকের জন্য তৈরি, হাসিমুখে বললো, ‘মা, শরীর ভাল তো ?’ অম্লান ভারত সরকারে বেশ উঁচু পোস্টে কাজ করে, ইকনমিক্স-এর মেধাবী ছাত্র ছিল সে । মেয়ে অনুরাধার জন্য যখন সুযোগ্য পাত্র খুঁজছিলেন অনিলবাবু, হঠাৎ জব্বলপুর থেকে ওঁর ছেলেবেলার বন্ধু সুবিনয়ের চিঠি এলো তাঁর ছেলে অম্লান-এর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে । সুঠাম, সপ্রতিভ অম্লানকে  দেখে ও তার সঙ্গে কথা বলে অনিলবাবু ও অপর্ণার খুব পছন্দ হয়েছিল । অম্লান সত্যিই বড় ভাল ছেলে – অনিলবাবু ও অপর্ণার প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান আর কাজকর্মেও তার খুব নামডাক ।

অনুরাধার থেকে বছর চারেকের বড় তার দাদা, অপর্ণার একমাত্র পুত্র, অনির্বাণ গুড়গাওঁতে থাকে – সেও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন এক মাল্টিন্যাশনাল  কোম্পানি-তে ভাইস প্রেসিডেন্ট । প্রায়ই অফিসের কাজে বিদেশ যায় অনির্বাণ, কখনও এক সপ্তাহ কখনওবা একমাসের জন্য –আজ জাপান, কাল জর্ডন অথবা পরশু ব্রাজিল – সারা পৃথিবী চষে বেড়ায় সে । ম্যানচেস্টারে পোস্টেডও ছিল বছর পাঁচেক । ছেলের কথা মনে পড়লেই অপর্ণার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, অভিমানে বুক ঠেলে উঠে আসে চাপা কান্না !

অনিলবাবু রেলে কাজ করতেন,  কলকাতা থেকে বদলী হয়েছিলেন চক্রধরপুরে – দু’টি কামরা, রান্নাঘর,  বাথরুম, সামনে ও পেছনে জাফরি দেওয়া বারান্দা আর পেছন দিকে একটা খোলা উঠোন  নিয়ে নতুন তৈরি রেলের কোয়ার্টার্স, সামনে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা অনেকটা বাগান করার জায়গা । সাবেকি উত্তর কলকাতার জয়েন্ট ফ্যামিলির প্রায়ান্ধকার বাড়ি ছেড়ে এসে অপর্ণা চক্রধরপুরে যেন মুক্তির স্বাদ পেলেন ! শনিবারের হাট থেকে খুরপি-কোদাল কিনে নিয়ে এসে জোর উদ্যমে অপর্ণা অনেক গাছপালা লাগিয়েছিলেন বাগানে । বিকেলে কলে জল এলে রোজ বালতি করে গাছে জল দিতেন অপর্ণা  – উর্বর মাটি আর তাঁর স্নেহমাখা স্পর্শ পেয়ে গাছগুলো সব লকলক করে বেড়ে উঠেছিল । চৈত্রের শেষ দিকে সারাদিন আগুন ঝরিয়ে যখন সূর্য ডুবত আর ধীরে ধীরে নেমে আসতো ছায়াঘন সন্ধ্যা, অপর্ণার বাগান ম-ম করতো যুঁই আর হাস্নুহানার গন্ধে – অনিলবাবু অফিস ফেরত বাগানে বসে চায়ের পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মৃদুহেসে বলতেন, ‘তুমি যে ওদের ভালোবাসো, গাছগুলো বোধহয় বুঝতে পারে’ ।

চক্রধরপুরে অনির্বাণ ছোট্ট ছেলে, তার তিন বছর বয়স, অনুরাধা তখনও পেটে আসেনি । এখনকার মত এত কম বয়সে কেউ স্কুলে ভর্তি হত না তখন, অনির্বাণ মা’র কাছেই পড়াশোনা করত – বর্ণপরিচয়, ছড়া ও ছবি, রবীন্দ্রনাথের সহজপাঠ এসবই পড়াতেন অপর্ণা । ছবি এঁকে শেখাতেন ভূগোল – উঁচুনিচু পাহাড়,  পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, নদীর স্রোত, সমতল বেয়ে এসে নদীর সমুদ্রে মিশে যাওয়া, নদী মোহনার ব-দ্বীপ – অতি আগ্রহে অনির্বাণ তার শিশুমনে গেঁথে নিত সব তথ্য । মাথাটা তার বরাবরই পরিস্কার, কোনও বিষয় একবারের বেশী দু’বার বোঝাতে হতনা ।

