The City of Four Seasons

In Delhi, one can clearly make out four different seasons of the year. The city is by far the greenest in the country; the greenery is a visual treat especially in its central neighbourhoods and southern fringes. Driving down the leafy avenues of Lodi Road, Prithviraj Road and APJ Abdul Kalam (erstwhile Aurangzeb) Road just to name a few under the arching canopies of the ancient trees is pure bliss!

The spring in Delhi sets in by mid-February, when all the Gulmohars (Krishnachura) start glowing with their scarlet blooms and the Silk Cotton (Shimul) trees without any leaves suddenly turn crimson with their heavy flowers. Among such a riot of colours, one can spot not so common Flame of the Forest (Palash) too. By mid-March, the trees, which had shed all their leaves before the winter turn coppery brown or glistening green with their nascent foliage.

As the spring gives in to the blistering summer, the city is infamous for, the dust settles onto the thick green leaves of the trees and as the temperature shoots up beyond 40 deg C by early May, the city roads are aglow with Amaltas (Indian laburnum). Some of the narrow roads in my neighbourhood are lined on both the sides with them laden with the delicate flowers of golden yellow hues. They bloom in abundance heralding the summer in the city while painting the canvas with our own ‘cherry blossom’. Unlike Kolkata, we don’t get many Nor’westers (কালবৈশাখী) during the summer in Delhi; we have our share of severe dust storms (Aandhi) though to bring down the temperature as it becomes almost unbearable!

While monsoon hits Malabar coast on June 01 and proceeds to Mumbai by June 10, it takes quite a momentum for it to cross the Vindhyas to set foot on the north. Though June 29 happens to be official date for the monsoon to arrive in Delhi, it often plays truant pushing back its arrival almost to mid-July. As the monsoon sets in, thick dark clouds cover the sky and the storm ushering in the much-awaited downpour brings down the temperature of the city by a few notches. The verdant nature, awash with the rains, soothes nerves of the city dwellers.

When the city celebrates Diwali in late October or in early November, a slight nip in the evening air sets the stage for the forthcoming winter. Soon the early mornings turn misty and Delhi-ites ring in the New Year amidst thick fog engulfing the city till quite late in the day. Some days in January can be depressing too as the sun fails to appear throughout the day with a haze hanging over the city, chilled to its bones. Come February and the city‘s well-crafted public spaces and parks explode with the vibrant colours of petunias, pansies, hollyhocks, calendulas… the kerbs of Shanti Path, Lodi Garden, Nehru Park, the Garden of Five Senses… invite the denizens into their open arms to savour the nature, a virtual kaleidoscope of floral extravaganza!

As the winter loses its teeth, spring comes with its new promises…fullsizeoutput_766.jpeg

Advertisements

কচি মেয়ে

সেদিন যখন গাড়িটা থামলো
ট্রাফিক সিগনালে,
দৌড়ে আসে কচি এক মেয়ে
চোখ তার ছলছলে
শীর্ণ দুহাতে ধরে আছে সে
গোলাপ ফুলের ভার,
অফিসের পথে ফুল কি হবে?
নেই মোর দরকার
কচি মেয়ে বলে, ফুল বেচে যদি
কয়েকটা টাকা পাই,
কিছু খেতে পাবো আমরা দু’জন
আমি আর ছোট ভাই
বিরসবদনে দশটা’ টাকা
গুঁজে দিই তার হাতে,
কাচ তুলে দিই সাত তাড়াতাড়ি
আর বিরক্ত না করে যাতে

মাঝা মাঝে তার দেখা পেয়ে যাই
চৌরাস্তা’র মোড়ে,
চোখ আমার খুঁজে ফেরে তারে
ব্যস্ত লোকের ভীড়ে
একদিন আমি মোবাইলে তার
দু’টো ছবি তুলে রাখি,
রুখু চুলো মাথা, মুখে হাসি তার
করুণ যে দু’টি আঁখি

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে মাঝে
দেখা নাই কেন তার?
আমি তো গিয়েছি ঐ মোড় দিয়ে
গাড়িতে বারংবার
একদিন তাই মোড়ের কাছেই
গাড়ি থেকে নেমে আসি,
কোথায় সেই কচি মেয়ে আর
মিষ্টি মুখের হাসি
ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করি
কোথায় গেছেরে সে?
শুনি দুরন্ত এক গাড়ির চাকা
দিয়েছে তারে পিষে !

হঠাৎ বৃষ্টি…

হঠাৎ আকাশ করে ঘন কালো,
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো
আমি তখন মেট্রোতে গুরগাওঁ,
মনটা বলে, আর কি মজা চাও?
ভ্যাপসা-পচা গরম হতে রেহাই,
চাইছিল মন, ঘটলো যেন তাহাই
পুরু ধূলোয় ঢেকেছিল গাছপালা,
বৃষ্টি পড়ে ঠাণ্ডা হল যে জ্বালা
হঠাৎ বৃষ্টি হঠাৎই গেল থেমে,
করলো পাগল প্রকৃতির এই game-এ
মেঘ সরলে সূয্যি হেসে কয়,
এ বর্ষা নয়, বর্ষার অভিনয়…

(২৫শে বৈশাখের পুণ্যতিথিতে রসকষহীন এক ইঞ্জিনীয়ারের কবি প্রণাম)

পথের সাথী…

অনিন্দ্য রায় কলকাতা ছেড়েছে বেশ কিছু বছর…যাদবপুরে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে এক বহুজাতিক কোম্পানীতে শাঁসালো মাইনের চাকরি নিয়ে তার পুণায় আসা । মেধা ও কর্মনিষ্ঠার জোরে কোম্পানী বেশ তাড়াতাড়িই অনিন্দ্যকে ম্যানেজার করেছে, কয়েক বছরের মধ্যেই আমেরিকা ও ইউরোপে দু’বার পাঠিয়েছে লম্বা এসাইনমেন্টে । সে এক নিরলস কর্মী, কাজে বড়ই ব্যস্ত … সুদর্শন অনিন্দ্য’র বয়স প্রায় তিরিশ ছুঁইছুঁই, কিন্তু বিয়েটা তার করা হয়ে ওঠেনি এখনও । আর তাছাড়া বিয়ের উদ্যোগটাই বা নেবে কে? অনিন্দ্য তার মা’কে হারিয়েছে ক্লাস টেনে পড়ার সময়, জামশেদপুরে বাবা থাকেন একা, তিনি বার কয়েক বলে ছিলেন; কিন্তু অনিন্দ্য ‘কাজের চাপ আছে’, ‘ছুটি পাবনা এখন’ ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিয়েছে এতদিন… অফিসে অনেক মহিলাই তার বেশ গুণমুগ্ধ, কয়েকজন বলেও ফেলেছে উইকেন্ড-এ দু’জনে লাঞ্চ বা ডিনার করতে গেলে কেমন হয় গোছের কথা, অনিন্দ্য মুচকি হেসে এড়িয়ে গেছে, মনের গভীরে তার কমিটমেন্টের কোনও অভাব কাজ করে বোধহয়…

