মনে কি দ্বিধা…

ভোরবেলা এ-সময়টা বড় ভালো লাগে অপর্ণার । সেই ছোটবেলা থেকেই খুব ভোরে স্নান সেরে নেওয়ার অভ্যাস – সাড়ে পাঁচটা বাজতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর । ঐ সময়ে গুড়গুড় আওয়াজ করে কলে জল আসে, তাড়াতাড়ি স্নান করে ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় চলে আসেন তিনি । সকাল ছ’টা নাগাদ দিল্লী অন্ধকার – পূবদিক সবে ফরসা হচ্ছে । অপর্ণা বারান্দায় বসে একমনে নামজপ করেন; সেই কম বয়সে মা’র হাত ধরে ভারত সেবাশ্রমে স্বামী পরমানন্দজির কাছে দীক্ষা নেওয়া । অপর্ণাকে বড়ই স্নেহ করতেন গুরুদেব, নিয়মিত চিঠি লিখতেন পোস্টকার্ড ভর্তি করে, মুক্তোর মত হাতের লেখা ছিল তাঁর ! দেহ রাখার আগের দিনও গুরুদেব অপর্ণাকে চিঠি লিখে গেছেন ।

দক্ষিণ দিল্লীর এদিকটা বেশ সবুজ – চারপাশে গাছগাছালিতে ভরা । একটা বড় শহরে এত গাছের ছড়াছড়ি – চারদিক তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে ওঠে ! এই বারান্দায় বসেই অপর্ণা অনেক পাখির দেখা পান । ধীরে ধীরে আলো ফোটে – দূরে রাও তুলারাম মার্গ দিয়ে একটা গাড়ি চলে যায় মৃদু শব্দ করে, স্থানীয় হিন্দিভাষীদের দুর্গামন্দির থেকে ভেসে আসা শিবস্তোত্র আর মসজিদের আজানের ডাক মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । হঠাৎ সমস্ত নিঃশব্দতা চিরে একঝাঁক টিয়াপাখি কর্কশ ডাক দিয়ে উড়ে যায় সামনের রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের বড় অশ্বত্থ গাছটার দিকে । পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস মেহরা বারান্দায় বাজরার দানা আর পাত্রে জল রেখে দেন – সেগুলো খুঁজে পেয়ে একদল শালিখ বেজায় কিচিরমিচির জুড়ে দেয় ।  দু’টো বুলবুলি নিজের মনে শিস দিয়ে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়ায় । অপর্ণা লক্ষ্য করেন পাশের বাড়ির সানশেডে একজোড়া পায়রা নিজেদের মধ্যে খুনসুটিতে ব্যস্ত । একজন তেড়ে যায় আর অন্যজন ঘাড়ের পালক উঁচিয়ে তাকে ভয় দেখায়, তারপর নিজেদের মধ্যেই কি রকম অদ্ভুত সুরে বকবকম ডাক তোলে – অপর্ণা বুঝতে পারেননা, সেটা ঠাট্টার টিটকিরী না প্রেমের অভিব্যক্তি !

একটু পরেই ছোট বেডরুমের দরজাটা খুলে যায় – নাতনি টুসি হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে আসে, ‘গুড মর্নিং দিম্মা, রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?’ টুসি ওরফে আত্রেয়ী, অপর্ণার ছোট নাতনি, ক্লাস ইলেভেনে পড়া তন্বী টীন-এজার । ডিপিএস-আর কে পুরম্ স্কুলে প্রথমে দিকের ছাত্রী – লেখাপড়া ও ডিবেটে তুখোড়, বাস্কেটবল আর সাঁতারেও সমান পারদর্শী । দিদির দেখাদেখি সেও সায়েন্স নিয়ে পড়ে, তারও ইচ্ছে দিদির মত ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ার । তার দিদি মানে অপর্ণার বড় নাতনি, সুমি ওরফে আদৃতা কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছে । দু’ই নাতনিই অপর্ণার সমান ন্যাওটা – ছোটবেলা থেকেই দু’পাশে শুয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনত । অপর্ণার গল্পের স্টক অফুরন্ত – রূপকথার রাজারানী, বিশ্বভ্রমণের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী বা ভূত-পেত্নীর গা ছমছমে গল্প বলে অপর্ণা ঘুম পাড়াতেন দুই নাতনিকে । ওরা কেমন তাড়াতাড়িই সব বড়  হয়ে গেল যেন !