দিনগুলো যেন বড়ই দ্রুত কেটে গেল এরপর – অনুরাধার জন্ম, অনির্বাণের স্কুলে ভর্তি । ধাপে ধাপে অনির্বাণ পার হল স্কুলের নিচু থেকে উঁচু ক্লাস – একগাল হাসি নিয়ে রেজাল্টের দিন ছেলে বাড়ি ফিরত, ‘মা, এবারেও আমি ফার্স্ট।’ ক্লাস টেন-এর বোর্ড পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করে অনির্বাণ ভর্তি হল নরেন্দ্রপুরে – ওকে হস্টেলে রেখে বাড়ি ফেরার সময় অনিলবাবু আর অপর্ণার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল । এরপরেই অনিলবাবু বদলী হলেন নাগপুরে; অনির্বাণ হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় তিনটে লেটার নিয়ে পাশ করল – জয়েন্ট এনট্রান্সে তার র‍্যাঙ্ক হল ৩৭, আনন্দে আত্মহারা অনিলবাবু অফিসের সবাইকে সিঙ্গাড়া-মিষ্টি-কচুরি খাওয়ালেন পেট ভরে ! অনির্বাণ যাদবপুরে ভর্তি হল ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে ।

অনির্বাণ যখন থার্ড ইয়ারে পড়ে, ওর সহপাঠী শৌভিকের বোন, সুদীপা ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হল যাদবপুরে – শৌভিক অনির্বাণের খুব কাছের বন্ধু, ওদের বাড়ি কসবায় । যাদবপুরের হস্টেল থেকে শনি-রবিবারে ওদের বাড়ি প্রায়ই চলে যেত অনির্বাণ, হস্টেলের ডাল-ভাত-চচ্চড়িতে পেটে চড়া পড়ে গেলে মাসীমার হাতের রান্নায় মুখ বদলাতে । সুদীপা-কে মাঝে মাঝে অঙ্ক আর ফিজিক্স পড়াত, সুদীপা বলতো, ‘অনির্বাণদা’, তুমি কিন্তু দাদার চেয়ে ভালো বোঝাতে পারো ।’  একদিন কলেজের পর অনির্বাণ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল হস্টেলের দিকে, দেখে মেন গেটে সুদীপা দাঁড়িয়ে তার আর এক বন্ধুর সঙ্গে । ‘আরে, কি খবর, তোমাদের ক্লাস শেষ ?’ সুদীপা হাসিমুখে বলল, ‘অনির্বাণদা’, কেমন আছো ? তুমি কিন্তু অনেক দিন আসনি আমাদের বাড়িতে । আলাপ করিয়ে দিই, আমার ক্লাসমেট সুচেতনা, ও মডার্ন হাই স্কুলে পড়ত’ । ‘সুচেতনা, এ আমার দাদার বিশেষ বন্ধু অনির্বাণদা’, হ্যান্ডশেক করার চেষ্টা করিসনা, তোর হাত কেটে যাবে – অনির্বাণদা’ হীরের টুকরো কিনা’, খিলখিল করে হেসে উঠল ওরা দু’জনেই ।

এরপর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে অনির্বাণের যেন ঘনঘনই চোখে পড়তে লাগলো সুচেতনা – মৌখিক স্বল্পালাপ থেকে রেস্তোরাঁর ঘেরাটোপ – তারপর একদিন ওদের বাড়ি । সুচেতনার বাবা ইউনিয়ন কার্বাইডের জেনারাল ম্যানেজার, সানি পার্কে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিঙে আটতলায় ওদের ফ্ল্যাট – সেখান থেকে কলকাতা যেন এক মায়া নগরী, আকাশছোঁয়া সাফল্যের স্বর্গলোক, সব রকম দুঃখকষ্টের অনেক ওপরে । ক্যালকাটা ক্লাবের সুইমিং পুল দাপানো, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ‘কেয়ার ফ্রী’ স্বভাবের সুচেতনা অনির্বাণের মন জয় করে নিল সহজেই । যাদবপুরের পড়া শেষ করে অনির্বাণ আই আই টি কানপুরে এম টেক করতে গেল, সুচেতনা বি এস সি’র পর এম এস সি তে ভর্তি হ’ল – কানপুর থেকে বেরিয়ে অনির্বাণ আমেরিকায় যাওয়ার আগেই চারহাত এক হল এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় । বড়লোক বেয়াই বাড়ি – অনির্বাণের বিয়েতে যথেষ্টই খরচা করেছিলেন অনিলবাবু, তবু তাদের মন পাওয়া ভার । বৌভাতের সন্ধ্যায় সুচেতনার মা’ ঝেঁঝেঁ উঠলেন, ‘দেখবেন মিস্টার মিত্র, আমাদের বাড়ির লোকজনদের যেন কোনও অযত্ন না হয়’ ।

বিয়ের দু’সপ্তাহের মধ্যেই অনির্বাণ আর সুচেতনা চলে গেল আমেরিকা, বৌ আর শ্বাশুড়ির মধ্যে কোনও সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই দূরত্বের ব্যবধান তৈরি হ’ল অনেক । অনিলবাবু ও অপর্ণা অনির্বাণের চলে যাওয়াতে প্রথমে ভেঙ্গে পড়েছিলেন, পরে অনুরাধার সঙ্গে অম্লানের বিয়ের পর ওঁরা যেন মনের জোর ফিরে পেয়েছিলেন একটু ।