ইদানীং অনিন্দ্য ঢুকেছে ফেসবুকে, জামশেদপুরের Loyola School ও যাদবপুর মিলিয়ে তার বন্ধু সংখ্যা বেশ ভালোই, এছাড়াও আছে তার কিছু তুতো ভাই-বোন… অনিন্দ্য হ’ল যাকে বলে নীরব দর্শক, সে মন দিয়ে অন্যদের দেশ-বিদেশ বেড়ানোর, জন্মদিনের কেক কাটার ছবি দেখে, বন্ধুদের বিবাহবার্ষিকীতে গদগদ ভাষায় তাদের বৌ’দের প্রশংসা বেশ বোকা-বোকা লাগে তার আবার কিছু বন্ধুদের হাস্যরসাত্মক লেখায় সে মজাও পায় বেশ… কিন্তু ঐ পর্যন্তই, অনিন্দ্য কোনও কমেন্ট করেনা, আর নিজে কোনও পোস্ট করা তো দূরের কথা ! এক শুক্রবার রাত দশটায় ডিনার সেরে ল্যাপটপ খুলে বসেছে অনিন্দ্য, অনেকদিন ধরে ভাবছে কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়, অনেক ছুটি তার পাওনা, দিন পনেরো ছুটি কোম্পানী খুব খুশী হয়েই দেবে কাজপাগল লোকটাকে একটু বিশ্রাম দিতে… কিন্তু একা একা বেড়াতে যাওয়াটা যে খুব বোরিং ব্যাপার, তার প্রায় সব বন্ধুদেরই বিয়ে হয়ে গেছে, কেই বা বৌ-বাচ্চা ছেড়ে তার মত ব্যাচেলরকে সঙ্গ দেবে, কি যে উপায়? তার অনেকদিনের শখ সাউথ-ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোয় যাওয়ার – থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি… ব্যাকপ্যাকিং-এর একেবারে আদর্শ জায়গা সব !

অনিন্দ্য ফেসবুকে দেখে ছোট্ট একফালি বিজ্ঞাপন, ‘Don’t travel alone… look for your travel buddies… বিজ্ঞাপনে আরও লেখা, ‘Register yourself for ideal travel mates…roam around the world in great company’. একটু অবাক হয়ে অনিন্দ্য সেই ওয়েবসাইটে ক্লিক করে – এতো মজার ব্যাপার, পৃথিবীতে অনেকেই তার মত একা, তারা ভ্রমণসঙ্গী খুঁজছে অথবা চাইছে কোনও ভ্রমণার্থী দলে ভিড়তে… অনেকটা খেলার ছলেই অনিন্দ্য রেজিস্টার করে নিজেকে, ‘Techie (30) working for MNC in Pune, India… love backpacking, swimming & photography… looking forward to meeting the travel buddy for a two-week holiday somewhere in SE Asia’… তারপর যথারীতি ফেসবুকের পাতা উল্টে, নিজের কিছু মেইল চেক করে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ শুতে যায় অনিন্দ্য…

সকাল ছ’টা নাগাদ পুণাতে সবে একটু আলো ফুটেছে পূবাকাশে, টুং করে মোবাইল জানালো অনিন্দ্য’র একটা মেইল এসেছে… চশমাটা পরে মেইলটা দেখে সে, ‘Hi, it’s Karen here…Karen Martin (27) from Sydney, NSW… planning a backpacking trip for about two weeks to Bali in March… would be happy to join you buddy’… অনিন্দ্য ফেসবুকে গিয়ে Karen Martin-এর প্রোফাইল চেক করে, দেখে ক্যারেন University of New South Wales থেকে কেমিস্ট্রি নিয়ে M.Sc করেছে, সিডনী-তে সে এক কেমিক্যাল ল্যাবোরেটরিতে কাজ করে Senior Analyst হিসেবে… অনিন্দ্য প্রথমে ক্যারেন-কে friend request পাঠায়, আধঘন্টার মধ্যেই ক্যারেন তার ফেসবুকের বন্ধু হয়…

বালি যাওয়ার প্ল্যান নিঃশব্দে সেরে ফেলে অনিন্দ্য, শুক্রবার রাতে বম্বে থেকে সাড়ে পাঁচ ঘন্টায় কুয়ালা লামপুর, তারপর সেখান থেকে প্রায় ঘন্টা তিনেক পর শনিবারের এক ঝকঝকে সকালে বালি’র ডেনপাসার বিমানবন্দরে পৌঁছয় অনিন্দ্য… ক্যারেন বলেছিল আধঘন্টা আগেই পৌঁছে যাবে ও সিডনি থেকে, অপেক্ষা করবে এয়ারপোর্টের বাইরে অনিন্দ্য’র জন্য … বালিতে ভারতীয়দের বিশেষ খাতির, ‘Visa on arrival’, ৩৫ ডলার ফি জমা করে একমাসের ভিসা পেয়ে যায় অনিন্দ্য, কাস্টমস পেরিয়ে এয়ারপোর্ট টার্মিনাল থেকে বেরোতেই অনিন্দ্য শোনে, ‘Hi Ani’… দেখে একমুখ উজ্জ্বল হাসি নিয়ে ক্যারেন দাঁড়িয়ে, সে বলে, ‘Hey, how was your flight? Any interesting co-passenger?’ অনিন্দ্য বলে, ‘No such luck buddy, a fat guy on the next seat… he was snoring so badly’… দু’জনেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে এবার… বালি ভ্রমণের খুঁটিনাটি সব প্ল্যান করেছে ক্যারেন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে, কাজে ব্যস্ত অনিন্দ্য এ ব্যবস্থায় খুব খুশী । এয়ারপোর্ট থেকে কাছেই কুটা নামের এক জায়গায় সমুদ্রের ধারে রিসোর্ট-এ দু’টো ঘর বুক করেছিল ক্যারেন, পাসপোর্ট দেখাতেই পাওয়া গেল ঘরের চাবি … বেশ উঁচুমানের কমপক্ষে চার তারকা মার্কা রিসোর্ট, কিন্তু অনিন্দ্য দেখে দেশের তুলনায় দাম অনেক কম…