এরপর টুসি দৌড়বে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হ’তে । অপর্ণার মেয়ে, অনুরাধা অন্য বেডরুম থেকে বেরিয়ে  এলো, ‘মা, তোমার চান হয়ে গেছে তো ? চা করি?’ । অনুরাধা কাছেই এক পাবলিক স্কুলে সিনিয়র ক্লাসে ইতিহাস পড়ায়, সেও বেরিয়ে যাবে সকাল আটটার মধ্যে । জামাই, অম্লান হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরে মর্নিং ওয়াকের জন্য তৈরি, হাসিমুখে বললো, ‘মা, শরীর ভাল তো ?’ অম্লান ভারত সরকারে বেশ উঁচু পোস্টে কাজ করে, ইকনমিক্স-এর মেধাবী ছাত্র ছিল সে । মেয়ে অনুরাধার জন্য যখন সুযোগ্য পাত্র খুঁজছিলেন অনিলবাবু, হঠাৎ জব্বলপুর থেকে ওঁর ছেলেবেলার বন্ধু সুবিনয়ের চিঠি এলো তাঁর ছেলে অম্লান-এর সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে । সুঠাম, সপ্রতিভ অম্লানকে  দেখে ও তার সঙ্গে কথা বলে অনিলবাবু ও অপর্ণার খুব পছন্দ হয়েছিল । অম্লান সত্যিই বড় ভাল ছেলে – অনিলবাবু ও অপর্ণার প্রতি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান আর কাজকর্মেও তার খুব নামডাক ।

অনুরাধার থেকে বছর চারেকের বড় তার দাদা, অপর্ণার একমাত্র পুত্র, অনির্বাণ গুড়গাওঁতে থাকে – সেও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে এখন এক মাল্টিন্যাশনাল  কোম্পানি-তে ভাইস প্রেসিডেন্ট । প্রায়ই অফিসের কাজে বিদেশ যায় অনির্বাণ, কখনও এক সপ্তাহ কখনওবা একমাসের জন্য –আজ জাপান, কাল জর্ডন অথবা পরশু ব্রাজিল – সারা পৃথিবী চষে বেড়ায় সে । ম্যানচেস্টারে পোস্টেডও ছিল বছর পাঁচেক । ছেলের কথা মনে পড়লেই অপর্ণার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, অভিমানে বুক ঠেলে উঠে আসে চাপা কান্না !

অনিলবাবু রেলে কাজ করতেন,  কলকাতা থেকে বদলী হয়েছিলেন চক্রধরপুরে – দু’টি কামরা, রান্নাঘর,  বাথরুম, সামনে ও পেছনে জাফরি দেওয়া বারান্দা আর পেছন দিকে একটা খোলা উঠোন  নিয়ে নতুন তৈরি রেলের কোয়ার্টার্স, সামনে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা অনেকটা বাগান করার জায়গা । সাবেকি উত্তর কলকাতার জয়েন্ট ফ্যামিলির প্রায়ান্ধকার বাড়ি ছেড়ে এসে অপর্ণা চক্রধরপুরে যেন মুক্তির স্বাদ পেলেন ! শনিবারের হাট থেকে খুরপি-কোদাল কিনে নিয়ে এসে জোর উদ্যমে অপর্ণা অনেক গাছপালা লাগিয়েছিলেন বাগানে । বিকেলে কলে জল এলে রোজ বালতি করে গাছে জল দিতেন অপর্ণা  – উর্বর মাটি আর তাঁর স্নেহমাখা স্পর্শ পেয়ে গাছগুলো সব লকলক করে বেড়ে উঠেছিল । চৈত্রের শেষ দিকে সারাদিন আগুন ঝরিয়ে যখন সূর্য ডুবত আর ধীরে ধীরে নেমে আসতো ছায়াঘন সন্ধ্যা, অপর্ণার বাগান ম-ম করতো যুঁই আর হাস্নুহানার গন্ধে – অনিলবাবু অফিস ফেরত বাগানে বসে চায়ের পেয়ালাটা হাতে নিয়ে মৃদুহেসে বলতেন, ‘তুমি যে ওদের ভালোবাসো, গাছগুলো বোধহয় বুঝতে পারে’ ।