অনুরাধার ছোট মেয়ে টুসি জন্মাবার সময় অনিলবাবু ও অপর্ণা দিল্লী চলে এসেছিলেন – ওদের একটু সাহায্য হবে ভেবে । দেখতে দেখতে টুসি বড় হয়ে উঠলো – মেয়ে-জামাই আর ওঁদের ছাড়েনা, যাবার কথা বললেই বলে আর ক’দিন থেকে যাওনা মা, কলকাতায় তোমাদের আর কি বা কাজ? তাছাড়া ওখানে লোকজন  পাওয়া যায়না, বাড়ির সব কাজ সামলাতে মা’র কষ্ট হবে ! একদিন গভীর রাতে অনিলবাবু অপর্ণাকে ডেকে বললেন, ‘আমার বুকে একটু কষ্ট হচ্ছে’ । অম্লান সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে গেল অল ইন্ডিয়া ইন্সটিউটে – ডাক্তারদের সব চেষ্টাই বিফল করে সকাল সাতটায় চিরকালের মত চোখ বুজলেন অনিলবাবু । সুমি আর টুসি এসে অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরল, ‘দিম্মা, তুমি আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবেনা’ । তখন অনির্বাণ গুড়গাওঁ-এ চাকরি নিয়ে চলে এসেছে, খবর পেয়ে সেও দৌড়ে এল – বাবার শ্রাদ্ধশান্তি সবই করলে নিয়ম মেনে । অপর্ণা রয়ে গেলেন মেয়ের কাছে, কর্তব্যপরায়ণ ছেলে সপ্তাহে একবার ফোন করে, মাসে-দুমাসে দেখা করতে আসে – কিন্তু ঐ পর্যন্তই, ছেলে বা বৌমা কেউ বলেনা, ‘মা, আমাদের কাছে ক’দিন থাকবে চলনা’ । তবুও যখন অনির্বাণের ফোনটা আসে, ‘মা, কেমন আছো ?’, অপর্ণার চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে যেন ।

সকালবেলায় এ সময়টা অপর্ণার মনে ঘুরে ঘুরে আসে কলকাতার বাড়িটার কথা । ছেলেকে হস্টেলে রেখে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়িয়ে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে বাড়িটা করেছিলেন অনিলবাবু – দমদম পার্কে প্রায় আড়াই কাঠা জমির ওপর একটা বসার ঘর, দু’টো শোবার ঘর, বাথরুম ও ছোট রান্নাঘর নিয়ে একতলা বাড়িটা । বড় শখ করে ওঁরা দুজনে বাড়ির নাম রেখে ছিলেন, ‘নোঙর’ । বাড়ির ঠিক পেছনে একটা বিরাট টলটলে পুকুর – ঐ পুকুরটা দেখেই জমিটা খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল অনিলবাবু আর অপর্ণার । বাড়িটা তৈরি হয়ে গেলে বিশুমালিকে কাজে লাগিয়ে একটা ছোট বাগান করেছিলেন অপর্ণা সামনের আর পাশের জমিতে । বাঁশ পুঁতে আর কঞ্চি লাগিয়ে বিশু মাচা তৈরি করেছিল –  বর্ষার জল পেয়ে সদ্য যুবতী লাউগাছটা মাচা জড়িয়ে আনন্দে নাচানাচি করত । আর তরতর করে বেড়ে যাওয়া শিম গাছটা দোতলার ছাতে পৌঁছে গিয়েছিল – ছাতে উঠলেই হাতে আসতো থোকা থোকা শিম । অপর্ণার বাড়ির পেছনের পাঁচিল থেকে পুকুরের ধার ঘেঁসে মালিরা গাছ লাগিয়েছিল অনেকরকম – ঝাঁকড়া আমগাছটায় যেবার প্রথম আম ফললো, বিশুমালির বউ শ্যামলী ডেকে বলল, ‘মাসীমা, এই নিন গাছের প্রথম কাঁচা আম, টক করে খাবেন’ ।  বিশুমালির মেয়ে বিন্তি আর ছেলে তাপসের জন্য ভালো রান্নাবান্না হ’লে একটু সরিয়ে রাখতেন অপর্ণা, পালাপার্বণে পাঁচ-দশটা টাকা ধরিয়ে দিতেন, বলতেন ‘এই নে, তোরা ফুচকা খাস’ । মালিদের গাছে এসে বসত অনেক পাখি, বসন্তবৌরি, টুনটুনি আর ফিঙে – পানকৌড়ি-টা দুচোখ  বুজে ঘুমোবার ভান করতো, কিন্তু পুকুরে কোনও ছোট মাছ দেখলেই ছোঁ মেরে তুলে নিত তার ঠোঁটের ফাঁকে ! শীতের দুপুরে বাড়ির পেছনে আচার রোদে দিতেন অপর্ণা । ভাতের সঙ্গে একটু আচার খেতে বড় ভালোবাসতেন যে অনিলবাবু ।

‘মা, ওরা সবাই বেরিয়ে গেছে, আমিও বেরোচ্ছি অফিসে, দরজাটা বন্ধ করে দিন’, অম্লানের গলার আওয়াজে সম্বিত ফিরল অপর্ণার ।

[মাতৃমন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৪]