শুরু হয় তাদের বালি ভ্রমণ… আদ্যন্ত এডভেঞ্চার স্পোর্টস পাগল ক্যারেন এক উচ্ছল অস্ট্রেলিয়ান তরুণী – সমুদ্রে উইন্ড সার্ফিং, প্যারাসেলিং, স্নর্কেলিং, স্কুবা ডাইভিং এসবে তার বিশেষ আগ্রহ… সকাল ছ’টায় ইন্টারকমে ফোন আসে তার, ‘Ani, get ready in 15 minutes. Let’s go jogging on the beach’. কুটার সমুদ্রসৈকতে প্রায় একঘন্টা দৌড়ে অনিন্দ্য তো গলদঘর্ম… অফিসের ঠান্ডাঘরে বসে মগজমারি করে সে, ক্যারেনের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে অনিন্দ্য… একটু একটু করে জানতে পারে সে ক্যারেনকে; ওর বাবা নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশে এক ছোট শহরে প্রাইমারী স্কুলের টীচার আর মা এক অতিনিষ্ঠ হোমমেকার; আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই তাদের প্রথম বিয়ে বছর ৩৫ আগের… ক্যারেনের দাদা ও বৌদি দু’জনেই ডাক্তার, দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তারা থাকে সিডনিতেই; ভাইপো-ভাইঝি দু’জন ক্যারেন-এর বিরাট ফ্যান, প্রায় প্রতি উইকএন্ড-এই ক্যারেন তার দাদার বাড়ি চলে যায় । বাচ্চাদের বড়ই ভালোবাসে ক্যারেন, অন্যান্য দেশে শিশু অধিকার, তাদের প্রতি অবিচার এসব নিয়ে অনেক পড়াশোনা তার । ভারতে শিশুদের প্রতি জঘন্য সব অপরাধের ঘটনা সবই তার জানা, এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ে ক্যারেন… অনিন্দ্য বলতে বাধ্য হয়, ‘Hey Karen, please stop this now. I’m no child molester… I simply adore kids’. মাঝে মাঝে একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করে তারা; অনিন্দ্য বলে, ‘Karen, aren’t we just wasting our money? We can save big time if we share room in the hotel… I don’t snore much’. ক্যারেন জবাব না দিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায় । কোনওদিন আবার ক্যারেন বলে, ‘Ani, you have a funny name. It sounds like calling you as Honey’… হো হো করে হেসে ওঠে ওরা দুজন ।

অনিন্দ্য ও ক্যারেন বালির সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে যায়, একদিন ওরা যায় কিন্তামনি – কিছুটা গাড়িতে আর অনেকটাই ট্রেক করে ওরা পৌঁছয় ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি ‘মাউন্ট বাটুর’… পাহাড়ের চূড়ো থেকে নীচে ‘লেক বাটুর’-এর শোভা বড়ই মনোরম… কোনও দিন আবার ওরা ঘুরে বেড়ায় ‘উবুদ’, অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে মধ্য বালির এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল; উবুদ নানারকম শিল্পকলা ও বালিনীজ্ নৃত্যগীতের কেন্দ্রস্থল । অনেক পর্যটকের, বিশেষত ‘ব্যাকপ্যাকার’ দের আস্তানা সেখানে । রাস্তার দুধারে ওরা দেখে বড় বড় আর্টগ্যালারিতে আঁকা ছবি, কাঠ ও পাথরের ভাস্কর্যের সম্ভার, অসংখ্য বুটিক হোটেল, ইউরোপীয় খানার রেস্তোরাঁ ও কাফে । ওরা থামে ‘তেগালালাং’ গ্রামে – ক্যামেরায় বন্দী করে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধানচাষের (terrace farming) দৃশ্য । ‘তাম্পাক সিরিং’ গ্রামে ওরা যায় ‘তির্তা এম্পুল’ (পবিত্র প্রস্রবণের মন্দির) দেখতে – মন্দিরটির একপাশে সবুজ পাহাড়, চত্বরে অনেকগুলি ছোট মন্দির, দীর্ঘ ও প্রাচীন গাছের ছড়াছড়ি, একটি বেশ বড় ও কয়েকটি ছোট ছোট জলাশয় – পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা এক প্রস্রবণই এই জলের উৎস । দেখে আসে ওরা সমুদ্রতীরে ‘পুরা টানা লট’, ভাষান্তরে ‘সমুদ্রে ভাসমান মন্দির’; বালির দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে হিন্দু জলদেবতা বরুণ বন্দনার মন্দির, তীর থেকে অল্প দূরে এক ছোট্ট দ্বীপে । ভাঁটার সময় সমুদ্রের জল যায় সরে, হেঁটে পৌঁছনো যায় মন্দির চত্বরে ।নীচে থেকে প্রায় দৌড়ে পৌঁছে যায় ক্যারেন পাহাড়ের মাথায় ‘উলুওয়াটু’ মন্দিরে – বালির একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে এক পাহাড়ের শীর্ষে মন্দিরটি, খাড়াই ‘ক্যানিয়ন’-এর নীচে নীল-সবুজ রঙ মেশানো ভারত মহাসাগরের আছড়ে পড়া ঢেউ – বড়ই মনোমুগ্ধকর !

দেখতে দেখতে কেটে যায় দু’টো সপ্তাহ, ফিরে যাওয়ার আগের দিন এক পড়ন্ত বিকেলে অনিন্দ্য ও ক্যারেন পৌঁছয় ‘জিম্বারন বীচ’ – সূর্যাস্তের পর সমুদ্রের পাড়েই সী-ফুড ডিনার সেরে নেবে তারা । রক্তিম গোলাকৃতি সূর্যদেব ধীরে এগিয়ে চলেছেন দিক চক্রবাল পানে – সমুদ্রে ঠোঁট ছোঁয়ালেন সুয্যিমামা – আকাশে লালিমার পরশ, একদল পাখির ঘরে ফেরা – পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছিল ওরা সূর্য ডোবার পালা… অনিন্দ্যর আঙুলে ক্যারেনের আঙুলের ছোঁয়া, ক্যারেন বলে, ‘Ani, I would like to visit India… would love to explore your country with you dear’. অনিন্দ্য নীচু স্বরে জবাব দেয়, ‘Karen, please don’t visit India…come over to stay back forever’… ডুবন্ত সূর্যের অস্তরাগে চারটি চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে যেন… ক্যারেনকে বুকে টেনে নেয় অনিন্দ্য নিবিড় আলিঙ্গনে…