চক্রধরপুরে অনির্বাণ ছোট্ট ছেলে, তার তিন বছর বয়স, অনুরাধা তখনও পেটে আসেনি । এখনকার মত এত কম বয়সে কেউ স্কুলে ভর্তি হত না তখন, অনির্বাণ মা’র কাছেই পড়াশোনা করত – বর্ণপরিচয়, ছড়া ও ছবি, রবীন্দ্রনাথের সহজপাঠ এসবই পড়াতেন অপর্ণা । ছবি এঁকে শেখাতেন ভূগোল – উঁচুনিচু পাহাড়,  পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, নদীর স্রোত, সমতল বেয়ে এসে নদীর সমুদ্রে মিশে যাওয়া, নদী মোহনার ব-দ্বীপ – অতি আগ্রহে অনির্বাণ তার শিশুমনে গেঁথে নিত সব তথ্য । মাথাটা তার বরাবরই পরিস্কার, কোনও বিষয় একবারের বেশী দু’বার বোঝাতে হতনা ।

দিনগুলো যেন বড়ই দ্রুত কেটে গেল এরপর – অনুরাধার জন্ম, অনির্বাণের স্কুলে ভর্তি । ধাপে ধাপে অনির্বাণ পার হল স্কুলের নিচু থেকে উঁচু ক্লাস – একগাল হাসি নিয়ে রেজাল্টের দিন ছেলে বাড়ি ফিরত, ‘মা, এবারেও আমি ফার্স্ট।’ ক্লাস টেন-এর বোর্ড পরীক্ষায় দুর্দান্ত রেজাল্ট করে অনির্বাণ ভর্তি হল নরেন্দ্রপুরে – ওকে হস্টেলে রেখে বাড়ি ফেরার সময় অনিলবাবু আর অপর্ণার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল । এরপরেই অনিলবাবু বদলী হলেন নাগপুরে; অনির্বাণ হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায় তিনটে লেটার নিয়ে পাশ করল – জয়েন্ট এনট্রান্সে তার র‍্যাঙ্ক হল ৩৭, আনন্দে আত্মহারা অনিলবাবু অফিসের সবাইকে সিঙ্গাড়া-মিষ্টি-কচুরি খাওয়ালেন পেট ভরে ! অনির্বাণ যাদবপুরে ভর্তি হল ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে ।

অনির্বাণ যখন থার্ড ইয়ারে পড়ে, ওর সহপাঠী শৌভিকের বোন, সুদীপা ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হল যাদবপুরে – শৌভিক অনির্বাণের খুব কাছের বন্ধু, ওদের বাড়ি কসবায় । যাদবপুরের হস্টেল থেকে শনি-রবিবারে ওদের বাড়ি প্রায়ই চলে যেত অনির্বাণ, হস্টেলের ডাল-ভাত-চচ্চড়িতে পেটে চড়া পড়ে গেলে মাসীমার হাতের রান্নায় মুখ বদলাতে । সুদীপা-কে মাঝে মাঝে অঙ্ক আর ফিজিক্স পড়াত, সুদীপা বলতো, ‘অনির্বাণদা’, তুমি কিন্তু দাদার চেয়ে ভালো বোঝাতে পারো ।’  একদিন কলেজের পর অনির্বাণ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল হস্টেলের দিকে, দেখে মেন গেটে সুদীপা দাঁড়িয়ে তার আর এক বন্ধুর সঙ্গে । ‘আরে, কি খবর, তোমাদের ক্লাস শেষ ?’ সুদীপা হাসিমুখে বলল, ‘অনির্বাণদা’, কেমন আছো ? তুমি কিন্তু অনেক দিন আসনি আমাদের বাড়িতে । আলাপ করিয়ে দিই, আমার ক্লাসমেট সুচেতনা, ও মডার্ন হাই স্কুলে পড়ত’ । ‘সুচেতনা, এ আমার দাদার বিশেষ বন্ধু অনির্বাণদা’, হ্যান্ডশেক করার চেষ্টা করিসনা, তোর হাত কেটে যাবে – অনির্বাণদা’ হীরের টুকরো কিনা’, খিলখিল করে হেসে উঠল ওরা দু’জনেই ।