After the sunset @ Kuta
After the sunset, Kuta

নইলে আমার লাথি খাবে…

আমার শ্বশুরমশায়ের ব্যক্তিত্ব ছিল বেশ গুরুগম্ভীর গোছের; বিয়ের পর একটু দূরত্ব বজায় রেখেই চলতেন তিনি আমার সঙ্গে । আমি হাল ছাড়িনি, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি সম্পর্কের বরফ গলানোর… বিয়ের প্রায় মাস তিনেক পর কলকাতা থেকে ভোপালে আমার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছি, একদিন দুপুরে শ্বশুরমশায়ের পাশে খেতে বসেছি আমি । তখন আনকোরা নতুন জামাই, আপ্যায়ণ হচ্ছে ভালোই; বেশ বড় সাইজের দু’খানা পাবদা মাছ পড়ল পাতে, দোষের মধ্যে আমি বলে ফেলেছি, ‘বাঃ, দারুণ মাছ তো’… অমনি শ্বাশুড়ি-মা আরও একটি মাছ দিতে উদ্যোগী হ’লেন । আমি সভয়ে বলে উঠি, ‘আরে না না, কি করছেন, আর খেতে পারবো না’। শ্বাশুড়ি জোরাজুরি করলে, আমি বলি, ‘এতো আমার লাথি খাবে, সেই ঘটনা হয়ে গেল’… সে কথা শুনে মা বলেন, ‘সে আবার কি ঘটনা?’ আর বাবা কোনও কথা না বলে গম্ভীর ভাবে আমার দিকে তাকালেন…

আমি বলি, তা সে অনেককাল আগের কথা, কলকাতা থেকে একটু দূরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে অতি ধার্মিক, তিলক কাটা এক বোস্টম দম্পতি থাকতেন । তাঁদের প্রথম পুত্র সন্তান জন্মালে তার নাম রাখলেন, কৃষ্ণ, তা সে কেষ্ট সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই পটল তুললো । পরের সন্তান হ’ল একটি মেয়ে, তার নাম হ’ল রাধা; ওমা, রাধাও দিন দশেক পর অক্কা পেল । এর পরে আবার ছেলে হ’লে নাম রাখা হ’ল রাম… রামও এক মাসেই ফুড়ুৎ ! ভীষণ রেগে গিয়ে তিলক মুছে সে দম্পতি ঘোর মাংসাশী হ’লেন, আর এক মেয়ে জন্মাতে তার নাম রাখলেন ‘লাথি’… লাথি বেঁচে গেল । বছর তিনেক পর লাথি’র এক ভাই জন্মাল, তার নাম রাখা হ’ল ঝাঁটা; ওমা, সেও বেঁচে গেল । ধীরে ধীরে লাথি-ঝাঁটা বেশ বড় হয়ে উঠলো, তাদের পোষাকি নাম ছিল কিছু একটা, কিন্তু লাথি-ঝাঁটা ডাকনামেই তারা বেশী পরিচিত … দুই ভাই-বোন আবার এক ছাগল পুষেছে, তার নাম দিয়েছে ‘জুতো’ !

সময়কালে লাথি’র বিয়ে হ’ল; তার বর কলকাতা শহরের এক নব্য যুবক, সে ডক্টরেট করে কলেজে ফিলসফি পড়ায়, তার নাম ত্রিদিব । সুন্দরী লাথি’র ছবি দেখেই পাত্র এক কথায় বিয়েতে রাজি; বিয়ের পর জামাই প্রথম শ্বশুরবাড়ি এসেছে, তার খুব আদর আপ্যায়ণ হচ্ছে । দুপুরে পাতে পড়েছে দু’টো বেশ বড় সাইজের গলদা চিংড়ি, তারপর ত্রিদিবের শ্বাশুড়ি-মা আরও দু’টো পেল্লায় ইলিশের পিস তাকে দিতে গেলে, সে সভয়ে বলে, ‘মা, এক পিস দিন, আমি অত খেতে পারিনা’ । শ্বাশুড়ি বলেন, তুমি যা পারো খাও বাবা, নইলে আমার লাথি খাবে’… একথা শুনে তো নতুন জামাই-এর তো কান লাল একেবারে ! রাতে খাওয়ার সময় শ্বাশুড়ি অনেকটা মুরগী’র মাংস দিয়েছেন, আরও একহাতা মাংস দিতে গেলে, ত্রিদিব বলে, ‘করছেন টা কি? আমি রাতে এমনিতেই কম খাই’… সঙ্গে সঙ্গে শ্বাশুড়ি বলে ওঠেন, ‘আরে, যা পারো খাও, নইলে আমার লাথি খাবে’ । পরপর দু’বার একথা শুনে ত্রিদিব খুব অপমানিত বোধ করলো, মনে মনে সে ভাবে যত্ত সব অশিক্ষিতের দল, এরকম প্রত্যন্ত গ্রামে তার বিয়ে করাই খুব অন্যায় হয়েছে…

পরদিন সকালে ত্রিদিব তার শ্বশুরমশাইকে একা পেয়ে বলে, ‘বাবা, এটা কি রকম কথা? কাল সকালে ও রাতে খাওয়ার সময় আমি আর খেতে পারবো না শুনে মা বললেন – যা পারো খাও নইলে আমার লাথি খাবে’ ! শ্বশুরমশাই উচ্চস্বরে হ্যা হ্যা করে হেসে উঠে বলেন, ‘আরে হয় লাথি খাবে নয়তো ঝাঁটা খাবে, এতে চিন্তার কি আছে?’ এই শুনে ত্রিদিব ভাবে এতো গুষ্টিসুদ্ধ পাগল, কথাবার্তা একেবারে অমার্জিত, এখানে আর থাকা নেই একদম…

পরদিন খুব ভোরে সবাই যখন ঘুমোচ্ছে, বাড়ির পাঁচিল টপকে ত্রিদিব যেই পালাতে গেছে, ঝাঁটা দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলে, ‘জামাইবাবু যাবেন না, আজ জুতো মারবো, জুতোটা খেয়ে যান’। এই শুনে ত্রিদিব প্রাণপনে দৌড়ে একেবারে পগার পার…

আমি থামলে হো হো করে হেসে উঠে বাবা বলেন,’ কোথা থেকে পাও এসব গল্প?’ এর পরেই তিনি আমার বেশ বন্ধু হয়ে ওঠেন !

 

পণ্ডিচেরীর পোস্টকার্ড

‘সময়কে দিন বিরতি’, পণ্ডিচেরী ট্যুরিজম-এর বিজ্ঞাপনে চোখটা আটকে গেল – আমার মত শহুরে ঘুনপোকাদের জন্য এ যেন অন্তহীন আলস্যে ডুব দেওয়ার ডাক! তাই মার্চমাসে ছেলে-মেয়ের পরীক্ষান্তে, আমরা চারজনে পন্ডিচেরী অভিমুখে রওনা দিলাম – সময় থামানো ছুটির নেশায়।

চেন্নাই থেকে ইস্ট কোস্ট রোড ধরে পন্ডিচেরীর দুরত্ব ১৫০ কিমি, রাস্তা খুবই সুন্দর, বঙ্গোপসাগরের প্রায় ধার ঘেঁষে। সমুদ্রের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছলাম মহাবল্লিপুরম যার নাম অধুনা মামল্লপুরম। আমরা থামলাম মামল্ল হোটেলে; সদ্য তৈরী ধোঁয়া বেরোনো ইডলি-দোসার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্বর দিয়ে প্রাতঃরাশ – হোটেল মামল্লর জনপ্রিয়তা ভালোই, দক্ষিণী ট্যুরিস্টদের উপচে পড়া ভীড়।

মহাবল্লিপুরমের প্রথম দ্রষ্ট্যব্য সমুদ্রতীরে পরিত্যক্ত বিষ্ণুমন্দির – মন্দিরের ভেতরে অর্ধশায়িত বিষ্ণুমূর্তি, এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খ্রিস্টাব্দ নয় শতাব্দীতে বিজয়নগরের রাজবংশ। কালের প্রকোপে মন্দিরের ভগ্নদশা; ২০০৫ সালের সুনামির তান্ডবেও মন্দিরটি বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর্কীয়লোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (ASI) রক্ষনাবেক্ষনের কিন্তু প্রশংসা করতে হয় – মন্দিরের চারপাশের পরিবেশ সৌন্দর্যায়ন, সী-বীচের দেখভাল, বিরাট গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা, মন্দিরের প্রভূত সারাইকাজ সবই চলছে ASI -এর দৌলতে। বিষ্ণুমন্দিরের একটু দূরেই আরও পাঁচটি মন্দির – পঞ্চপান্ডবের রথ নামে পরিচিত, স্যান্ডস্টোনের তৈরী মন্দিরের গায়ে বিভিন্ন দেবদেবী, হাতি, ঘোড়া ও গাভীর খোদাইকরা মূর্তি। সামুদ্রিক আবহাওয়ার ঝড়ঝাপটায় ক্ষয়িষ্ণু সব ভাস্কর্য।

পায়ে হেঁটে একটু এগোলে চোখে পড়বে এক ছোট পাহাড়ের গায়ে বিশাল এক ভাস্কর্য – যার পরিচিতি, ‘অর্জুনের তপস্যা’। অনেক সাধু-সন্ত, রাজা-রাজড়া, পশু-পাখি সবাই অর্জুনের সঙ্গে একমনে তপস্যারত – ঐ বিশালাকায় ভাস্কর্যের মাপজোক একেবারে নিখুঁত। ভাস্কর্যটির নামকরণ নিয়ে দ্বিমত আছে – কেউ বলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুনের ‘পাশুপত’ অস্ত্র পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা এই ভাস্কর্যের থিম; আবার কারোর মতে ভগীরথের মর্ত্তে গঙ্গা আনার সাধনাই এখানে বিমূর্ত হয়েছে। ভাস্কর্যের একেবারে ওপরে যেন এক নদীর ধারা দ্বিতীয় থিওরী-টাকেই বেশি পুষ্ট করে। এরপরেই টিপিক্যাল ট্যুরিস্টদের ভীড় শ্রীকৃষ্ণের মাখনমন্ডের (butterball) চারপাশে, এক বিশাল গোলাকার বোল্ডার বেশ ভয়ংকর ভাবে পাহাড়ের ওপরে একচিলতে জায়গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বহু লোকের ঠেলাঠেলিতেও নড়ছেনা একচুল!

মহাবল্লিপুরম থেকে পন্ডিচেরী প্রায় ১০০ কিমি দূরে; আমাদের গাড়ী ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই পণ্ডিচেরী শহরে ঢুকলো। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয় পণ্ডিচেরী তামিলনাডুর কোনও এক সম্পন্ন জনপদ কিন্তু শহরের ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার-এ প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পন্ডিচেরীর ঐতিহ্যময় অতীতের দৃষ্টান্ত।  ছড়ানো ছেটানো প্রাক্তন চারটি ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরীর চার জেলা, যার কেন্দ্র পন্ডিচেরী। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী পন্ডিচেরী থেকে ১৫০ কিমি দক্ষিনে ‘কারাইকাল’ আর ৮৭০ কিমি উত্তরে ‘ইয়ানাম’; চতুর্থ জেলা ‘মাহে’ আরব সাগরের তীরে পন্ডিচেরী থেকে প্রায় ৬৫০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখতে পাই ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৭৩ সালে পন্ডিচেরী আসে বাণিজ্যের হাত ধরে; ধীরে ধীরে পত্তন হয় ফরাসী শাসনের । ১৬৯৩ থেকে ১৬৯৯ সাল অবধি পন্ডিচেরী ছিল ডাচ দখলে, এর পরবর্তী ১৫০ বছর ধরে ফ্রেঞ্চ ও বৃটিশের হাতবদল হতে থাকে পন্ডিচেরীর শাসনভার। ১৮৫৭ সালে যখন ভারতের মূল ভূখন্ডে আধিপত্য বিস্তার করে ব্রিটিশ শাসন, ফরাসী ঔপনিবেশিকতাও ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় পন্ডিচেরী, কারাইকাল, ইয়ানাম, মাহে আর আমাদের চন্দননগরে। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পর ভারত সরকার সক্রিয় হয় এইসব উপনিবেশ অধিগ্রহন করতে। ১৯৪৯ সালে চন্দননগর হয় ফরাসী শাসনমুক্ত, এরপর ১৯৫৪ সালে বাকি উপনিবেশগুলি যোগ দেয় ভারত যুক্তরাজ্যে। ১৯৬৩ সালের জুলাই মাসে পন্ডিচেরী পৃথক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পায়।