এরপর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে অনির্বাণের যেন ঘনঘনই চোখে পড়তে লাগলো সুচেতনা – মৌখিক স্বল্পালাপ থেকে রেস্তোরাঁর ঘেরাটোপ – তারপর একদিন ওদের বাড়ি । সুচেতনার বাবা ইউনিয়ন কার্বাইডের জেনারাল ম্যানেজার, সানি পার্কে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিঙে আটতলায় ওদের ফ্ল্যাট – সেখান থেকে কলকাতা যেন এক মায়া নগরী, আকাশছোঁয়া সাফল্যের স্বর্গলোক, সব রকম দুঃখকষ্টের অনেক ওপরে । ক্যালকাটা ক্লাবের সুইমিং পুল দাপানো, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ‘কেয়ার ফ্রী’ স্বভাবের সুচেতনা অনির্বাণের মন জয় করে নিল সহজেই । যাদবপুরের পড়া শেষ করে অনির্বাণ আই আই টি কানপুরে এম টেক করতে গেল, সুচেতনা বি এস সি’র পর এম এস সি তে ভর্তি হ’ল – কানপুর থেকে বেরিয়ে অনির্বাণ আমেরিকায় যাওয়ার আগেই চারহাত এক হল এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় । বড়লোক বেয়াই বাড়ি – অনির্বাণের বিয়েতে যথেষ্টই খরচা করেছিলেন অনিলবাবু, তবু তাদের মন পাওয়া ভার । বৌভাতের সন্ধ্যায় সুচেতনার মা’ ঝেঁঝেঁ উঠলেন, ‘দেখবেন মিস্টার মিত্র, আমাদের বাড়ির লোকজনদের যেন কোনও অযত্ন না হয়’ ।

বিয়ের দু’সপ্তাহের মধ্যেই অনির্বাণ আর সুচেতনা চলে গেল আমেরিকা, বৌ আর শ্বাশুড়ির মধ্যে কোনও সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই দূরত্বের ব্যবধান তৈরি হ’ল অনেক । অনিলবাবু ও অপর্ণা অনির্বাণের চলে যাওয়াতে প্রথমে ভেঙ্গে পড়েছিলেন, পরে অনুরাধার সঙ্গে অম্লানের বিয়ের পর ওঁরা যেন মনের জোর ফিরে পেয়েছিলেন একটু ।

অনুরাধার ছোট মেয়ে টুসি জন্মাবার সময় অনিলবাবু ও অপর্ণা দিল্লী চলে এসেছিলেন – ওদের একটু সাহায্য হবে ভেবে । দেখতে দেখতে টুসি বড় হয়ে উঠলো – মেয়ে-জামাই আর ওঁদের ছাড়েনা, যাবার কথা বললেই বলে আর ক’দিন থেকে যাওনা মা, কলকাতায় তোমাদের আর কি বা কাজ? তাছাড়া ওখানে লোকজন  পাওয়া যায়না, বাড়ির সব কাজ সামলাতে মা’র কষ্ট হবে ! একদিন গভীর রাতে অনিলবাবু অপর্ণাকে ডেকে বললেন, ‘আমার বুকে একটু কষ্ট হচ্ছে’ । অম্লান সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে গেল অল ইন্ডিয়া ইন্সটিউটে – ডাক্তারদের সব চেষ্টাই বিফল করে সকাল সাতটায় চিরকালের মত চোখ বুজলেন অনিলবাবু । সুমি আর টুসি এসে অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরল, ‘দিম্মা, তুমি আমাদের ছেড়ে কোথাও যাবেনা’ । তখন অনির্বাণ গুড়গাওঁ-এ চাকরি নিয়ে চলে এসেছে, খবর পেয়ে সেও দৌড়ে এল – বাবার শ্রাদ্ধশান্তি সবই করলে নিয়ম মেনে । অপর্ণা রয়ে গেলেন মেয়ের কাছে, কর্তব্যপরায়ণ ছেলে সপ্তাহে একবার ফোন করে, মাসে-দুমাসে দেখা করতে আসে – কিন্তু ঐ পর্যন্তই, ছেলে বা বৌমা কেউ বলেনা, ‘মা, আমাদের কাছে ক’দিন থাকবে চলনা’ । তবুও যখন অনির্বাণের ফোনটা আসে, ‘মা, কেমন আছো ?’, অপর্ণার চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে যেন ।