উত্তর থেকে দক্ষিনে বয়ে চলা একটি সুপরিসর ক্যানাল পন্ডিচেরী শহরকে করেছে দ্বিখন্ডিত – ফ্রেঞ্চ আর তামিল কোয়ার্টার-এ। সাহেবদের বসবাসের জন্য চিহ্নিত ফ্রেঞ্চ অংশ শুধু সুপরিকল্পিতই নয়, সমুদ্রতীরের কাছে বলে সুন্দরও খুবই। শহরের এই অংশেই সব সরকারি অফিস, মিউজিয়াম, হাসপাতাল, এমনকি অরবিন্দ আশ্রমও। Rue Francois Martin, Rue Bussy, Rue Romain Roland…নামাঙ্কিত রাস্তাগুলি পন্ডিচেরীর ফরাসী উপনিবেশের নীরব সাক্ষী; দুপাশে পুরোনো আমলের villa – বড় বড় কাঠের দরজা, নকশাদার cast iron-এর বিরাট গেট, ছোট ছোট থামে ঘেরা ব্যালকনি, সময় সত্যিই যেন থমকে গেছে পন্ডিচেরীতে! আমার ক্যামেরার শাটার হল সচল, এক টুকরো ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টায়।   বেশ কিছু পুরোনো বাড়ী সংস্কার করে তৈরী হয়েছে ব্যুটিক হোটেল, রেস্তোরাঁ আর গেস্টহাউস…বিদেশী ট্যুরিস্টর ভীড়ই বেশী।

ফরাসী খাবারের খোঁজে লাঞ্চে আমরা পৌঁছলাম Suffren Street-এ রন্দেভু (Rendezvous)-তে; রেস্তোরাঁটি ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার-এ একটি পুরোনো বাড়ীতে। একতলায় কাঠের থাম, বিশাল মাটির পাত্র, ঘোড়াগাড়ীর চাকা এসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে; দোতলায় বাঁশ ও নারকোল পাতায় ঢাকা ছাদে খাবার জায়গা। রন্দেভুর খাবার তারিফ যোগ্য – আমাদের পছন্দের সীফুড ও চিকেন-এর sizzler তারসঙ্গে oyster baked with cheese মন দিল ভরিয়ে, আর শেষে dessert, ‘death by chocolate’ দেখলাম বেশ উপভোগ করলো ছোটরা। এরকম একটা গুরুভোজের পর দিবানিদ্রা অবশ্যম্ভাবী ! সূর্য যখন প্রায় অস্তমিত, আমরা পৌঁছলাম পন্ডিচেরীর promenade-এ, সমুদ্রের ধারে চওড়া রাস্তা – স্থানীয় মানুষ ও ট্যুরিস্টদের ভীড়। নানারকম খাবারের স্টল, হস্তশিল্প প্রদর্শনী, টুরিস্টদের জন্য টুকিটাকি, সব মিলিয়ে যেন এক মেলা প্রাঙ্গন ।

খাদ্যরসিকদের পন্ডিচেরী ভালো লাগবে খুবই; ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার-এর অলিতে গলিতে অনেক রেস্তোরাঁ, কারোও বৈশিষ্ট খাঁটি ফ্রেঞ্চ, কারোওবা creole (ভারতীয় রান্নায় প্রভাবিত ফরাসী খানা)। আমরা এক ইতালিয়ান Pizzeria খুঁজে পেলাম, যেখানে কাঠের আগুনে pizza বেক করা হচ্ছে। ডিনারে আমরা গিয়েছিলাম Hotel de l’Orient এ, এক প্রাচীন প্রাসাদোপম বাড়ীতে – হোটেলটি এখন চালায় দিল্লীর Neemrana Group। রেস্তোরাঁটি বাড়ীর বাইরে বাগানে, খোলা আকাশের নীচে, চারপাশে গাছ-গাছালি, মৃদু আলো ও live band-এ পাশ্চাত্ত্য সঙ্গীত – বেশ এক মায়াবী পরিবেশ! আমরা অর্ডার করলাম creole খাবার – crab soup, squid vindaloo আর dessert-এ chocolate mousse ও chocolate torte।

Promenade সংলগ্ন সী বীচ সে রকম উপভোগ্য না হলেও, পন্ডিচেরীতে কিন্তু সুন্দর সী বীচের অভাব নেই। পরদিন আমরা গেলাম পন্ডিচেরীর ৮ কিমি দক্ষিনে Chunnambar Water Sports Centre-এ, এখানে চুন্নাম্বার নদী সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে আর নদী মোহনার পাশেই Paradise বীচ। মোটরবোটে চুন্নাম্বার নদীপথে মিনিট ১৫ লাগে – নদীর দুধারে ঘন সবুজ জঙ্গল, আকাশে বকেদের ইতিউতি ওড়াউড়ি, মোটরবোটের চারপাশে রুপোলী মাছেদের নৃত্য দেখতে দেখতে আমরা Paradise বীচে পৌঁছলাম। এখানে বঙ্গোপসাগরের সুশান্ত রূপ, খুবই পরিষ্কার সী বীচ, লোকজনের ভীড় নেই বললেই চলে। ঢেউ-এর সঙ্গে ভেসে আসে অসংখ্য ছোট্ট ছোট্ট জীবন্ত ঝিনুক, শাঁখ…ঢেউ সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা সব বালিতে যায় সেঁধিয়ে।

পন্ডিচেরী ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি বাদ পড়ে যায় ওখানের গীর্জাগুলি। আমরা প্রথমে দেখতে গিয়েছিলাম সাউথ বুলেভার্ডে Sacred Heart Church – গীর্জাটির তখন প্রভূত সংস্কার চলছিল। ধনুকাকৃতি খিলান দেওয়া গথিক শৈলীতে তৈরী গীর্জার অভ্যন্তর আর বিশাল জানালায় রঙ্গীন কাঁচের প্যানেলে যীশুর জীবনের নানান প্রতিচ্ছবি – সবমিলিয়ে এক মনোরম স্থাপত্য। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য Cathedral Street-এ Immaculate Conception Cathedral। প্রাচীন গীর্জাটি প্রথমে তৈরী হয় ১৬৯২ খ্রীস্টাব্দে, প্রায় একশ বছর বাদে ১৭৯১ সালে পুনঃনির্মাণের পর গীর্জাটি বর্তমান রূপ নেয়। বাইরে থেকে দেখলে অনেকটাই পর্তুগীজদের তৈরী গোয়ার গীর্জার কথা মনে পড়ে। ভেতরে অর্ধবৃত্তাকার খিলান, কারুকার্যময় সব থাম আর ঝুলন্ত বিরাট ঝাড়বাতি মনটাকে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে।

প্রাচ্যের ফ্রেঞ্চ Riviera পন্ডিচেরীর হাতছানিতে সাড়া দিয়ে এসেছে কত বনিক, পর্যটক, যোদ্ধা…পৃথিবীর দূর দূরান্ত থেকে। অধুনা পুঁজিবাদের উদারীকরণের হাওয়ায় যখন ভারতবর্ষ  এগোচ্ছে বিকাশের পথে, পন্ডিচেরীর ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার যেন জড়িয়ে রয়েছে সেই ফরাসী ঔপনিবেশিকতার রোমান্টিক মায়াজালে! পন্ডিচেরীতে চারদিনের সফরে আমাদের ঘড়ির কাঁটা সত্যিই গেছিল থেমে…বেশ কষ্ট করেই আমাদের ফিরতে হল দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায়।

[হাওয়াবদল, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১লা জুলাই, ২০১০]

মিতুল

মিতুলের আজ সকাল থেকেই বড্ড মন খারাপ…

মিতুলের সঙ্গে পরিচয় আছে আপনাদের? ছোট্ট মেয়ে মিতুলের বয়স বছর তিনেক, তার আছে এক পুঁচকে ভাই – টুটুল, তার বয়স মোটে ছ’মাস । তা সে টুটুল এতদিন শুধু ঘুমোতো, আর খিদে পেলেই কেঁদে উঠতো, আবার খেয়ে-দেয়েই লম্বা ঘুম, ইদানীং সে একটু-আধটু হাসতে শিখেছে । মিতুল তার কাছে গেলে সে হাত-পা ছুঁড়ে কিছু বলার চেষ্টা করে, আর তার ঝুমঝুমিটা নাড়িয়ে দিলে, বেশ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সে… আছেন মিতুলের মা ও বাবা – মিতুল তাদের মাম্মা ও বাবাইয়া বলে ডাকে। ওদের সঙ্গেই থাকেন মিতুলের ঠাম্মা ও দাদু, ছোটবেলায় ঠাম্মা বলতে পারতো না মিতুল, সে তাঁকে আম্মা বলে ডাকে । আর থাকে কাঁথির কাছে এক গ্রাম থেকে আসা রূপাদিদি – সে মাম্মা ও ঠাম্মাকে রান্নায় সাহায্য করে, মাঝে মাঝে বেশ ভালো চিকেনকারি রান্না করে, মিতুল-টুটুলকে চান করিয়ে দেয়, গুনগুন করে গান গেয়ে টুটুলকে ঘুম পাড়ায়, রূপাদিদি খুব ভালোবাসে তাদের…

দক্ষিণ দিল্লীর আর কে পুরমে আটতলা উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ির চারতলায় থাকে মিতুলরা, লম্বা করিডোরের দু’পাশ ধরে ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজা । গরমকালে সেই ঢাকা করিডোর থাকে বেশ ঠাণ্ডা, আর সেই করিডোরে শতরঞ্চি পেতে সকালবেলা মিতুল, তারই সমবয়সী বর্নিকা, পল্লবী, বৈশালী আর ও’দের চেয়ে একটু বড় নিধিদিদি ও স্বাতীদিদিদের সঙ্গে তাদের খেলার সংসার সাজিয়ে বসে । ছোট্ট গ্যাসের উনুনে ঠান্ডা জলেই তাদের ভাত ফোটে, গাছের পাতা দিয়ে সবজি হয় আর সাদা প্লাস্টিকের বোতল থেকে মিছিমিছি দুধ ঢেলে ক্ষীরও তৈরি করে তারা, পুতুলদের জন্য এলাহি ভোজের বন্দোবস্ত একেবারে।

বারো’টা বাজলে আম্মা’র ডাকাডাকিতে মিতুল বাড়ি ঢোকে, রূপাদিদির কাছে চান করে সে । এরপর আম্মা তার খোপকাটা খাবারের থালায় আলু-ডিম-বীন্স সেদ্ধ দিয়ে ডাল মেখে ভাত খাইয়ে দেন; মাছের কাঁটা বেছে দিলে সে মাছও খেয়ে নেয় টপাটপ ! কিন্তু মিতুলের তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়ার আসল কারণটা হ’ল খেতে খেতে আম্মা’র কাছে গল্প শোনা; আম্মা একটা গল্প শেষ করেননা কখনও, খাওয়া সেরে বিছানায় তাঁর পাশে শুয়ে গল্পটা’র শেষ শুনতে শুনতে মিতুল ঘুমিয়ে পড়ে… রাতেও একই রুটিন; আম্মার ভাঁড়ারে গল্পের স্টক অফুরন্ত – রাজা-রাণী, রাজপুত্তুর-রাজকন্যে, রামায়ণ-মহাভারত আর ভূত-পেত্নী, দত্যি-দানো’র গল্প সব; দু’হাতে আম্মা’র গলা জড়িয়ে সেসব গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ে মিতুল…

বিকেলটা মিতুলের কাটে তার দাদুর সঙ্গে – সাড়ে পাঁচটা-ছ’টার সময় সূর্যের তাপ একটু কমলেই মিতুলকে তৈরি করে দেয় রূপাদিদি, একগ্লাস দুধ খেয়ে, ছোট ছোট ফুলের প্রিন্টের ফ্রক কিংবা জীন্সের হাফপ্যান্ট ও টি-শার্ট পরে মিতুল দাদুর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে । দাদু কোনও দিন নিয়ে যান বাড়ির কাছেই দূর্গামন্দিরে, একটু দূরের ‘রক গার্ডেন’ বা শান্তিনিকেতনের পার্কে, সেখানে স্লাইড ও দোলনা আছে… বেশী অন্ধকার হওয়ার আগেই ফিরে আসে তারা তাদের ফ্ল্যাট বাড়ির ক্যাম্পাসের মধ্যে; গেটের ঠিক বাইরেই এক চীনে বাদামওয়ালা বসে, এক ঠোঙা বাদাম কিনে তাদের ক্যাম্পাসের বাগানে বসে দাদু খান আর খোসা ছাড়িয়ে কয়েকটা বাদাম মিতুলকে দেন । দাদু-নাতনির সখ্য এভাবেই বেড়ে চলে…