সকালবেলায় এ সময়টা অপর্ণার মনে ঘুরে ঘুরে আসে কলকাতার বাড়িটার কথা । ছেলেকে হস্টেলে রেখে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়িয়ে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে বাড়িটা করেছিলেন অনিলবাবু – দমদম পার্কে প্রায় আড়াই কাঠা জমির ওপর একটা বসার ঘর, দু’টো শোবার ঘর, বাথরুম ও ছোট রান্নাঘর নিয়ে একতলা বাড়িটা । বড় শখ করে ওঁরা দুজনে বাড়ির নাম রেখে ছিলেন, ‘নোঙর’ । বাড়ির ঠিক পেছনে একটা বিরাট টলটলে পুকুর – ঐ পুকুরটা দেখেই জমিটা খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল অনিলবাবু আর অপর্ণার । বাড়িটা তৈরি হয়ে গেলে বিশুমালিকে কাজে লাগিয়ে একটা ছোট বাগান করেছিলেন অপর্ণা সামনের আর পাশের জমিতে । বাঁশ পুঁতে আর কঞ্চি লাগিয়ে বিশু মাচা তৈরি করেছিল –  বর্ষার জল পেয়ে সদ্য যুবতী লাউগাছটা মাচা জড়িয়ে আনন্দে নাচানাচি করত । আর তরতর করে বেড়ে যাওয়া শিম গাছটা দোতলার ছাতে পৌঁছে গিয়েছিল – ছাতে উঠলেই হাতে আসতো থোকা থোকা শিম । অপর্ণার বাড়ির পেছনের পাঁচিল থেকে পুকুরের ধার ঘেঁসে মালিরা গাছ লাগিয়েছিল অনেকরকম – ঝাঁকড়া আমগাছটায় যেবার প্রথম আম ফললো, বিশুমালির বউ শ্যামলী ডেকে বলল, ‘মাসীমা, এই নিন গাছের প্রথম কাঁচা আম, টক করে খাবেন’ ।  বিশুমালির মেয়ে বিন্তি আর ছেলে তাপসের জন্য ভালো রান্নাবান্না হ’লে একটু সরিয়ে রাখতেন অপর্ণা, পালাপার্বণে পাঁচ-দশটা টাকা ধরিয়ে দিতেন, বলতেন ‘এই নে, তোরা ফুচকা খাস’ । মালিদের গাছে এসে বসত অনেক পাখি, বসন্তবৌরি, টুনটুনি আর ফিঙে – পানকৌড়ি-টা দুচোখ  বুজে ঘুমোবার ভান করতো, কিন্তু পুকুরে কোনও ছোট মাছ দেখলেই ছোঁ মেরে তুলে নিত তার ঠোঁটের ফাঁকে ! শীতের দুপুরে বাড়ির পেছনে আচার রোদে দিতেন অপর্ণা । ভাতের সঙ্গে একটু আচার খেতে বড় ভালোবাসতেন যে অনিলবাবু ।

‘মা, ওরা সবাই বেরিয়ে গেছে, আমিও বেরোচ্ছি অফিসে, দরজাটা বন্ধ করে দিন’, অম্লানের গলার আওয়াজে সম্বিত ফিরল অপর্ণার ।

[মাতৃমন্দির সংবাদ, অক্টোবর ২০১৪]

 

Author: Soumitra

A Chemical Engineer by profession and a traveller by passion, Soumitra Biswas works as an Advisor in the Union Ministry of Science & Technology, Govt. of India. He dabbles in photography and travel writing in his spare time. Soumitra lives in New Delhi. The views expressed in the article are totally his own.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s