কয়েকমাস বাদেই স্কুলে যাওয়া শুরু করবে মিতুল, ডি পি এস-আর কে পুরম স্কুলের ইনফ্যান্ট সেকশনে তার এডমিশনও হয়ে গেছে । আরও দু’টো স্কুলে চান্স পেয়েছিল সে, তার বাবার পছন্দ ছিল এক মিশনারী স্কুল । কিন্তু ডি পি এস ইনফ্যান্ট স্কুলে মিতুল দেখে একটা বিরাট কাচের বাক্স, তাতে অনেক রঙিন মাছ আর একটা বড় খাঁচায় অনেকগুলো খরগোশ ছুটোছুটি করছে – ব্যাস, মিতুল বায়না ধরে, ওই খোগ্গসওয়ালা ডি পি এসেই পড়বো আমি ! মা তার বাবাকে বোঝায়, মিশনারী স্কুলটা তো শুধু মেয়েদের জন্য, টুটুলকে তাহলে আবার অন্য স্কুলে ভর্তির ঝামেলা হবে । আর ডি পি এস কো-এড স্কুল, ওখানে দিদি পড়ে বলে দু’বছর পর টুটুল এডমিশনের সময় একটু বাড়তি সুবিধেও পাবে । তাই ডি পি এস ইনফ্যান্ট স্কুলেই মিতুলের ভর্তির জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে ।

মিতুলের সব খেলনাগুলো একটা বড় প্লাস্টিকের বালতিতে রাখা থাকে… সন্ধ্যাবেলা তার পুতুলের সংসার ছড়িয়ে মিতুল খেলতে বসে । তার এক নীল রঙের শুঁড়তোলা হাসি হাসি মুখের হাতি আছে, বাবাইয়া তার নাম দিয়েছে ‘নীলমাধব’; এক পাটকিলে রঙের শান্তশিষ্ট শিম্পাঞ্জী, বাবা তার নামকরণ করেছে ‘ঘটোৎকচ’, এক সোনালি চুলের স্কার্ট পরা রোগাসোগা মেমসাহেব পুতুল, বাবা তাকে বলে ‘সুন্দরী শাঁকচুন্নি’… এসব নাম শুনে মিতুল খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে… কিন্তু কাচের আলমারিতে সাজানো দু’টো সিরামিকের সাহেব-মেম আছে, তাদের নিয়ে খেলা মিতুলের একদম মানা; সে সাহেব-মেম নাকি আম্মা’র মায়ের পুতুল, অনেক বছর আগে বিদেশ থেকে আনা… তবে হ্যাঁ, মাম্মা বলেছে যে মিতুল বড় হলে তাকে পুতুলগুলো নিয়ে খেলতে দেওয়া হবে… কে জানে কবে যে মিতুল বড় হবে ?

মিতুলের বাবাইয়া ভারত সরকারের অফিসার, কাজে তাঁকে দিল্লী’র বাইরে যেতে হয় প্রায়ই… বাবাইয়া হায়দ্রাবাদ, চেন্নাই, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, আহমেদাবাদ, ভোপাল, ইন্দোর… সব শহর চষে বেড়ান; মিতুল কিছুদিন আগেও ব্যাঙ্গালোর বলতে পারতো না, বলতো, ‘বাবাইয়া ব্যাঙ্গাদোলদোল গেছে’ । আর বাবাইয়া কাজে এক-দু’দিনের জন্য বাইরে গেলেই মিতুল তাঁর ফেরার সময় উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে, কাজের ফাঁকে সময় করে বাবাইয়া ঠিক মিতুলের জন্য একটা নতুন পোষাক বা খেলনা কিংবা নিদেনপক্ষে একটা চকলেটের বার নিয়ে আসে… তাতেই মিতুল মহাখুশী !

আজ সকালে কাচের আলমারি খুলে ভেতরের জিনিসের ধূলো ঝাড়ার সময় রূপাদিদির হাত থেকে সিরামিক সাহেব পুতুলটা পড়ে গিয়ে ভেঙে খানখান… এমনই টুকরো হয়ে ভেঙেছে যে তাকে কিছুতেই জোড়া দেওয়া সম্ভব নয় । রূপাদিদি এমনিতে খুবই সাবধানী, সে-ই মাঝে মাঝে আলমারির জিনিস পরিস্কার করে, কোনওদিন এমন হয়না… বাড়িসুদ্ধু সকলের ভীষণ মন খারাপ, রূপাদিদি তো কান্নাকাটি করছিল, আম্মার চোখেও জল । মিতুলের মনটা বিশেষ ভাবে খারাপ, আহারে ! ওই মেমসাহেবের এতদিনের বন্ধুটা চলে গেল; বড় হয়ে তারও আর ওই পুতুল দু’টো নিয়ে খেলে করা হবেনা !

দু’-তিনদিন পর বাবাইয়া অফিস থেকে ফিরে এসে বললে তাকে অফিসের বিশেষ কাজে এক সপ্তাহের জন্য জার্মানি যেতে হবে । মাম্মা একথা শুনে প্রথমেই বলে, ‘টুটুলের জন্য ওখান থেকে ভালো ডায়াপার নিয়ে এস তো, ওগুলো অনেক বেশী কাজের’ । মিতুল বলে, ‘বাবাইয়া, অনেক ছবি তুলো কিন্তু, জার্মানি কি রকম আমি দেখব’…

জার্মানির কাজ শেষে বাবাইয়া ফিরেছে ভোরবেলা, গলার আওয়াজ পেয়ে উঠে পড়েছে মিতুল তাড়াতাড়ি, বাবার স্যুটকেস থেকে বেরোচ্ছে অনেক জিনিস, একটা বিরাট প্লাস্টিকের থলে ভর্তি কতরকমের চকলেট, মিতুলের জন্য দারুণ ফ্রক ও একটা মেম পুতুল, টুটুলের জন্য টি-শার্ট আর ডায়াপারের বিরাট স্টক, মাম্মা’র জন্য পারফিউম, আম্মা-দাদু-দিম্মা ও দাদুভায়ের জন্য কার্ডিগান, রূপাদিদির জন্য একটা সুন্দর স্কার্ফ… সবশেষে বাবাইয়া বার করে খুব যত্ন করে মোড়া একটি প্যাকেট, মোড়ক খুলে বাবাইয়া বার করে একটা সিরামিকের পুতুল… অবিকল সেই ভেঙে যাওয়া সাহেবটি’র জোড়া যেন… সেটা দেখে আনন্দে হৈ হৈ করে ওঠে সবাই !